মানুষ প্রকৃতির সন্তান। দৈনন্দিন জীবনে প্রকৃতির যে শক্তিকে দেখে ভীত হয়েছে তাকেই দেবতা জ্ঞানে পুজো করেছে। সময়ের সরণি বেয়ে এইসকল ধারণা থেকে জন্ম নিয়েছে ব্রতচার। ব্রত শুধুমাত্র একটি শব্দ নয়, এর গভীরে রয়েছে লোকায়ত সংস্কৃতির গতিশীল ধারা।
গ্রাম বাংলার বৈশাখী উৎসব পালন করা হয় নানারকম ব্রত পালনের মধ্যে দিয়ে। শস্যকেন্দ্রিক ভাবনা থেকে বৈশাখ মাসে বৃষ্টির জন্য পালন করা হয় নানান ব্রত। যেমন…

তুলসী ব্রত : পয়লা বৈশাখ থেকেই তুলসী ব্রত পালন করা হয়। তুলসী শ্রীকৃষ্ণপ্রেয়সী। সৌর মাসে সূর্যের প্রখর তাপে বিষ্ণুভক্তকে জলদানের মধ্যে দিয়ে শ্রীকৃষ্ণের সেবা করা হয়। পুরাণ বলে, সমস্ত পত্রের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে তুলসী। তুলসী গাছের ভেষজগুণ অপরিসীম।
তুলসী গাছের গোড়া নিকিয়ে একটি আল করে দেওয়া হয়। এরপর ‘ঝারা’ দেওয়া হয় তুলসী গাছে। ঝারা দেওয়ার অর্থ, একটি বাঁশ বা কাঠি দিয়ে নিক্তির মতো তিনটি দড়ি ঝুলিয়ে তাতে একটি ছোট ছিদ্র করা মালসা বসিয়ে দেওয়া হয়। বাড়ির কোন বয়স্কা মহিলা বা সধবা নারী স্নান করে ভিজে কাপড়ে কোন জলাশয় থেকে আনা এক ঘটি জল মালসার ভিতর ঢেলে দেয় যাতে তুলসী গাছের মাথায় অবিরত জল পড়তে থাকে। সন্ধ্যায় তুলসী তলায় প্রদীপ জ্বালানো হয়। ব্রতী জল ঢালতে ঢালতে মুখে ছড়া বলে—
তুলসী ! তুলসী! বৃন্দাবন
তুমি তুলসী নারায়ণ।
তোমার শিরে ঢালি জল,
অন্তিমকালে দিয়ো স্থান।
এই ব্রতের মধ্যে দিয়ে নারীর অন্তিম কামনা প্রকাশ পেয়েছে। এছাড়া দৈবীক উপায়ে বৃষ্টিপাত ঘটানোর কামনাও নিহত থাকে।

রণে এয়ো ব্রত : পুরো বৈশাখ মাস ধরে পরপর চার বছর এই ব্রত পালন করার নিয়ম আছে। ধন-ধনা-সৌভাগ্য-স্বাস্থ্য-দীর্ঘজীবন এইসব পার্থিব জিনিসের কামনায় এই ব্রত পালন। পিটুলি গোলা দিয়ে ১টা ধানের পুঁটলি, ১টা সিঁদুরের কৌটা, ১টা ধনের (টাকা-পয়সা) পুঁটলি, ১টা কাঁচা আম বা সুপুরির পুঁটলির ঘর এঁকে প্রত্যেক ঘরে উক্ত জিনিসগুলো রাখা হয়। এরপর সিঁদুরের কৌটা ধরে ব্রতী বলে :
রণে রণে এয়ো হবো।
ধনের পুঁটলি ধরে বলে : জনে জনে সো হবো
ধানের পুঁটলি ধরে বলে: আকালে লক্ষ্মী হবো।
কাঁচা আম বা সুপুরির পুঁটলি ধরে বলে : সময়ে পুত্রবতী হবো।
তিনবার এরকম ছড়া শেষে বলে :
রণে এয়ো ব্রত করে যেন হয় স্বামীর সো।
যতকাল বাঁচি যেন না পড়ে আমার নো।।

হরির চরণ ব্রত : সাধারণত সধবা নারী ও কুমারী মেয়েরা সারা বৈশাখ মাস ধরে পালন করে। একটি তামার টাটে শ্বেত চন্দন দিয়ে দুটি পদ চিন্হ (হরির চরণ) আঁকতে হয়। হরির চরণে আত্মনিবেদনের মধ্যে দিয়ে সংসারের সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধির চিরপোষিত কামনা করা হয়।

পুণ্যিপুকুর ব্রত : চৈত্র মাসের সংক্রান্তির দিন থেকে শুরু করে সারা বৈশাখ মাস জুড়ে পাঁচ থেকে নয় বছরের কুমারী মেয়েরা এই ব্রত পালন করে। আবার কোন অঞ্চলে সধবা নারীরাও পালন করে। বাড়ির মাটির উঠানে গর্ত করে পুকুর কেটে চারটে ঘাট করে কড়ি দিয়ে সাজানো হয়। সাদাফুল, চন্দন, দূর্বাঘাস সহ উপাচার সহযোগে পাতাসমেত কাঁটাশুদ্ধ বেলগাছের ডাল ও তুলসী গাছ পুকুরে পুঁতে পুকুর জল ঢেলে পূর্ন করা হয়।
বৈশাখের গরমে যাতে জল না শুকায়, গাছ না মরে যায়, বৃষ্টির কামনায় এই ব্রত পালন করা হয়। বসুন্ধরাকে শস্যশ্যামলা করার এক কামনা প্রসূত ব্রত।প্রিয়জনের মঙ্গলকামনায় কুমারী ও সধবা নারী উভয়ই এই ব্রত পালন করে।
পুণ্যিপুকুর পুষ্পমালা
কে পূজেরে দুপুরবেলা?….
ঢালি জল তুলসী বিল্বদলে,
স্বামী সোহাগিনী হব ফলে ফুলে।
পুণ্যিপুকুরে ঢালি জল,
শ্বশুরকুলের হউক মঙ্গল।

অশ্বথপাতা ব্রত : বৈশাখ মাস জুড়ে পালন করা হয় অশ্বথপাতা বা অশ্বথনারায়ণ ব্রত। এই ব্রত চার বছরে সমাপন করা হয়। মূলত এটি বৃক্ষ বন্দনা, প্রকৃতির রোষ থেকে বাঁচবার প্রবৃত্তি, বৃষ্টিপাত ঘটিয়ে ধরিত্রীকে উর্বর করার ব্রত। একটি করে কাঁচা-কচি-পাকা-শুকনো-ঝুরঝুরে ছেঁড়া অশ্বথ পাতা মাথায় নিয়ে ব্রতীনিকে পুকুরে গিয়ে পাঁচবার ডুব দিয়ে ছড়া কেটে পালন করতে হয়।
যুগের বিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তন হয়েছে মানুষের চাওয়া পাওয়া।আদিম কামনা-বাসনার সাথে যুক্ত হয়েছে যুগোপযোগী চাহিদা। আজকের নারীরা স্বামীর বিত্তবৃদ্ধি, আয়ুবৃদ্ধি, সন্তানদের সুখ কামনা, শ্বশুর বাড়ির সঙ্গে পিতৃকুলের উন্নতির মতো আকাঙ্ক্ষাকে যুক্ত করেছে এই ব্রত পালনের সঙ্গে। ব্রতের অন্তরে থাকা এইসব লৌকিক সংস্কার আজো মাটির কাছাকাছি পৌঁছে দেয় মানব হৃদয়কে। পরম্পরাবাহিত ব্রত মানুষকে বেঁধে রেখেছে একসূত্রে।।
তথ্যসূত্র : বাংলার ব্রতপার্বন— ডা. শীলা বসাক, বাংলার ব্রত— অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সম্পর্কিত অন্যান্য বই।
Valo laglo.jana gelo onek kichu
খুব ভালো লেখা।
বাহ! খুব ভালো লাগল।
খুব ভালো লাগলো, পড়লাম, WhatsApp এ 5 জন বান্ধবী কে share করলাম
চমৎকার উপস্থাপন ভালোলাগা।ব্রতৎসব,পূজা, অর্চনা ভারতীয় সংস্কৃতির অঙ্গ।ভালো পরিবেশন।