| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

সাহিত্যে রস, রসে সাহিত্য : স্বপনকুমার মণ্ডল

Reporter
স্বপনকুমার মণ্ডল / ৪১৫৩ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২১

সাহিত্যমোদী পাঠকমাত্রেই সাহিত্যরসের রসিক। অথচ সেই রস ও রসিক নিয়ে কথা বলতে গেলেই রস শুকিয়ে আসে, আলোচককেই বেরসিক মনে হয়। আসলে সাহিত্যের নির্যাস বা রস বলা যত সহজ, বোঝানো ততই কঠিন। মুখ থেকে কথা কীভাবে বেরয়, তা বোঝাতে গেলেই কথা আটকে পড়ে। দেহকে বোঝানো যায়, দেহজুড়ে তার প্রাণের পরিচয় মেলানো দুরূহ। সাহিত্যের ক্ষেত্রেও তার রস আগে এলেও তা সরস হয়ে ওঠেনি। প্রথম শতকেই ভরতের নাট্যশাস্ত্রে রসের উৎপত্তির কথা জানা যায়। কিন্তু কীভাবে তা হয়, তা অস্পষ্ট। অন্যদিকে তার আলোচনাও বেশিদূর এগোয়নি। সপ্তম শতক থেকে তার চর্চা ক্রমশ গতি লাভ করে। আসে কাব্য বা সাহিত্যের প্রাণ খোঁজার নানান তরিকা। সেখানে সাহিত্যের তত্বকথাই নতুন শাস্ত্রের জন্ম দেয়, ভারতীয় অলঙ্কারশাস্ত্র। নামে অলঙ্কার হলেও তাতে প্রাণের পরিচয়ই মুখ্য। অর্থাৎ সাহিত্য বা কাব্যের আত্মা বা প্রাণ কী বা কোথায় থাকে, তার হালহদিশ নিয়েই প্রাচীন ভারতীয় অলঙ্কারশাস্ত্রের বিস্তার। সেই আত্মার পরিচয় স্বাভাবিকভাবে কাব্যের শরীরে অলঙ্কারের মধ্যে খোঁজার প্রয়াস চলে। এ থেকেই আসে শরীবের সৌন্দর্য বৃদ্ধিকারক অলঙ্কারের কথা। সাধারণভাবে দেহরূপের শ্রীবৃদ্ধিতে অলঙ্কারের ভূমিকা বর্তমান। বিশেষ করে নারীদের সৌন্দর্যচর্চায় প্রসাধনী অলঙ্কারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সপ্তম শতকে অলঙ্কারবিদ ভামহ তাঁর ‘কাব্যলঙ্কার’ গ্রন্থে বলেছেন : ‘রূপকাদি কাব্যের অলঙ্কার। সুন্দরীর মুখচ্ছবি যতই কমনীয় হোক না কেন, ভূষাহীন হলে কখনই তা শোভা পায় না।’ সেক্ষেত্রে সমালোচকের কথায় বনিতার মুখ যতই মনোহর হলেও বিনা অলঙ্কারে দীপ্তি পায় না’র চেতনায় সৌন্দর্যবিস্তারে অলঙ্কারের অপরিহার্যতাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে একসময় পুরুষেরাও অলঙ্কার ব্যবহার করতেন। আলঙ্কারিকদের অভিমতেও তার পরিচয় বর্তমান। একাদশ শতকে সাহিত্য-মীমাংসক ধারাধিপতি ভোজদেব মানবদেহের সঙ্গে কাব্য বা শব্দাত্মক সাহিত্যের তুলনায় বলেছেন, ‘শব্দ এবং অর্থ কাব্যের শরীর, রস (ভাব) প্রভৃতি কাব্যের আত্মা, (ওজঃ শ্লেষ প্রভৃতি) গুণ শৌর্য প্রভৃতির ন্যায়, (কাব্যের) দোষ-সমূহ (মানবদেহের) কাণত্বাদির ন্যায়, রীতিসমূহ অবয়বের সন্নিবেশের সহিত তুলনীয় এবং অলঙ্কারসমূহ কটক কুন্তল প্রভৃতির সদৃশ। অন্যভাবে প্রায় একই কথা ‘কাব্য-মীমাংসা-র রচয়িতা মহাকবি রাজশেখরও সারস্বতেয় ‘কাব্যপুরুষ’-এর বর্ণনা প্রসঙ্গে জানিয়েছেন : ‘(হে বৎস্য!) শব্দ এবং অর্থ তোমার শরীর। সংস্কৃত তোমার মুখ; প্রকৃত-ভাষানির্মিত তোমার বাহুদ্বয়; তোমার জঘন দেশ অপভ্রংশভাষাময়; তোমার পদযুগল পৈশাচভাষানির্মিত। তুমি সমতা, প্রসাদ, মাধুর্য এবং ওজগুণযুক্ত। তোমার বচন উক্তিনৈপুণ্যে ভূষিত। রস তোমার আত্মস্বরূপ; তোমার রোমরাজি ছন্দোময়; অনুপ্রাস এবং উপমা প্রভৃতি তোমাকে অলঙ্কৃত করিতেছে।’ সেদিক থেকে কাব্যদেহের আভরণ বা অলঙ্কার সৌন্দর্য প্রদানেই তার ভূমিকা নিঃশেষ হয়ে পড়ে। তারফলে সৌন্দর্যের আধারেই অলঙ্কারের প্রকৃতি নানাভাবে বিকশিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, কাব্যের আবেদনে সেই অলঙ্কারের সৌরভই প্রকাশমুখর। সপ্তম শতকে দণ্ডী তাঁর ‘কাব্যাদর্শ’-এ জানিয়েছেন, ‘কাব্যের যে সমস্ত ধর্ম তার শোভা সম্পাদন করে, তাই অলঙ্কার।

