একটু ব্যাঙ্ক থেকে ঘুরে আসা যাক, আমাদের কেমন অভিজ্ঞতা হয়? আমি শুধু নিজের টুকু বলতে পারি। একজন সরকার পোষিত হাই স্কুলের শিক্ষিকা হিসেবে নানা কাজে বিভিন্ন সরকারি অফিসে গেছি। সেখানে সময় নষ্ট, কাজের ঢিলেমির মত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি। কিন্তু নিজের মত করে সে কাজ হাসিল করে এসেছি। কিন্তু প্রায় ১৫ বছর ধরে এমন এক জায়গায় যেতে আজও দ্বিধাতে থাকি, কোথাও একটা জড়তা বিরক্তি কাজ করে, সেটা হলো… ব্যাঙ্ক। তবু দৈনন্দিন জীবনে আমাদের সামাজিক অবস্থান চালু রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই জায়গাতে আমাদের সবাইকে যেতেই হয়। বেশ কয়বার বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে গিয়ে এত তুচ্ছতাচ্ছিল্যের সম্মুখীন হয়েছি, মনে হয় যেন আমি বড্ড অজ্ঞ এই আধুনিক পরিষেবা থেকে। অপেক্ষা করে বসে হয়ত একটা দিন পুরো কেটে গেছে, কিন্তু দিনের শেষে কোন একটা বিষয়ের/ কাগজের অভাবের জন্য কাজটা করা যায় নি। সত্যি বলতে তখন কি ভীষণ রাগ হয়… মনে হয় যে, ঐ তীব্র অহংকারী কিংবা ঔদ্ধত্যপূর্ণ ব্যাঙ্কারটির বিরুদ্ধে কিছু যদি ব্যবস্থা নিতে পারতাম!
দিনের শুরুতে মানুষগুলো কি একটু পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিতে পারতেন না কি কি পদ্ধতি বা কি কি লাগবে। মন থেকে অভিশাপ বর্ষণ হয় খুব। এ তো তবু গেল আমার মত মাঝামাঝি অবস্থানের মানুষের হাল… যারা কিছুটা বুঝি, কিছু বিষয়ে অজ্ঞ, আমাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও আছে। কিন্তু ব্যাঙ্কে আরো ২ রকমের মানুষ দেখা যায়… বিত্তমান মানুষদের সরাসরি পরিষেবা পেতে দেখেছি, কারণ হিসেবে ব্যক্তিগতস্তরে মনে হয় যে, ব্যাঙ্ক তাদের থেকে বিভিন্ন মিউচুয়াল-সহ ফিক্সড ডিপোজিটের সুবিধা পান। নিজ লাভের স্বার্থে তারা সবসময়েই গুরুত্বপূর্ণ কাস্টমার ব্যাঙ্কের। আরেক ধরনের মানুষকে দেখা যায়… খেটে খাওয়া সমাজের পিছিয়ে পড়া প্রজাতির। তারা সারাদিন ঘুরে বেড়ান এই কাউন্টার থেকে অন্যটায়। যদি একটু খবর পাওয়া যায়.. তাদের অ্যাকাউন্টে সরকারী টাকা ঢুকলো কিনা, অ্যাকাউন্টটা বন্ধ কেন? কিংবা কোনোভাবে কিছু লোন পাওয়া যায় কিনা…এই সব প্রশ্নের সমাধানে সেই মানুষগুলো দিনের পর দিন ঘুর ঘুর করে। অবাক হয়ে দেখি… টাকার কাছে তারা কেমন বশ্যতা স্বীকার করে, তাই অনেকসময় সাধারণ ক্যাসুয়াল স্টাফদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য-সহ নানা অপমানও হজম করে নেয়। কিন্তু সমস্যা তো আমার মত মধ্যবিত্ত মানুষগুলোর… আত্মসম্মান বোধ জেগে ওঠে, আবার সামাজিক পারিবারিক দায়বদ্ধতায় টাকাপয়সার প্রসঙ্গকেও অবহেলা করতে পারি না। তাই মনের মধ্যে তীব্র রাগ পোষণ করেই ব্যাঙ্কে যেতে হয় প্রায় বাধ্য হয়েই।
তাই যখন এই ব্যাঙ্কাররা এসে কোন একদিন সই সংগ্রহে আসে, আমার মত লোকেরা মনে মনে বা মুখেও অনেক সময় বলে ফেলি যে, বেশ হবে বেসরকারিকরণ হলে। আপনাদের ব্যবহার-সহ নানা পরিসেবা ঠিক হয় যদি এবার। তাই সেই সইসাবুদের রাস্তায় আমরা হাঁটি না। উল্টে সরকারের বেসরকারীকরণের পথকে প্রশস্ত করছি।
