কেউ নির্মাণ কাজ করেন, কেউ জিনিস ফেরি করেন। যেটুকু পুঁজি ছিল শেষ হতে চলেছিল। মালিক দেখেননি। ২১ দিনের লকডাউন তাই দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায় এ রাজ্যের শ্রমিক, মজুরদের কাছে। তবু নিয়ম মেনে সামান্য পুঁজিতে ভর করে এ কদিন কাটিয়েছেন। তবে কারও সাহায্য মেলেনি বলেও অভিযোগ। লকডাউন আরও বাড়তেই চিন্তায় পড়েন গরিব, অসহায় এই মানুষগুলো। টিভির খবরে খালি হটস্পট, হটস্পট করে আতঙ্ক বাড়ানো হচ্ছে। হাওড়া, হুগলি হটস্পট বলে খবর আর গুজব মিলেমিশে একাকার। এই শ্রমিক আর মজুররা তাই পায়ে হেঁটে বেরিয়ে পড়েন কয়েকশো কিলোমিটার দূরে বাড়ি ফিরতে। বাড়ির নিরাপদ আশ্রয়ে কে না ফিরতে চায়? শুরু হয় হাঁটা, রেললাইন ধরে। হাওড়া, উত্তরপাড়া, ধূলাগড়, কলকাতা থেকে রওনা দেওয়া মানুষগুলো এভাবেই দু-তিন ধরে হেঁটে পৌঁছান হুগলির গুপ্তিপাড়া স্টেশনে। কারও গন্তব্য কাটোয়া, সালার, কেউ বা যাবেন জঙ্গিপুর, ফরাক্কা। পেটের টান, তাই খিদে মেটাতে কেউ বেচে দিয়েছেন মোবাইল। কাউকে আবার একটু এগোতে সিভিক ভলান্টিয়ার বা পুলিশকে হাতে কিছু দিতে হয়েছে বলেও অভিযোগ। পুলিশ সব জায়গায় ভালো কাজ করছে, সেখানে আবার এমন কিছুও আছে!

গুপ্তিপাড়া স্টেশনে তাঁরা পৌঁছাতেই অরুণ দেবনাথ, সাধন সেনগুপ্তর মতো তৃণমূল কংগ্রেসের পঞ্চায়েত সদস্যরা এই শ্রমিকদের খাওয়ানোর বন্দোবস্ত করেন। তাঁরা স্টেশন কর্তৃপক্ষকে বলেন, এই মানুষগুলোকে স্টেশনে থাকতে দেওয়া হোক, আমরা লকডাউন চলাকালীন তাঁদের খাওয়ানোর ব্যবস্থা করব। রেল জানিয়ে দেয় হবে না, এঁরা না সরে গেলে লাঠিচার্জ হবে। মানবিকতা! বিপন্ন মানুষের জায়গায় নিজেদের বসিয়ে ভাবলে যন্ত্রণা উপলব্ধি করা যায়।

ফলে আবার হাঁটা শুরু। চড়া রোদ, রেললাইনের গরম পাথরের উপর দিয়ে অন্তত ৭০ কিলোমিটার হাঁটা কম কথা নয়। পথের ক্লান্তিতে ওঁরা পারছিলেন না। গুপ্তিপাড়া স্টেশনের অদূরে তাঁদের পথ আটকায় পূর্ব বর্ধমানের কালনা থানার পুলিশ। রেল লাইন থেকে নেমে তাঁদের পূর্ব সাতগেছিয়া গ্রাম ধরে হেঁটে যেতে বলা হয়। কিন্তু গ্রামের মধ্যে ব্যারিকেডে তাঁদের আটকান সিভিক ভলান্টিয়াররা। গ্রামের মানুষ এতো অচেনা লোককে দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। কিছুক্ষণ রাস্তায় বসিয়ে রেখে তাঁদের লাইন করে নিয়ে যাওয়া হয় এসটিকেকে রোডের ধারে। কোনও দলের কোনও নেতা সাহায্য করতে এগিয়ে আসেননি। এক পুলিশকর্মী বলেন, এঁদের ছেড়ে দিলে আমাদের চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়বে। পুলিশ শ্রমিকদের বলে, যেখানে ছিলেন সেখান থেকে বেরোলেন কেন? প্রশাসন সাহায্য করত। পাল্টা শ্রমিকরা বলেন, সাহায্য পাইনি বলেই তো বাধ্য হয়েছি। এরপর পুলিশ বলে, আর এগোনো যাবে না। যেখান থেকে এসেছেন সেখানে ফিরে যান। অমানবিক নির্দেশ! অমানবিক! কাছেই কালনায় এসবিএসটিসি ডিপো। তবু এক পরিবহণ আধিকারিক পর্যন্ত ‘অ্যাই যা, অ্যাই যা’ বলে পশু তাড়ানোর ভঙ্গিতে মানুষগুলোকে তাড়াতে থাকেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে এটাও অমানবিক ঠেকেছে।

এক পুলিশের যখন এমন মুখ, অন্য পুলিশের মানবিক মুখ পরে স্বস্তি দিল শ্রমিকদের। তাঁরা যখন সন্ধ্যার মুখে বাধ্য হয়ে হুগলির দিকে ফিরছেন তখন খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান বলাগড় থানার ওসি। তিনি একটি শিবিরে নিয়ে যান। কালনা-সহ পূর্ব বর্ধমানের নেতারা যখন এই মানুষদের পাশে দাঁড়াননি তখন কী করা উচিত ছিল তা দেখিয়ে দিলেন হুগলি জেলার তৃণমূল যুব কংগ্রেস সভাপতি শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়। বলাগড় থানার ওসিকে শান্তনু বলেন, এখানে যে ৩৩ জন রয়েছেন তাঁদের খাওয়ার খরচ আমি বহন করব। বলাগড় থানা সেই ব্যবস্থা করার পাশাপাশি এই শ্রমিকদের বাড়ি পৌঁছে দেওয়া কীভাবে যায় তার উদ্যোগ নিতে শুরু করে। এটুকু মানবিক হলেই তো ক্লান্তি, উৎকণ্ঠার মধ্যে কাটাতে হতো না এ রাজ্যের আমাদের ভাইদের। হুগলি জেলা পরিষদের স্বাস্থ্য কর্মাধ্যক্ষ তথা তৃণমূল যুব কংগ্রেসের হুগলি জেলার সভাপতি শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, শ্রমিকদের পাশে থাকা তো কর্তব্য। আপাতত কোয়ারেন্টিনে তো রাখা যায়। তাই এই কথা জেনেই বলাগড় থানার পাশে দাঁড়াই। ক্ষুধার জ্বালা বুঝি। আর মানবিকতা? এক ভদ্রমহিলা পাণ্ডুয়া থেকে আসায় তাঁকে এলাকায় ঢুকতে দেওয়া হচ্ছিল না। পুলিশ, প্রশাসনকে নিয়ে ওই মহিলার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে মানুষকে বুঝিয়ে বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছি। সাবধান থাকুন, কিন্তু এলাকার মানুষের প্রতি সহমর্মিতা দেখানোও তো দরকার। এই শ্রমিকদের অবস্থা জেনেই তাই সাধ্যমতো সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছি। বলাগড় থানার ওসি ও পুলিশকর্মীরা খুবই মানবিক।