ছাই মোড়ানো আকাশটি মুখ গোমরা করে আছে সকাল থেকে। এক পসলা বৃষ্টি হয়ে গেছে বোধকরি খানিক আগে। পাথরের চাঙর বসানো কচ্ছপের পিঠের মতো সড়কটির পাথরের খাজে খাজে জল জমে আছে। সেই জলের উপর পড়েছে ঈষৎ কৃষ্ণবর্ণ আকাশের প্রতিবিম্ব। মনে হচ্ছে যেন উর্ধ্বে ও মর্ত্যে দুটো আকাশ। সেসব দেখতে দেখতে হঠাৎ নবীনচন্দ্রের দৃষ্টি পড়ল পাশ্ববর্তী বাংলোটিতে। বাংলোর বারান্দায় দীর্ঘাকৃতি, গৌরবর্ণ ও তেজোদ্দীপ্ত একজন পুরুষ অনাবৃহ দেহে নিবিষ্ট মনে বসে বই পড়ছেন। কলকাতা কোর্টের হাকিম ফিল্ড সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষ করে নবীনচন্দ্র ফিরেই যাচ্ছিলেন বটে কিন্তু ল্যান্ডোতে উঠতে উঠতে কোচওয়ানকে তিনি কৌতুহলী দৃষ্টিতে জিজ্ঞেস করলেন — এ লোকটি কে? কোচওয়ান ব্যাটা তরমুজের বিচি সাদৃশ্য একপাটি দাঁত দেখিয়ে বলল — উনি সঞ্জীব বাবু, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিমচন্দ্রের মেঝ ভাই। নবীনচন্দ্র ভ্রু কুচকে বললেন — এনিই তাহলে সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়? গাড়োয়ান বলল — জ্বী হুজুর।
দাঁড়াও দাঁড়াও। আমি গাড়িতেই অপেক্ষা করছি তুমি বরং আমার এই ভিজিটিং কার্ডখানা সঞ্জীব বাবুর হাতে গিয়ে দাও। কার্ডখানা হাতে পাওয়া মাত্র সঞ্জীবচন্দ্র হৈ হৈ করে নেমে এলেন বারান্দা থেকে। চিরপরিচিতের মতো জড়িয়ে ধরলেন নবীনচন্দ্রকে। তিনি বললেন — আমি ঠিক দেখছি তো! এইকি সেই চাঁটগার বিখ্যাত কবি ও ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট নবীনচন্দ্র সেন। নবীনচন্দ্র স্মিত হেসে বললেন — আমাকে আর লজ্জা দেবেন না। আপনি তো একখানা ভ্রমণকাহিনী লিখেই এই বঙ্গদেশ একেবারে মাতিয়ে দিয়েছেন। চারদিকে তো এখন ‘পালামৌ’ বইখানির ব্যাপক জয়জয়ওকার। অন্যদিকে আপনার জেষ্ঠ্য ভ্রাতার কথা আর নাই বা বললাম। তিনি তো এখন বাংলাসাহিত্যে সম্রাটের মুকুট পড়ে বসে আছেন।
সঞ্জীবচন্দ্র বললেন — ভালো কথা মনে করেছেন, দাদা আপনাকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছেন। আমার উচিত আপনাকে এক্ষুণি কয়েদ করে নিয়ে যাওয়া। নবীনবাবু বললেন — আমি আপনার দাদার চেয়েও বেশী উন্মুখ হয়ে আছি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য। আমাকে কয়েক করে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আচ্ছা আজ তো শনিবার আমি কালই আসছি আপনাদের বাড়িতে। আপনাদের বাড়ি তো এখন সেই নৈহাটিতেই নাকি? জ্বী আমরা সবাই এখন ওখানেই আছি। ও ভালো কথা সঙ্গে আমার এক উকিল বন্ধুও থাকছে কিন্তু নাম অক্ষয়চন্দ্র সরকার অসুবিধা নেই তো। সঞ্জীববাবু হো হো শব্দে হেসে উঠলেন — ‘সাধারণী’ পত্রিকার সম্পাদক অক্ষয়বাবুর কথা বলছেন তো? নবীনচন্দ্র বললেন — হ্যাঁ। সঞ্জীববাবু বললেন — অক্ষয়বাবুর সঙ্গে আমাদের পরিবারের বেশ আগে থেকেই জানাশোনা। কোন অসুবিধে নেই। আপনি নির্দিধায় তাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসতে পারেন।
পরদিন বিকেলবেলা অক্ষয়চন্দ্র সরকারকে নিয়ে নবীনচন্দ্র ছুটলেন নৈহাটির উদ্দেশ্যে। রেলষ্টেশন থেকে নেমে গঙ্গা নদী পার হয়ে তবেই নৈহাটি কাঠালবাগান, বঙ্কিমচন্দ্রের ভিটা। ষ্টেশন থেকে গঙ্গা অবধি বেশ কিছুদূর পায়েহাটা পথ। খানিক আগে ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ায় রাস্তাখানা কর্দমাক্ত। শুধু কর্দমাক্ত বললে ভুল হয়। বন্ধুরও বটে। চারদিকে উঁচু-নিচু ও মাটির বড় বড় ঢিবি সেই সঙ্গে প্রচুর চোরাকাটার গাছ। নবীনবাবু অক্ষয়চন্দ্রকে উদ্দেশ্য করে বললেন — দেখে পথ চলবেন দাদা। পা পিছলে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে কিন্তু। অক্ষয়চন্দ্র বললেন — ও আপনি ভাববেন না। বরং আপনি সামলে চলুন।
