“আলু বেচো, ছোলা বেচো, বেচো বাকরখানি, বেচো না বেচো না বন্ধু তোমার চোখের মণি…” প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া একটি জনপ্রিয় গান। যে গানের মধ্যে উল্লেখ আছে এপার-ওপার দুই বাংলার মানুষের প্রিয় একটি খাবারের স্বাদ— বাকরখানি (একধরনের রুটি)। স্বাভাবিক তাপমাত্রায় এই রুটি দীর্ঘদিন ভালো থাকে।
ঐতিহ্যবাহী রকমারি খানার সমারোহ বাংলাদেশকে পৌঁছে দিয়েছে বিশ্বের দরবারে। তার অনেক খাদ্যের নামকরণে জড়িয়ে রয়েছে কোন একটি স্থানের বা ঘটনার ইতিহাস। যেমন বাকরখানি নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক করুণ প্রেমের ইতিহাস।
পুরোন ঢাকার ইতিহাস থেকে জানা যায়, নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর দত্তক ছেলে আগা বাকের ও মুর্শিদাবাদের নর্তকী খনি বেগমের মধ্যে প্রণয়ের সম্পর্ক ছিলো। এই প্রণয় যুগলের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন উজিরেআলা জাহান্দর খাঁর পুত্র জয়নল খান। খনি বেগমের কাছ থেকে প্রেমের প্রত্যাখ্যান পেয়ে, দুশ্চরিত্র জয়নাল খনি বেগমের ক্ষতি করার চেষ্টা করে। খবর পেয়ে বাকের সেখানে গিয়ে যুদ্ধ করে তলোয়ারবাজিতে জয়নালকে হারিয়ে দেন। কিন্তু জয়নালের বন্ধুরা গুজব ছড়িয়ে দেন যে, বাকের জয়নালকে হত্যা করে মৃতদেহ গুম করে দিয়েছে।

অভিযোগ দরবারে পৌঁছায়। ন্যায়পরায়ণ রাজা মুর্শিদকুলি পুত্রের প্রণয়ের খবর জানতেন না। মিথ্যা সাক্ষ্যের ভিত্তিতে নিজের ছেলেকে বাঘের খাঁচায় নিক্ষেপ করেন। যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী বাকের বাঘকে হত্যা করে খাঁচা থেকে বেরিয়ে জানতে পারেন জয়নাল খনি বেগমকে অপহরণ করে দূর্গম চন্দ্রদ্বীপের গভীর অরণ্যে পালিয়ে গেছেন। বাকের প্রেমিকাকে উদ্ধারের জন্য চন্দ্রদ্বীপে যান। এদিকে ছেলের কুকর্মের খবর জানতে পেরে উজির জাহান্দার খান শাস্তির উদ্দেশ্যে অসির আঘাত করেন ছেলেকে। আঘাতে মরণাপন্ন জয়নাল প্রতিশোধ স্বরূপ খনি বেগমকে হত্যা করেন।
আগা বাকরের নাম অনুসারে বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ (পটুয়াখালী-বরিশাল) এর নাম করা হয় বাকেরগঞ্জ।
এই বাকেরগঞ্জেই সমাধিতস্থ করা হয় খনি বেগমকে।
আগা বাকেরের সঙ্গে খনি বেগমের প্রেমের ইতিহাস স্মরণ রাখতে তিনি একপ্রকারের শুকনো রুটি জাতীয় খাবার প্রস্তুত করালেন। নাম দেন ‘বাকেরখনি’। আম জনতার মধ্যে বাকের বাঁচিয়ে রাখলেন তাঁর মরহুম দয়িতাকে। তবে সেই আম জনতার মধ্যে থাকতে থাকতে তার নাম হয়ে গেলো ‘বাকরখানি’।

