‘বাঙালি অস্মিতা’ শব্দবন্ধ বা লব্জটি আমরা ছেলেবেলায় শুনিনি। কৈশোর বা যৌবনেও এটি আমাদের জানা ফ্রেজ বা ইডিয়ম ছিল না। প্রৌঢ়ত্বে উপনীত হয়েও তা শুনিনি, সিনিয়র সিটিজেন হওয়ার পরেই তা আমি শুনছি ও জানছি। যুগ্ম শব্দ বা শব্দবন্ধ, যাই বলুন না কেন, হাল আমলের সৃষ্টি এই শব্দ। তবে মারাঠী অস্মিতা শব্দবন্ধটি আমাদের জানা আছে বহুবছর ধরে।
সুধীরকুমার চক্রবর্তী তাঁর ‘বুদ্ধিজীবীর নোটবই’ (প্রথম প্রকাশ-২০০৫) বইটির সূচিপত্রে ‘বাঙালি অস্মিতা’ দেননি। এটি যদি চালু লব্জ হত তখন, তাহলে তাঁর মতো প্রাজ্ঞ লেখক-সম্পাদক শব্দবন্ধটি অন্তর্ভুক্ত করতেনই। অস্মিতা শিরোনামেও কোনও লেখা নেই। অ বর্ণের মধ্যে আছে অন্দর-বাহির, অভিধান ও অভিবাসী শিরোনামের লেখা।
আর ব-বর্ণের মধ্যে বাংলা ব্যান্ড, বাঙালি উদ্বাস্তু, বিকল্প পরিবার, বিচ্ছিন্নতাবাদ, বিজ্ঞাপন, বিশ্বায়ন, বুর্জোয়া, বৈষ্ণবধর্ম ও গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম, বোধ ও বোধিবিজ্ঞান, বৌদ্ধ ধর্ম, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও ব্রতকথা শিরোনামের লেখাগুলি।
বস্তুত ‘আমরা বাঙালি’ যখন বেশ শক্তিশালী সংগঠন, তখনও শুনিনি বাঙালি অস্মিতা লব্জটির কথা।
‘সাইন বোর্ডে বাংলা চাই’ নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে যখন হইচই পড়ে গেছে, তখনও বাঙালি অস্মিতা লব্জটি শুনিনি। নবজাগরণ সংস্থাটির বেশ কয়েকটি মিটিংয়ে আমি সশরীরে হাজির ছিলাম, সেখানেও কোনও বক্তার মুখে বাঙালি অস্মিতা লব্জটি শুনিনি।
বছর কয়েক ধরেই এই লব্জটি বঙ্গজীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছে। ২০২০ সালে একটি লেখায় আমিও লিখেছিলাম, ‘মারাঠী অস্মিতা আছে বিহারী অস্মিতা আছে, বাঙালি অস্মিতা নেই’।
বাঙালি অস্মিতা শব্দবন্ধটি হাল আমলে বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে।
ইতিহাসবিদ রঞ্জন চক্রবর্তী লিখেছেন, “বাঙালি ঐতিহাসিক ভাবেই প্রতিবাদী ও কেন্দ্রিকতা-বিরোধী, সে যেমন তার সামূহিক ‘আত্ম’কে ভারতীয়ত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করেনি, তেমনই বৃহদত্বের মাঝে স্বকীয়তাকে বিলীন হতে দেয়নি। বর্তমানের বিতর্কে বাঙালি অস্মিতাকে এই প্রতিবাদী চরিত্রের উৎস ধরা হচ্ছে। ‘অস্মিতা’ শব্দটির আদি উৎস সংস্কৃতের অস্মি (‘আমি আছি’) ধাতু থেকে। এর অর্থ দাঁড়ায়, ‘আমি-ভাব’ বা ‘আমি-সত্তা’ বা ‘আমিত্ব’। বাংলা দার্শনিক পরিভাষায় অস্মিতা বলতে সাধারণত বোঝানো হয় অহংবোধ, ব্যক্তি-সত্তা বা ‘আমি’-বোধের ধারণা। আধুনিক মনোবিজ্ঞানের আলোচনায় অস্মিতা বলতে বোঝায় নিজেকে নিয়ে সচেতনতা বা আত্ম-পরিচয়ের ধারণা।
বঙ্গীয় অস্মিতা যতখানি রাজনৈতিক, তার থেকেও বেশি সাংস্কৃতিক। হর্ষের বিরোধাচারী শশাঙ্ক থেকে মুঘল জয়তিলকবিমোচী প্রতাপাদিত্যের মতোই এই অস্মিতার অপর বাহকরা হলেন বঙ্গীয় বিদ্বৎসমাজ। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূত্র ধরেই বলা যায় যে, তখন সর্বভারতীয় আন্দোলনের মধ্যে থেকেও বঙ্গীয় অস্মিতার রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক স্বকীয়তা বজায় রেখেছিলেন সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষচন্দ্র বসুর মতো ব্যক্তিত্ব। বিদেশি প্রশাসনের রক্তচক্ষুর সামনে ধূলিধূসরিত খড়ম তুলে ধরা বিদ্যাসাগরের প্রজন্মগত দায় তাঁরা অস্বীকার করেননি। স্বাধীনতার পর থেকে পশ্চিমবঙ্গ শিল্পক্ষেত্রে ক্রমপশ্চাদ্গামী রাজ্য হিসেবেই তার যাত্রা শুরু করেছিল, এবং আর্থিক ভাবে ধুঁকতে থাকা একটি সংস্কৃতি হিসেবে পূর্বায়ত্ত ন্যায়ধর্মের বলেই বিরূপ পরিস্থিতিতেও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা বজায় রাখতে পেরেছিল।”