এর মধ্যেই শুরু হলো ঝিরঝিরে ময়দা চালা মোলায়েম বৃষ্টি। গঙ্গার ঘাটে পৌঁছাতে পৌঁছাতে হঠাৎ পশ্চিম আকাশে দেখা গেল এক টুকরো মেঘের তলায় সূর্য্য বেচারা হাসছে। এতক্ষণ লুকিয়ে থাকতে হয়েছিলো বলেই হয়তো শরীরের সমস্ত আলো ছড়িয়ে দিয়েছে এই বিশ্বচরাচরে। খানিকটা দূর থেকেই দেখা গেল অনাড়ম্বর নৌকার ঘাট। পাঁচ-সাতটা খেয়ানৌকা বাঁধা আছে ঘাটে। নৌকাগুলোকে দূর থেকে দেখে নবীনচন্দ্রের কাছে মনে হলো যেন পাঁচ-সাতটা আরশোলা উল্টো হয়ে পড়ে আছে ঘাটে।
বঙ্কিমবাবুর সদর ফটকে নবীনচন্দ্র ও অক্ষয়বাবুরা যখন পৌঁছলেন তখন সন্ধ্যা প্রায় সমাগত। সঞ্জীববাবু সাদরে অভ্যার্থনা জানিয়ে তাদের ফরাস বিছানায় বসালেন। অবিলম্বে বঙ্কিমবাবুকে খবর পাঠানো হলো অন্দর মহলে। অক্ষয়বাবুর এ বাড়িতে আগে থেকেই যাতায়াত। তিনিই নবীনচন্দ্রকে বললেন — কি বুঝলেন ভায়া এটাই হলো বঙ্কিমবাবুর বৈঠকখানা। বৈঠকখানার অপরপাশে রয়েছে আরো দুটি কক্ষ। বৈঠকখানায় একপাশে একসেট সোফা ও খানকয়েক কুসনওয়ালা চেয়ার। দেয়ালে ঝুলছে কতগুলো ছবি। ঘরের এককোনে একটি হারমেনিয়াম। নবীনচন্দ্র সঞ্জীববাবুর সঙ্গে কথোপকথনে যখন ব্যাস্ত ঠিক এমন সময় পেছন দিক থেকে কেউ একজন নবীনচন্দ্রকে জড়িয়ে ধরে বললেন — বলুন তো আমি কে? নবীনচন্দ্র মুখ ফিরিয়ে দেখতেই অবাক হয়ে গেলেন। লোকটি ঈষৎ স্বাস্থ্যবান ও গৌরবর্ণ পুরুষ। মাথায় কুঞ্চিত ও সজ্জিত কেশ, চোখ দুটো স্বআলোয় সমুজ্জ্বল। উন্নত টিকোলো নাক, অধর ক্ষুদ্র ও রহস্যব্যঞ্জক। ঠোঁটের উপর প্রকান্ড গোফের সমাবেশ। অগ্রভাগ কুঞ্চিত। দীর্ঘ্য বঙ্কিম গ্রীবা, মুখও ঈষৎ দীর্ঘ্য ও সুগঠিত। শরীরে বাহু পর্যন্ত একটি সামান্য পিরান এবং নিম্নাঙ্গে তিনি পড়েছেন নয়নসুকের সাদা ধবধবে ধুতি। দেখার সঙ্গে সঙ্গে মুর্তিখানি সুন্দর, সতেজ এবং প্রতিভান্বিত বলে মনে হয়।
নবীনচন্দ্র ঈষৎ হেসে বললেন — আপনি নিঃসন্দেহে বাংলার সাহিত্য সম্রাট, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বঙ্কিমচন্দ্র কপট বিস্মিত কণ্ঠে বললেন — আপনি আমায় চিনলেন কি করে? নবীনচন্দ্র সহাস্যে বললেন — শিকারী বিড়ালের গোফ দেখলেই চেনা যায়। বঙ্কিমচন্দ্র বললেন — আমার গোফের উপরই তাহলে আপনার চোখ পড়েছে দেখছি? বঙ্কিমবাবুর মুখে এ কথা শুনে সবাই একযোগে অট্ট হাসির ফোয়ারা ছড়িয়ে দিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র বললেন — আচ্ছা নবীন আপনার বাড়ি তো চাঁটগায়ে তাইনা। নবীনচন্দ্র বললেন — জ্বী। তবে আমার বর্তমান কর্মস্থল কুমিল্লা। সে হোক কিন্তু আপনি চাঁটগায়ের ছেলে অথচ কথায় বাঙ্গাল দেশের গন্ধমাত্র নেই। এতো ভালো কলকাতার উচ্চারণ শিখলেন কি করে। অক্ষয়বাবুকে উদ্দেশ্য করে নবীনচন্দ্র বললেন — আচ্ছা দাদা আপনিই বলুন তো, ইচ্ছা থাকলে এ পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কি কিছু আছে।
বঙ্কিমচন্দ্র নবীনচন্দ্রকে উদ্দেশ্য করে বললেন — অক্ষয়চন্দ্রকে আপনি দাদা বলে সম্বোধন করেন দেখছি। ওকে কিন্তু আমি নাতি বলে ডাকি। সেই সূত্রে আপনিও তাহলে আমার নাতি। আপনি বয়সে এতো ছোট যে আপনাকে আর আপনি বলে সম্বোধন চলে না।
