মল্ল রাজারা যে শুধুই রাজধানী বিষ্ণুপুরকে মন্দিরে মন্দিরে ভরিয়ে দিয়েছিলেন তা নয়, রাজধানীর বাইরে বৃহত্তর মল্লভূমের বিভিন্ন জায়গায় তাঁরা বহু মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেরকমই একটি বাঁকুড়া জেলার ওন্দা থানা এলাকার বিক্রমপুর গ্রামের গোপালজিউ মন্দির। সবুজ ধান ক্ষেত আর মেঠো পথ পার করে বিক্রমপুর গ্রামে প্রবেশ করলেই দেখবেন এক সুবিশাল পুকুর। আপনি যদি কৌতূহলী হন তাহলে পুকুরপাড়ে বিরাজমান এক সুন্দর কিন্তু পরিত্যক্ত মন্দির আপনার চোখ এড়াবে না। কাছে গেলে স্পষ্ট দেখতে পাবেন টেরাকোটার এই মন্দিরটি। দুঃখের বিষয় শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী টেরাকোটার মন্দিরটি আজ যেন গোয়াল ঘর। মন্দিরের আরও কাছে গেলে দেখতে পাবেন দেওয়ালে ঘুঁটের কারুকার্য। হ্যাঁ ঠিকই বলছি, ঐতিহাসিক মন্দির রূপান্তরিত হয়েছে গোয়ালঘরে। মন্দিরের বাইরে চরে বেড়াচ্ছে গরু-ছাগল। ভরা বর্ষাতে এখন মন্দির অগম্য। এইভাবেই পরিচর্যার অভাবে পড়ে রয়েছে বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজাদের আমলের বিগ্রহহীন শতাব্দী প্রাচীন মন্দির। মন্দিরের গায়ে খোদাই করা ইতিহাস অপেক্ষা করছে পরিচর্যার ছোঁয়ার।

আসুন এবার একটু ফিরে দেখা যাক । অমিয় কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৭০ সালে বাঁকুড়া জেলার পুরাকীর্তি দেখতে এসে লিখেছিলেন “বিক্রমপুরের উড়িষ্যা-শৈলীর, দক্ষিণমুখী, পাথরের শিখর দেউলটি জেলার শ্রেষ্ঠ পুরাকীতিগুলির মধ্যে অন্যতম। উচ্চতায় প্রায় ৪৫ ফুট (১৩৫ মিটার) ও দৈর্ঘ্য প্রস্থে ১৭ ফুট (৫’১ মিটার), এ দেবালয়ের সামনের জগমোহনটি প্রায় ২০ ফুট (৬ মিটার) উঁচু ও ১৩ ফুট × ১৩ ফুট (৩৯ × ৩৯ মিটার) প্রস্থচ্ছেদের। মূল দেউল মন্দিরের ও পীঢ়া রীতির জগমোহনের দু’টি শিখরই সপ্তরথ; শেষেরটি তিনটি স্তরে বিভক্ত। দু’টিরই ছাদ ধাপযুক্ত চারচালার ওপর ন্যস্ত। জগমোহনে ঢোকবার তিনটি ও গর্ভগৃহে ঢোকবার একটি প্রবেশপথের খিলানগুলিও ধাপযুক্ত। জগমোহনের সামনের দেওয়ালে, কার্নিসের নীচে নিবদ্ধ পাথরের উৎসর্গলিপিটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। সেটির পাঠ নিম্নরূপ — “শ্রীরাধিকাকৃষ্ণ- পদেশকেন ভাবালাঙ্ক/ গে সৌধগৃহংসমর্পিতং শ্রীবীরসীং/ হ ক্ষিতি- পালযোষিতামুদাজননী/ শ্রীরঘুনাথ শ্রীপতেঃ ॥ সকে ৯৬০।” প্রথম রঘুনাথ সিংহ যে ৯৬০ মল্লাব্দে (১৬৫৩-৫৪ খ্রীষ্টাব্দে) বিষ্ণুপুর- সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন তাতে কোনই সন্দেহ নেই।

এ দেবালয় স্থাপনের এক বছর পরে, ১৬৫৫ খ্রীষ্টাব্দে, বিষ্ণুপুরের বিখ্যাত জোড় বাংলা মন্দিরটি তিনিই প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানকার উৎসর্গলিপিতে নিজের পরিচয় দেন বীর হম্বীরের পুত্র বলে। কিন্তু এখানে পরিচয় দিয়েছেন ক্ষিতিপাল বীর সিংহের পত্নীর পুত্র হিসাবে, ঐতিহাসিক ভাবে এতে কোন ভুল নেই।জগমোহন সমেত পাথরের দেউল আর একটিমাত্র অবশিষ্ট আছে বাঁকুড়া জেলার কোতুলপুর থানার শিহর গ্রামে।” অন্য আর এক মতে এটির প্রতিষ্ঠাত্রী মল্লরাজ বীরহম্বীরের পট্টমহিষী। প্রতিষ্ঠাকাল ৯৫০ মল্লাব্দ বা ১৬৪৪ খ্রিস্টাব্দ। মল্ল রাজাদের তুলনায় রানী বা মহিলাদের প্রতিষ্ঠিত মন্দিরের সংখ্যা অনেক কম। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান ও প্রাচীন হলো বিক্রমপুরের এই মন্দিরটি।

এরপর আরও পঞ্চান্ন বছর কেটে গিয়েছে। শোনা গেলো এটি নাকি সরকার অধিগ্রহণ করেছে। কিন্তু এটির বর্তমান অবস্থা খুবই শোচনীয়। পিছনের জীর্ণ দেওয়াল ভেঙে পড়বার উপক্রম হয়েছে, জগমোহনের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের বেশ কিছু অংশ ভেঙেই পড়েছে ইতিমধ্যে। বর্তমান সেবাইত পরিবারের বল্লভ ও অধিকারী উপাধিধারী ব্রাহ্মণ পরিবার, কৃষ্ণরাধিকার অষ্টধাতুর বিগ্রহ দু’টি নিজেদের বাড়িতে স্থানান্তরিত করেছেন; সেখানেই পালা ক’রে তাঁদের উপাসনা চলে।এই নিয়ে যথেষ্ট চিন্তিত আশীতিপর গুইরাম বল্লভ। পুরাতত্ত্বপ্রেমী বিপ্লব বরাট স্থানীয় বিভাগীয় আধিকারিকদের নিয়ে মন্দিরটি পরিদর্শন করেছিলেন। ও সম্পূর্ণ একটি খসড়া লিখে স্থানীয়দের দাবিকে তুলেধরে পুরাতত্ত্ব দপ্তরে পাঠিয়েছিলেন তাঁরপরও দুবছর কেটে গিয়েছে, কিন্ত অবস্থার কোন উন্নতি হয়নি।
মর্মান্তিক।
আমাদের এতো ঐতিহ্য থাকতেও আমরা আজ ভিখারি, কারণ আমরা অতীতকে চূড়ান্ত অবহেলা করি।
পুরুলিয়াতেও এরকম দেখেছি।
ধন্যবাদ কমল ব্যানার্জি মহাশয়, এরকম আরো অনেক হারিয়ে যাওয়া মন্দিরকে খুঁজে বের করবার জন্য।
আপনার মুল্যবান মতামতের জন্য ধন্যবাদ