আজকের শব্দ বিজয়া ও চণ্ডু।
বিজয়াদশমীর ‘বিজয়া’ প্রকৃতপক্ষে যে কী তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যেই মতবিরোধ আছে।
প্রধান যে মতটি চালু, তা হচ্ছে, এই বিশেষ দিনটিতে রামচন্দ্র লঙ্কাজয় সম্পূর্ণ করেছিলেন, অর্থাৎ রাবণবধ সংঘটিত হয়েছিল এদিন৷ লঙ্কাবিজয় থেকেই ‘বিজয়াদশমী’র উদ্ভব৷ কালীপুজোর দীপাবলিতে নাকি রামচন্দ্র গৃহপ্রত্যাবর্তন করেছিলেন, সেইজন্য চর্তুদিক সেদিন আলোয় আলো৷
বিজয়াদশমী নিয়ে আরও একটি মত হল, শরৎকালের এই সময়ে অনেক জায়গায় ফসল ঘরে উঠতে শুরু করে৷ শস্যসম্ভার গোলায় ওঠা বা শস্যবিজয়কে স্মরণ করতেই নাকি এই ‘বিজয়াদশমী’৷
কোন্ মতটি ঠিক সে নিয়ে পণ্ডিতরা ধন্দে৷ এ বিষয়ে তৃতীয় একটি মতের উপস্থাপনা করছি। তার জন্যে কালীপ্রসন্ন সিংহের শরণাপন্ন হতে হয়। বিজয়াদশমীর নিখুঁত বিবরণ পাচ্ছি কালীপ্রসন্ন সিংহের লেখা ‘হুতোম প্যাঁচার নকশায়’৷
দুর্গোৎসব অধ্যায়ে তিনি লিখেছেন,
‘‘কর্মকর্তারা প্রতিমা নিরঞ্জন করে, নীলকণ্ঠ শঙ্খচিল উড়িয়ে ‘দাদা গো’ ‘দিদি গো’ বাজনার সঙ্গে ঘট নিয়ে ঘরমুকো হলেন৷ বাড়ীতে পৌঁছে চণ্ডীমণ্ডপে পূর্ণ ঘটকে প্রণাম করে শান্তিজল নিলেন, পরে কাঁচা হলুদ ও ঘটজল খেয়ে পরস্পরকে কোলাকুলী কল্লেন৷ অবশেষে কলাপাতে দুর্গানাম লিখে সিদ্ধি খেয়ে বিজয়ার উপসংহার হলো’’৷
অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে বিজয়ার শেষ পাতে সিদ্ধি বা ভাঙ ছিল একটি অপরিহার্য অঙ্গ৷ বাংলা ভাষার দুটি প্রধান অভিধানে (হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস প্রণীত) ‘বিজয়া’ শব্দের একটি প্রধান অর্থ সিদ্ধি বা ভাঙ৷ সিদ্ধিপান বা ভাঙ খাওয়া একটি সর্বজনবিদিত প্রথা বিজয়াদশমীতে৷ ‘বিজয়া’ পান করা হয় যে দশমীতে তাই আসলে বিজয়াদশমী৷ ‘ সত্যনারায়ণকথকতা’য় আছে, —
‘গৈরিকের বস্ত্র কটিতে আঁটা,
প্রয়াগের রুলি কপালে ফোঁটা,
শিরে জটাভার কুণ্ডল কানে,
ঢুল ঢুলু আঁখি বিজয়াপানে৷’
এখানে বিজয়া যে সিদ্ধির সরবত, তা কাউকে বলে দিতে হয় না।
অর্থাৎ ‘বিজয়া’ তথা সিদ্ধি-ভাঙ পান করা হয় বলেই দেবী দুর্গার বিসর্জনের দিনটিকে বিজয়াদশমী বলা হয়৷
আবার অন্যদিকে বিজয়া দুর্গার এক নাম, দুর্গার সখীর নামও বিজয়া৷ এই বিজয়ারূপ দুর্গার দশমীই কি বিজয়াদশমী? প্রশ্নই শুধু তোলা যায়, উত্তর কে দেবে?
বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের আর একটি স্থির বিশ্বাস এই যে তর্কপ্রিয় ও আড্ডাপ্রিয় বাঙালির আড্ডার উৎসস্থল হল চণ্ডীমণ্ডপ৷ শুধু তাই নয়, চণ্ডীমণ্ডপের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে অশ্লীলতা ও পরনিন্দা-পরচর্চার অনুযোগ৷
সত্যিই কি তাই? তিন-চারশো বছর আগে গোঁড়া ধর্মীয় পরিমণ্ডলে গৃহস্থের চণ্ডীমণ্ডপে কি আড্ডা নামক বস্তুটি সহজসাধ্য ছিল? ধর্মীয় অনুশাসন যেখানে নিত্যদিন চণ্ডীপাঠের আয়োজনে মানুষকে সদাব্যস্ত রাখত, সেখানে আড্ডার ফুরসত মিলবে কিভাবে?
অথচ পণ্ডিতরা ‘চণ্ডু’ শব্দটিকে দিব্যি ভুলে গেছেন৷ ‘চণ্ডু’ মানে ‘আফিং’৷ তিন-চারশো বছর আগে গড়পড়তা বাঙালি আফিংয়ের মৌতাতে বুঁদ হয়ে থাকত৷ সন্ধে হলেই আফিংয়ের ঠেকগুলি জমজমাট হয়ে উঠত৷ কলকাতার বাগাবাজার-বটতলা-গরানহাটায় ছিল বিখ্যাত সব ঠেক৷ ‘চণ্ডুখোর’ বাঙালিরা ‘চণ্ডুমণ্ডপ’-এ ভিড় জমাত৷ আজ্ঞে হ্যাঁ, চণ্ডুমণ্ডপ আর কিছু নয়, নিখাদ আফিংয়ের ঠেক৷ আফিংয়ের নেশার ঝোঁকে মাথায় নতুন নতুন আইডিয়া ভিড় করত, জমে উঠত কথার পিঠে কথা তথা আড্ডার মজলিশি সন্ধ্যা৷ শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্তের মেজদা তিনবার ম্যাট্রিক ফেল করে চতুর্থবারের জন্যে তৈরি হচ্ছিলেন এই আফিংশাসিত পারিবারিক চৌহদ্দিতে৷ উত্তর কলকাতার বিখ্যাত পক্ষীর দলও তো আফিং-গাঁজা-গুলির শুকনো নেশায় বুঁদ হয়ে থাকত।
আফিং কিন্তু সে যুগে তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের, নিন্দেমন্দ পাওয়ার বস্তু ছিল না, আফিং তখন সমাজে জলচল ছিল রীতিমতো৷ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঠাকুরদা দ্বারকানাথ ঠাকুর নিজের মেধা ও অধ্যাবসায়ের জোরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ‘কাস্টমস ও অহিফেন বিভাগের দেওয়ানি’ লাভ করেছিলেন৷ এই পদটি ছিল রীতিমতো গর্বের ও সম্মানের৷ টাটাদের আদিপুরুষ চিনের সঙ্গে যে আফিংয়ের ব্যবসা করে টুপাইস কামিয়েছিলেন সেকথাও আমরা জানি৷ বস্তুত ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আফিং-এর ব্যবসা শিখেছিল ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে৷ ডাচ বা ওলন্দাজরা সেই সপ্তদশ শতক থেকেই আফিং বা চণ্ডুর ব্যবসায়ে নাম করেছিল৷ দ্বারকানাথ ঠাকুরের সঙ্গে ডাচ কোম্পানির যোগাযোগ ছিল ভালোই৷ ‘ঠাকুর’ থেকে’ Tagore’ হওয়ার পেছনে এই বণিকদের হাত থাকতেই পারে৷
যাই হোক, জুতো সেলাই থেকে ‘চণ্ডুপাট’ করার অভ্যাস সে যুগে অনেক বাঙালিরই ছিল৷ চণ্ডুমণ্ডপে সান্ধ্যকালীন আসরে আফিং-এর সাজসরঞ্জাম ঠিকঠাকভাবে সাজিয়ে রাখার নাম ছিল ‘চণ্ডুপাট’ করা৷
চণ্ডীপাঠ হত অন্যত্র, ধর্মীয় ভাবগম্ভীর পরিবেশে বাঙালির পবিত্র চণ্ডীমণ্ডপে৷ চণ্ডীমণ্ডপ আর চণ্ডুমণ্ডপকে গুলিয়ে ফেলে তর্কপ্রিয় বাঙালি বিতর্ক সৃষ্টি করেছে চিরকাল। চণ্ডীমণ্ডপে নয়, আড্ডার উৎসস্থল যে চণ্ডুমণ্ডপ বা ‘আপিং-মাচান’, তা বাঙালিকে বোঝায় কে!