ইতোমধ্যে গৃহভৃত্য রেকাবিতে করে পিয়াজি ফুলরি নিয়ে ঘরে ঢুকলো সঙ্গে কারুকার্যময় চিনেমাটির পেয়ালায় ধুমায়িত চা। গল্প বেশ জমে উঠছে। ঠিক এমন সময় বৈঠকখানার একজন আগন্তুকের আগমন ঘটল। বঙ্কিমচন্দ্র উপস্থিত সকলের সঙ্গে আগন্তুককে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র বললেন — উনার নাম হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, বিশিষ্ট ভারততত্ত্ববিদ, সংস্কৃত বিশারদ ও সুলেখক। নবীনচন্দ্র বললেন — আমি আপনাকে চিনতে পেরেছি। আপনিই তো চর্যাপদের সেই আবিস্কারক তাই না? শাস্ত্রী মহাশয় সলজ্য কণ্ঠে বললেন — ওই আর কি। নবীনচন্দ্র বললেন — আপনার লিখিত উপন্যাস কাঞ্চনমালার খুব নাম হয়েছে শুনেছি। উপন্যাসটি যখন বঙ্গদর্শনে ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল আমরা তো সবাই ভেবেছিলাম ওটা বঙ্কিমবাবুর-ই উপন্যাস। নবীনচন্দ্র আড়চোখে লক্ষ করলো বঙ্কিমবাবুর মুখঅবয়ব হঠাৎ করেই যেন বিষন্নতায় ছেয়ে গেল। প্রসঙ্গ পরিবর্তন করতে গিয়ে নবীনচন্দ্র বঙ্কিমবাবুর লিখালিখির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠলেন। সঙ্গে সকলেই যোগ দিলেন সেই প্রশংসায়। বঙ্কিমচন্দ্র বললেন — আজ আর আমার লেখালেখি কিংবা আমার প্রশংসা শুনতে চাইনা। আজ আমার সমস্ত দোষ ত্রুটি শুনবো তোমাদের মুখ থেকে। আমাকে যদি তোমরা সত্যি সত্যি ভালোবাসো তবে আমার ও আমার সাহিত্যকীর্তির দোষ ক্রটি গুলো শুনাও আমায়। ধরো আজ আমি তোমাদের কাঠগড়ায়। আমার ভুল ভ্রান্তিগুলো তোমাদের মুখ থেকে শুনতে চাই আজ।
ঘরের ভেতর উপস্থিত সবাই একটু ইতোস্তবোধ করতে লাগলেন। বঙ্কিমবাবু এক্ষুণে একি খেলায় সবাইকে আহ্বান করছেন! শাস্ত্রী মহাশয় বললেন — বঙ্কিম দাদা আমার গুরু স্থানীয়। তার লেখালেখির খুদ ধরা আমার কর্ম নয়। বঙ্কিমবাবু বললেন — আরে তোমরা তো বিষয়টাই বুঝতে চাইছো না। কলকাতা কিংবা ধরো এই বঙ্গের মানুষজন আমাকে নিয়ে যা ভাবে কিংবা আমার বিরুদ্ধে তাদের যেসব অভিযোগ অনুযোগ সেগুলোই আমি তোমাদের মুখ থেকে শুনতে চাইছি। নবীনচন্দ্র চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বললেন। অভয় দিচ্ছেন বলেই বলছি — আচ্ছা দাদা সবাই যে বলে আপনি আপনার প্রথম উপন্যাস “দুর্গেশনন্দিনী” স্যার ওয়াল্টার স্কটের ‘আইভানহো’র অনুকরনে লিখেছেন, সে সম্পর্কে আপনি কি বলতে চান। বঙ্কিমচন্দ্র সহাস্য বদনে বললেন — দেখ, এ অভিযোগ আমি বিস্তর শুনেছি এগুলো শুনে শুনে আমি এখন ক্লান্ত। সত্যি বলতে কি জানো ‘দুর্গেশনন্দিনী’ লিখার আগে আইভানহো আমি কখনো পড়েই দেখিনি। নবীনচন্দ্র ঠোঁট উল্টে বললেন — আজ যেহেতু আপনি নিজেই নিজেকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন সে জন্যই বলছি। কেউ না জানলেও আমার কাছে প্রমান আছে সমুদ্রপথে জাহাজে করে কলকাতা বন্দরে দু’খানা ‘আইভানহো’ নেমেছিলো তার একটি তৎকালীন ভাইসরয়ের লাইব্রেরির জন্য আর দ্বিতীয়টি এসেছিলো আপনার হাতে। তাছাড়া আইভানহো আর দুর্গেশনন্দিনীর সময়ের ব্যবধান প্রায় ৪৬ বছর। আপনি কি বলতে চান এই ৪৫-৪৬ বছরের মধ্যেও আপনি আইভানহো পড়েন নি। বঙ্কিমবাবু চুপ করে রইলেন।
