করোনা আতঙ্ককালে মনের জড়তাও বেড়েছে কিন্তু অনেকখানি। ঘরবন্দী নিত্য দিনের দমবন্ধ জীবন থেকে পালিয়ে বিশুদ্ধ বাতাসের মাঝে যেতে মন উড়ু উড়ু করছিলো খুব। ঠিক সেই মুহূর্তে আমাদের এক বিশেষ ভ্রমণ পাগল বন্ধু জানালো যে, ওরা কয়েকজন বর্ধমানের প্রত্যন্ত গ্রামের মধ্যে এক eco village যাবে, শুনে তো আমরাও এক পায়ে রাজি।

খুব ভোর ভোর বেড়িয়ে পড়লাম, দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে বর্ধমান থেকে কাটোয়া রোডে চললাম। এখানে বলি… সারা রাস্তা জুড়ে ধানের ক্ষেতের সবুজ আর সবুজ, চোখের শান্তি মনে হয় একেই বলে!! রাস্তার দুপাশে সবুজ গালিচা বিছিয়ে প্রকৃতি শুধুই বলছে যে… আমার চেয়ে বিশুদ্ধ আর কেউ নেই। এরপর কেতুগ্রাম রোড ধরে বেশ ভিতরে ঢুকে বেলুন গ্রামে প্রবেশ করলাম। খুবই সংকীর্ণ পথ, গ্রামের মাটির বাড়ি, ধানের গোলা, পুকুরধার পেরিয়ে এক জলা জঙ্গলের সামনে গাড়ি থামলো। এবার আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে যে পথ ধরলাম সে কাদামাখা, আগাছা বিছানো। বৃষ্টির দরুন, যাওয়ায় রাস্তায় বড় বড় ঘাসের মাঝে জল জমেছে। আর মাটি খুব আঠালো হওয়ায় পা পিছলানোর সম্ভাবনা বেশ। এত কিছুর মধ্যে কখন যেন বাইরের করোনার ভয়ের বাতাবরণ সব ভুলে গেলাম… এক নিমেষে মেঠোসুরে গা ভাসালাম।

এবার আসি বেলুন Eco village প্রসঙ্গে… এটি আদপে একজন প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের নিজস্ব উদ্যোগে তৈরি biodiversity research center। সেই সাথে ওখানে থাকা আর খাওয়ার বন্দোবস্ত আছে। পুরো গ্রাম ঘুরিয়ে বেশ কিছু activity করার ব্যবস্হাপনাও করা আছে। শিবাই নামে এক ছোট নদীর ধার ধরে কত রকমের গাছ গাছালি দিয়ে তৈরি করা এ গ্রাম। প্রতি বছর প্রবল বৃষ্টিতে নদীর পাড় ভেসে যায়,তারপর এই অঞ্চল হয়ে ওঠে পরিযায়ী পাখি, নানা রকম সরীসৃপ, প্রজাপতি, বিভিন্ন পোকামাকড়, জন্তুদের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র। এক অদৃশ্য বন্ধনে গ্রামবাসী আর অন্যান্য প্রাণীকূলের বোঝাপড়ার বসবাস গড়ে উঠেছে।

