কলকাতায় আমেরিকা বানিয়াদের মধ্যে ব্যবসা বাড়তে থাকায় দু-দলের মধ্যে কৃষ্টির আদান প্রদান হতে থাকে। সালেমের পিবডি মিউজিয়াম এবং ম্যাসেচুসেটস-এর এসেক্স ইন্সটিটিউটে কলকাতা বানিয়ানদের ৯টি পোট্রেট রাখা আছে। এই পোট্রেটগুলো বানিয়ারা আমেরিকিয় ব্যবসায়ীদের উপহার দেওয়ার জন্যে আঁকিয়েছিলেন। আমরা আগেই দেখেছি এই ধরণের উপহার কলকাতা এবং আমেরিকার ব্যবসায়ীরা নিজেদের মধ্যে আদানপ্রদান করতেন। অথচ দেশিয় বানিয়া আর ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের মধ্যে কিন্তু এই ধরণের প্রীতি উপহার হাত বদল ঘটে নি।
প্রথম পূর্ণদৈর্ঘের পোট্রেটটা ছিল জর্জ ওয়াশিংটনের। গিলবার্ট স্টুয়ার্টের আঙ্গিকে আঁকেন উইলিয়াম উইনস্ট্যানলি। ১৮০১-এ প্রীতি উপহার হিসেবে রামদুলাল দে’কে উপহার হিসেবে পাঠানো হয়। শোনা যায় ওয়াশিংটন এবং লি ইউনিভার্সিটিতে আজও রামদুলাল সোসাইটি আছে। আরেকটি পোট্রেট রাধাকৃষ্ণ মিত্তিরের, রামদুলাল দে’র জামাই-এর। তিনিও যতদূরসম্ভব শ্বশুরের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমেরিকিয় ব্যবসায় প্রবেশ করেন। রাধা কৃষ্ণ এবং রাজ কৃষ্ণ মিত্রের কুঠি বেশ বড়ভাবে আমেরিকিয় ব্যবসায় জড়িয়েছিল। ১৮৪০ দশক অবদি ব্যবসা করা বোস্টনের ব্যবসায়ী কুঠি জন টি মোর্সে তাদের পাঁচটা পোট্রেট রয়েছে।
রাজেন্দ্র (লাল) দত্ত ছিলেন চার্লস নিউটনের বানিয়ান। তিনি আমেরিকায় প্রায় রামদুলালের কাছাকাছি সম্মান অর্জন করেছিলেন। সে সময়ের এক ইতিহাসকার লিখছেন, In Calcutta a rich family is widely known for the display of statuary, pictures and ornamental works, on the Rash (festival). Every American merchant engaged in the Kolkata trade knows that family, of which Baboo Rajendro Narain Dutto is the head … the most celebrated Rash … is held in Khordah … but it is not so expensive, so finished, so showy, as that of the Dutt family। রাজেন্দ্র এবং তার ভাইপো কালিদাস, অনেকটা রামদুলাল আর মিত্র পরিবারের মত করে নিজেদের যৌথ ব্যবসা সাজিয়েছেন। চার্লস নর্টন তাঁকে কলকায়তার একমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিক বানিয়া অভিধা দিচ্ছেন।
রাজেন্দ্র তাঁর পোট্রেট উপহার দিচ্ছেন বোস্টনের কুঠি উইলিয়ান স্টোরি বুলার্ডকে ১৮৫০-এর দশকে। বানিয়ান রাজেন্দ্র, চিকিৎসকও ছিলেন তিনি বুলার্ডের চিকিতসাও করেন। চার্লস এলিয়ট নর্টনকে ১৮৫০-এর দশকে পাঠানো রাজেন্দ্রর একগুচ্ছ চিঠি হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির হাউটন লাইব্রেরিতে নিথিকৃত করা আছে এবং এই চিঠির বয়ান থেকে আমরা নিউ ইংলন্ড এবং বঙ্গের মধ্যে চলা ব্যবসা ছাড়াও কোন স্তরের বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা হত তার উদাহরণ খুঁজে পাই। প্রথম জীবনে সুপারকার্গো হিসেবে কাজ শুরু করে পরের জীবনে তিনি অধ্যাপনার পেশা বেছে নেন। ১৮৫২তে নর্টন কলকাতায় থাকাকালীন সময়ে উভয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়।

ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দেশিয় বানিয়াদের মধ্যে শুধুই যেমন ব্যবসা সম্পর্কটুকুই টিকেছিল, বুদ্ধিচর্চার অন্তঃস্থলে পৌঁছায় নি, আমেরিকিয়দের সঙ্গে ব্যবসা এবং বুদ্ধিবৃত্তিচর্চা উভয় কাণ্ডই একসঙ্গে ঘটেছিল। বানিয়াদের মার্ফত ব্যবসায়িরা বাঙলা থেকে ভারত সভ্যতা বিষয়ে নানান ধরণের পুঁথি বই ইত্যাদি সংগ্রহ করতেন। তাছাড়া বানিয়ানেরা নানান ধরণের প্রীতি উপহার যেমন প্রতিকৃতি, গয়না, শাল, মসলিন এবং মসলিনজাত পণ্য, বাজনা ইত্যাদি পাঠিয়েছেন ভালবেসে। তাছাড়া জাহাজের নাবিক বা নাখোদারা দেশের মানুষদের দেখাবার জন্যে নানান ধরণের উপহার সামগ্রী যেমন পালকি, আসবাব, বস্ত্র-পরিধেয়, হুঁকা ইত্যাদি সংগ্রহ করেছেন। এই সব সংগ্রহ ইস্ট ইন্ডিয়া মেরিন সোসাইটি এন্ড মিউজিয়াম এবং অন্যান্য মিউজিয়ামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে সংগ্রহ করে রাখা আছে।
পিবডি মিউজিয়ামের (Peabody Museum) নথিকরণে কলকাতার বানিয়াদের নানান দানসামগ্রীর তথ্য উল্লিখিত হয়েছে। ১৮০৩এ প্রথম যে দানটা মিউজিয়ামে শোভা পাচ্ছে, সেটি হল দুর্গাপ্রসাদ ঘোষের পাঠানো। সে বছর পাঁচজন সালেম ব্যবসায়ীর কেনা একটি পালকি সালেম মিউজিয়ামে প্রদর্শিত হয়। এটিকে নিয়ে সালেম শহরে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযত্রা আয়োজিত হয়। পালকিটির ছাতা হিসেবে দুর্গাপ্রসাদ মিউজিয়ামকে একটি Kittishall উপহার দেন যাতে পালকি বয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় ছায়া পাওয়া যায়। মিউজিয়ামকে তিনি দুটো বাদ্যযন্ত্র — একটি ঢোল এবং একটি তম্বুর উপহার দেন। কলকাতার অন্যান্য বানিয়ানরা মিউজিয়ামকে যথাবিহিত উপহার প্রেরণ করেন।
১৮০৬-এর গ্রীষ্মে আমেরিকার সেক্রেটারি জেমস ম্যাডিসন বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করা নিয়ে ব্রিটেনের সঙ্গে আলাপ আলোচনা চালাচ্ছিলেন। তিনি সালেম, ম্যাসেচুসেটস-এর কংগ্রেস সদস্য জেকব ক্রাউনিনশিল্ডকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যবসা নিয়ে তাকে একটি সমীক্ষ দেওয়ার নির্দেশ দেন। সমীক্ষাপত্রটির গুরুত্ব হল জেকব মনে করতেন ব্রিটিশেরা আমেরিকিয় বাণিজ্য বৃদ্ধির শত্রু। তিনি ফরাসীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাতে উৎসাহী ছিলেন।
৩৬ বছরের ক্রাউনিনশিল্ডের ২০ বছর কেটেছে সমুদ্রে সুপারকার্গো, জাহাজের নাখোদা হিসেবে। শেষে তিনি সালেমের একটি বড় ব্যবসায়ী কুঠির মালিক হন। তাছাড়া তিনি ১৮০৩ থেকে কংগ্রেস সদস্য হিসেবেও জনপ্রতিনিধিত্ব করছেন। জেকব ক্রাউনিনশিল্ড, জর্জ ক্রাউনিনশিল্ড এন্ড সনসের অন্যতম সদস্য ছিলেন। ফরাসি বিপ্লবের সময় থেকে ১৭৯৩-১৮০৬ পর্যন্ত এই কুঠির ১০০ টনের কম মাপের ৩টে জাহাজ ছিল। সে সময় আমেরিকিয় জাহাজ ব্যবসা দ্রুতলয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং ক্রাউনিনশিল্ড এন্ড সনসের ২৫০ থেকে ৫০০ টনের জাহাজের সংখ্যা হয় ৯টি। তাদের সে সময়ের সম্পদ ছিল ৪,৬৯,০০০ ডলার। ১৭৯২ তে জেকব সালেমের জাহাজ কোম্পানি ডার্বির নাখোদা হন। কিন্তু জর্জ ক্রাউনিনশিল্ড এন্ড সনসের ব্যবসা ১৭৯৬ থেকে এত বাড়তে থাকে যে প্রত্যেকটি জাহাজের দায়িত্ব প্রতেক ভাইকে নিতে হয়। জাহাজগুলো উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং ইস্ট ইন্ডিজের দিকে আসত। জেকব প্রথম আমেরিকায় হাতি এনে বিপুল দামে বিক্রি করেন। কিন্তু অধিকাংশ সময় তিনি ইন্ডিজ অঞ্চলেই ব্যবসা করতেন। ১৭৯৯ তে ২৯ বছর বয়সে তিনি কুঠির মূল প্রশাসনিক ভবনে প্রশাসনিক কাজে আত্মনিয়োগ করেন।
তিনি ইস্ট আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ অঞ্চলের আমেরিকিয় ব্যবসাবিষয়ে ১৮০৬এ জেমস ম্যাডিসনকে যে সমীক্ষা জমা দেন সাম রিমার্ক্স অন দ্য আমেরিকান ট্রেড শীর্ষকে, সেখান থেকে দশম পরিচ্ছেদে আমেরিকান ট্রেড টু ক্যালকাটা ইন বেঙ্গলের অনুবাদ তুলে দেওয়া গেল।

বাংলার কলকাতায় আমেরিকিয় ব্যবসা
গঙ্গার তীরে কলকাতা শহর। ব্যবসার শহর কলকাতা। সর্বভারতে সে চাল রপ্তানি করে; তাছাড়া তার চিনি নীল রেশম এবং সুতিবস্ত্রও খুব আকর্ষণীয়। বছরে আমাদের ৩০ থেকে ৫০টা জাহাজ কলকাতায় যায়। আমরা রপ্তানি করি ডলার, লোহা, দস্তা, ব্রান্ডি, মদিরা এবং অন্যান্য মদ্য; এছাড়াও ইওরোপ থেকে আমরা টার আর বড় ছোট যন্ত্রপাতিও রপ্তানি করি। কয়েকটি বছরে আমরা ৩০ লক্ষ ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করেছি। সরাসরি কিনতে পারলে সাদা সুতির নানান বস্ত্র সত্যিই শস্তা; বিদেশি বা দেশিয় বণিকদের থেকে কিনলে একটু বেশি পড়তা পড়ে। আমব্রব্রিটিশ ব্যবসায়িদের থেকে কলকাতার পণ্য না কিনে দেশিয় বণিকদের থেকে সংগ্রহ করি। তারা খুব কম দস্তুরিতে আমাদের পণ্য সরবরাহ করতে পারে। ব্রিটিশেরা ব্যবসা বিষয়ে আমাদের তুমুল ঈর্ষা করে; এবং নিজেদের দেশে আমাদের ব্যবসা সম্বন্ধে অসত্য এবং অবিচারমূলক প্রচার চালায়।
আমরা যদি কলকাতা ব্যবসা থেকে বেরিয়ে যাই, তাহলে ব্রিটিশেরা আমাদের সেই সব পণ্য সরবরাহ করতে পারবে না; এবং আমাদের যদি ইংলন্ড থেকে সে সব পণ্য আনাতে হয়, তাহলে আমাদের ১০০ শতাংশ বেশি অর্থ দিতে হবে। কিন্তু ব্রিটিশদের মার্ফত ভারতীয় পণ্য পাওয়ার ধারণাতেই গলতি আছে। বাস্তবে এটা সফল হতে দেওয়া উচিৎ হবে না।
আমাদের আইনে ব্রিটিশ জাহাজ ভারতীয় পণ্য আমেরিকিয় বন্দরে নিয়ে আসার অনুমতি দেওয়া আছে। কিন্তু তারা যদি আমাদের কোনও জাহজকে ভারতের কোনও বন্দরে ঢুকতে না দেয়, তার প্রতিষেধক আমাদের জানা আছে। মি জয়ের চুক্তিতে এই ঝামেলাটা আছে। তারা আমাদের উপকূলীয় ব্যবসা করতে দেবে না, আমাদের সরাসরি ভারতীয় পণ্য নিয়ে আমেরিকায় আসতে হবে। যদি আমরা পণ্যগুলো ফরাসি বা ডেনিশ উপনিবেশ থেকে সংগ্রহ করি, তাহলে তারা আমাদের জাহাজকে ব্রিটিশ উপকূলে ঢুকতে দেবে না।
লঙ্কা বা গোলমরিচ এবং সুপুরি ভারতের খুব বিক্রিত পণ্য এবং এগুলো বিভিন্ন দেশিয় বন্দর থেকে জোগাড় করি; কিন্তু আমরা চাইলেও এগুলো ব্রিটিশ বন্দরগুলোয় বিক্রি করা আইন সিদ্ধ নয়। আইসল অব ফ্রান্স বা মরিসাস থেকে সংগৃহীত পণ্যও ব্রিটিশ উপনিবেশে বিক্রি করার নিষেধাজ্ঞা জারি করা আছে। অথচ এগুলি ভারতের উপকূলের কোনও বন্দর থেকে কেনা নয়। অথচ ভারতের সব কটা ইওরোপিয় দেশে এই কাজ করতে পারে। ভারতীয় দেশিয় পতাকাবাহী জাহাজও একই ব্যবসা করতে পারে; কিন্তু এই সুযোগ আমাদের নেই। আমাদের একটি জাহাজ ভারতীয় ব্রিটিশ পোর্ট থেকে কয়েক বাক্স আফিম তুলে একটি নেটিভ বন্দরে নামানো হলে সেটিকে আমেরিকায় যাওয়ার ছাড়পত্র দেওয়া হয় না। একটি আমেরিকিয় জাহাজ ডেনিস শ্রীরামপুর থেকে পণ্য তুলে ইওরোপে আসার সময় তাকে লন্ডনে পাঠানো হয়, কিন্তু ভুল বোঝার পর সেটিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। জয় চুক্তি অনুসারে চাল আমেরিকায় রপ্তানি করা যায় না। (চলবে)