হুগলীর তারকেশ্বর পুরসভার ১১ ওয়ার্ডের জ্যোৎশম্ভু গ্রামকে অনেকেই বহুরূপী গ্রাম নামেই চেনেন। এখানকার ৩৫ থেকে ৪০ টি পরিবারের মানুষ কয়েক দশক ধরে বংশপরম্পরায় বহুরূপী পেশাতে কাজ করে আসছেন। কিন্তু বেশ কিছু বছর ধরেই এই পেশায় রোজগার কমে গিয়েছে, তবুও অনেকেই বাপ ঠাকুর্দার কালের পেশা বদল করেননি। কিন্তু করোনাকালে তাদের অবস্থা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
সারা বছর বছর ধরে শিব, কালী, দুর্গা সেজে পথেঘাটে ঘুরে ঘুরে ওঁরা মানুষের সামনে গিয়ে দাড়ালে সাধারণ মানুষ ভক্তিভরে প্রণামী দিতেন। আর সেটা সম্বল করে কোনমতে দিন গুজরান হত ওই বহুরূপীদের। কিন্তু লকডাউনের আবহে এই সব দেব-দেবীর বেশধারী বহুরূপীদের পাড়ায় নেমে আসে আকাল। কারণ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ছিল ট্রেন চলাচল। তার ফলে রোজগারে টান পড়ে ওদের। কারণ আশপাশের এলাকায় ঘুরে ঘুরে তেমন আর রোজগার হয় না। তারকেস্বর থেকে ট্রেনে উঠে কলকাতা বা সংলগ্ন বিভিন্ন অঞ্চলে না পৌঁছালে আয় হয়না।

যদিও মাঝে মধ্যে নানা এলাকায় চাল, ডাল, আলু বিলি করা হয়েছে। লাইনে দাঁড়িয়ে সেই সব সংগ্রহ করেই কোনওক্রমে টিকে ছিল ওঁরা। কিন্তু এই ভাবেই বা আর কতদিন!
ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হওয়ায় একটু হলেও জ্যোৎশম্ভু গ্রামের বহুরূপীদের মুখে হাসি ফুটেছে। এতদিন স্টাফ স্পেশাল ট্রেন চললেও তাদের ট্রেনে উঠতে দেওয়া হত না। ফের সংখ্যায় কম হলেও ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হওয়ায় প্রতিদিন সকালে সূর্য উঁকি দিলেই ওঁরা সবাই রং তুলি নিয়ে বসতে শুরু করেছে। ফের শিব-কালী-পার্বতী সেজে ট্রেনে উঠে কলকাতা অথবা অন্যান্য এলাকায় সন্ধ্যে পর্যন্ত টানা ভিক্ষা। সারাদিনের সেই সংগ্রহ দিয়ে কোনওক্রমে অভাবের সংসারকে টেনে তোলার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন ওঁরা।

প্রশ্ন ছিল পঞ্চাশ শতাংশ যাত্রীর পরিমাপ করবে কে? রেলের তরফ থেকে জানানো হয়েছিল আরপিএফ এবং জিআরপি নজরদারি চালাবে স্টেশনে স্টেশনে। কিন্তু তারকেশ্বর স্টেশনের চিত্রটা একেবারেই আলাদা। সকাল থেকে পঞ্চাশ শতাংশ নয় একশো শতাংশ যাত্রী নিয়ে ট্রেন ছুটছে তারকেশ্বর থেকে হাওড়া এবং তারকেশ্বর থেকে গোঘাট।

ওই সব ট্রেনের যাত্রীদের অনেকের মুখেই মাক্স নেই, নেই সামাজিক দূরত্বের বালাই। দেখে মনে হবে না করোনা নামক কোন ভাইরাস মানব জীবনে প্রভাব ফেলেছে। তারকেশ্বর স্টেশন থেকে ট্রেনের ভিতরের ছবিটা দেখলেই আঁতকে উঠবেন অনেকে। করোনাকালে মাস্কবিহীন মানুষজনের এই ছবিটা দেখে তাই অনেকেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন, কোথায় জিআরপি আর কোথায় রেলের সুরক্ষা বাহিনী? মাত্র দুদিন হল ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে তার মধ্যে একদিন ছিল রবিবার। ছুটির দিনে সেরকম ভিড় নজরে পড়েনি ঠিকই তবে সপ্তাহের প্রথম দিন সোমবার সকাল থেকেই সেই চেনা ছবি ধরা পরেছে তারকেশ্বর স্টেশন এবং ট্রেনের কামড়ার ভিতরে। যে ছবিটা সত্যি কিন্তু উদবেগের।