কতকগুলি বাংলা শব্দের ব্যুৎপত্তি খুঁজতে গেলে কূলকিনারা পাওয়া যায় না। অভিধানগুলি নীরব। বিভিন্ন গ্রুপ বা সোস্যাল সাইটে শব্দগুলিকে নিয়ে হাসিমশকরা চলে। ঠাট্টা-ইয়ার্কির চোটে আসল উদ্দেশ্যটাই পণ্ড হয়। মূল লক্ষ্য থেকে সকলে সরে যায়। এখানে বেশ কিছু শব্দের অভিধানবহির্ভূত ব্যুৎপত্তি নির্ণয়ের চেষ্টা করব। আজকে প্রথম কিস্তি।
এক
ডাকসাইটে
ডাকসাইটে শব্দটি আমাদের অভিধানকারদের ঘোল খাইয়ে ছাড়ে। এর ব্যুৎপত্তি খুঁজতে ডাকিনী-যোগিনী, পিশাচিনীদের টেনে আনতে হয়। ডাকিনীবিদ্যায় সিদ্ধ যে সেই নাকি ডাকসিদ্ধ বা ডাকসাইটে।
আসলে তা নয়। লাগসই, জুতসই, টেকসই, মানানসই, মাপসই ইত্যাদি শব্দগুলির মতই শব্দ ডাকসই। সই এখানে সহিত। আসল শব্দগুলি যথাক্রমে লাগসহিত, জুতসহিত, টেকসহিত, মানানসহিত, ডাকসহিত। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ-এ এই সহিতকে বিশেষণপদ বলা হয়েছে। বহুব্রীহি সমাস। উদাহরণ আছে, হিতসহিত। মানে শুভান্বিত, সুলক্ষণ।
ডাকসই শব্দটির ব্যবহার আছে সাহিত্যে। যেমন ডাকসই কবি। আসলে ডাকসহিত কবি। মানে নামডাকওয়ালা কবি। ডাকসহিত অন্য পথে (অপভ্রংশে) ‘ডাকসাহিতে’ তথা ডাকসাইটে হয়ে গেছে।
ডাকিনীবিদ্যার কোনও ব্যাপারই নেই এখানে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের Bichitra Online Tagore Variorum থেকে জানতে পারছি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সমগ্র সাহিত্যে চারবার ‘ডাকসাইটে’ লিখেছেন। একবারও ‘ডাকসাইটে সুন্দরী’ লেখেননি। লিখেছেন, ডাকসাইটে পালোয়ান, ডাকসাইটে জ্যোতিষী, ডাকসাইটে নিন্দুক আর ডাকসাইটে কয়েতবেল। ‘ডাকসাইটে সুন্দরী’ রবীন্দ্রপরবর্তী যুগের আমদানি।
দুই
গোয়েন্দা কেন টিকটিকি
গোয়েন্দা বা পুলিশের ইনফর্মারকে কেন টিকটিকি বলে, তা নিয়ে প্রায়ই দেখি বিভিন্ন আড্ডায়, বিতর্কসভায় নরক গুলজার হচ্ছে। প্রায় প্রত্যেকেই টিকটিকি নামক এক নিরীহ প্রাণীকে টেনে আনছেন এর ব্যাখ্যায়। টিকটিকি দিয়ে জুত না হলে তার বড়দা গিরগিটিকেও জড়িয়ে নেওয়া হচ্ছে। তাদের নিঃশব্দ পদচারণা, ক্ষিপ্রতা, রং বদলে ফেলার মুন্সিয়ানার সঙ্গে গোয়েন্দা তথা পুলিশের খোঁচড়দের তৎপরতাকে মেলানো হচ্ছে। এছাড়া উপায়ও নেই কারোর।
অথচ হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ দেখলে যে কেউ জানবেন বাংলায় ‘টিকটিকী’ বলে আর একটি জিনিস আছে। এটি এসেছে তৎসম ‘ত্রিকাষ্ঠী’ থেকে। মানে কাঠের তিনটি দণ্ড দিয়ে তৈরি একটি কল, যার সঙ্গে অপরাধী বা দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির হাতপা বেঁধে শরীরে বেত্রাঘাত করা হত আগে। একটি লব্জই ছিল ‘টিকটিকিতে চড়ানো’। এই গ্যাঁড়াকলটি ব্রিটিশ আমলেও ছিল। পুলিশের যে সহকারীরা এই বেত মারার কাজ করত, তাদের টিকটিকী-পুলিশ বলা হত। পরে পুলিশই টিকটিকি হয়ে গেল লোকমুখে।
গোয়েন্দাকেও বৃহত্তর অর্থে আইনের রক্ষক তথা পুলিশের সঙ্গে একাসনে বসানো হত। বস্তুত যে কোনও গোয়েন্দা গল্পের শেষ পর্বে পুলিশের আগমন ঘটে। দুষ্টের দমনের জন্যে তৈরি এই ‘টিকটিকী’-ই গোয়েন্দা তথা গোয়েন্দাপুলিশ তথা পুলিশের খোচড়দের টিকটিকি বানিয়ে দিয়েছে। নিরীহ সরীসৃপের কোনও ভূমিকা নেই।
তিন
নাপিত কেন নরসুন্দর
