একদিন এক প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতায় প্রশ্নকর্তা হঠাৎ দর্শক সাধারনের কাছে জানতে চাইলেন, আজ বাংলার সাল তারিখ কত? অসহায় জনতার দিকে তাকিয়েই বোঝা গেল, সেটাই ছিল সেদিনের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন। কারণ তারিখ তো প্রায় কেউই বলতে পারেননি এমনকি সালটাও অনেকে ভুল বলেছেন। এটাই বাস্তব। ২৫শে বৈশাখ, ১১ই জ্যৈষ্ঠ, কিম্বা ২২শে শ্রাবণ এর মত হাতে গোনা কয়েকটি দিন আছে যেগুলি আমরা বাংলায় মনে রাখি। ১লা বৈশাখ ও তেমনই এক উজ্জ্বল দিন। যদিও ইংরেজি নববর্ষের মাল মসলা দিয়ে তার হালচাল পাল্টে তাকে আধুনিক করে তোলার একটা অপচেষ্টা চলছে আজকাল। অনেকটা ঠিক আজকালের জন্মদিন পালনের মতই। প্রদীপ জ্বালানোর মাঙ্গলিক প্রথার চেয়ে আমাদের মনে ধরছে মোমবাতি নেভানোর অমঙ্গুলে ইংরেজি কালচার। এইসব কালচার-ই যেন আজকের প্রজন্মের মতে নাবালক থেকে সাবালোক করে তুলতে চেষ্টা করছে বাংলা সংস্কৃতিকে। সেই চেষ্টা যতই এগোচ্ছে ততই আমার সোনার বাংলার স্বাদ ক্রমশঃ তেতো হয়ে যাচ্ছে আমাদের কাছে, এ নিঃসন্দেহে পরিতাপের বিষয়।
তবে যাই হোক, শেষ পর্যন্ত আশার কথা, বাংলা নববর্ষের ক্ষেত্রে এখনো পর্যন্ত বেশিরভাগ বাঙালি কিন্তু খাঁটি বাঙালিআনায় বিশ্বাসী। আশ্চর্যের বিষয় হল, “বর্ষ” কথাটি সর্বপ্রথম আমরা পেয়েছি স্থানবাচক হিসেবে। আমাদের পৌরাণিক কাহিনী থেকে শুরু করে বৌদ্ধ কিংবা জৈন সাহিত্যের কল্পনায় পৃথিবীটা ছিল জাম গাছের শ্যামল ছায়ায় ঘেরা একটি মিষ্টি দ্বীপ। তার নাম জম্বু দ্বীপ। এই জম্বু দ্বীপের একেকটি অংশকে বলা হত বর্ষ। সেই দিক থেকে নতুন গড়ে ওঠা ভারত বর্ষ নিজেই নববর্ষ হিসেবে পরিচিত ছিল। সম্রাট অশোকের অনুশাসন থেকে জানা যায়, আফগানিস্তান থেকে শুরু করে অশোকের পুরো রাজ্য সীমাই সম্পূর্ণ পৃথিবী অর্থাৎ জম্বু দ্বীপ। অর্থাৎ সম্রাট অশোক সমগ্র পৃথিবীর অধীশ্বর ছিলেন, এই কথাই বলা হত। এখন অবশ্য সেই জম্বু দ্বীপ আমাদের আলোচনার অতীত।

বর্তমানে নববর্ষের প্রথম কথাই হল হালখাতা। বিষয়টি নিঃসন্দেহে অর্থনৈতিক। পাওনাদারের সারা বছরের হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে আবার নতুন করে তার ক্ষেরোর খাতায় নাম তোলা। কিংবা বৎসরান্তি যা কিছু অবশিষ্ট থাকলো তা বীজের মতো লক্ষ্মীর ঝাঁপিতে সঞ্চয় হিসেবে তুলে রাখা এটাই নববর্ষের মূল উদ্দেশ্য। সেই দিক থেকে ১লা বৈশাখ বাঙালি জীবনে বিশেষ একটি দিন। আজকাল শহরাঞ্চলের অনেক জায়গায় এদিন ঘটা করে সিদ্ধিদাতা গণেশের পুজোর চল হয়েছে। গণেশের আশীর্বাদ নিয়ে নতুন খাতা পুজো করেন কোনো কোনো বড় ব্যবসায়ী। আম বাঙালি কিম্বা গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষের ভাবনা কিন্তু একেবারে আলাদা। এখানকার গরিব গুর্বো মানুষ কিন্তু গণেশের প্রতি খুব একটা সন্তুষ্ট আগেও ছিলেন না এখনো আছেন বলে মনে হয় না, বরং