সাহিত্যের রথী-মহারথীর ভাষ্যমতে, আধুনিক মননের অন্যতম আবিষ্কার কৌতুক। কৌতুক সমৃদ্ধ জাতিসত্তার ইঙ্গিতবহও বৈকি। জানা আরও যা যায়, গুহা-মানবের জীবনযাপন আপাতসরল ছিল বলেই কৌতুক ছিল না, পবিত্র আসমানি কিতাবগুলোতেও নেই, গিলগামেশেও পাওয়া যায় না; স্রেফ এ এক সমসাময়িক আবিষ্কার। পরিস্থিতি যত জটিল, রম্যও তত প্রবল। বিবর্তনের ধারায় পৃথিবী যদি একদিন সরল হয়ে পড়ে, কৌতুকও বিপন্ন হবে।
বাঙালি রেনেসাঁ বা রিভাইভেলের সময়ে ইংরেজি-জানা বাঙালি তথা ভারতীয়রা যখন ইংরেজদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছিল, শিখে নিচ্ছিল বারুদের ব্যবহার খোদ জানি দুশমনের কাছ থেকে, তখন অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। কালীপ্রসন্ন সিংহের হুতোমপেঁচার নক্সা কি ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের বাঙ্গাল নিধিরাম, ফোকলা দিগম্বর-এর মধ্য দিয়ে সেই আলো এসে পড়ছিল রম্যসাহিত্যেও। ব্যস, সেরা কৌতুকের কারিগরগণের ভরাহাট বসতে দেরি হয় না: ত্রৈলোক্যনাথ, সুকুমার রায়, রাজশেখর বসু, প্রমথনাথ বিশী, শিবরাম চক্রবর্তী, গৌরকিশোর ঘোষ, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সৈয়দ মুজতবা আলী প্রমুখ কত সব নাম। এমনকি বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথও সরসতায় পিছিয়ে থাকেননি। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে কোট করলে তেমন সারবত্তা প্রতিধ্বনিত হয়- ‘বঙ্কিমচন্দ্রে হিউমার তার উপন্যাস ও অন্যান্য লেখাকে একই সঙ্গে আকর্ষণীয় ও তাৎপর্যময় করেছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের বেশির গল্পের পরতে-পরতে চাপা হাসির ছটা কি লেখাকে আরও লাবণ্যময় করে তোলেনি? উপন্যাসে তার আইডিয়ার যথোচিত উপস্থাপনা এবং সেই অনুযায়ী চরিত্র গড়ে তোলার কাজে রবীন্দ্রনাথ খুব সচেতন হওয়ায় এদিকে উপযুক্ত মনোযোগ দিতে পারেনি। তবু তার উপন্যাসে হিউমার যা আছে তা কিন্তু ওই গভীর চিন্তাভাবনার মধ্যে পাঠককে চাঙ্গা করে তোলবার জন্য কম নয়।’ রবীন্দ্রনাথের কতিপয় ঝলমলে কৌতুক তবে উদ্ধার করা যাক- ‘১/সর্বদা দেখিতাম, আমার বাপ উক্ত আদালতজীবীদিগকে অত্যন্ত সম্মান করিতেন- নানা উপলক্ষে মাছটা-তরকারিটা-টাকাটা-সিকেটা লইয়া যে তাহাদের পূজার্চনা করিতে হইত তাহাও শিশুকাল হইতে আমার জানা ছিল;…ইহারা আমাদের বাংলাদেশের পূজ্য দেবতা; তেত্রিশ কোটির ছোটো ছোটো নূতন সংস্করণ।…সুতরাং পূর্বে গণেশের যাহা কিছু পাওনা ছিল আজকাল ইহারাই তাহা সমস্ত পাইয়া থাকেন (একরাত্রি)…২/ অত্যন্ত অসংলগ্নভাবে কম্পিত অঙ্গুলিতে নাড়ি দেখিলেন, তিনি আমার জ্বরের উত্তাপ বুঝিলেন, আমিও তাহার অন্তরের নাড়ি কিরূপ চলিতেছে কতকটা আভাস পাইলাম (কঙ্কাল)…৩/সেদিন মা কাকে বলছিলেন উনি ম্যাগনেটিজম নিয়ে কাজ করছেন, তাই পাশ দিয়ে কেউ গেলেই কাঁটা নড়ে যায়, বিশেষত মেয়েরা (ল্যাবরেটরি)।’ রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধসাহিত্যেও শ্লেষাত্মক বর্ণনা দুর্লক্ষ্য নয়।
ঘরের ভেন্টিলেটরগুলো যেমন ঘরের বাতাসকে নির্মল সঞ্জীবিত রাখে, সুষম রঙ্গরসও সমধর্মা উদ্দেশ্য হাসিলে সক্ষম। রংতামাশার জায়গায় এসে পাঠকের একটু জিরিয়ে নেয়ার ফুরসত মেলে; কমিক রিলিফ আরকি! টনিক বুস্টারও বলা চলে। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের টেনিদা সিরিজ, প্রেমেন্দ্র মিত্রের ঘনাদা সিরিজ, গৌরকিশোর ঘোষের রূপদর্শীর ঝাঁকিদর্শন, সৈয়দ মুজতবা আলীর পঞ্চতন্ত্র, ময়ূরকণ্ঠী, হিমানীশ গোস্বামীর চোখ বন্ধ করে চোখ বন্ধ করে, কিংবা তারাপদ রায়ের দিন আনি দিন খাই, শোধবোধ বা সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের লোটাকম্বল, রাখিস মা রসেবসে, একদম হালের চন্দ্রিল ভট্টাচার্যের রস কষ সিঙাড়া বুলবুলি, উত্তম মধ্যম-এ পাঠক সেই ঈপ্সিত কমিক খুঁজে পান। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের লেবুমামার সপ্তকাণ্ড, খান মোহাম্মদ ফারাবীর মামার বিয়ের বরযাত্রী, খোন্দকার আলী আশরাফের নাগরিক জীবনের প্রেক্ষাপটে লেখা দুর্জন উবাচ, দুর্জন পুনর্বাচ, ফাহমিদা আমিনের ঝালে ঝোলে অম্বলে আজও সমান টানে। কথাটা কমিক রিলিফ বা টনিক বুস্টার যা পাঠককে বহুমুখী সুবিধা দেয়, চাইকি নব উদ্যমে ঢুকতে পারেন কমলকুমার মজুমদারের বর্মাচ্ছিত গদ্যের অন্দরমহলেও। কিংবা আরেক মজুমদার অমিয়ভূয়ণেও যিনি উপন্যাসকে ঘটনাপুঞ্জের স্থলে থিম নামে এক জীবন্ত বিষয়ের ভাব হিসেবে দেখেছেন, সেই ভাব যা আমাদের চোখের নিচে ফুটে ওঠে।
বাংলাদেশে আরও কয়েকজন লেখকের নাম স্মর্তব্য যাদের বহুভঙ্গিম লেখনিতে পাঠক রসসিক্ত হন। ওবায়েদ উল হক, মমতাজউদ্দীন আহমদ, আবদুশ শাকুর, আবদার রশীদ, আবুল খায়ের মুসলেউদ্দীন, আলী হাবিব প্রমুখ সমহিমায় উজ্জ্বল। শামসুজ্জামান খান জহুরির ন্যায় তার সংকলিত ঢাকাইয়া গল্প-এ রগড়াত্মক গল্পগুলো ছেঁকে তুলে এনেছেন। পল্লীকবি জসীমউদ্দীনও গ্রামবাংলার হাসির গল্পের সংকলন বাঙালির হাসির গল্প দুই খণ্ডে হাসির হররা ছুটিয়েছেন। চাল-মারা কথার সঙ্গে কৌতুকের তফাত তুলে ধরতে অনেকখানি সফল আহসাবউদ্দীন। আহসাবউদ্দীনের দাম শাসন দেশ শাসন মাত্র ৮০ পৃষ্ঠার রোগা বই হলে হবে কী, কৌতুকের ঝাঁজ শান-দেয়া তেজে পরিণত হয়েছে। কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার বিরাট অনুঘটক তার পরিমিত রসবোধ। ফুর্তিবাদী হাসি আর প্রতিবাদী হাসি- দু’রকম হাসিই বর্তমান তার সাহিত্যসম্ভারে। রচনাবলি বিপুল বলে হয়তো রসিকতার পুনরাবৃত্তি আছে, তারপরও পরিবেশনার গুণে সর্বদা পাঠকসমাদৃত। তাবৎ বড় লেখকদের সম্পদ তাদের সূক্ষ্ম সেন্স অব হিউমার। বিশ্বসাহিত্যেও এর প্রমাণ ভূরি ভূরি।
তবে আলাদা করে সুকুমার রায়, ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়, শিবরাম চক্রবর্তীর নাম বলতে হয়। মুক্তারামের মেসে, শুক্তারাম খেয়ে, তক্তারামে শুয়ে শিবরাম চক্রবর্তী যা বারোমাসি অট্টহাসি-কাণ্ড করলেন তা তুলনারহিত। হর্ষবর্ধন-গোবর্ধন-নকুড়মামা-ডালুমাসিরা তার একার রইল না, প্রকাশলগ্ন থেকেই রম্যসাহিত্যের চিরকালীন সম্পদ। ভাঁড়ামোকে তিনি সব সময় রেডকার্ড দেখিয়েছেন। তির্যক অথচ নির্মোহ চোখে ব্যক্তিকে দেখেছেন রাষ্ট্রীয় পটভূমিকায়। উনিশ শতকে ধর্মীয় কূপমণ্ডুকতাকে ত্রৈলোক্যনাথ যেভাবে বাউন্ডারিছাড়া করেছেন, কিংবা পরশুরাম যেমন বিরিঞ্চিবাবাদের মুখোশ উন্মোচন করেছেন, একই ধারায় শিবরামও হেঁটেছেন; শিবরাম খালি মুখোশধারীদের চর্মমুখ উদোম করেননি, একেবারে গোড়া ধরে টান দিলেন। সুকুমার রায়, ত্রৈলোক্যনাথ, শিবরাম রম্যধারার থ্রি মাসকেটিয়ার্স। ‘তারা কখনো মুগ্ধ করেন না, হাসাতে-হাসাতে সচেতন করে তোলেন, এমনকি সমস্ত বিষয় নিয়ে অবিরাম মজা করা সত্ত্বেও ভক্তিতে গদগদ হওয়ার সুযোগ তারা নিজেরাই দেন না।’ তাদের তিনজনই ছিলেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের প্রিয় লেখক-তালিকায়। যে কারণে ইলিয়াসের ইস্পাত কঠিন ঋজু গদ্যের অন্তঃশীলে পাহাড়ি খাঁজে লুক্কায়িত ঝরনার মতো এক স্বতঃস্ফূর্ত রম্যধারা বহমান। পুরু বাইফোকাল লেন্সের ভেতর দিয়ে ইলিয়াস যখন রাগী চোখে তাকান, তখন সেখানে কেবল সূর্যের খরতাপ থাকে না, চাঁদের মিহি গুঁড়ো দুধের সরের ভঙ্গিতে লেগে থাকে। তবে এই অন্তর্লীন কৌতুক জাতে আলাদা, মোটেই তরল নয়, হাসতে-হাসতে পাঠকের লুটিয়ে পড়ার সুযোগ নেই, শিরদাঁড়া খাড়া রাখতেই হয়। সাম্প্রদায়িকতা তো বটেই, জাতপাতের পিণ্ডি চটকাতেও ভূমিকা রাখে। ইলিয়াসের কৌতুক হয়ে ওঠে ক্রোধজ্ঞাপনের হাতিয়ার। চেরাগ আলীর ঘরে বৈকুণ্ঠ জল খেতে পারে না বলে কৌশলে আম চেয়ে নিয়ে চুষে-চুষে পিপাসা মেটানোর পর কুলসুমের ঝামটায় তীব্র ব্যঙ্গকটাক্ষই ঝরে পড়ে- ‘তোমার ভগমান মানুষের ঘরত আম খাবার হুকুম দিছে, না? ভগবানের লালচ বেশি, পানি খাবার দিবি না, আমেত আপত্তি নাই।’ সাম্প্রদায়িকতাবিষয়ক চোখা রম্য আরেকটু চেখে দেখা যাক- ‘লোকটা মনে হয় আজ সকালেই রিহার্সেল দিয়ে এসেছে, কিংবা নিজের চেম্বারে বসে রোজ রোজ বলতে বলতে তার মুখস্থ, ‘মুসলমান হল হিন্দু জমিদারের প্রজা, হিন্দু উকিলের মক্কেল, হিন্দু মহাজনের খাতক, হিন্দু মাস্টারের স্টুডেন্ট, হিন্দু ডাক্তারের পেশেন্ট।’ তার কথাসাহিত্যে ক্রোধসমৃদ্ধ রম্যের উপস্থিতি ব্যাপক। শুধু তাই নয়, নিজের রোগবালাই নিয়েও মশকরা করতে ছাড়েননি,- ‘১/আমি থিওরিটিক্যালি অসুস্থ। এক্স-রে ছবিতে ফুসফুসকে বিশেষ সুবিধার ঠাহর হয় না। দিন দিন নানারকম গয়না তিনি পরছেন। গয়না তার বেড়েই চলেছে…২/ কোথায় পড়েছিলাম যে মানুষ ছাড়া পৃথিবীর কোনো প্রাণীর পাইলস জাতীয় রোগ হয় না। এর কারণ নাকি এই যে, স্তন্যপায়ী জীবের নিয়ম অগ্রাহ্য করে মানুষ দুই পায়ে হাঁটে। আসলে নিয়ম তো চার পায়ে হাঁটা। কিন্তু সব মানুষের তো পাইলস হয় না, তাই ভয় হচ্ছে যে পাইলসওয়ালাদের এভ্যুলিউশন সম্পূর্ণ হয়নি। আমি আবার সেই মিসিং লিংকের মধ্যে পড়ি কিনা কে জানে?’ পায়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তিনি যখন মৃত্যুশয্যায়, তখনও একইভাবে ঠাট্টামশকরা করেছেন। একজন শিল্পী যখন একটু দূরে দাঁড়িয়ে অন্যের নিরাসক্ত চোখে নিজেকে দেখতে পারেন, তখনই শুধু নিজেকে নিয়ে এমন রঙ্গব্যঙ্গ করার শক্তি জোটে। বস্তুত ইলিয়াসের কৌতুক মানুষের ক্ষোভকে ক্রোধে প্রজ্বলিত করে হাস্যরসের এক নতুন সীমানাকেই নির্ধারণ করে।
আমাদের আরেক শক্তিমান কথাসাহিত্যিক আহমদ ছফাও থিমের প্রয়োজনে হাস্যপরিহাসমুখর বাক্যবাণ রচনায় যথেষ্ট কুশলতা দেখিয়েছেন। যা ইলিয়াসের চোখে পড়তে দেরি হয়নি,- ‘তীক্ষ্ণ বিদ্রুপ ও ঠাট্টা এই বইটির পরতে পরতে- আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠিত উচ্চবিত্তকে নিয়ে এরকম ঠাট্টা আজ পর্যন্ত কোনো উপন্যাসেই এমন সফলভাবে দেখা যায়নি। মনে হয় লেখক যেন নিষ্ঠুর খেলায় মেতে উঠেছে, মন্ত্রী বেটার পাছার কাপড় তুলে তাকে তিনি ন্যাংটো করে ছাড়বেন।’ হিউমার আর উইটের পার্থক্য এখানেই। বুদ্ধিদীপ্ত রঙ্গরস যদি হিউমার হয়, তবে বক্রোক্তিকে উইটের মর্যাদা দেয়া যায়। উইট এক বালি-শান ধারালো অস্ত্র, সামাজিক অসঙ্গতির ভেতরমহলে ফটোগ্রাফিক খানাতল্লাশি করতে পর্যন্ত সক্ষম; রাষ্ট্র, সমাজ, মধ্যবিত্তের ভণ্ডামি- কিছুই রেহাই পায় না। বহু সাধ্যসাধনায় যা বলা কঠিন ক্ষেত্রবিশেষে কৌতুকের এক ঝিলিকে তা প্রকাশ পেয়েছে। চাবুকের মতো উইটকে সপাটে ব্যবহারের সুযোগ থাকে বলেই না রম্যসাহিত্যের সম্ভাবনা অপার।
কিন্তু এমন অগাধ সম্ভাবনাময় ধারার কতখানি শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে উত্তরসূরির হাতে? সত্যের খাতিরে বলতেই হয়, এই উর্বর জমিনের আরাধ্য কর্ষণ হয়নি। বহুলাংশে উপেক্ষিতও বটে। ঐশ্বর্যশালী উত্তরাধিকারকে পল্লবিত করা তো দূরে থাক, সমাদরটুকু পর্যন্ত করা হচ্ছে না। একটু খাটো চোখে কি তবে দেখা হচ্ছে? প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক। রম্যশিল্পীকে যদি একজন চুটকি বলিয়ের সঙ্গে কাতারবন্দি করা হয়, তাহলে সমূহ বিপদ। চুটকির সঙ্গে রঙ্গবিদ্রুপকে গুলিয়া ফেলার পরিণতি ভয়ানক। অসফল কৌতুকের বিপদ সম্বন্ধে অমিয়ভূষণ সতর্ক করেছেন কবেই, ‘রস টানলে ফাজিল’। রসিক আর ফাজিল এক নয়। যেমন তেল আর ঘি এক না। রম্যের ভিয়ানে যদি রসই না থাকে, সমাজবাস্তবতা ঢলে পড়ে, ব্যক্তির ক্ষয় ও গ্লানি কি ব্যক্তিপিচ্ছিলতা প্রকটিতই না হয়, তাহলে আর কীসের রস! মিলান কুন্ডেরাকে উদ্ধৃত করলে অনুধাবন সহজ হয়,- ‘কৌতুক আরও নিষ্ঠুর; বর্বরোচিতভাবে সে বস্তুর নিরর্থকতাকে প্রকাশ করে। আমার মনে হয় মানবিক বস্তুর মধ্যে কৌতুক আছে, যা কোনো-কোনো ক্ষেত্রে চিহ্নিত, স্বীকৃত, ব্যবহৃত এবং অন্য সব ক্ষেত্রে অবগুণ্ঠিত। কৌতুকের প্রকৃত প্রতিভাবানরা আমাদের হাসান না, বরং তারা কৌতুকের অজানা রাজ্য প্রকাশ করেন।’ অর্থাৎ একই রন্ধনশৈলীর দুটো পিঠ; আঁচের সামান্য হেরফের হলেই বিপর্যয়, জীবনবোধের গূঢ় সূত্র অনাবিষ্কৃত থেকে যেতে পারে। পৃথিবীর প্রথম আধুনিক উপন্যাস ডন কুইক্সোট-এ দেবতুল্য নাইটদের অন্তঃসারবিহীনতাকে ব্যঙ্গশ্লেষে আঁকা হয়েছিল বলেই না গত ৪০০ বছর বিক্রির দিক দিয়ে বাইবেলের পরেই বইটির অবস্থান।
জোকস্ বা চুটির পরিবর্ত কখনও শিবরাম কি সুকুমার কিংবা জেরোম কে জেরোম নয়। নিয়ামত হোসেন অথবা আরও অনেক হাসির গল্পকারদের কথা একবার ভাবুন। সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা বাজারে আসার ঢের আগেই নিয়ামত হোসেন ফেলুমামা শুরু করেন। সেই পঞ্চাশ দশকে নিয়ামত হোসেনের হাতেখড়ি; প্যারোডি-সৃজনে তার মতো কাজ আর কে করেছেন। তথাপি একালে এসে তিনি বিস্মৃতপ্রায়। পাকিস্তান অবজারভারের গুণী সম্পাদক ওবায়েদ উল হকের স্যাটায়ারধর্মী লেখার খোঁজ এখন আর ক’জন রাখেন। ইতিহাসের বদমায়েশির আদলে একে সাহিত্যিক বদমায়েশি ছাড়া আর কী বলবেন! যেখানে অমিয়ভূষণদের মতো কাঞ্চনজঙ্ঘাসম লেখকরা ধারাবাহিক অবহেলার শিকার, সেখানে রম্যের কারিগরগণ যে উপেক্ষিত থাকবেন এ আর এমন কী!
এতে লোকসান কিন্তু আমাদেরই। জাত রম্যশিল্পীরা অমরত্বের ধোড়াই তোয়াক্কা করে লিখেছেন। লেখার আনন্দে তারা লিখে গেছেন জীবনসত্যের নিকটবর্তী হতে। সার্থক রসসাহিত্য কেবল হাসায় না, ভাবতেও শেখায়। তা যে কালখণ্ডই ধরুন, রম্যতার বিকল্প হয় না। একজন ভাঁড় ছাড়া রাজদরবার যদি অসম্পূর্ণ থাকে, শেকসপিয়রের নাটক যেখানে ক্লাউন ছাড়া জমে না, একজন বীরবল-গোপাল ভাঁড় অথবা তুরস্কের রসিকশিরোমণি মোল্লা নাসিরুদ্দিন আজও যেখানে সমান উপভোগ্য, সেখানে সরসতার প্রতি অবহেলা স্রেফ খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গি, আত্মহননের নামান্তর। সাম্প্রতিক রসসাহিত্যের স্থবিরতার নানাবিধ কারণ নিশ্চয় আছে। স্বীয় তাগিদেই চুলচেরা বিশ্লেষণ প্রয়োজন। বোঝা দরকার হাল জমানায় সমস্যা কোথায় আর কেনই-বা অগ্রজপ্রতিমগণ এতটা সফল। বস্তুত পূর্বসূরিদের কাছে রম্যরসের উপর্যুপরি ব্যবহার ছিল কার্যসিদ্ধির মতো একটা ব্যাপার; প্যানপানানিমার্কা রোমান্টিকতাকে খারিজ করতে, ঘিনঘিনে ভক্তিকে চটিয়ে দিতে তেতো গোলাগুলো ছুড়েছেন সুগারকোটেড করে। তাদের কৌতুকের মধ্যে কল্পনার বিষয়টি বেশ ভালোমতোই ছিল; ফলে তাদের কমিক করার বিষয়টি এসেছে একটি লক্ষ্য সামনে রেখে: emotion-কে তা sentiment-এ পরিণত হতে দেয়নি; এই ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুত্ববহ, কেননা emotion একবার sentiment-এ রূপান্তরিত হলে উইটের পুরো অভিপ্রায় মার খায়, লেখা লাউড হয়ে পড়তে পারে। যে-কোনো বিষয়কে হাস্যকর ভঙ্গিতে নিয়ে এসে তার প্রকৃত স্বভাব উন্মোচন করার এই যে প্রবণতা বর্তমানে তত সুলভ নয়। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। ফলাফল ভালো হয়নি।
একদা স্ফীত রম্যসাহিত্যের ধারাটি ক্রমশ ক্ষীণতোয়া। প্রমত্তা নদীগুলোর মতো এ শাখাটিও রুদ্ধপ্রায়, হাঁসফাঁস করছে, থই থই জলের বদলে বালুচরে কণ্টকিত। অথচ বাঙালিমাত্রেই হাস্যরসপ্রিয়। এই বৈপরীত্য শুধু পোড়ায় না, রঙ্গভরা বঙ্গদেশের আরেক ভঙ্গও বটে!
প্রথম প্রকাশ : ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