একসময় বঙ্কিমচন্দ্রকে বাংলার স্কট বলা হতো। অর্থাৎ ইংরেজ রোম্যান্স-উপন্যাস রচয়িতা ওয়াল্টার স্কট (১৭৭১-১৮৩২)-এর সঙ্গে তাঁর তুলনা করা হতো। আবার বঙ্কিমচন্দ্রের নামের আগে ঋষি বিশেষণ আজও অনেকে ব্যবহার করেন। এ নিয়ে বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, কবি বা লেখক হওয়া যথেষ্ট নয়, ঋষি, গুরুদেব ইত্যাদি গুরুগম্ভীর কিছু একটা প্রয়োজন।
রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে স্কুল খুলে প্রথম এই গুরুদেব বিশেষণটিতে ভূষিত হন। এই বিদ্যালয়ের আদর্শকে প্রাচীন ভারতীয় তপোবনের সঙ্গে তুলনা করা হতো।
বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বিষবৃক্ষ’ উপন্যাস বঙ্গদর্শন প্রথম সংখ্যা থেকেই, অর্থাৎ বৈশাখ ১২৭৯ বঙ্গাব্দ থেকে প্রকাশিত হতে থাকে। এই নিয়ে রবীন্দ্রনাথের আশ্চর্য একটি পর্যবেক্ষণ আছে।
রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, ‘বঙ্গদর্শনে যে জিনিসটা সেদিন বাংলাদেশের ঘরে ঘরে সকলের মনকে নাড়া দিয়েছিল সে হচ্ছে বিষবৃক্ষ। এর পূর্বে বঙ্কিমচন্দ্রের লেখনী থেকে দুর্গেশনন্দিনী, কপালকুণ্ডলা ও মৃণালিনী লেখা হয়েছিল। কিন্তু সেগুলি ছিল কাহিনী। ইংরিজিতে যাকে বলে রোম্যান্স। আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রা থেকে দূরে এদের ভূমিকা। সেই দূরত্বই এদের মুখ্য উপকরণ…। বিষবৃক্ষে কাহিনী এসে পৌঁছল আখ্যানে। যে পরিচয় নিয়ে সে এল তা আছে আমাদের অভিজ্ঞতার মধ্যে…।’
গ্রন্থাকারে দুর্গেশনন্দিনী প্রকাশিত হয় ১৮৬৫ সালের মার্চ মাসে। বঙ্কিমচন্দ্রের ছোটো ভাই পূর্ণচন্দ্র বলেছেন, ‘আমাদের খুল্লপিতামহ ১০৮ বছরেরও বেশি জীবিত ছিলেন। তিনি প্রায়ই আমাদের গল্প শুনাতেন’। এই বৃদ্ধের কাছ থেকেই বিষ্ণুপুর, মান্দারণ গ্রাম ইত্যাদি শোনা। এর মধ্যে থেকেই গড়ে উঠলো ‘গড় মান্দারণ’।
৯৯৭ বঙ্গাব্দে নিদাঘ শেষে সেই অশ্বারোহী সূর্যপাটে বসেছে দেখে যেমন দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন, আমাদের বাংলা ভাষায় ‘নভেল’ বস্তুটাও কিন্তু তেমনই জোরালো গতি পেলো। একদিকে বঙ্কিম লিখেছেন ‘সাংখ্যদর্শন’, ‘প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য’, ‘কৃষ্ণচরিত্র’, ‘ধর্মতত্ত্ব’ (‘অনুশীলন’), কিংবা তাঁর ‘গীতাভাষ্য’, তেমনই লিখেছেন ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, ‘ইন্দিরা’ প্রভৃতি উপন্যাসও।
‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ সম্পর্কে শ্রীশচন্দ্র মজুমদার তো বলেছেন, ‘ইহাই বকিমচন্দ্রের সর্বোৎকৃষ্ট উপন্যাস’। ১২৮৪ বঙ্গাব্দে সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়র সম্পাদনায় বঙ্গদর্শন পুনরায় প্রকাশিত হয়। এখানেই ধারাবাহিকভাবে বেরোয় ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’। এর কিছু পরেই ‘কৃষ্ণচরিত্র’ প্রকাশিত হচ্ছে।
যদি কৃষ্ণচরিত্র বা গীতাভাষ্যের কারণে বঙ্কিমের ঋষি-বিশেষণটা পাকাপাকিভাবে গ্রহণ করতে হয়, তাহলে এটাও ভুলে গেলে চলবে না, যে ‘নভেল’ বস্তুটি কিন্তু আগাগোড়াই adulteration-এর গল্প শোনায়। পৃথিবীর প্রথম সার্থক আধুনিক নভেল, গুস্তাভ ফ্লবেয়ার-এর ‘মাদাম বোভারি’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৫৭ সালে। এই বছরই ‘পাপের ফুল’ নামে যে কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ পায়, তার প্রভাব পরবর্তী সময় পৃথিবীর কোনও দেশের কোনও লেখকই এড়াতে পারেননি। ১৮৭৩ সালে লিও তলস্তয়-এর ‘আনা কারেনিনা’ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ পায়। এগুলির প্রত্যেকটিতে জমাট বেঁধেছিল গাঢ় অন্ধকার। আমাদের সমাজের মূল একক পরিবার। আর সমাজ ও পরিবার-ব্যবস্থার পরতে পরতে যে কালির ছিটে রয়েছে, সেই সব কালো কালো ছবি দেখাচ্ছিলেন এই লেখকরা। বঙ্কিমচন্দ্রও কিন্তু এর ব্যতিক্রম নন।
বঙ্কিম যখন ‘বন্দে মাতরম’ লিখেছিলেন, তাঁর চোখে ছিল বাংলাদেশের মায়াকাজল। নাহলে তিনি ‘সপ্তকোটি কণ্ঠ’ লিখবেন কেন?
বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বঙ্গদেশে কৃষক’, ‘মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত’, ‘বাংলা ভাষা’, ‘বহু বিবাহ’, এই লেখাগুলো তো তাঁর তীক্ষ্ণ বাস্তবধর্মী মনোভাবের পরিচয় দেয়। একদিকে প্রাচীন ভারতের গরিমায় তিনি যেমন সে সময়ের অনেকের মতোই উদ্বুদ্ধ, তেমনই নভেলের পরতে পরতে উঠে এলো বাস্তবেরই নানা বিন্যাস। রবীন্দ্রনাথ-কথিত ওই দূরের জিনিস আর কাছের অভিজ্ঞতা মিলেমিশে ছড়িয়ে পড়লো নানা লেখায়। তবে ‘নভেল সম্রাট’ হিসেবেই বঙ্কিম আজও প্রবল প্রতাপশালী। সেই সঙ্গে ঋষি বঙ্কিমও রয়েছেন স্বমহিমায়।
তাঁর জন্ম ২৬ জুন ১৮৩৮, প্রয়াণ ৮ এপ্রিল ১৮৯৪।