তারা কিছুটা অভিমানীও বলা যায়। কারণ পেট মোটা গণেশ ঠাকুর নিজের নামটি জনগণের থেকে নিলেও দুধ কিন্তু খেয়েছেন সম্পন্ন বণিক শ্রেণীর হাতে। গ্রামের শিবমন্দিরে ১লা বৈশাখ বেশিরভাগ মানুষ শিব ঠাকুরের আশীর্বাদ নিয়ে তাদের খাতা পুজো করান। এটাই চলে আসছে চিরাগত কাল থেকে। বাসি চড়কের মতো বিগত বছরের উৎসবের অবশিষ্ট আলো যেন খুশি হয়ে নেমে আসে নতুন বছরের প্রাঙ্গণে, এইটুকু কামনায় তারা ফুল চড়ান ভোলা মহেশ্বর এর মাথায়।

ফুল চড়ানোর কথা উঠতেই এসে পড়ে চৈত্র গাজনের সন্ন্যাসীর কথা। “বাবা তারকনাথের চরণে সেবা লাগি, মহাদে-এ-এ-ব”। গ্রামের প্রাচীন মূল সন্ন্যাসীর সেই উদাত্ত ডাকে কেঁপে ওঠে চৈত্রের গোধূলি। বেতের ছড়ি হাতে, সুতোর উত্তরীয় গলায় দলবল নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় তাদের ঘোরা, আম কাঁঠাল নারিকেল ইত্যাদি গাছ জড়িয়ে ধরে কোল দেওয়া — গুষ্টি বর্গের উন্নতি হোক সব সন্ন্যাসী আছো-ও-ও-? আছি। সারা বছর মাঠে মাঠে খেটে হাড় কালি করা মানুষগুলো যেন এই কদিনের নায়ক হয়ে ওঠেন। তাদের কোঁচরে গাছের ফল দিয়ে, পায়ে কলসির জল ঢেলে দিয়ে প্রণাম করেন মা কাকিমারা। বহুদিন থেকে চলে আসা রীতির সেই চিত্র এখনো অম্লান। সাধারণত গ্রামের মূল সন্ন্যাসীরা দায়িত্ব পালন করেন বংশ পরম্পরায়। দেখা যায়, হয়তো তার জন্য বহুকাল আগে তাঁর কোনো পূর্বপুরুষ দেবোত্তর সম্পত্তি বা জমি পেয়েছিলেন। আকালের বছর তা হয়তো বেচে খেয়েছিলেন তারা অনেকেই। এই প্রজন্ম তার ছিটেফোটাও পায়নি। কিন্তু পূর্বপুরুষদের সেই ঋণ এখনো প্রজন্মের পর প্রজন্ম শোধ করে চলেছেন সন্ন্যাসীর ভূমিকা পালন করে। রাজা আসে রাজা যায় সাধারণ মানুষের ঋণের মাপ হয় কিন্তু দেবতার সম্পত্তির ঋণ কিছুতেই শোধ হয় না। তাদের কোন নতুন খাতা হয় না। শুধু পরবর্তী প্রজন্মের কোনো বংশধর ঘাড়ে জোয়াল নিলে তবেই নিস্তার পান বৃদ্ধ মূল সন্ন্যাসী।
প্রাসঙ্গিকভাবেই পরবর্তী বিষয়টি হল রাজনৈতিক। নতুন পাঁজি হাতে নিয়ে গাজনেবামুন বসে যান নতুন বছরের শুভাশুভ ঘোষণা করতে। তার চারদিক ঘিরে উৎকণ্ঠ নিয়ে বসে থাকেন বহু নরনারী। মূল প্রশ্ন হলো শুক্র, শনি, বৃহস্পতি ইত্যাদি গ্রহদের মধ্য থেকে কে রাজা হচ্ছেন আর কে হচ্ছেন মন্ত্রী। কেইবা আর বিভিন্ন দায়-দায়িত্ব পাচ্ছেন। গ্রহদের এইসব পদপ্রাপ্তির উপরেই নির্ভর করছে বৃষ্টি কতটা হবে, মারি ও মড়ক হবে কিনা, বন্যা ও ঝড়-ঝঞ্ঝার প্রকোপ কতটা হবে, ফসল কি রকম হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি। সাধারণ মানুষের অগাধ বিশ্বাস এই সব গ্রহদের উপর, তাঁদের দায়-দায়িত্বের উপর। সেই সব গ্রহদের আশীর্বাদ মাথায় নিয়েই বিশ্বাসীরা আজকের গণতন্ত্রের গলগ্রহদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকে অন্তত একটা দিন। এভাবেই বাংলার নববর্ষ বাঙালিদের নতুন প্রাণে জাগিয়ে তোলে প্রতিবার।