অন্যদিকে ভামহের ‘কাব্যলঙ্কার’ গ্রন্থের ব্যাখ্যাকার বামানাচার্যের মতে, ‘সৌন্দর্যম্‌ অলঙ্কার।’ অর্থাৎ সৌন্দর্যই অলঙ্কার। শুধু তাই নয়, ‘কাব্যলঙ্কার-সূত্রবৃত্তি’ গ্রন্থের উপক্রমেই বামনাচার্য জানিয়েদেন, ‘অলঙ্কারবশই কাব্যসহৃদয়গণের আস্বাদনীয় হইয়া ওঠে।‘ তাঁর ভাষায়, ‘কাব্যং গ্রাহ্যমলঙ্কারাৎ।’ অন্যদিকে দশম শতকে কাশ্মীরি আচার্য কুন্তক তাঁর ‘বক্রোক্তিজীবিত’ গ্রন্থে অলঙ্কারের অপরনাম দিয়েছেন বক্রোক্তি। অর্থাৎ সরাসরি প্রত্যক্ষভাবে না বলে ঘুরিয়ে বা বক্রভাবে বলা। আর তা বলার জন্য প্রয়োজন বৈদগ্ধভঙ্গি। আচার্য কুন্তকের কথায়, ‘বৈদগ্ধভঙ্গীভণিতি’র বক্রোক্তিই সাহিত্যিক সৌন্দর্যের নিদান তথা উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপক, অতিশয়োক্তি, সমাসোক্তি, ব্যাজস্তুতি প্রভৃতি অলঙ্কারের প্রাণস্বরূপ। আচার্য কুন্তকের কথায়, ‘পদসমুদয়াত্মক বাক্যের সহস্র প্রকারে বক্ত্রতা সম্পাদন করা যাইতে পারে এবং সেই ‘বক্ত্রতা’র মধ্যেই সকল অলঙ্কারবর্গ নিঃশেষে অন্তর্ভুক্ত হইবে’। প্রসঙ্গত স্মরণীয়, সাহিত্য কখনো সরাসরি কিছু নির্দেশ করে না, নানাভাবে ঘুরিয়ে বলে। কাউকে চোর না বলে তার হাতটান আছে বলার মতো সাহিত্যের শোভন প্রকাশপ্রকৃতি। ভাবের ভাষাতে তার স্বচ্ছন্দতায় স্বাভাবিক ভাবেই ভাষায় কারুকার্য ও অর্থের কারসাজি স্বাভাবিক। আর সেখানেই কাব্য বা সাহিত্যের শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কারের ব্যঞ্জনা।