নবীনচন্দ্র এবার হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন — আচ্ছা শাস্ত্রী মশাই আপনি তো বঙ্কিম দাদার শিষ্যতুল্য। সেই সঙ্গে আপনি একজন পন্ডিতও বটে। আচ্ছা আপনি বলুন তো বঙ্কিমচন্দ্রের কোন চরিত্রটি আদর্শ চরিত্র। শাস্ত্রী বললেন — কেন সকল চরিত্রই আদর্শ। নবীনচন্দ্র বললেন — পুরুষ চরিত্রের আদর্শ কে কে? তিনি একটু ভেবে বললেন — পুরুষ চরিত্র না হয় বাদ দিলাম। বঙ্কিম দাদা পুরুষ চরিত্র সৃষ্টিতে না হয় বড় কৃতিত্ব দেখাতে পারেননি। কিন্তু তাঁর স্ত্রী চরিত্রগুলো কি আদর্শ নয়? নবীনচন্দ্র বললেন — তাহলে শাস্ত্রীজি আপনি এবার বলুন মাতৃচরিত্রের আদর্শ কে? তিনি কিঞ্চিৎ ভেবে বললেন — না কাউকে তো পাচ্ছিনা।
— আচ্ছা বোনের চরিত্রের আদর্শ
— সেটাও নেই
— কন্যা চরিত্রের আদর্শ। শাস্ত্রী মশাই নিশ্চুপ। তবে আপনিই বলুন কোন চরিত্রের আদর্শ আছে? শাস্ত্রী তৎক্ষণাৎ বললেন — কেন, পত্নী চরিত্রের? নবীনচন্দ্র বললেন — কে? আবার তৎক্ষণাৎ উত্তর — কেন? সূর্য্যমুখী? আচ্ছা আপনি কি চান আপনার স্ত্রী সীতা সাবিত্রীর মতো হোক। বাস্তবে সূর্য্যমুখীর মতো কোন রমনী পেলে আপনি কি তাকে বিয়ে করবেন। আপনি কি এটাই চান যে আপনার স্ত্রী অভিমান করে মধ্যরাতে আপনার ঘর ছেড়ে পালিয়ে যান। এবার শাস্ত্রী বেচারা মনে হয় গভীর সংকটে নিপতিত হলেন। তিনি কিছুক্ষণ ভেবে বললেন — আচ্ছা সূর্য্যমুখী না হোক ভ্রমর চরিত্র তো আদর্শ হতে পারে? নবীনচন্দ্র উচ্চ কণ্ঠে হেসে বললেন — এবার বেশ বলেছেন কিন্তু। আচ্ছা বাস্তবে যদি আপনার স্ত্রী একবার মাত্র ভুল করে তাহলে আপনি কি সত্যি সত্যি বাড়িতে ঘুঘু চড়াবেন। দু’একবার কি মানুষ ভুল করতে পারে না।
শাস্ত্রী মহাশয় বিস্ময়াবিভূত দৃষ্টিতে নবীনচন্দ্রের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ তারপর কৌতুহলী দৃষ্টিতে বললেন — তবে কি আপনার দৃষ্টিতে বঙ্কিমবাবুর উপন্যাসগুলোর মধ্যে আদৌ কোন সারবস্তু নেই? নবীনচন্দ্র বললেন — মহাশয়, আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন। আমি কি কখনো সে কথা বলেছি। সমস্য হলো কি জানেন, আপনি বঙ্কিমবাবুর অন্ধভক্ত আর আমি তাঁর উপাসক। আপনার মতো আমিও বঙ্কিমবাবুর গদ্য পড়েই লিখালিখি শিখেছি। নিঃসন্দেহে তিনি আমার গুরুস্থানীয়। একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় বাংলাসাহিত্যে তিনি অমর হয়ে থাকবেন। কিন্তু তার উপন্যাসগুলোতে অনিবার্য ভাবেই অতি উচ্চ শিল্প আছে। সেই সঙ্গে আছে শিক্ষা। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে আদর্শ কোন চরিত্র নেই। রামায়ণ, মহাভারত কিংবা অন্যান্য উপন্যাসের কল্যাণে ভারতের ঘরে ঘরে যে আদর্শ পিতা, আদর্শ পুত্র, আদর্শ ভাই, আদর্শ বোন, আদর্শ মা, আদর্শ কন্যা এমনকি আদর্শ ভৃত্য পর্যন্ত আছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় কি জানেন, এসব আদর্শ তাঁর অসাধারণ প্রতিভার আঘাতে বরং তিনি ভেঙ্গেছেন কিন্তু গড়তে পারেননি। একথা যে কেবল আমি আপনাকেই বলছি তা নয়। বঙ্কিম দাদার উপন্যাসগুলো প্রকাশিত হওয়ার পর আমি যখন প্রায় প্রতিটি উপন্যাস উপহার পেতাম, সেগুলো পাঠ করার সঙ্গে সঙ্গে বঙ্কিম দাদাকে বিষয়গুলো আমি চিঠি লিখে পর্যন্ত জানিয়েছি। উনিতো এখন আমাদের সামনেই উপস্থিত আছেন আপনি নিজেই না হয় জিজ্ঞেস করুন। একথা আমি আগেও বলেছি এখনও বলছি, বঙ্কিম দাদার উপন্যাসগুলো ইউরোপীয় উপন্যাস হিসেবে উৎকৃষ্ট উপন্যাস কিন্তু ভারতীয় সাহিত্যের হিসেবে উৎকৃষ্ট সাহিত্য নয়।
সবশুনে বঙ্কিমচন্দ্র বললেন — সে তোমরা বলতে পারো, সে অধিকার আছে তোমাদের। তবে আমি মনেকরি ইতিহাসই ঠিক করবে আমার উপন্যাসগুলো স্বার্থক নাকি আদৌ স্বার্থক নয়।
নবীনচন্দ্র ইতস্তত কণ্ঠে বঙ্কিমচন্দ্রকে উদ্দেশ্য করে বললেন — আপনি যদি কিছু মনে না করেন তবে কিছু বিষয় জানতে চাই আপনার কাছে। বঙ্কিম সহাস্য কণ্ঠে বলে উঠলেন — আরে আজ তো তোমাদেরই দিন। মন খুলে জিজ্ঞেস করো। যা জানতে চাইবে সব উত্তর পাবে আজ। নবীনচন্দ্র বললেন — লোকজন বলাবলি করে, সমসাময়িক কোন লেখক সাহিত্যিকের সঙ্গেই নাকি আপনার সৎভাব নেই। সে হোক আপনার অগ্রজ কিংবা অনুজ। দীনবন্ধু মিত্র আপনার অকৃত্রিম বন্ধু সে ঠিক আছে কিন্তু আড়ালে আবডালে তাকে নিয়েও নাকি আপনি কটুকাটাব্য করেন। বঙ্কিমচন্দ্র শুকনো মুখবদনে বললেন — তোমার একথা সত্যি নয় নবীন। নবীনচন্দ্র চোখ কপালে তুলে বললেন — কী বলছেন! সত্যি নয়? আচ্ছা এই যে, আপনার অগ্রজ কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, যে মানুষটি আপনাকে লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কত কিছুই না করলেন। তার সম্পাদিত সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় আপনার লেখা ছাপিয়ে ছাপিয়ে আপনাকে লেখক বানিয়ে দিলেন তারপরও আপনি যখন ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের জীবনী লিখছিলেন তখন কেউ একজন আপনাকে জিজ্ঞেস করলেন — তিন বছর বয়সে ঈশ্বরচন্দ্র নাকি একটি কবিতা লিখেছিলেন — রেতে মশা, দিনে মাছি/এই নিয়ে কলকাতায় আছি। এর উত্তরে আপনি বলেছিলেন — “তাই নাকি? একথা আমরা বিশ্বাস করবো কিনা জানিনা। তবে স্টুয়ার্ট মিলের তিন বছর বয়সে গ্রীক শেখার কথাটা যখন সাহিত্য জগতে চলিয়া গিয়াছে তখন এ কথাটাও চলুক।” নবীনচন্দ্র বললেন — এ ধরনের হেয়ালিপুর্ণ কথার মানে কি দাদা? তাছাড়া ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ঐ যে কবিতা খানা লিখলেন — আপনাকে বড় বলে বড় সেই নয়/লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়/বড় যদি হতে চাও ছোট হও তবে। সাহিত্য জগতের অনেকেই কিন্তু জানে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত কবিতাখানি আপনাকে উদ্দেশ্য করেই লিখেছিলেন। সাহিত্য সম্রাট উপাধি পাওয়ার পর আপনার সেকি অহংকার! মাটিতেই পা পড়ে না। আপনার ঐ অবস্থা দেখেই তো ঈশ্বরচন্দ্র এই কবিতাটি লিখলেন। বঙ্কিমচন্দ্র ঈষৎ ম্লান কণ্ঠে বললেন — দেখ নবীন এতো কিছুর পরেও কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্র কে আমি গুরু বলে মানি। নবীন অনুযোগের সুরে বললেন — সে আপনার মুখের কথা হতে পারে দাদা কিন্তু মনের কথা কিনা সেটা আপনিই ভালো বলতে পারেন।
আচ্ছা আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো আপনার পুত্রবয়সী লেখক। তাঁর সঙ্গেও আপনার দ্বন্দে জড়াতে হবে কেন? আপনাদের বাকরুদ্ধ দেখে তো সেসময় কলকাতার বিদ্বসমাজ বিস্মিত ও হতবাক! রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন তেইশ আর আপনার ছেচল্লিশ। অনেকেই আপনাকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করতো নিভৃতে, বলতো বঙ্কিমের কি মাথায় গন্ডগোল হলো নাকি? নিজের ছেলের বয়সী একজন লেখকের সঙ্গে এমন দ্বন্দে নেমেছে। বঙ্কিম উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন — ঐ ছোকরাটাই তো পত্রিকায় আমাকে গালমন্দ করে প্রবন্ধ লিখেছে। আমি যেখানে নিজের গলার মালা খুলে ওর গলায় পড়িয়ে ওকে কবি হিসেবে বরণ করে নিয়েছিলাম অথচ সে কিনা আমার বিরুদ্ধে তীর্ষণ মন্তব্য করে। নবীনচন্দ্র বললেন — দাদা আমার মনে হয় আপনার একটু ভুল হচ্ছে। আপনিই রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আগে কটাক্ষপাত করেছেন।