এবার এই মুদ্রার উল্টো পথের কথায় আসা যাক।
আমার মত সাধারণের দৃষ্টিভঙ্গিতে… হয়ত এর গভীরতা নিয়ে অতটাও ওয়াকিবহাল নই, তবুও যতটুকু মনে এসেছে, সেটা এমন–
আমরা পরিষেবা নিয়ে এত বিড়ম্বনা প্রকাশ করলেও আমাদের সবার কাজ মোটামুটি হয়েই যায়। তাই আর্থিক সচলতা সব শ্রেণির মানুষের মধ্যেই বিরাজমান। কিছু সংখ্যক কর্মীর দুর্ব্যবহার দিয়ে সবাইকে বিচার করাটাও যুক্তিযুক্ত নয়। আমাদের অনেকের বহু জটিল সমস্যাও সমাধান করেন অনেক কর্মী তাদের ধৈর্য সুব্যবহার দিয়ে।
এবার কথা হলো, বেসরকারিকরণ কি? তাতে কি বা লাভ, কি বা লোকসান। আমাদের মাথাতে প্রথমেই আসে যে, এই ব্যাঙ্কাররা সরকারি হওয়ার সুবাদে যে যে সুবিধা পাচ্ছে, তা হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে এমন মরিয়া হয়ে উঠেছে। অথবা তাদের কিছু অংশ যারা অলস প্রকৃতির তারা কাজে আর ফাঁকি দিতে পারবে না, তাই এত উদ্যোগ। কিংবা আধুনিক প্রযুক্তিতে কম জানা লোকেরা নিজের চাকরি হারানোর ভয়ে এত প্রতিবাদি। আবার এটাও হতে পারে ব্যাঙ্কারদের মাইনের পরিমাণ কম বেশির মাপকাঠি তাদের কাজ বা আমাদের মত কাস্টমারদের মূল্যায়নের উপরে নির্ভর করবে এমন বেসরকারি হলে। তাহলে পুরো স্বার্থটাই ওদের নিজস্ব। তাই আমাদের কি বা আসে যায়… ওরা সরকারি থাকুক বা বেসরকারিতে যাক। আমাদের পরিসেবা সুস্থ থাকলেই হল.. তাই ও সব ব্যাঙ্ক বাঁচাও, দেশ বাঁচাও, এসব সই বা সমর্থনে আমরা নেই।
এখন কথা হলো… ব্যাঙ্ক সরকারি সংস্থা নয়। ওরা স্বাধীন সংগঠন। আমরা প্রায় অধিকাংশ আম আদমি যে ব্যাঙ্কে গিয়ে আমাদের কাজকর্ম করি, তার প্রায় সবই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক। তাই সেখানে ঐ নিম্নবিত্ত মানুষের ৫০০ টাকাও জমা থাকে, আবার ৫০ কোটির মালিকও তার টাকা রাখেন। এবার ব্যাঙ্ককর্মীরা কি নিজের স্বার্থে আন্দোলন করছেন? আমার মনে হয়, তা নয়। কারণ কাজে অপারগ কর্মীকেও যদি ব্যাঙ্ক ছাটাই করে, বেসরকারি হলেও তাকে এত টাকার বিনিময়ে অগ্রিম পেনশনের সুযোগ দেবে, তাতে তার একজন্ম হেসে খেলে কেটে যাবে৷ এবার কাজের সময় নিয়ে কথা… ওরা অনেকেই সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত কাজ করেন। হয়ত বেসরকারি হলে সে সব কর্মীদের উপার্জনের পরিমাণ এখনের থেকে বেড়ে যাবে, তাতে লাভ তো ওদেরই। আর সুযোগ সুবিধা যা যা এখন পাচ্ছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি সুদক্ষ কর্মীরা লাভ করবেন। তাই লাভের ভাগ কর্মচারীদেরই। এমন নয় যে, এই আন্দোলন শুধু কতিপয় কর্মী করছেন। আমরা দেখতে পাই… সেই দুর্ব্যবহার করা লোকটা, টিফিন/বাথরুমের নাম করে ৩০ মিনিট দাঁড় করানো মহিলা ব্যাঙ্কার, প্রবল ঘ্যাম নেওয়া অল্প বয়সী ছোকরা, মিষ্টি ব্যবহারের লকার খুলে দেওয়া দিদিটি, লোনের কাগজ সব দেখে তাড়াতাড়ি লোন করে দেওয়া মানুষটি, জটিল অ্যাকাউন্টসংক্রান্ত বিষয় সমাধান করা ম্যানেজার… সবাই কিন্তু এক ছাতার তলায় ওরা। তাই বিষয়টা একটু হলেও ভেবে দেখার।