কাব্য বা সাহিত্যে অলঙ্কারের সবিশেষ ভূমিকা বর্তমান। সংস্কৃত ‘অলম্‌’ শব্দের অর্থ ‘ভূষণ’। যা ভূষিত করে তথা সুন্দর করে শোভাবর্ধন করে তাই অলঙ্কার। তার শব্দালঙ্কারের চেয়ে অর্থালঙ্কারের ব্যঞ্জনা আরও বেশি। অলঙ্কারের শোভন প্রকৃতি নানাভাবেই প্রস্ফুটিত হয়। সেখানে ফুলের সৌন্দর্যে তার রূপ ও সৌরভ উভয়ই আবেদনক্ষম হয়ে ওঠে। স্বাভাবিক ভাবেই শব্দালঙ্কারের ধ্বনিময় রূপের সঙ্গে তার অর্থময় বৈচিত্র্যের সমন্বয় বহুমাত্রিক চেতনার দ্বার মুক্ত করে দেয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন উজ্জয়নীর প্রথমা প্রিয়ার ছবি এঁকেছেন, তখন প্রাকৃতিক অলঙ্কার ও প্রসাধনীতে অপূর্ব সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলেছেন : ‘মুখে তার লোধ্ররেণু, লীলাপদ্ম হাতে,/ কর্ণমূলে কুন্দকলি, কুরুবক মাথে,/ তনুদেহে রক্তাম্বর, নীবীবন্ধে বাঁধা,/ চরণে নূপুরখানি বাজে বাজে আধা আধা।’ কাব্য-সাহিত্যে সৌন্দর্যচেতনায় অলঙ্কারের নিবিড় অস্তিত্ব। সৌন্দর্যবিধায়ক প্রসাধন সামগ্রীর মতো তার উপযোগিতা। ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতকে রসবাদী বিশ্বনাথ কবিরাজও তাঁর ‘সাহিত্য-দর্পণ’ গ্রন্থে শব্দ ও অর্থে গড়া কাব্যদেহের বাইরে কটককুণ্ডলাদির মতো অলঙ্কারের অস্তিত্বের কথা বলেছেন। সেদিক থেকে সপ্তম শতকে ভামহ যেভাবে কাব্যের আত্মার সজীবতায় অলঙ্কারের গুরুত্ব প্রদান করেছেন এবং বামনাচার্য কাব্যের গ্রহণযোগত্যায় তার অপরিহার্যতাকে কথা ব্যক্ত করেছেন, তা যেমন একেবারে গৃহীত হয়নি, তেমনই তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করাও সম্ভব হয়নি। প্রসঙ্গত স্মরণীয়, ভারতীয় কাব্যতত্ব বা সাহিত্যতত্ব অলঙ্কারশাস্ত্র হিসাবেই প্রচলিত।

সেক্ষেত্রে কাব্য-সাহিত্যে অলঙ্কারের শোভন সৌন্দর্য যেমন স্বাভাবিক, তেমনই তার তাতে অন্তরঙ্গ যোগের অভাবও প্রত্যয়সিদ্ধ। এমনিতে অলঙ্কারের অভিব্যক্তিতে সৌন্দর্যের প্রকাশ বহুমাত্রিক। ধারাধিপতি ভোজদেব তাঁর ‘শৃঙ্গারপ্রকাশ’ শীর্ষক আলঙ্কারিক নিবন্ধে তিন প্রকার অলঙ্কারের কথাও বলেছেন। যথা, বহিরঙ্গ যেমন, বস্ত্র, মালা, কটক, কেয়ুর প্রভ্রৃতি, অন্তরঙ্গ যেমন, দাঁত, নখ ও কেশের পরিচর্যা এবং মিশ্র যেমন, স্নান, ধূপ, চন্দন, কুঙ্কুম প্রভৃতি। কিন্তু সেসব অলঙ্কার দেহের সৌন্দর্য বৃদ্ধির সহায়ক হলেও তার সঙ্গে প্রাণের যোগ নেই। মৃতদেহে প্রচুর অলঙ্কার পরালেও দেহ জীবিত হয় না। ঠিক সেভাবেই কাব্যের দেহে অলঙ্কারের যোগ একান্তভাবেই বহিরঙ্গের। শুধু তাই নয়, তাতে শব্দার্থের দেহে সবসময় সূক্ষ্মভাবে অলঙ্কারের শনাক্ত করে উপলব্ধিও করা যায় না। আবার দেহবিচ্ছিন্ন অলঙ্কারের স্বতন্ত্র অস্তিত্বও নেই। কেননা তার নিজস্ব সৌন্দর্য আবেদনক্ষম হয়ে ওঠে না, দেহধারণেই তার সৌন্দর্যের বিস্তার। অন্যদিকে অলঙ্কারের প্রাচুর্যে বা সন্দেহে সৌন্দর্যের হানিও হয়। এজন্য সংকরালঙ্কার এবং সন্দেহ অলঙ্কারের সৌন্দর্যে স্পষ্টতার অভাব বর্তমান। তাছাড়া শুধু অলঙ্কারেই নয়, দৈহিক লাবণ্যেও সৌন্দর্য বিকশিত হয়। লাবণ্য তথা লবণের ভাবের মধ্যেও দেহশ্রী জেগে ওঠে। শুধু তাই নয়, অলঙ্কার ছাড়াও কাব্যের প্রকাশ অস্বাভাবিক নয়। রজনীকান্ত সেনচ তাঁর ‘অমৃত কথা’য় ঈর্ষাপরায়ণ পিঁপড়ের অকাল পরিণতির কথা অলঙ্কারহীনভাবেই ব্যক্ত করেছেন : ‘পাখিরা আকাশে উড়ে দেখিয়ে হিংসায়/ পিপীলিকা বিধাতার কাছে পাখা চায়;/ বিধাতা দিলেন পাখা, দেখো তার ফল,—/ আগুনে পুড়িয়া মরে পিপীলিকা-দল।’

অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বাশি’ কবিতায় কিনু গোয়ালার ভাড়াটিয়া পঁচিশ টাকা মাইনের হরিপদ কেরানি টিউশন করে কোনোরকমে বেঁচেবর্তে থাকায় ধলেশ্বরীনদীর তীরে পিসিদের গ্রামে বিয়ে ঠিক হলেও বিয়ে না করে মেয়েটিকে বাঁচানোর কথা তুলে ধরায় অলঙ্কারের প্রয়োজন হয়নি। অথচ তার মর্মভেদী ব্যঞ্জনা জেগে ওঠে : ‘ঘরেতে এল না সে তো, মনে তার নিত্য আসাযাওয়া—/ পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর।’ সেক্ষেত্রে আবার অলঙ্কারবাদীরা মনে করেন অলঙ্কারহীনভাবে কাব্য প্রকাশিত হয় না। যেখানে কোনোকিছুর স্বভাব বা স্বাভাবিক বর্ণনা করা হয়, সেখানে স্বভাবোক্তি অলঙ্কার হয়। সেদিক থেকে ‘অমৃত কথা’ বা ‘বাঁশি’তে স্বভাবোক্তি অলঙ্কারের পরিচয় মেলে। অর্থাৎ দেহাত্মবাদীরা মনে করেন কাব্যে অলঙ্কারের অস্তিত্ব নানাভাবেই ব্যক্ত হয়ে থাকে। অথচ সেই অলঙ্কারের গুণেই কাব্য গ্রহণীয় হয়ে ওঠে না। কেননা তাতে অন্য কোনো গুণ বা বিশেষত্ব বর্তমান। কী সেই গুণ? সেই গুণের অস্তিত্বে অলঙ্কারের পরেই আসে রীতির কথা। যে বামনাচার্য অলঙ্কারের জন্য কাব্যের গ্রহণযোগ্যতার কথা বলেছিলেন, সেই তিনিই আবার বলেন, ‘রীতিরাত্মা কাব্যস্য’। সেক্ষেত্রে কোন রীতি কাব্যের আত্মা, সেবিষয়ে আলোকপাত প্রয়োজন।

সাধারণত শব্দ ও অর্থে কাব্য-সাহিত্যের শরীর গড়ে উঠলেও তার শিল্পরূপের অসাধারণত্বে স্বতন্ত্র রূপের পরিচয়ই স্বাভাবিক। সেখানে শুধুমাত্র শব্দ ও অর্থের এলোমেলো বা অগোছালো অথবা যথেচ্ছাচারের কোনো অবকাশ নেই। শিল্পরূপের মাধ্যমেই তার প্রকাশ। সেই প্রকাশরূপের মধ্যে কোনোরকম অসঙ্গতি, অসামাঞ্জস্য বা অপূর্ণতাবোধের প্রত্যাশিত নয়। স্যামুয়েল বাটলার কোলরিজ যেমন গদ্য সম্পর্কে কথাপ্রসঙ্গে বলেছেন, ‘words in their best order’, তেমনই কবিতা সম্পের্কে ‘the best words in the best order’ বলে আরও শিল্পসচেতনার কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। সংস্কৃত সাহিত্যতত্বেও সেই রীতি’র মধ্যেও সেই শিল্পরূপের বিন্যাসের কথা উঠে এসেছে। ফুলের পাপড়িগুলি যেমন খুলে নিলে ফুলের সৌন্দর্য নিঃস্ব হয়ে পড়ে, তেমনই আবার সেগুলো ফুলের মতো সুবিন্যস্ত না করলে হৃত সৌন্দর্য ফিরে আসে না। সেক্ষেত্রে শিল্পরূপে ‘রীতি’র ভূমিকা অনস্বীকার্য। বামনাচার্যের মতে, ‘বিশিষ্টা পদরচনা রীতিঃ।’ সেদিক থেকে ‘রীতি’কে পদরচনার বিশিষ্ট ভঙ্গি হয়ে ওঠে। শরীরে শুধু অলঙ্কার পরলেই শুধু সুন্দর দেখায় না, সুবিন্যস্ত করে পরলে তবেই তার সৌন্দর্য ছড়ায়। সেদিক থেকে ‘রীতি’ হচ্ছে কাব্য বা সাহিত্যের অবয়বসংস্থান। অবশ্য এই সংস্থানে নানাভাবেই হতে পারে।

সময়ের পরিবর্তনে নতুন ধরনের সাজ-সজ্জার রূপে fashion-এর প্রকাশ দৃষ্টিনন্দন হয়ে ওঠে। অবশ্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা অতিদ্রুত হারিয়েও যায়। শুধু তাই নয়, তার মধ্যে শিল্পীসুলভ একক প্রয়াস নেই, আছে আকারে-প্রকারে রঙে-রূপে সময়ে প্রভাব। তাতে থাকে সমষ্টি চেতনার প্রকাশ, সর্বজনীন আবেদন। তাতে নবত্ব আছে, অভিনবত্ব নেই। সেদিক থেকে ‘রীতি’কে fashion না বলে ‘style’ বা শৈলী মনে করা হয়। চিন্তার স্বতন্ত্র ধারায় তার প্রকাশপ্রকৃতি সবুজ হয়ে ওঠে। গদ্য-পদ্য লেখক স্টাইলের গুণেই স্বতন্ত্র আভিজাত্য লাভ করে থাকেন। ‘Style is the man’ তারই প্রকট পরিচয়। অথচ স্টাইলও বহু ব্যবহারে ফ্যাশনে পরিণত হতে পারে। তাছাড়া এককের প্রয়াসে ব্যক্তির ছায়া যেভাবে বিস্তার লাভ করে, সেভাবে শিল্পরূপে তার কায়া প্রতিভাত না হওয়ায় তার প্রকৃতিতে ‘রীতি’র স্বরূপ নিবিড়তা লাভ করে না। সেদিক থেকে ‘রীতি’কে স্টাইলও যথার্থ বলা যায় না। অন্যদিকে দ্বাদশ শতকে কাশ্মীরি পণ্ডিত রুয্যক তার আরও একটি প্রতিশব্দ প্রদান করেছেন। তা হল ‘বৃত্তি’। তাঁর মতে, রসনাকূল বর্ণ রচনাকে বৃত্তি বলে। অবশ্য রুয্যকের ‘বৃত্তি’চেতনায় অলঙ্কারসর্বস্ব চেতনাই প্রকট হয়ে উঠেছে। বামনাচার্যই প্রথম ‘রীতি’র গুরুত্বের কথা স্পষ্ট করে তোলেন। শুধু তাই নয়, তাঁর পূর্বে কেউ কাব্যের আত্মা নিয়ে আলোচনা করেননি।

অলঙ্কারের জন্য কাব্য গৃহীত হয় বলেও বামনাচার্য ‘রীতি’কেই কাব্যের আত্মা বলে অভিহিত করেন। সেক্ষেত্রে তিনি অলঙ্কারের পরিবর্তে কাব্যের ‘গুণ’-এর কথা বলেন। অলঙ্কার অনিত্য, গুণ নিত্য। তাঁর মতে, সৌন্দর্যের নিদান অলঙ্কার নয়, তার গুণ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বামনাচার্য কাব্যের দোষ-গুণের কথা স্পষ্ট করে তুলেছেন। তাঁর ‘কাব্যালঙ্কার সূত্রবৃত্তি’তে সর্বপ্রথম শব্দগুণ ও অর্থগুণের কথা বলা হয়েছে। সেই কাব্যরসের ধর্ম গুণভেদে তিনি ‘গৌড়ী’(ওজো গুণ ও কান্তি প্রচুর পরিমাণে থাকে।), ‘বৈদর্ভী’ (দশটি গুণই এতে আছে।) ও ‘পাঞ্চালী’ (মাধুর্য ও সৌকুমার্য উপাদান তার।) তিনটি ‘রীতি’র কথা বলেছেন। এভাবে পরবর্তীতে রুদ্রট একটি (‘লাটী’) ও ভোজদেব দুটি (‘মাগধী’ ও ‘অবন্তিকা’) ‘রীতি’র কথা বলেছেন। অন্যদিকে কাব্যের ‘রীতি’ আলোচনায় গুণের সঙ্গে দোষের কথাও স্বাভাবিক ভাবে উঠে এসেছে। সেখানে দোষ পরিহার করে গুণের সমাবেশ করার কথাই প্রাধান্য লাভ করে। যেমন, বামনাচার্যের মতে ‘দোষ’ চার প্রকার। যথা, পদ দোষ, শব্দার্থ দোষ, বাক্যার্থ দোষ এবং বাক্য দোষ। একাদশ শতকে মম্মটাচার্য তাঁর ‘কাব্যপ্রকাশ’-এ ১৬টি পদদোষের কথা বলেছেন। আবার ভোজদেব ২৮টি করে শব্দ ও অর্থগুণের সঙ্গে ১৬টি করে পদ দোষ ও বাক্য দোষের কথাও জানিয়েছেন। অন্যদিকে ‘রীতি’র স্বরূপ ও তার আত্মিক অস্তিত্ব আদতে অলঙ্কারের বিস্তার। সেখানে দেহের অস্তিত্ব প্রকাশিত হলেও তার প্রাণের অধরা মাধুরী। ভামহ’ই বামনাচার্যের ‘রীতি’র বিভাজনকে মূর্খরাই করে বলে কটাক্ষ করেছেন। দশম শতকে ধবনিবাদী অভিনবগুপ্ত তাঁর ‘লোচন’টীকায় ‘রীতি’কে অনুপ্রাস হতে ভিন্ন নয় বলে অভিহিত করেছেন। দেহভিন্ন আত্মা বা প্রাণ যে অন্যকিছু, তা ‘রীতি’র মাধ্যমে প্রকাশিত হয় না। সেই অন্যকিছুই হল ‘ধ্বনি’।