বঙ্কিমচন্দ্র রাগে কাঁধ ঝাকিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে বেশ ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললেন — তুমি তো কিছুই জানো না নবীন। আমার লিখা গান ‘বন্দে মাতারম’ ভারতে তখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে, আলোচনা চলছে বন্দে মাতারমই হয়তো হবে ভারতের জাতীয় সংগীত কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নেহেরুকে চিঠি লিখে বারণ করলেন কিছুতেই যেন ‘বন্দে মাতারম’ গানখানি জাতীয় সংগীত না করা হয়। গানটিতে নাকি মুসলমানদের প্রবল আপত্তি। এ জন্যই তো নেহেরু বন্দে মাতারম গানটিকে বাদ দিয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘জনমন অধিনায়ক’ গানটিই ভারতের জাতীয় সংগীত করলেন।
নবীনচন্দ্র চিবুক দুটো ডান হাতের আঙ্গুল দিয়ে ঘষতে ঘষতে বললেন — বঙ্কিম দাদা মনোযোগ দিয়ে শুনুন আপনাকে একটা গল্প বলি। একবার জনৈক্য ব্যক্তি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কাছে গিয়ে আপনার বিরুদ্ধে বিস্তর নিন্দে মন্দ করলেন। সবশুনে বিদ্যাসাগর মশাই কি করলেন জানেন? তিনি আগন্তুক সেই ব্যক্তিটিকে বললেন — আপনার কথা শুনে বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতি তো আমার শ্রদ্ধা আরো বেড়ে গেল মশাই। লোকটি বিদ্যাসাগরকে পাল্টা প্রশ্ন করলেন — কেন বলুন তো? কারণ বঙ্কিমচন্দ্র সমস্ত দিন সরকারী কাজে ব্যস্ত থাকেন। অন্যদিকে বাকি সময় যদি আমার মতো সাধারণ মানুষকে নিয়ে সমালোচনা করেন ও কুৎসা রটান তাহলে উনি লেখালেখি করে কখন! তার লেখা কেতাবে আমার আলমারির একটা সেল্ফ যে ভরে গেল! ঐ লোকটির কাছে বিদ্যাসাগর আপনার প্রশংসা করলেন অথচ আপনি কিনা তাঁর বিরুদ্ধে লেগেছেন।
বঙ্কিম স্ববিস্ময়ে বললেন — আমি বিদ্যাসাগরের বিরুদ্ধে লেগেছি কে বলল তোমায়? নবীনচন্দ্র বললেন — কেন, বিষবৃক্ষ উপন্যাসে আপনি তাঁর বিরুদ্ধে লেখেন নি? উপন্যাসের ১১তম পরিচ্ছেদে সেই যে সূর্যমুখীর পত্রে লেখা হলো — “ঈশ্বর বিদ্যাসাগর নামে কলিকাতায় কে না কি বড় এক পন্ডিত আছেন! তিনি আবার একখানি বিধবা বিবাহের বহি বাহির করিয়াছেন। যে বিধবা বিবাহের ব্যবস্থা দেয়, সে যদি পন্ডিত হয় তবে মূর্খ কে?” বঙ্কিমচন্দ্র মুখে বঙ্কিম হাসি হেসে বললেন — ও তাহলে তুমি পড়েছো উপন্যাসখানা।
নবীনচন্দ্র বললেন — আমি কেন অনেকেই পড়েছে। বিদ্যাসাগর মশাই কিন্তু বেশ কষ্ট পেয়েছেন আপনার এই কর্মকান্ডে। আমার সঙ্গে বিদ্যাসাগরের সম্পর্ক অত্যন্ত নিগুঢ়। উনার বাড়িতে আমার নিয়মিত যাতায়াত। উনিই একদিন আমাকে বললেন — দেখেছ নবীন আমার সম্পর্কে কি লিখেছে বঙ্কিম। আমি উনাকে জিজ্ঞেস করলাম — এর হেতু কি দাদা। বিদ্যাসাগর তখন আফসোস করে বললেন — প্রথমে আমিও বুঝতে পারিনি আমাকে ছোট করে বঙ্কিমের কি ফায়দা হাসিল হলো। তবে বেশ পরে জেনেছি এর কারণ। রহস্যভেদ হবার পর মনে হয়েছে এত ছোট মনের মানুষও থাকতে পারে এই দুনিয়ায়? হায় ভগবান! আমি তখন বিদ্যাসাগরকে উদ্দেশ্য করে বললাম — খুলে বলুন না দাদা, এতো হেয়ালি করছেন কেন? বিদ্যাসাগর আবেগতাড়িত কণ্ঠে বললেন — কি আর বলবরে ভাই, ১৮৫৮ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বি.এ পরীক্ষা দিয়েছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। মোট দশজন ছাত্রের মধ্যে কেবলমাত্র দু’জন ছাত্রই দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। এ দু’জন ছিলেন যদুনাথ বসু ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। এঁরা দু’জনেই ছয়টি বিষয়ের মধ্যে পাঁচটিতেই কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হলেন বটে কিন্তু ষষ্ঠ বিষয়ে ফেল করায় এঁদের দু’জনকেই সাত নম্বর করে গ্রেস দিয়ে পাশ করানো হলো। এরমধ্যে ওই যে ষষ্ঠ বিষয় অর্থাৎ সংস্কৃত, বাংলা ও ওড়িষা ভাষার পরীক্ষক ছিলাম আমি। আমি তখন সংস্কৃত কলেজের প্রিন্সিপাল পন্ডিত। তো হয়েছে কি জানো; এ দু’জনের খাতা দেখতে গিয়ে দেখলাম এঁরা দু’জনেই সংস্কৃত ও বাংলা মোটামুটি ভালো জানলেও ওড়িষা ভাষাতে বেশ দুর্বল। এ কারণে দু’জনের কেউই ওরিষা সাবজেক্টে পাশ করতে পারলো না। সাত নম্বর কম পেল। আমি তো তখন দু’জনের কাউকেই চিনতাম না। আমার অপরাধটা কোথায় বলতে পারো নবীন।
নবীনচন্দ্রের মুখে এসব শুনে কিছু সময় চুপ করে রইলেন বঙ্কিমচন্দ্র। তারপর চুকচুক করে অস্ফুট কণ্ঠে বললেন — আর যাই হোক, ফেল করার মতো ছাত্র আমি নই। বিদ্যাসাগর আমাকে ইচ্ছে করে ফেল করিয়েছে। নবীনচন্দ্র বিস্ময়াভিভূত কন্ঠে বললেন — তাহলে উনি যদুনাথ বসুকেও ফেল করালেন কেন? আপনাকে ফেল করিয়েই তো উনাঁর মনস্কামনা পূর্ণ হতো। বঙ্কিমের কণ্ঠ নিরুত্তর।
সঞ্জীবচন্দ্র হঠাৎ অন্দরমহল থেকে আবির্ভূত হয়ে বললেন — একি! আপনারা এখনো তর্কেবিতর্কে মশগুল হয়ে আছেন। ওদিকে বৌদি রাতের খাবার সাজিয়ে অপেক্ষা করছেন আপনাদের জন্য। নবীনচন্দ্র বললেন — সে কি? আপনি বৌদিকে এক্ষুণি গিয়ে বলুন, কিছুক্ষণের মধ্যেই উনার দরবারে হাজির হয়ে যাবো।
নবীনচন্দ্র বঙ্কিমচন্দ্রকে বললেন — আমার একটি বিষয় জানার খুব ইচ্ছে। আপনি আপনার কিছু উপন্যাসে মুসলমানদের বেশ হেয় করেছেন, কেন? বঙ্কিমচন্দ্র অবাক দৃষ্টিতে বললেন — কোন উপন্যাসে তাদের হেয় করা হলো? নবীনচন্দ্র বললেন — প্রচ্ছন্নভাবে বেশ কিছু উপন্যাসেই, তবে মুসলমান সমাজকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করা হয়েছে ‘আনন্দমঠ ও রাজসিংহ’ উপন্যাস দু’টোতে। রাজসিংহ উপন্যাসের এক জায়গায় আপনি লিখেছেন — “একখন্ড রুটির ভিখারী ঔরঙ্গজেব শেষে বেত্রাহত কুকুরের মত বদনে লাঙ্গুল নিহিত করিয়া রাজসিংহের সম্মুখ হইতে পলায়ন করে। সম্রাট ঔরঙ্গজেব নির্মলকুমারীর মত একজন অতি সাধারণ হিন্দু যুবতীর প্রণয়াকাঙ্খী। জেবউন্নিসার মত বিদুষী বাদশাজাদী স্বেচ্ছাচারিণী তো বটেই, এমন কি তার কামপ্রবণতা এতদূর বিস্তৃত যে, তা পিসীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দিতাতে পর্যন্ত পৌঁছায়।”
তাছাড়া আনন্দমঠের প্রথম সংস্করণে আপনি ইংরেজদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করলেও উপন্যাসটির দ্বিতীয় সংস্করণে শত্রু হিসেবে আপনি চিহ্নিত করলেন মুসলমানদের। ‘ইংরেজ’, ‘গোরা’, ‘ব্রিটিশ’, শব্দ গুলো আচানক পরিবর্তিত হয়ে ‘মুসলমান’, নেড়ে’, ‘যবন’, প্রভৃতি হয়ে গেল? সেটা খুবই বিস্ময়কর। প্রথম সংস্করণের দ্বিতীয় খন্ডের একাদশ পরিচ্ছেদের ১৫১ পৃষ্ঠায় আপনি লিখেছেন — “ভবানন্দ বলিল, ভাই ইংরেজ ভাঙ্গিতেছে, … ফিরিয়া আসিয়া ইংরেজদিগকে আক্রমণ করিতে ধাবমান হইল। আকস্মাৎ তাহারা ইংরেজের উপর পড়িল। ইংরেজ যুদ্ধের আর অবকাশ পাইল না।” ঠিক এই অংশটি দ্বিতীয় সংস্করণে পরিবর্তিত হয়ে লেখা হলো — “ভাই নেড়ে ভাঙ্গিতেছে… ফিরিয়া আসিয়া যবনদিগকে আক্রমণ করিতে ধাবমান হইল। আকস্মাৎ তাহারা যবনের উপর পড়িল। যবন যুদ্ধের আর অবকাশ পাইল না।”
বঙ্কিমচন্দ্র ভ্রু কুচকে বললেন — তুমি শুধু তোমার চোখে যা কিছু দৃষ্টিকটু সেটাই দেখলে। কিন্তু ‘আনন্দমঠে’ পরোক্ষ ভাবে মুসলমানদের প্রশংসাও আছে, সেটা কিভাবে তোমার চোখ এড়িয়ে গেল? নবীনচন্দ্র অবাক দৃষ্টিতে বললেন — যেমন? বঙ্কিমচন্দ্র বললেন — প্রথম খন্ডের অষ্টম পরিচ্ছেদে আমি লিখেছি — “সেই সময়ে ইংরেজের কৃত আধুনিক রাস্তা সকল ছিল না। নগরসকল হইতে কলিকাতায় আসিতে হইলে মুসলমান-সম্রাট-নির্মিত অপূর্ব রাস্তা দিয়া আসিতে হইত।”
নবীন তুমি কি জানো, আনন্দমঠের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হওয়ার পর সাম্প্রদায়িকতার ধ্বনি তুলে কতিপয় মুসলমান বইটি প্রকাশ্যে দাহ করেছিলো। ইহুদীদের প্রতি নিন্দে-মন্দ আছে বলে শেক্সপিয়রের ‘মার্চেন্ট অব ভেনিস’ তো অগ্নিদগ্ধ হয়নি। কিন্তু আমার উপন্যাস কেন প্রকাশ্যে পোড়ানো হলো? আনন্দমঠ যে শিল্পকর্ম হিসাবে স্বার্থক সে কথা আমি কখনোই বলিনি। ‘আংকল টম্স কেবিন’ প্রথম শ্রেণীর উপন্যাস না হয়েও সমাজের জন্য যে অসামান্য উপকার করেছে তা তো কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। ‘আনন্দমঠও’ উপন্যাস হিসাবে যত অকিঞ্চিতকর-ই হোক না কেন স্বাধীনতা আন্দোলনে তার দান অতুলনীয়। তোমরা যদি আনন্দমঠকে সে দৃষ্টিতে বিচার করো তবেই দেখতে পাবে এর স্বার্থকতা। ঐ যে তুমি বললে — আমি ইংরেজদের খুশী করতে আনন্দমঠের কিছু অংশ পরিবর্তন করেছি, তোমার সে ধারনা ভুল। আমি স্বেচ্ছায় অবসরে যাই ১ নভেম্বর ১৮৯১ সালে। ছোটলাট এলিয়ট যখন জানলেন আমার বয়স তখন মাত্র তিপান্ন, তিনি আমাকে আরো কিছুকাল চাকরি করার জন্য বারংবার অনুরোধ করলেন। কিন্তু চাকুরির প্রতি আমার কোন মোহ ছিলো না। আমি স্বেচ্ছায় অবসরে চলে গেলাম।
নবীনচন্দ্র এবার মুখ খুললেন — আচ্ছা দাদা আমি সবই বুঝলাম কিন্ত আপনার একটা লিখা আছে — ‘কাক, কুকুর এবং মুসলমান’ শিরোনামে। সেখানে আপনি লিখেছেন — “ঢাকাতে দুই চারিদিন বাস করিলেই তিনটি বস্তু দর্শকদের নয়নপথের পথিক হইবে — কাক, কুকুর এবং মুসলমান। এই তিন সমভাবে কলহপ্রিয়, অতি দুর্দম, অজেয়। ক্রিয়াবাড়িতে (অর্থাৎ বেশ্যালয়ে) কাক এবং কুকুর, আদালতে মুসলমান। এই তিনটি সমভাবে কলহপ্রিয়।” এমন ধরনের লেখা কোন সুস্থ লেখক কি লিখতে পারে? আপনি-ই বলুন। এরপরও কি বলবেন — আপনি মুসলমান বিদ্বেষী নন।
বঙ্কিমচন্দ্র বললেন — তুমি পূর্ববঙ্গের মানুষ এই জন্য তোমার মুসলমানদের প্রতি এতো দরদ। নবীনচন্দ্র বললেন — এটা কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর হলো না দাদা। আমি আপনার কাছে সুনির্দিষ্ট উত্তর আশা করেছিলাম। বঙ্কিমচন্দ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন — চলো চলো, দেরি হয়ে যাচ্ছে, তোমার বৌদি রাতের খাবার নিয়ে অপেক্ষা করছেন।