এ থেকেই বোঝা যায়, বাঙালি সবসময় তার নিজস্বতা, স্বাতন্ত্র্যবোধ বা স্বকীয়তা বজায় রাখতে অভ্যস্ত। এই স্বাভিমান বা জাত্যভিমান বাঙালির বৈশিষ্ট্য।
বাংলায় শিক্ষাজগতে বিতর্ক ও সংঘাতের ইতিহাস বহু বার ঘটেছে। স্বাভাবিকভাবেই রাজনীতির সঙ্গে তা যুক্ত হয়েছে এবং তা বিতর্কের আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়েছে। কিন্তু তা কখনও বঙ্গীয় স্বকীয়তার মূলে আঘাত করেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন নিয়ে অবিভক্ত বাংলার দুই দিকের বিদ্বজ্জনদের সংঘাতের কথা আমাদের অনেকেরই জানা আছে। শুধু যা ততটা জানা নেই, তা হলো, সে বিতর্কের মাঝেও অটুট ছিল বঙ্গীয় অস্মিতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি যাঁরা করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে মুসলিম সংখ্যাধিক্য দেখে মহম্মদ আলি জিন্নাহ্ আশা করেছিলেন যে, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্বন্ধিত একটি কলেজ পেলেই পূর্ববঙ্গের মুসলিম জনসংখ্যার মধ্যে শিক্ষার প্রসার যেমন হবে, তেমনই সর্বভারতীয় মুসলিম জনসমাজের সঙ্গে একত্রিত করা যাবে দূরবর্তী মুসলমান-প্রধান পূর্ববঙ্গকে। জিন্নাহ্-র সাম্প্রদায়িক ঐক্যচেতনাকে সে দিন ছাড়িয়ে গেছিল বাঙালি মুসলমানের বঙ্গীয় অস্মিতা। তাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে অনড় ছিলেন। বাংলার অভ্যন্তরীণ শিক্ষাবিতর্কে সে দিন তাঁরা সাম্প্রদায়িক একদেশদর্শী মনোভাবকে ঢুকতে দেননি।রাজ্যের অভ্যন্তরীণ শিক্ষার ক্ষেত্রে ক্ষোভ-বিক্ষোভের জায়গা তৈরি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে, বঙ্গীয় অস্মিতাকে ভূলুণ্ঠিত করে, বাঙালির ন্যায়চেতনাকে ধ্বংস করে আত্মসম্মানকে বলি দেওয়ার সময় এটা নয়। এখনই বাঙালি অস্মিতা জেগে ওঠার প্রকৃষ্ট সময়।
কারও কারও দাবি ক্ষিতিমোহন সেন নাকি শান্তিনিকেতনে বসে ‘বাঙালি অস্মিতা’ শব্দবন্ধটি লিখে গেছেন রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে বসবাস করার সময়। এই দাবির সপক্ষে কোনও তথ্য কেউ দিতে পারেননি। তবে সোস্যাল মিডিয়ায় একটি উদ্ধৃতি ঘুরছে। তবে যেযুগে রবীন্দ্রনাথ নিজে ‘বাঙালী’ বানান লিখতেন, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ও বাঙ্গালী বা বাঙালী লেখার পক্ষপাতী ছিলেন, সেযুগে ক্ষিতিমোহন সেন ‘বাঙালি’ লিখতেই পারেন না। বড়জোর ‘বঙ্গীয় অস্মিতা’-র কথা লিখতে পারেন।
যাই হোক নতুন করে বাঙালি অস্মিতার কথা বিগত কয়েকবছর ধরে উঠেছে। এখন সেটা তুঙ্গমুহূর্তে পৌঁছেছে।
বাংলা ও বাঙালি জাতিসত্তার স্বাভীমানী ধ্বজা উর্ধ্বে তুলে রাখতে, হঠাৎ করে জেগে ওঠা এই ” অস্মিতা ” বাক্যটি, যেটা হিন্দি ভাষা সাম্রাজ্যবাদের পরিকল্পিত ভাবে অহিন্দি
রাজ্যের মাতৃভাষা কে ধ্বংসের চক্রান্ত ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই আমার অনুরোধ বিদগ্ধ জনের কাছে, অসিত দাস
মহাশয়ের এই আলোচনা (বিশেষ করে বাংলার জাতীয় সত্তা রক্ষায়) কে জাতির স্বার্থে গঠনাত্বক রুপদানে কলম ধরুন।