লৌকিক অভিজ্ঞতাই সাহিত্যের শিল্পরূপ লাভ করে। সেই অভিজ্ঞতা একেক জনের একেক রকম মনে হলেও তা সর্বসাধারণের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। সাহিত্যে সাধারণত শব্দ ও অর্থের সহিতত্ব ঘটে। সেখানে শব্দ উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে তার অর্থ বোঝা যায়। প্রতিটি শব্দের নির্দিষ্ট অর্থ বোঝায়। সেই অর্থ মূলত তিন ভাবে প্রকাশিত হয়। অভিধা (Denotation), লক্ষণা (Indication বা Metaphor) ও ব্যঞ্জনা (Suggestion)। সেই সব অর্থ অভিধানে মেলে বলে আভিধানিক অর্থ বলে। সেগুলি মুখ্য অর্থ বা বাচ্যার্থ নামেও অভিহিত। বাক্যে ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দকে বলে পদ। সেই পদের অর্থ শব্দের সমন্বয়ের উপরে নির্ভর করে। অর্থাৎ সেখানে ইঙ্গিত বা ভঙ্গী কিংবা লক্ষণের মাধ্যমেও অর্থ বেরিয়ে আসে। সেই অর্থকে বলা হয় লক্ষণা। আবার যখন শব্দ লৌকিক অর্থ পরিহার করে অলৌকিক ইঙ্গিত বহন করে তখন তা ব্যঞ্জনা। এই ব্যঞ্জনার্থ সাহিত্য সৃষ্টি করে। একটি বাক্যের সাহায্যে তা সহজবোধ্য হতে পারে। যদি বলা হয়, লোকটি গঙ্গায় বাস করেন। এই ‘গঙ্গা’র অর্থ গঙ্গা নদী অর্থাৎ আভিধানিক অর্থ বা বাচ্যার্থ। আবার ‘গঙ্গায় বাস’ মানে তো জলে নয়, গঙ্গার পাড়ে বাস করেন। সেই পাড়ে না বললেও বুঝতে অসুবিধা হয় না। একে বলে লক্ষণা।

অন্যদিকে যা বাক্যটির আভিধানিক বা লক্ষণার্থেও প্রকাশিত হয়নি, অথচ সেই অদৃশ্য অর্থ অর্থাৎ লোকটি মনোরম স্বাস্থ্যকর আবহাওয়ায় বসবাস করেন, আমরা বুঝে যাই। এই অলৌকিক অর্থই ব্যঞ্জনার্থ। সাহিত্যে তার নিবিড়তা। সেদিক থেকে যা শ্রেষ্ঠ কাব্য তার প্রকৃতিই বাচ্যার্থকে ছাড়িয়ে চলে। অর্থাৎ তার অর্থ কোথাও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে না, বিষয়ান্তরে ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে। এজন্য বলা হয়, কবিতাকে কেউ বিবসনা করতে পারে না। ‘এর মানে এই’ বলে তার শেষ কথা বলা যায় না। নানাভাবেই তার অর্থ ব্যঞ্জিত হয়। সেখানে যেমন বাচ্যার্থ সচল, তেমনই ব্যঞ্জনার্থের বহুমুখী বিস্তার। এই বিস্তারেই ‘ধ্বনি’র পরিচয় আলোকিত হয়। সপ্তম ও অষ্টম শতকে অলঙ্কারবাদীদের অলঙ্কার থেকে রীতি’র মধ্যে কাব্য-সাহিত্যের আত্মা বা প্রাণের পরিচয় নবম ও দশম শতকে কাশ্মীরী পণ্ডিতদ্বয় আনন্দবর্ধন ও অভিনবগুপ্তের আবির্ভাবে অস্বীকৃত হয়ে পড়ে। আনন্দবর্ধন তাঁর ‘ধবন্যালোক’ গ্রন্থের বৃত্তি অংশে ‘ধ্বনি’র পরিচয়কে নিবিড় করে তোলেন। তাঁর কথায়, ‘যত্রার্থঃ শব্দো বা তমর্থমূপসর্জনীকৃতস্বার্থৌ।/ ব্যঙ্‌ক্তঃ কাব্যবিশেষঃ স ধ্বনিরিতি সূরিভিঃ কথিতঃ’।। অর্থাৎ যেখানে অর্থ ও শব্দ নিজেদের প্রাধান্য পরিত্যাগ করে ব্যঞ্জিত অর্থকে প্রকাশ করে, পণ্ডিতেরা তাকে ‘ধ্বনি’ বলেছেন। এখানে ব্যঞ্জিত অর্থকে বলা হয় ‘ব্যঙ্গ’ বা ‘ব্যঙ্গার্থ’। ধবনিবাদীরা এই ধবনিকেই বলেছেন ‘ধ্বনিরাত্মা কাব্যস্য’ বা কাব্যের আত্মা। অবশ্য বাক্যে যেকোনো ভাবে ব্যঞ্জনা বা ব্যঙ্গার্থ সৃষ্টি হলেই ধ্বনি হয় না।

এজন্য বিশ্বনাথ কবিরাজ বলেছেন, তা হলে প্রহেলিকাও কাব্য হত। যেখানে বাচ্যার্থকে অনুসরণ করেই ব্যঞ্জনা বা ব্যঙ্গার্থ হয়, তা বাচ্যালঙ্কার হলেও ধ্বনি হয়। যেমন, সমাসোক্তি অলঙ্কার ধ্বনি হয়। আবার একাধিক ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করলেও ধ্বনি হয় না। যেমন, সংকরালঙ্কার। শুধু তাই নয়, যেখানে ব্যঞ্জনার্থ বা ব্যঙ্গার্থ সন্দেহের সৃষ্টি করে, তা হলেও তাকে ধ্বনি বলা যায় না। যেমন, সন্দেহ অলঙ্কার। আসলে বাচ্যার্থকে চেয়ে যেখানে ব্যঙ্গার্থ প্রাধান্য লাভ করে, সেখানেই শুধু ধ্বনি হয়ে থাকে। ধ্বনির বাচ্যাতিরিক্ত অর্থকেই ব্যঞ্জিত করে। যেমন, কালিদাসের ‘কুমারসম্ভব’ কাব্যে হিমালয়ের কাছে অঙ্গিরা মহাদেবের সঙ্গে পার্বতীর বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলে পাত্রীর ভাবপ্রকাশের মধ্যেই ধ্বনির পরিচয় সুরভিত হয়ে ওঠে : ‘এবংবাদিনি দেবর্ষৌ পার্শে পিতুরধোমুখী।/ লীলাকমলপত্রাণি গণয়ামাস পার্বতী’।। অর্থাৎ পার্বতী মুখে কিছু না বললেও পদ্মের পাপড়ি গোণার মধ্যেই তার সদিচ্ছা ব্যক্ত করেছে এবং সেখানেই ধ্বনির ব্যঞ্জনা নীরবে প্রকাশিত। অন্যদিকে ধ্বনিই রসে পরিণত হয়। বস্তুধ্বনি, অলঙ্কার ধ্বনি ও শেষে রস ধ্বনি। ধ্বনিবাদীরা মনে করেন কাব্যের আত্ম বাচ্য নয়, ‘ব্যঞ্জনা’, কথা নয় ‘ধ্বনি’। সেজন্য বস্তুধ্বনি নয়, অলঙ্কার ধ্বনিও নয়, রসধ্বনিই বাক্যকে কাব্য করে তোলে। কেননা কাব্যের ‘ধ্বনি’ হচ্ছে রসের ধ্বনি। সে ধ্বনি যেমন রসে পরিণত হয়, তেমনই রসের ব্যঞ্জনায় বাক্য কাব্য হয়ে ওঠে। এজন্য ধ্বনিবাদীরা কাব্যের আত্মা ধ্বনি বলে আরম্ভ করলেও রস বলে শেষ করেছেন। চতুর্দশ শতকে রসতাত্বিক বিশ্বনাথ কবিরাজ তাঁর ‘সাহিত্যদর্পণ’ (১৩৮৬)-এ জানিয়েছেন, ‘বাক্যং রসাত্মকং কাব্যম্‌।’ এখন কাব্যে রসের প্রকৃতি কীভাবে সবুজ হয়ে ওঠে, তা দেখা প্রয়োজন।

