শর্ত মেনে ঠিকঠাক কাজ। খরচের হিসাবে স্বচ্ছতা। এই দুটি শর্ত পূরণ করতে পারাটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নজর কাড়ে। ‘বাংলার বাড়ি’ প্রকল্পও শর্ত দুটি যথাযথ পালন করেছে, আর তারই ফলস্বরূপ বাংলাকে কুর্নিশ জানিয়েছে কেন্দ্র। উচ্ছ্বসিত প্রশংশা জানিয়েছে কেন্দ্রীয় পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রক। তবে কেবল প্রশংশাঈ নয়, ফের মিলেছে বাড়ি নির্মাণের ছাড়পত্র। রাজ্যে ৪৬টি পুরসভায় নতুন ৪৫ হাজার বাড়ি নির্মাণ করার অনুমোদন দিল কেন্দ্র।
‘হাউজিং ফর অল’ প্রকল্প এখানে ‘বাংলার বাড়ি’ নামে পরিচিত। মূলত, পুরসভা এলাকায় বস্তিবাসী ও গৃহহীনদের মাথার উপর ছাদ দেওয়াই মূল লক্ষ্য এই প্রকল্পের। প্রতিটি বাড়ি পিছু বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ ৩ লক্ষ ৬৮ হাজার টাকা। এর মধ্যে কেন্দ্র দেয় ৪০ শতাংশ। সমপরিমাণ ভাগ রাজ্যের। বাকি ২০ শতাংশ টাকা দেয় উপভোক্তা। প্রকল্প বাস্তবায়নে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি নজরদারি শুরু করেন।
এখন পর্যন্ত বিভিন্ন পুরসভা মিলিয়ে ১ লক্ষ ২১ হাজার বাড়ি নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ করেছে রাজ্যে। ২ লক্ষ ২৩ হাজার ৭৯৫টি বাড়ির কাজ চলছে। লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৮ লক্ষেরও বেশি বাড়ি নির্মাণের। প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রতিটি পদক্ষেপেই কেন্দ্রের দেওয়া ‘গাইড লাইন’ যথাযথ মেনেছে রাজ্য। ওই বৈঠকে সেটা মেনে নিয়েছেন কেন্দ্রের নগরোন্নয়ন সচিব দুর্গাশঙ্কর মিশ্র। প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজে ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি। আর এই সুযোগকে হাতছাড়া করেননি রাজ্যের নগরোন্নয়ন দপ্তরের আধিকারিকরা। নতুন করে ৪৫ হাজার বাড়ি নির্মাণের অনুমোদন চেয়ে আবেদন করেন তাঁরা। সঙ্গে সঙ্গেই সেই আবেদন গ্রহণ করে চটজলদি অনুমোদনও দিয়ে দেন মিশ্র।
মোদি সরকারের এই সহযোগিতাকে ‘স্বচ্ছতার প্রতিদান’ হিসেবে দেখছেন রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরের আধিকারিকরা। রবিবার পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম বলেছেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সরকার যে স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করে, তা ফের প্রমাণিত হয়ে গেল। আমরা শীঘ্রই পুর এলাকায় নতুন বাড়ি নির্মাণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করব।’ নগরোন্নয়ন দপ্তর সূত্রে খবর, কোন কোন পুরসভায় নতুন করে বাড়ি নির্মাণের কর্মসূচি নেওয়া হবে, তার তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।
কেন্দ্রের ‘হাউজিং ফর অল’ প্রকল্পে কাজের অগ্রগতি খতিয়ে দেখছে নগরোন্নয়ন মন্ত্রক। সেখানে প্রতিটি রাজ্যের কাজ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন মন্ত্রকের আধিকারিকরা। তাতে দেখা গিয়েছে, কেন্দ্রের ‘গাইড লাইন’ মেনে প্রকল্প রূপায়ণে একমাত্র এগিয়ে পশ্চিমবঙ্গ। বিশেষ করে প্রকল্পের সঙ্গে ‘জিওট্যাগিং’ প্রযুক্তি যুক্ত করার ক্ষেত্রে বাংলার ধারেকাছে নেই কোনও রাজ্য। আর এই ‘জিওট্যাগিং’ হল প্রকল্পের উপর ‘ডিজিটাল’ নজরদারির অন্যতম মাধ্যম। এতে স্বচ্ছতা মেনে কাজ হচ্ছে কি না, তা সরাসরি দেখভাল করতে পারেন প্রকল্পের আধিকারিকরা। গত বছর প্রকল্পের কাজ খতিয়ে দেখতে সরেজমিনে রাজ্যে এসেছিলেন কেন্দ্রের প্রতিনিধিরা। নগরোন্নয়ন দপ্তরের আধিকারিকদের সঙ্গে নিয়ে হুগলি জেলা ঘুরে দেখেন তাঁরা। ‘বাংলার বাড়ি’ প্রকল্পের কাজে সন্তোষ প্রকাশও করেছিল কেন্দ্রের দল।
রাজ্যে তৃতীয় বার জয়ী হওয়ার পর নাগরিক পরিসেবা দিতে বদ্ধপরিকর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিগত কয়েক মাসে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী একের পর এক প্রকল্পের ঘোষণা করেছেন তিনি। কন্যাশ্রী, যুবশ্রী, বাংলার বাড়ি, উৎকর্ষ বাংলা, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে রাজ্য সাফল্যও পেয়েছে। শহরাঞ্চলে ‘বাংলার বাড়ি’ প্রকল্পটি সমাজে আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষজনের বাড়ি তৈরির জন্য সাহায্য। গ্রামাঞ্চলে পঞ্চায়েত দফতরের তত্ত্বাবধানে এই কাজই চলছে ‘বাংলা আবাস যোজনা’ নামের প্রকল্পের অধীনে। এই প্রকল্পের প্রশংসা করেই কেন্দ্রের চিঠি এসেছে নবান্নে। নগরোন্নয়ন মন্ত্রক জানিয়েছে, বাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের এই প্রকল্পটি সবচেয়ে এগিয়ে। পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নে ভাল কাজ হয়েছে।
অর্থাৎ বাংলার তৃণমূল সরকারের আরও একটি প্রকল্প জাতীয় স্তরে সাড়া ফেলে দিল। বাংলার বাড়ি প্রকল্পে কেন্দ্রীয় সরকারের ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়ে নিল মমতার সরকার। রাজ্য বিজেপি যতই মমতার সরকারের নিন্দায় মুখর হোক জাতীয় স্তরে বাংলার প্রকল্পের প্রশংসা করল কেন্দ্রের বিজেপি সরকারই। স্বভাবতই খুশির হাওয়া রাজ্যজুড়ে। আগেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৈরি নিজস্ব কিছু প্রকল্প জাতীয় স্তরের ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছিল। এবার বাংলার মুকুটে যোগ হল আরও একটি পালক।