বাংলাদেশের মানুষের কাছে এটি ‘শুকা’ বা নিমশুকা (শুকনা) রুটি নামে পরিচিত। গও, জোবান, চিনশুখা, কাইচারুটি , মুলাম, ভিগারুটি নানান ভাগ আছে বাকরখানির। মুঘল আমলে বাকরখানি জনপ্রিয়তা পেলেও, এটির উৎপত্তিস্থল আফগানিস্তান বা তার বাইরে বলে জানা যায়। পাঞ্জাবের অমৃত্সর থেকে কাশ্মীরিরা ঢাকায় বাকরখানি প্রচলন করেন। নবাবী আমলে মুর্শিদাবাদে, লক্ষ্নৌতে, আগ্রার মুঘল দরবারে সমাদৃত হয়েছিলো। প্রকৃতপক্ষে আজ গোটা ভারতবর্ষেই খাবারটি এতটাই প্রসিদ্ধ যে, বাকরখানি নামটি শুনলেই লোকের মনে বাংলাদেশের নাম মনে পড়ে।
সাধারণত ময়দা, ঘি, মেওয়ার খামির, লবন ও দুধ দিয়ে মন্ড তৈরি করা হয়। লেই কেটে রুটির মতো বেলে ছুরি দিয়ে তিনটে দাগ কেটে উনুনের আঁচে সেঁকে বাকরখানি তৈরি করা হয়। এখন অনেকেই ওভেন ট্রেতে মাখন ব্রাশ করে ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে প্রি-হিট করে ২০ মিনিট বেক করে নিয়ে তৈরি করে। কাশ্মীরি বাকরখানিতে তিল দেওয়া থাকে। মিষ্টি ও রসালো বাকরখানিও তৈরি হয়। দুধ আর চিনির সঙ্গে জ্বাল দিয়ে তৈরি বাকরখানির স্বাদ যেন শাহী টুকরার মতো। এছাড়া পনির, দুধের মালাই, নারকেল, সুজি, মাংস দিয়েও বাকরখানি বানানো হয়। ইউটিউব দেখেও বানানো যায় এই সুস্বাদু রুটি। জানা যায়, বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে লালবাগ কেল্লার কাছে ঢাকার প্রথম বাকরখানি দোকান গড়ে ওঠে।

পুরোনো ঢাকাবাসীর কাছে বাকরখানি অনেকটা ডালভাতের মতোন। সকালের নাস্তায়, বিকালে চায়ের সঙ্গে কিম্বা তরকারি, মাংস দিয়ে খেতে মন্দ লাগে না। প্রতি কেজি বাকরখানি ১২০ টাকা থেকে শুরু করে ৩০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ঐতিহ্যশালী বাকরখানি বর্তমানে ভারত, ব্রিটেন, কুয়েত, শ্রীলঙ্কা, সৌদি আরব-সহ বেশ কিছু দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। রমজান মাস ও অন্যান্য সময়ে কলকাতায় পাওয়া যায় বাকরখানি। আজো এই সুস্বাদু খাবার আগা বাকের ও খনি বেগমের প্রেম কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।।
তথ্যসূত্র : হাকিম হাবিবুর রহমান : ‘ঢাকা পচাস বরস পেহেলে’ উইকিপিডিয়া।
সুন্দর ভাবে পরিবেশন করেছেন। অজানা তথ্য জানতে পারলাম।
Thank you
Apnar lekhoni asadhoron
Thank you.
সত্যিই “প্রেমের বাকরখানি* স্বাদ প্রেম আর
ভালোলাগা ভালোবাসা বৃদ্ধি পেলো* সুন্দর
তথ্য বহুল রচনায় মুগ্ধতা।
অনেক ধন্যবাদ????
খুব ভালো লাগলো আপনার লেখা। বাকরখানি রুটি এই নাম টা প্রথম শুনি আমার পিতৃদেবের মুখে।স্বাদ ও জনপ্রিয়তার কথা। এতো বিস্তারিত ইতিহাস আমার অন্তত জানা ছিল না। শুভেচ্ছা একরাশ এই লেখাটি র জন্য।
ধন্যবাদ জানাই আপনাকে।