নাপিতকে বলে নরসুন্দর। কেননা তিনি নরকে কামিয়ে সুন্দর করে তোলেন। আমি অবশ্য অনেককে জানি যাদের দাড়িগোঁফ কামালে অতীব কুশ্রী লাগে। মাকুন্দসুন্দরের মত আর কী! তা হলে অভিধানকাররা কি ভুল বলেছেন? সেটা তো আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। আমি অতি নগণ্য মানব। তবে বিকল্প চিন্তা একটি করা যায় বই কী। নরসুন মানে নাপিতের খুর। নরসুন শব্দটির ব্যবহার বাউলগানে পেয়েছি। এটি নরকু নামক তামিল শব্দ থেকে আগত অনেক কর্তন যন্ত্রের একটি। নরসানি বা নরসিং কাটারি, নরুন, নারিচ (তীরের ফলা), নরিয়ান (কাতান বা হেঁসো) ইত্যাদি হল অন্যান্য যন্ত্রগুলি। নরসুন দিয়ে কাজ করা যার পেশা, সেই হল নরসুনদার। মানে নাপিত। ঝাড়ুদার, বেলচাদারের মতো। নরসুনদারকেই নরসুন্দর বানিয়ে নিয়েছেন আমাদের পণ্ডিতকুল। আমজনতাও সংস্কৃত মূলে পৌঁছাতে পেরে যারপরনাই আহ্লাদিত।
চার
চুদুরবুদুর মানে কী
পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত বাংলাভাষার প্রামাণ্য কোনও অভিধানে ‘চুদুরবুদুর’ শব্দটির দেখা পাবেন না। মানেটা যে কী, সেটাই জানা যায় না। অথচ অশ্লীল অর্থে প্রয়োগ হচ্ছে দেদার। বাংলাদেশের সংসদে এক মহিলা সাংসদ কথাটি ব্যবহার করেছিলেন কয়েকবছর আগে। ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়া চুদুরবুদুর চইলত না’ বলেছিলেন তিনি। তখন শব্দটি শ্লীল না অশ্লীল, তা নিয়ে দু-বঙ্গ ও ত্রিপুরায় বেশ বিতর্ক হয়েছিল। শ্রদ্ধেয় ভাষাবিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন শব্দটি কোনও মতেই অশ্লীল নয়।
মানে হচ্ছে উল্টোপাল্টা বকা, এদিক-সেদিক কথা বলা। বাড়াবাড়ি, গড়িমসি ইত্যাদি বোঝাতেও এর ব্যবহার হয়। কিন্তু কেউ শব্দটির ব্যুৎপত্তি দিতে পারেননি। গ্রাম্য বা দেশি বলেই খালাস।
এটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে অনেকগুলি কৃষিভিত্তিক বাগধারার সন্ধান পাই, যা মানুষের বাচনবৈশিষ্ট্যকে চিহ্নিত করে। যেমন, ধানাইপানাই করা, তিলকে তাল করা, খেঁজুরে আলাপ করা, আমড়াগাছি করা, মুখে খই ফোটা, ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়া, বসে বসে জাবর কাটা, তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠা ইত্যাদি। ভালো করে লক্ষ করলে দেখা যাবে, কথা বলার বিভিন্ন ভঙ্গি বা ধরন এগুলি। প্রত্যেকটিতেই ফল বা ফসলের নাম।
এই ক্রমপর্যায়েই আসবে ‘চুদুরবুদুর করা’ বাগধারাটি। চূত মানে আম আর বদর মানে কুল। আমকাঁঠাল যেমন দ্বন্দ্ব সমাস, চূতবদর তেমনি। এবার দেখুন আম ও কুলের বৈপরীত্য। আম গ্রীষ্মকালীন ফল, কুল শীতকালীন, আম আকারে বড়, কুল ছোট, আম মিষ্টতার দ্যোতক, কুল অম্লতার। সুকুমার রায়ের আবোলতাবোলে পাবেন, — “আম পাকে বৈশাখে, কুল পাকে ফাগুনে/ কাঁচা ইট পাকা হয় পোড়ালে তা আগুনে”। তাই উল্টোপাল্টা বকা তথা এদিক-সেদিক বা আবোলতাবোল বকাকে চূতবদর করা বলা হত। চূতবদর-কে সমাসবদ্ধ পদ না ধরলেও একই অর্থ দাঁড়াবে। ‘চূত-র বদর করা’ বললেও বুঝতে ভুল হবে না। যাই হোক, অপভ্রংশে ‘চূতবদর’ হয়ে গেল ‘চুদুরবুদুর’। আবার গাছে আম ফলার কাল ও কুল ফলার সময়ে বিস্তর ব্যবধান। একটার পর আর একটা পেতে অনেক কালক্ষেপ করতে হয়। তাই গড়িমসি বা বাড়াবাড়ি বোঝাতেও চূতবদর বা ‘চূত-র বদর’ বা চুদুরবুদুর করা-র ব্যবহার আছে। টালবাহানা বোঝাতেও চুদুরবুদুর-এর প্রয়োগ হয়।
তাই চুদুরবুদুর অশ্লীল নয়, অন্য একটি জৈবিক-ক্রিয়াবাচক শব্দের সঙ্গে ধ্বনি-সাদৃশ্যের জন্যে চুদুরবুদুর অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হয়েছে। বাস্তবে তা নয়।