চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন বাজেট পেশ করাকালীন জানিয়েছিলেন দুই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের বেসরকারিকরণ করা হবে। যে দুটি রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংক বেসরকারিকরণ করা হবে, তার একটি সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক এবং অন্যটি ইন্ডিয়ান ওভারসিজ ব্যাঙ্ক। অথচ এই দুটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের লাভের অঙ্ক যথেষ্ট সন্তোষজনক। দুটি ব্যাংকই অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে যথেষ্টই লাভ রেখেছে। সেন্ট্রাল ব্যাংকের লাভ ২০৬ কোটি এবং ওভারসিজ ব্যাঙ্কের ৩২৭ কোটি টাকা। অথচ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকই কেন্দ্রের বেসরকারিকরণের প্রধান লক্ষ্য।
অন্যদিকে কয়েকদিন আগে সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটি সংসদে যে রিপোর্ট দিয়ে জানিয়েছে, আর্থিক সমস্যা, রুগ্নদশা বা অনুৎপাদী সম্পদের চাপ অজুহাত দেখিয়ে কেন্দ্রের ব্যাংক বিক্রি কোনওভাবে মানা যায় না। ব্যাঙ্কের আর্থিক চাপ আছে একথা ঠিকই। তবে সেই চাপ কাটাতে সরকারের উচিত ব্যাংককে সাহায্য করা। রিজার্ভ ব্যাংক, সরকার এবং শেয়ার হোল্ডার—সকলে মিলেই একটা সমাধান সূত্র বের করা দরকার। তা না করে সরকারকে কেন্দ্র অজুহাত দেখাচ্ছে এবং ব্যাংক বেসরকারি হাতে বিক্রি করে দিতে চাইছে।
প্রসঙ্গত, বিগত চার বছরে কেন্দ্রীয় সরকার ১৪ টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ককে সংযুক্ত করেছে। ব্যাঙ্ক পরিষেবা ভারতের মতো এক উন্নয়নশীল দেশে সাধারণ নাগরিকদের এক বিশাল অঙ্কের আমানত নিয়ে কাজ করে। দেশের আর্থিক উন্নতির ক্ষেত্রে ব্যাঙ্কগুলি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সামাজিক দিক থেকে দেখতে গেলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির ভূমিকা অপরিসীম। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি বেসরকারি হাতে চলে গেলে সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাঙ্কগুলির ভূমিকা দুর্বল হয়ে পড়বে।
খবর অনুযায়ী, আগামী কাল সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে ব্যাংক বেসরকারিকরণের আইনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে একটি বিল উত্থাপন করার কথা রয়েছে। ইতিমশ্যে সরকারি থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক নীতি আয়োগ সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া এবং ইন্ডিয়ান ওভারসিজ ব্যাঙ্ককে বিনিয়োগের জন্য তালিকাভূক্ত করেছে৷ সেই অনুসারে ব্যাঙ্কিং আইন সংশোধনী বিল ২০২১ পেশ করা হবে ব্যাঙ্কিং কোম্পানি অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ট্রান্সফার অফ আন্ডারটেকিংস অ্যাক্ট, ১৯৭০ এবং ১৯৮০ এবং ব্যাঙ্কিং রেগুলেশন অ্যাক্ট, ১৯৪৯ এর সংশোধনীগুলির যথাযথ পরিবর্তনের জন্য।

উল্লেখ্য, কেন্দ্রের ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে কর্মী ইউনিয়নগুলি আগেই আন্দোলন চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তারা পরবর্তীতে কৃষক আন্দোলনের সাফল্যে আরও উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। ইউনিয়ন নেতারা জানান, কৃষকদের আপসহীন আন্দলনের চাপ মোদী সরকারকে যেভাবে নতুন তিন কৃষি বিল প্রত্যাহার করতে বাধ্য করিয়েছে তাতে ব্যাঙ্ক কর্মী ইউনিয়নগুলির মনোবল বাড়িয়েছে। সামনে ধর্মঘট ছাড়াও একাধিক কর্মসূচি রয়েছে। ইতিমধ্যে কলকাতা-মু্ম্বই থেকে আন্দোলনকারী কর্মীরা দিল্লি গিয়েছেন। সরকার বেসরকারি শিল্পপতির কাছে ব্যাঙ্ক বেচে দিলে মানুষ কিভাবে ও কেন বিপদে পড়বেন তা বোঝানো হবে।
মোট ব্যাঙ্ক আমানতের ৭০% রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিতে। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, বেসরকারি উদ্যোগপতিরা সেই ব্যাঙ্কগুলি কিনে নিলে গ্রাহকের আমানতের কি আর সরকারি গ্যারান্টি থাকবে? কৃষি, স্বনির্ভর গোষ্ঠী-সহ বিভিন্ন গ্রামীণ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে যে ভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক ও তাদের উদ্যোগে তৈরি ৪৩টি আঞ্চলিক গ্রামীণ ব্যাঙ্ক ঋণ দেয়, সেভাবে কি আর ঋণ দেবে? এত খুব সহজ কথা সরকার এসব কাজ যেভাবে করতে পারে, বেসরকারিরা তা পারে না। কারণ বেসরকারি উদ্যোগের একমাত্র লক্ষ্য লাভ। তাছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির ৩১% শাখাই গ্রামীণ। যার উপর কৃষক-ছোট ব্যবসায়ী প্রভৃতি মানুষ নির্ভরশীল। তারা কি আর কোনওভাবে উপকৃত হবেন? তার ওপর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক সংযুক্তিতেই গত চার বছরে ৩৩২১টি শাখা উধাও হয়েছে। কর্মী কমেছে ৭৪,০০০ জন। বেসরকারিকরণ হলে কর্মী ছাঁটাই হবে ব্যাপক হারে।
ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণ বিলের প্রতিবাদে ইতিমধ্যেই ১৬ তারিখ এবং ১৭ তারিখ দেশজুড়ে ব্যাঙ্ক ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে ইউনাইটেড ফোরাম অব ব্যাঙ্ক ইউনিয়ন্স। এ দিন থেকেই তাদের দিল্লির যন্তর মন্তরে ধর্না দেবার কথা। অন্যদিকে সংসদে বিল পাশ হলেই কৃষক আন্দোলনের ধাঁচে দেশজুড়ে প্রতিবাদের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার নেতা রাকেশ টিকায়িত। পাশাপাশি সর্বভারতীয় কিষাণ সভার সাধারণ সম্পাদক হান্নান মোল্লা বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত হাজারের বেশি বেসরকারি ব্যাঙ্ক ফেল করেছে। কিন্তু ১৯৬৭ এর পর কোনও সরকারি ব্যঙ্ক ফেল করেনি। বেসরকারি ব্যাঙ্ক ফেল করা মানে লগ্নীকারীদের টাকা গায়েব করে মালিকরা অন্য জায়গায় গিয়ে ব্যঙ্ক খোলা। এই জন্যই কেন্দ্র সরকারের ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা। মোদি ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণের বিল এনে আবার সেই জায়গা ফিরিয়ে আনতে চাইছেন।
এখন দেখার কৃষক আন্দোলনের সাফল্য এবং ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণ এর প্রতিবাদে কৃষক নেতাদের ফের আন্দোলনের হুঁশিয়ারি কতটা আন্দোলনকারী ব্যঙ্ক কর্মীদের কতটা উজ্জীবিত করে।