আমাদের আজ এই সাধারণ ব্যাঙ্কে যেতেই কেমন জড়তা হয়, এরপর বেসরকারি হলে তার ঝাঁ চকচকে দরজা ঠেলে ঢুকতে তো বুক কাঁপবে। এমন ব্যাঙ্ক কি আর গ্রামাঞ্চলে বেশি থাকবে? সংখ্যা কমে ২-৩ টে ব্যাঙ্ক এক হয়ে একটা তৈরি হলে কোন কাজের সীমাবদ্ধতা কতদিন হবে? যে কাজে আগে ৩দিন যেতে হত, হয়ত ১৫দিন পরেও সে কাজটা মিটবে না। বেসরকারি হলে ওই বয়স্ক কিছু মানুষকে টাকা পয়সা বুঝিয়ে অবসর নিতে বাধ্য করবে, তখন লোকসংখ্যা কমার সাথে সাথে আমাদের পরিষেবা পেতেও সময় লাগবে অনেক। যতজন কর্মী তাদের দিয়ে অনেক বেশি পরিমাণ কাজ করিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলবে, হয়ত বিনিময়ে তারা মোটা অংকের অতিরিক্ত উপার্জন করবেন। কিন্তু আমাদের মত সাধারণ ঘরের নতুন প্রজন্মের একটা চাকরির ক্ষেত্র কমে যাবে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে প্রতি বছরই কয়েক হাজার নিয়োগ হয় নানা পোষ্টে। সেই জায়গাটা কমে গেলে আমাদের প্রজন্মের একটা কাজের জায়গা হারানোর সম্ভাবনা প্রবল। এই তো গেল আমাদের মত মানুষদের কথা।
সেই কত বড়লোক শিল্পপতিরা কয়েক লক্ষ কোটি উধাও করে চলে গেল বিদেশে, ব্যাঙ্কগুলোর সে টাকা ফেরতের আর তো উপায় থাকবে না। তার ফল স্বরূপ বিভিন্ন খাতে সুদের পরিমাণ যাবে কমে। লোকসানটা সেই আমাদের। যারা জীবনের সঞ্চয় ব্যাঙ্কে গচ্ছিত রাখি কিছু লাভের আশাতে। সেই গচ্ছিত টাকাই যদি অসুরক্ষিত হয়ে যায়, সারাজীবনের সঞ্চয় জলে ভেসে যাবে৷ এবার রাজ্য বা কেন্দ্রের যে সব অনুদান নিম্নশ্রেণি-সহ ছাত্র ছাত্রীদের নানা খাতে টাকা ঢোকে, সেই সব কয়েক কোটি মানুষের পরিষেবা কি বেসরকারি ব্যাঙ্ক দেবে? লক্ষ্মীর ভান্ডারের ৫০০টাকা বা ১৮ বছর বয়সী মেয়েটার ২৫,০০০ টাকা কন্যাশ্রীর… সে সব অ্যাকাউন্ট সবটাই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলোর কাছে। তারা নিজের লাভের বাইরেও এই সব সরকারি কাজের দায়ভার বহন করে যায় দিনের পর দিন। কিন্তু বেসরকারি ব্যাঙ্ক কি এই অতি সামান্য টাকার মানুষটির হাল হকিকত বুঝে তাকে সময় দেবে? তারা ব্যাঙ্কে ঢুকে এ টেবিল সে টেবিল ঘুরে কাজটা বুঝে নেওয়ারও কি সুযোগ পাবে? নাকি গেট থেকেই বিদায় নিতে হবে।
আমাদের সবার জীবনের ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপরে। আর সেই ব্যবস্থার সঞ্চালক ব্যাঙ্কিং সিস্টেম। মধ্যবিত্ত-সহ সাধারণ মানুষের আর্থিক নির্ভরতা… রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের উপরে। সেই ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হলে, ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণের পথে হাঁটলে তার প্রভাব পড়বে আমাদের উপরেই। আমরাই এর ফল ভোগ করবো বেশি। ব্যাঙ্ককর্মীদের নিজস্ব স্বার্থের বাইরে এ বিপদ সমাজের… এটা মাথায় রেখেই আমাদেরও ভাবনার সময় এসেছে।
লেখিকা উত্তর চব্বিশ পরগনার পৃথিবা রাধারাণী গার্লস হাই স্কুল, হাবড়া অঙ্কের শিক্ষিকা।