আমরা ওখানে দুধরণের মানুষ গেছিলাম, একপক্ষ (আমাদের মত) হলো… রোজের জীবন থেকে একটু অবসরের সন্ধানে প্রকৃতিতে শান্তিতে কাটাতে আর অপরপক্ষ (আমাদের সেই বন্ধু শোভেনের মত) হলো… প্রকৃতি এবং সে সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়বস্তু গাছপালা, পোকামাকড় ইত্যাদিকে নতুন করে আবিষ্কার করতে,তাদের গতিবিধি দেখতে। তবু দু’পক্ষই কখন মিলে জুড়ে গেলাম। বাঁশের খুঁটির চালাঘরে দুর্দান্ত সকালের খাবার খেয়ে গ্রাম দেখতে বেরোলাম। সঙ্গে ওখানের একটি ছেলে আমাদের সব কিছু সম্পর্কে দেখিয়ে বোঝাতে লাগলো।
ঘন ঘাসের জমি পেরিয়ে নদীর পাড় ধরে আমরা চললাম, দুপাশে সবুজ ধানের মেলা, চাষীরা মাঠে কাজ করছেন, বট-অশ্বত্থ-ইউক্যালিপটাসের মত বড় গাছের সারি, রকমারি ছোট ছোট গাছ, নিমের বাতাস, জলা জমিতে মাছের আনাগোনা… এমন করেই কাদা পেড়িয়ে পৌঁছালাম অনেকপথ। পথে কতরকম কীটপতঙ্গ… ফড়িং, মথ, প্রজাপতি, এমনকি শুঁয়োপোকা, বড় মাকড়সা, জোঁকেরও দেখা মিললো। আর বহুরকমের পাখির উঁকিঝুঁকি… বক, শামুখখোল, ছাতার, চড়ুই কতরকমের!!

ঘন্টা খানেক ঘুরে এসে বিশ্রাম নিলাম সেই রিসোর্টের ছাউনিতে। বাগানের নিজস্ব লেবুর জল খেয়ে শরীরের সব ধকল কমলো আর আমরা ওখানের প্রতিষ্ঠাতা তন্ময় বাবুর মুখে নানারকম গল্প শুনতে লাগলাম। ওখানেই দেখলাম যে, সাপ ধরার লাঠি, বর্শি রাখা। শুনলাম যে, তারা আসেন মাঝেমধ্যে আর ঐ লাঠি দিয়ে ওদের ধরে জঙ্গলে ছেড়ে দেয় ওখানের কর্মীরা। এরপর অন্যদিক ঘুরে দেখলাম, অনেক ফল সবজি ফুলের গাছের মধ্যে একটি মন্দিরও রয়েছে, মাঝে পদ্মপুকুরও বেশ সুন্দর। কতরকমের গাছের যে বাহার, অর্কিড থেকে জবার নানা প্রজাতি, বাতাবি লেবু থেকে তালের মেলা। এ এক অবাক জগৎ… শহুরে কোলাহল থেকে পালিয়ে এক অনাবিল শান্তির দেশ। আবার এরমধ্যেই রয়েছে শহুরে সবরকম ব্যবস্হাপনায় সাজানো চারটি থাকার ঘর। সামনে ছোট্ট জলের খাল,তা পেরিয়ে সাজানো গোছানো ঘর বারান্দা।

যাই হোক, দুপুরের খাবার পালা… সম্পূর্ণ ঘরোয়া খাবার, খুবই সুস্বাদু। সাথে নলেনগুড়ের পায়েস… মন ভরে গেল।এরপর দুপুরে সবাই মিলে গল্পে, ক্যুইজে কেটে গেল। বাঁশের মাচায় বসে কিছুসময় বসে মেঠো পথে ঘুরে সবুজের ভালবাসা গায়ে মাখলাম।
বিকেলে শুনলাম… পাখির কলরবে, ঘরে ফেরার কিচিরমিচিরে এ প্রাঙ্গন ভরে যায় আর সাথে jungle cat বা বনবিড়ালের ঘোরাঘুরিতে মেতে ওঠে। কিন্তু আমাদের চলে আসতে হলো তাড়াতাড়ি, প্রবল বৃষ্টি শুরু হলো। রাস্তা আরো দুর্গম হওয়ার আশঙ্কায় ফিরে এলাম। তবে আবারও শীতকালে পরিযায়ী পাখি দেখার আমন্ত্রণ নিয়ে এলাম।

একবেলার জন্য চোখের আরাম, মনের শান্তি, প্রাণের আনন্দ নিয়ে ফিরে এলাম বাড়ি। বারাসাত থেকে বেলুন গ্রামে পৌঁছাতে প্রায় ৪ ঘন্টা লেগেছে।