বাক্য শুধু উপমাদি অলঙ্কারের ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করলেই যে ধ্বনি হয় না, সেকথা পূর্বেই ব্যক্ত হয়েছে। অন্যদিকে ধ্বনির উৎকর্ষমুখর প্রকৃতিতেই রসের পরিচয় নিবিড় হয়ে ওঠে। আভিধানিক বা বাচ্যার্থের অতিরিক্ত অর্থের বিস্তারেই ধ্বনি রসে পরিণত হয়। সেক্ষেত্রে বাচ্যার্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ অর্থ যতই ব্যঞ্জনাবহ মনে হোক, তা যেমন ধ্বনি নয়, তেমনই রসের অভাবে কাব্য হয়ে ওঠে না। অভিনবগুপ্ত তাঁর ‘ধ্বন্যালোকলোচন’-এ এরকম দুটি উদাহরণ দিয়েছেন যেখানে ধ্বনির অভাবে কাব্য হয়ে ওঠেনি। মদনের ভস্মিত দেহের প্রভাব সারা বিশ্বে পড়া নিয়ে একটি কবিতায় বলা হয়েছে, ‘স একস্ত্রীণি জয়তি জগন্তি কুসুমায়ুধঃ।/ হয়তাপি তনুং যস্য শম্ভুনা ন হৃতং বলম্‌।।’ অর্থাৎ সেই এক কুসুমায়ুধ তিন লোক জয় করে। কিন্তু শম্ভু তাঁর দেহ হরণ করলেও বল হরণ করতে পারেননি।’ আরেকটি কবিতা : ‘কর্পূর ইব দগ্ধোহপি শক্তিমান্‌ যো জনে জনে।/ নমোহস্ত্‌ববার্যবীর্যায় তস্মৈ কুসুমধন্বনে।।’ অর্থাৎ দগ্ধ হলেও কর্পূরের মতো গুণ ছড়াচ্ছে, অবার্য-বীর্য সেই কুসুমধনু মদনে প্রণাম। দুটি কবিতাতেই বাচ্যার্থের অতিরিক্ত অর্থ প্রাধান্য না পাওয়ায় কাব্য হয়ে না উঠার কথা স্মরণ করিয়েছেন আভিনবগুপ্ত। প্রথমটিতে ভাবের প্রকাশমাত্রে, দ্বিতীয়টিতে কর্পূরের সঙ্গে মদনের তুলনাতেই ব্যঞ্জনা শেষ হয়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত অর্থের রসঘন প্রকৃতি উঠে আসেনি।

সেদিক থেকে একই বিষয় নিয়ে শিবের মদনভস্মের প্রভাব নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অপূর্ব কাব্যনিদর্শন ‘মদনভস্মের পর’ অভিনব চেতনার বিস্তারে অনাস্বাদিত রসের অবতারণা লক্ষণীয় : ‘পঞ্চশরে দগ্ধ ক’রে করেছ এ কী সন্ন্যাসী!/ বিশ্বময় দিয়েছ তারে ছড়ায়ে।/ ব্যাকুলতর বেদনা তার বাতাসে ওঠে নিশ্বাসি,/ অশ্রু তার আকাশে পড়ে গড়ায়ে।’ প্রেমের বিচ্ছেদবিরহের অপূর্ব প্রকাশে কবিতাটির আবেদন রসঘন হয়ে উঠেছে। সেখানে বাচ্যার্থের অতিরিক্ত অর্থই শুধু মূর্ত হয়ে ওঠেনি, সেই মূর্তি প্রতিমায় আবেদনক্ষম মনে হয়। এজন্য কবিতাটির ধ্বনি অলৌকিক রসে বর্ণরঙিন। চিরন্তন বিরহীপ্রেমিকের বেদনার্ত অশ্রুজলে মদনের ভস্ম একাত্ম হয়ে পড়ে। আর সেখানেই ধ্বনির রসে পরিণতি, রসের অলৌকিক অভিব্যঞ্জনা। কাব্যের আত্মা বা প্রাণ হিসাবে সেই রসের সরসতাই কাব্যকে রসবতী বা সরস্বতী করে তোলে। সাহিত্যরসিকের তাতে নিত্য আনাগোলা, অবগাহনে সতৃষ্ণ আজীবন।

লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা-বিশ্ববিদ্যালয়, যোগাযোগ : জীবনসুরভি, ক্রিং টাওয়ার, হুচুকপাড়া, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।

আপনার মতামত লিখুন :

2 responses to “সাহিত্যে রস, রসে সাহিত্য : স্বপনকুমার মণ্ডল”

  1. সুখেন দাস says:

    আপনার লেখা যতই পড়ি আর শুধু ভাবি! আপনার বিচরণ সর্বত্র। আপনি শুধু দিয়ে যান আমরা গ্রহণ করতে প্রস্তুত…

  2. Kshitish Tantubay says:

    খুব সুন্দর করে বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন রস কি রস কিভাবে এল বাংলা সাহিত্যে, ধন্যবাদ আপনাকে স্যার

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev