| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বাণীব্রত চক্রবর্তী-র ছোটগল্প ‘রণক্ষেত্র পেরিয়ে তোমাকে পেলাম’

Reporter
বাণীব্রত চক্রবর্তী / ৮১২ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ২৩ জুলাই, ২০২২

সুমনের সঙ্গে তার দেখা হয় ছুটির দিনের বিকেলে। কফি হাউসে। ওখানে ঘণ্টাখানেক আড্ডা দিয়ে ওরা রাস্তায় বেরিয়ে হাঁটতে থাকে। কোনও দিন হাঁটতে হাঁটতে চৌরঙ্গি পর্যন্ত যায়। ফুটবল খেলা ছেড়ে দিয়েছে বলে সুমনের পায়ে মাঝে মাঝে ব্যথা হয়। তখন ওরা বিবেকানন্দ রোড পর্যন্ত হাঁটে। অটো ধরে সুমন গিরিশ পার্কের মেট্রো স্টেশনে চলে যায়। ওর বাড়ি শ্যামবাজারে। সুমনের কালীঘাটে।

শশাঙ্কমোহন বারান্দার চেয়ারে বসে সে-দিন একটা বই পড়ছিলেন। পতত্রি টিয়া পাখিকে লঙ্কা খাওয়াচ্ছিল। খাঁচাটা বারান্দাতেই। বই থেকে মুখ তুলে শশাঙ্কমোহন বলেছিলেন, ‘ছেলেটা ভাল নয়।’ পতত্রি জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কোন ছেলেটা, জেঠু?’ বই থেকে মুখ না তুলেই শশাঙ্কমোহন বলেছিলেন, ‘যে ছেলেটার কান দুটো বড়। মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা। যে ছেলেটা লম্বা।’

সুমনের চেহারা হুবহু এই রকম। পতত্রির আর কোনও প্রশ্ন করতে সাহস হয়নি। জেঠুও আর কিছু বলেননি।

আবার যে-দিন সুমনের সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা সে-দিনটা ক্যানসেল করে দিয়েছিল। সুমন অবাক, ‘কেন?’ পতত্রি বলেছিল, ‘জেঠু অসুস্থ।’ ছাদে এসে ফোন করছিল। দোতলায় নেমে দেখল জেঠু টিভি দেখছেন আর হো হো করে হাসছেন। কোনও হাসির সিরিয়াল হবে হয়তো।

জানলার সামনে দাঁড়িয়ে পতত্রির মনে হল সুমনকে মিথ্যে কথা বলেনি। অসুস্থ না হলে চোখের দেখা দেখে জেঠু ছেলেটাকে ভাল নয় বললেন কেন! সুমন ভাল। খুব ভাল। জয়েন্টে কত ভাল র্যাঙ্ক করেছিল। এক বছর হল তাদের আলাপ-পরিচয়। সুমন কোনও দিন তার সঙ্গে কোনও অসভ্যতা করেনি। হাত ধরেছে অবশ্য। এক বছরের ঘনিষ্ঠতা। হাত ধরবে না! না ধরাটাই তো অস্বাভাবিক।

জেঠুর গলা শোনা গেল, ‘পুতু, এক বার শুনে যা তো!’ পতত্রির বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। ভয়ে ভয়ে জেঠুর সামনে এসে দাঁড়াল। মুখ তুলে তাকাবার সাহসটুকুও নেই। জেঠু বললেন, ‘কী হয়েছে, মুখ নিচু করে আছিস কেন?’ সে মুখ তুলল। জেঠু বললেন, ‘এক কাপ চা খাওয়াবি!’ পতত্রি বলল, ‘এক্ষুনি আনছি।’

কিচেনে সুধাদি গ্যাসের দুটো ওভেনে দু’রকম রান্না চাপিয়েছে। পতত্রি বলল, ‘একটা খালি করো। জেঠুর জন্যে চা করব।’ চা করতে করতে তার মনে হল অ্যাপয়েন্টমেন্ট ক্যানসেল করাতে সুমন কেবল একটু অবাক হল। কষ্ট পেল না তো! জেঠুর কী হয়েছে জিজ্ঞেস করেনি। রিং ব্যাকও করেনি। তবে কি জেঠুর কথাটাই ঠিক, ছেলেটা ভাল নয়?

জেঠু চিনি ছাড়া লিকার চা খান। চা নিয়ে বারান্দায় গিয়ে দেখল জেঠু চেয়ারে বসে বই পড়ছেন। লেখকের নামটা স্পষ্ট। গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ। জেঠু মুখ তুললেন, ‘চা হয়ে গেছে! চল, ঘরে চল।’ পতত্রিকে নিয়ে নিজের ঘরে এলেন। টেবিলে বইটা এমন ভাবে রাখলেন কেবল পৃষ্ঠাগুলি দেখা যাচ্ছে। চায়ে চুমুক দিলেন, ‘বাহ। দারুণ।’ দ্বিতীয় চুমুকে বললেন, ‘ছেলেটা ভাল নয়।’ সভয়ে পতত্রি জিজ্ঞেস করল, ‘কোন ছেলেটা জেঠু?’ জেঠু বললেন, ‘তোকে বুঝি বলিনি!’ ছেলেটার কান দুটো বড়, মাথায় কদম ছাঁট। বেশ ঢ্যাঙা ছেলেটা।’ পতত্রি বুঝতে পারল জেঠু সুমনের সঙ্গে তাকে দেখেননি। স্বস্তি একটু হল, ‘ছেলেটাকে কোথায় দেখলে?’ জেঠু হেসে উঠলেন এবং তার পর বললেন, ‘প্রথমে দেখতে পাইনি। এক জন দেখিয়ে দিল।’ পতত্রির মাথাটা যেন কেমন করছে, ‘কে দেখাল?’ জেঠু বললেন, ‘কে দেখাল সেটা বড় কথা নয়। তবে দেখেই বুঝেছি ছেলেটা ভাল নয়।’

পতত্রি ছাদে এসে সুমনকে ফোন করল। ফোন বেজে যাচ্ছে। ধরছে না কেন! শেষ পর্যন্ত ধরল, ‘বলো পতত্রি।’ পতত্রি জিজ্ঞেস করল, ‘মার্কেজের কোনও লেখা পড়েছ!’ সুমন বলল, ‘গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ? খুব নাম। লাতিন আমেরিকার লেখক। না। পড়িনি।’ পতত্রি হতাশ হয়, ‘আমিও পড়িনি। তোমার বন্ধুরা পড়ে না!’ সুমন বলল, ‘প্রবুদ্ধ পড়ে। কেন বলো তো!’ একটু ভেবে পতত্রি বলল, ‘একটা কথা ওকে জিজ্ঞেস করতে পারবে?’ সুমন বলল, ‘কী কথা?’ পতত্রি বলল, ‘থাক। খুঁজে নেব।’ নীচে এসে দেখল মায়ের এর মধ্যে পুজোটুজো সারা হয়ে গিয়েছে। জেঠুর ঘরে গেল। হেমন্ত সরকার এসেছেন। ওঁরা দাবা খেলছেন। বইটা কোথায়! দেখতে পেল না। ভেতরের বারান্দায় পা দিতেই ল্যান্ড ফোন বেজে উঠল। পতত্রি ফোন ধরতেই এক বৃদ্ধের গলা শোনা গেল, ‘ছেলেটা যে ভাল নয়, এক দিন বুঝতে পারবে। তখন আবার আমাকে ভুলে যেয়ো না শশাঙ্ক। আমি প্রথম তোমাকে ছেলেটাকে দেখিয়েছিলাম।’ রিসিভার নামিয়ে রেখে সে একছুটে নিজের ঘরে চলে গেল। আবার ল্যান্ড ফোনটা বাজছে। জেঠু এ বার কথা বলছেন, ‘তাই নাকি! কখন?’ একটু থেমে বললেন, ‘বুড়ো হলে এই হয়। রং নাম্বারে ফোন করেছিলে। তাই সাড়া পাওনি।’ আবার একটু থেমে ওদিককার কথাবার্তা শুনে বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। তুমিই তো ছেলেটাকে আমায় দেখালে।’ একই কথা শুনতে পতত্রির আর ভাল লাগছে না। সুমনের সঙ্গে আজ বিকেলে দেখা করতে হবে। কফি হাউসে নয়। অন্য কোথাও।

দুই

সুমন বলেছে পাঁচটার সময় বেথুন কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে। এ দিকে একটা ব্যাপার হয়ে গিয়েছে। জেঠু বইটা হেমন্ত সরকারকে ফেরত দিয়ে দিয়েছেন। পতত্রি দেখেছে। বইটা ব্যাগে ঢোকাতে ঢোকাতে হেমন্ত সরকার বলেছিলেন, ‘এঁর লেখা ‘দ্য হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচ্যুড’ পড়বে নাকি! উনিশশো বিরাশিতে ইনি নোবেল পুরস্কার পান।’ জেঠু বলেছিলেন, ‘পড়িয়ো তো!’

পৌনে পাঁচটার সময় বেথুন কলেজের সামনে এসে সুমনকে দেখতে পেল না। সাধারণত পনেরো মিনিট আগেই সুমন চলে আসে।

পতত্রি যখন বাড়ি থেকে বেরচ্ছিল জেঠু লিলুয়ায় বড় পিসির বাড়িতে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন। হাওড়ার বাস এই রাস্তা দিয়ে যায়। পতত্রি বেথুন কলেজের পাশের রাস্তায় ঢুকে পায়চারি করতে করতে সুমনকে ফোন করল। বলছে সুইচড অফ। সুমন নিশ্চয়ই পাতাল রেলে আসছে। টাওয়ার পাওয়া যাচ্ছে না হয়তো। তা হলে সুইচড অফ বলবে কেন! পাঁচটা দশে আবার ফোন করল। ওই একই কথা। সুইচড অফ। পতত্রি মনে করার চেষ্টা করল তার বান্ধবীদের মধ্যে কে বেশি বই পড়ে। শর্মিলিকেই মনে পড়ছে। শর্মিলিকে ফোন করল। শুনেটুনে শর্মিলি বলল, ‘না রে। মার্কেজের কোনও লেখা পড়িনি।’ আবার গলির মধ্যে পায়চারি। আবার সুমনকে ফোন। এ বার কোনও সাড়া নেই। এখান থেকে বাসে ওঠা মুশকিল। খুব ভিড়। ট্রামের চিহ্ন নেই। হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফিরতে হবে। শ্যামবাজার আর কতই বা দূর। পা বাড়িয়ে পতত্রিকে থমকে দাঁড়াতে হল। উদ্ভ্রান্তের মতন সুমন তার দিকে এগিয়ে আসছে। কী হয়েছে সুমনের! তখনই তার চোখে পড়ল সুমনের কান দু’টি বড়। মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা। সুমন বেশ লম্বা। আজ কি আবার পায়ে ব্যথা হচ্ছে! সুমন একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে আসছে।

পতত্রির সামনে এসে সুমন হাঁপাতে লাগল। পতত্রি আবাক, ‘কী হয়েছে!’ সুমন হতাশ গলায় বলল, ‘মোবাইলটা কে যেন পকেট থেকে তুলে নিয়েছে। শ্যামপুকুর থানায় ডায়েরিটা করে বাড়ি ফিরব। তোমার দেরি হয়ে যাবে। তুমি এসো।’

সুমন চলে গেল। পতত্রি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। কেন দাঁড়িয়ে রইল কে জানে। হঠাৎ বাঁ পাশে তাকিয়ে চমকে উঠল। সুমন  মোবাইলে কার সঙ্গে কথা বলতে বলতে হেঁটে যাচ্ছে। দূরে গিয়ে এক বার পিছন ফিরে তাকাল। আবার হাঁটতে হাঁটতে আরও দূরে মানুষের ভিড়ে মিশে গেল। পতত্রির চোখে জল এসে যাচ্ছে। ব্যাগ থেকে রুমাল বার করে চোখ মুছতে মুছতে শুনতে পেল সুমনের গলা, ‘কাঁদছ কেন?’ পতত্রি চমকে পিছন ফিরে তাকাল। সুমন।

‘এই না তুমি চলে গেলে!’ পতত্রির প্রশ্নের উত্তরে সুমন বলল, ‘চলে যাচ্ছিলাম। ফিরে এলাম। তোমার জন্যে মন কেমন করে উঠল।’ কথাটা তার বিশ্বাস হল না। আবার একই সঙ্গে মনে হল যে সুমনকে ফোন কানে চেপে কথা বলতে বলতে দূরে মিলিয়ে যেতে দেখেছে সে এত তাড়াতাড়ি ফিরবে কেমন করে! অথচ সে সুমন ছাড়া অন্য কেউ নয়। লম্বা দু’টি কান, মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা। বেশ লম্বা। সুমনের মতো।

পাঁচ মাথার ক্রসিং পার করিয়ে দিয়ে সুমন বলল, ‘এ বার আসি।’ তার পর রাস্তা পেরিয়ে পতত্রির দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল। পতত্রিও। সুমন চলে যাচ্ছে। পতত্রি এক দৃষ্টে সুমনের দিকে তাকিয়ে থাকল।

বাড়ি ফিরে দোতলায় উঠে দেখল জেঠু বারান্দায় পায়চারি করছেন। পতত্রি অবাক, ‘লিলুয়ায় যাওনি!’ জেঠু বললেন, ‘যাব বলে তো বেরিয়েছিলাম। বাস ব্রেক ডাউন হয়ে গেল। ফিরে এলাম।’ পতত্রি জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় বাসটা খারাপ হল?’ জেঠু বললেন, ‘হেদোর সামনে!’

তিন

সুমনের দেখা নেই। সুমন ফোন হারিয়ে ফেলেছে। ওদের বাড়ি পতত্রি চেনে না। ওদের ল্যান্ড ফোনের নম্বর তার জানা নেই। তার কলেজেও তো সুমন এক দিন আসতে পারত। আসেনি। সুমনের অবশ্য যখন তখন আসা সম্ভব নয়। তার পড়াশোনার চাপ আছে। যাদবপুর থেকে প্রেসিতে এলে অনেকটা সময় নষ্ট হয়।

জেঠু এক দিন অন্তর মর্নিং ওয়াকে বেরোন। শ্যামবাজার থেকে হাঁটতে হাঁটতে দেশবন্ধু পার্ক। জেঠুর অন্য দু’জন বন্ধুও যান। হেমন্ত সরকার আর সুধীররঞ্জন বসু। সুধীররঞ্জন এই বাড়িতে কম আসেন। দোতলায় উঠতে তাঁর কষ্ট হয়। বাতের রোগী। বেলা এগারোটা নাগাদ হেমন্ত সরকার সিঁড়ি দিয়ে উঠে এলেন, ‘কই? শশাঙ্ক কই?’ শশাঙ্কমোহন নিজের ঘর থেকে হাঁক পাড়লেন, ‘এসো। ভায়া এসো।’

পতত্রির মোবাইল বেজে উঠল। অচেনা নম্বর। সুমন হয়তো কোনও বন্ধুর মোবাইল থেকে ফোন করছে। ধরতেই বুঝতে পারল। ভুল। হিন্দিগান। লাইন কেটে দিল।

তার পড়ার টেবিল থেকে রাস্তা দেখা যায়। রাস্তা দিয়ে কত রকমের লোক যাচ্ছে। এদের মধ্যে একটা লোককেও খুঁজে পেল না, যার দুটো কান বড়, মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা, আর যে বেশ লম্বা।

অনুশীলা এসে মেয়েকে ধমক দিলেন, ‘চুপ করে বসে থাকলে চলবে? যা, চা কর। জেঠুরা চা চাইছেন।’

জেঠুর ঘরে চায়ের ট্রে নিয়ে ঢুকতে ঢুকতে তার কানে এল জেঠুর কথা, ‘জানি। জানি। ছেলেটা এক সময় ফুটবল খেলত।’ শশাঙ্কমোহন পতত্রিকে দেখতে পেলেন, ‘কী হল! আয়।’ কোনও রকমে চায়ের ট্রে রেখে পতত্রি নিজের ঘরে চলে এল।

বিকেলে ছাদে এসে বড় বেশি সুমনের কথা মনে পড়ছিল। ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে ফুটে উঠেছে সুমনের নাম। প্রথমে খুব আনন্দ হল। পর মুহূর্তে ম্রিয়মাণ হয়ে গেল। তবে কি সুমনের ফোন হারায়নি! সে মিথ্যে কথা বলেছে! ফোন বেজে গেল। পতত্রি ধরল না। এখন মনে হচ্ছে জেঠুর কথাটাই ঠিক। এক বছরেও সুমনকে চিনতে পারল না! নাকি জেঠুরা মার্কেজের উপন্যাসের কোনও চরিত্রের কথা বলছেন! ওই লেখকের কোনও লেখা পতত্রি পড়েনি। সুমনও। অথচ প্রেসির অনেক ছেলে মেয়েদের মুখে মার্কেজের নাম শুনেছে। শর্মিলি কত বই পড়ে। সেও পড়েনি।

আবার মুঠোর মধ্যে ফোনটা বেজে উঠল। সুমন। এ বার না ধরে পারল না। সুমন বলল, ‘ফোন ধরছিলে না কেন?’ সে প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে পতত্রি জানতে চাইল, ‘তা হলে তোমার ফোন হারায়নি?’ সুমন আকাশ থেকে পড়ল, ‘তার মানে!’ এটা নতুন ফোন। নম্বর একই আছে।’ পতত্রি শান্ত গলায় বলল, ‘বলো, কী বলবে।’ সুমন বলল, ‘প্রবুদ্ধকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। ও মার্কেজের অনেক বই পড়েছে। কী জানতে চেয়েছিলে বলো।’ পতত্রি বলল, ‘আমার কিছু জিজ্ঞেস করার নেই।’

খানিকক্ষণ বাদে পতত্রি সুমনকে ফোন করল। সুমন বলল, ‘বলো।’ পতত্রি বলল, ‘প্রবুদ্ধকে জিজ্ঞেস করবে, মার্কেজের লেখায় কি এমন কোনও ক্যারেক্টার আছে, যার দুটো কান বড়, মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা, যে বেশ লম্বা।’ সুমন হেসে ফেলল, ‘কী যে ঠাট্টা করো। এ তো আমার চেহারার বর্ণনা!’ পতত্রি বলল, ‘আরও জিজ্ঞেস করবে, সে কী আগে ফুটবল খেলত! আজ সন্ধেবেলায় কখন শ্যামবাজারের মোড়ে আসতে পারবে?’ সুমন বলল, ‘সাতটায়।’ পতত্রি বলল, ‘ঠিক আছে। কালী মন্দিরের সামনে।’

সন্ধেবেলায় পতত্রি বেরোতে যাচ্ছিল। অনুশীলা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোথায় যাচ্ছিস!’ পতত্রি বলল, ‘সংসারের কোনও কাজ করি না বলে বার বার ধমক দাও। তাই সংসারের একটা কাজ করতে যাচ্ছি।’ অনুশীলা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী কাজ শুনি!’ পতত্রি বলল, ‘শ্যামবাজারে ফল কিনতে যাচ্ছি। টাকা দাও।’ শ্যামবাজারে গিয়ে নানা রকম ফল কিনল। তার পর কালীমন্দিরের সামনে এসে দেখল সুমন দাঁড়িয়ে আছে। পতত্রি বলল, ‘চলো, পাঁচ মাথার মোড়ের চায়ের দোকানটায় গিয়ে বসি।’ চা খেতে খেতে পতত্রি জিজ্ঞেস করল, ‘প্রবুদ্ধ কী বলল!’ সুমন বলল, ‘না। ওই রকম দেখতে কোনও ক্যারেক্টর মার্কেজের লেখায় পায়নি।’ পতত্রি বলল, ‘মার্কেজের সব লেখা পড়েছে?’ সুমন বলল, ‘অনেক লেখাই পড়েছে।’ চা শেষ করে ওরা উঠল।

জেঠু পাকা পেঁপে খেতে খুব ভালবাসেন। বাড়ি ফিরে জেঠুর ঘরে গিয়ে দেখল উনি মন দিয়ে একটা বই পড়ছেন। পতত্রিকে দেখে চোখ তুললেন, ‘শুনলাম ফলের বাজারে গিয়েছিলি?’ পতত্রি বলল, ‘তোমার জন্য দুটো পাকা পেঁপে এনেছি। সোনালি রঙের। তুমি কার বই পড়ছ?’ জেঠু বললেন, ‘গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের।’ পতত্রি বলল, ‘আমার একটা প্রশ্নের জবাব তোমাকে দিতে হবে।’ শশাঙ্কমোহন একটু অবাক, ‘কী প্রশ্ন?’ প্রশ্ন শুনে হেসে ফেললেন, ‘না, না। মার্কেজের নভেলের কোনও ক্যারেক্টার নয়। আসল ব্যাপারটা তোকে বলছি। এক দিন হেমন্ত আর সুধীররঞ্জনের সঙ্গে দেশবন্ধু পার্কের বেঞ্চে বসে গল্প করছি। হঠাৎ সুধীররঞ্জন আঙুল তুলে ছেলেটাকে দেখাল। তার কান দুটো লম্বা, চুল ছোট করে ছাঁটা, বেশ ঢ্যাঙা। সুধীররঞ্জন বলল, ছেলেটা ভাল নয়। ছেলেটা পার্কের ভেতরে পায়চারি করছিল। হেমন্ত বলল, লক্ষ করেছ ছেলেটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে! আমাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। সুধীররঞ্জন জিজ্ঞেস করল, পায়ে কী হয়েছে?’ পতত্রি রুদ্ধশ্বাসে শুনছিল, ‘তার পর!’ শশাঙ্কমোহন বললেন, ‘ছেলেটা মুখ ফেরাল। কী ভয়ঙ্কর মুখ। ছেলেটা বলল, আগে ফুটবল খেলতাম। এখন মাঝে মাঝে পায়ে ব্যথা হয়। তার পর বুক পকেট থেকে একটা মোবাইল বার করে হ্যালো হ্যালো বলতে বলতে চলে গেল। হেমন্ত বলল, ফোনটা তো এক বারও বাজেনি!’ পতত্রি বলল, ‘তাতেই বুঝে গেলে ছেলেটা ভাল নয়!’ শশাঙ্কমোহন আমতা-আমতা করে বললেন, ‘দেখে শুনে তো তা-ই মনে হল।’

সকালে ঘুম ভাঙার পর সুমনের মুখটা মনে পড়ল। সুমনের মুখটা সত্যিই সুন্দর। পতত্রির চোখে জল এল। ব্রাশ করতে করতে শুনতে পেল জেঠু তাকে ডাকছেন। মুখ ধুয়ে জেঠুর ঘরে গেল। জেঠু বললেন, ‘বলেছিলাম না। খবরের কাগজটা দেখো।’ জেঠুর হাত থেকে কাগজটা নিল। বাংলাদেশ থেকে আগত এক উগ্রপন্থীকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। ছেলেটি অ্যালজাইমার্সের রোগী। একটা অকেজো মোবাইল তার কাছে পাওয়া গিয়েছে। আর কিছু নয়। যুবকটির ছবি কাগজে ছাপা হয়েছে। তার লম্বা দু’টি কান, ছোট করে ছাঁটা চুল, হাইট পাঁচ এগারো। মুখটা ভয়ঙ্কর কুৎসিত।

পতত্রি ছাদে গিয়ে সুমনকে ফোন করল, ‘আজ বিকেল পাঁচটার সময় পার্ক স্ট্রিটের বুক শপের সামনে এসো। তেমন হলে ক্লাস কামাই করে। জরুরি দরকার।’ জমানো শ’পাঁচেক টাকা ব্যাগে নিয়ে কলেজ যাওয়ার সময় পতত্রি মাকে বলল, ‘দেরি হলে ভেবো না। ছুটির পর ভবানীপুরে শর্মিলিদের বাড়ি যাব।’ পার্ক স্ট্রিটের বুক শপের সামনে সুমন দাঁড়িয়েছিল। পতত্রি বলল, ‘এখানে দাঁড়িয়ে থাকো।’ পতত্রি বুক শপে ঢুকল। কুড়ি মিনিট পরে বেরিয়ে এল। হাতে একটা প্যাকেট। দু’জনে কথাহীন ভাবে হাঁটতে হাঁটতে এসপ্ল্যানেডের মোড়ে এল। একটা রেস্তোরাঁর আপস্টেয়ার্সে গিয়ে ফাঁকা টেবিলের সামনে চেয়ার টেনে দু’জনে মুখোমুখি বসল। তার পর বইয়ের প্যাকেটটা সুমনের দিকে এগিয়ে দিল। প্যাকেট থেকে বইটা বার করে সুমন দেখল মার্কেজের বই। পৃষ্ঠা ওল্টাতেই পতত্রির হাতের লেখা চিনতে পারল। রণক্ষেত্র পেরিয়ে তোমাকে পেলাম সুমন। নীচে পতত্রির নাম।

সুমনের হাতে মার্কেজের ‘লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা’। সুমন পতত্রির দিকে তাকাল, ‘কী ব্যাপার পতত্রি!’ পতত্রি মৃদু হেসে বলল, ‘পরে বলব।’

প্রথম প্রকাশ : ১১ ভাদ্র ১৪১৮ রবিবার ২৮ অগস্ট ২০১১

আপনার মতামত লিখুন :

One response to “বাণীব্রত চক্রবর্তী-র ছোটগল্প ‘রণক্ষেত্র পেরিয়ে তোমাকে পেলাম’”

  1. শুভাশিস গোস্বামী says:

    এ গল্পটা মনে হচ্ছে আগে পড়িনি।গল্পটি অনেকটা রহস্য গল্পের ধাঁচে লেখা।সারাক্ষণ একটা সাসপেন্স পাঠককে পরিণতির দিকে এগোতে প্ররোচিত করে।মার্কেজের লেখার সঙ্গে এ গল্পের একটা যোগ আছে বোঝা যায়।তবে যোগসূত্রটি একটু অস্পষ্ট।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev