“পরিপাটি বংশবাটি স্থানমনোহর/যেদিকে তাকাই দেখি সকলই সুন্দর/ বিদ্যা বিশারদ কত পন্ডিতের বাস/ সুগৌরবের শাস্ত্রালাপ করে বারো মাস” (নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র)।
প্রাচীনকালে বাঁশবাড়িয়া পূর্ব নাম ছিল বংশবাটি। ঐতিহাসিকগণ মনে করেন ভাগীরথীর তীরে সেই সময় অসংখ্য বাঁশঝাড় ছিলো এবং সেই থেকেই বংশবাটি নামের উৎপত্তি। বংশবাটির অপভ্রংশ বাঁশবেড়ে। বাঁশবেড়ের উত্তরে ত্রিবেনী, গুপ্তিপাড়া, নবদ্বীপ, খাগড়াঘাট, দক্ষিনে নতুন বন্দর কোলকাতা আর এই বানিজ্যের সদর সড়কের ধারেই ছিল বাঁশবেড়ে। এই নামটি নিয়েও একটা প্রবাদ প্রচলিত ছিল — “কার্তিক কাঁসী উদগেরে, এই তিন নিয়ে বাঁশবেড়ে”।
মুঘল আমলের পরিপাটি দুর্গ-নগর বংশবাটী বা বাঁশবেড়িয়ার মনোহারিত্ব কালের কবলে গ্রাস হলেও, আজও বিখ্যাত তার হংসেশ্বরী কালীমন্দিরের জন্য। এই বংশবাটী রাজবংশের প্রজাবৎসল রাজপরিবার দত্তরায়দের আদি নিবাস ছিল বর্ধমানের পাটুলিতে। এই বংশেরই রাজা নৃসিংহদেব স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে হংসেশ্বরী মন্দিরটি নির্মাণ করেন।
নৃসিংহদেবের জন্মের তিন মাস আগে তাঁর পিতাগোবিন্দ দেবের মৃত্যু হয়। ‘নিঃসন্তান অবস্থায় গোবিন্দ দেবের মৃত্যু হয়েছে ‘এই অজুহাতে নবাব আলীবর্দী তাঁর সম্পত্তি অন্যান্য জমিদারের দিয়ে দেন। ফলতঃ রাজা নৃসিংহদেবকে শৈশবে খুবই আর্থিক কষ্টের মধ্যে কাটাতে হয়। পরবর্তী সময়ে নৃসিংহদেব ওয়ারেন হেস্টিংস ও লর্ড কর্নওয়ালিসের নিকট প্রার্থনা করে তাঁর পিতার সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করেন।

ফোয়ারা। একসময় গঙ্গার জল প্রবেশ করে সচল থাকতো।
১৭৯২ থেকে ১৭৯৯ সাল পর্যন্ত রাজা নৃসিংহদেব কাশীতে গিয়ে তন্ত্রসাধনা করেন ও ‘উড্ডীশতন্ত্র’ নামে একটি গ্রন্থও রচনা করেন। কাশী থেকে ফিরে এসে তাঁর প্রপিতামহ রামেশ্বর রায়ের তৈরি টেরাকোটার কারুকার্য খোচিত পোড়ামাটির ক্ষয়প্রাপ্ত অনন্ত বাসুদেব মন্দিরটি (বর্তমানে মন্দিরটি হংসেশ্বরী মন্দিরের পূর্ব দিকে রয়েছে) দেখে পাথরের মন্দির নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন।
সালটা ১৮০১, রাজা নৃসিংহদেব এক রাতে হঠাৎই স্বপ্নাদিষ্ট হন। তিনি দেখেন নিম কাঠের একটি মূর্তি বেনারস থেকে ভাসতে ভাসতে এসে ভিড়লো হুগলির হংসেশ্বরী ঘাটে। সেই বছরই নৃসিংহদেব মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত করলেন। ১৮০২ সালের মধ্যে নৌকায় কাশির নিকটস্থ চুনার থেকে পাথর নিয়ে এসে মন্দিরের একতলা সম্পূর্ণ করে মা হংসেশ্বরীর মূর্তি তৈরি করা হল। হিন্দু শাস্ত্রের প্রাচীণ শত-চক্র-বেদের তান্ত্রিক মতের ওপর প্রতিষ্ঠিত মন্দির ও মূর্তি। কাশী থেকে একজন মুসলিম স্থপতি এসেছিলেন মন্দির নির্মাণ করতে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাঁর অকাল প্রয়াণে মন্দির নির্মাণে কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে পড়ে। নৃসিংহদেবের দুই স্ত্রীর মধ্যে প্রথম স্ত্রী রানি ভবানন্দময়ী রাজার সঙ্গে সহমরণে যান। দ্বিতীয়া স্ত্রী রানিশঙ্করী ছিলেন মহীয়সী নারী। তিনিই অসম্পূর্ণ মন্দিরের কাজ সম্পূর্ণ করেন ১৮১৪ সালে। এরপর মাকে প্রতিষ্ঠা করা হয়। “হংস হলো সাদা শিব আত্মা, আত্ম এবং জ্ঞান তার যিনি ঈশ্বরী — তিনি হলেন হংসেশ্বরী”।

রাজা নৃসিংহদেব তান্ত্রিক ছিলেন তাই মাকে পঞ্চমুন্ডি আসনে স্থাপিত করা হয়। হাজার পদ্মের পাপড়ি দিয়ে গড়া মায়ের বেদির প্রথম ধাপ। দ্বিতীয় ধাপে অষ্টদল আর তৃতীয় বেদীতে ত্রিকালদর্শী শ্বেতশুভ্র পাথরের মহাকাল শায়িত আছেন উত্তর-দক্ষিণে। এই মহাকালের নাভিমূল থেকে উত্থিত দ্বাদশ হৃদপদ্মের ওপর মা বিরাজ করছেন। এই বেদি আর মহাকাল হল পাথরে খোদিত। মায়ের গাত্রবর্ণ নীলাভ। তিনি চতুর্ভূজা। বামদিকের দুহাতে তার তলোয়ার আর নরমুন্ড। ডানদিকের দুই হাতে দেবী আশীর্বাদ করছেন, সঙ্গে বরাভয়।
সেই যুগে মন্দির নির্মাণকল্পে খরচ হয়েছিল ৫ লক্ষ টাকা। মন্দিরের গায়ে লাগানো একটি ফলকে এই শ্লোকটি খোদাই করা আছেঃ
“শাকাব্দে রস-বহ্ণি-মৈত্রসনিতে শ্রীমন্দিরং মন্দিরং।
মোক্ষদ্বার চতুর্দ্দশেশ্বর সমং হংসেশ্বরী রাজিতং।।
ভূপালেন নৃসিংহদেব কৃতি নারব্ধং তদাজ্ঞানুগা।
তৎপত্নী গুরুপাদপদ্মনিরতা শ্রীশঙ্করী নির্মমে”।।
মায়ের মূল মন্দিরটি নান্দনিক। কারুকার্যখচিত
৯০ ফুট উচ্চ মন্দিরটি পাঁচ তলায় বিভক্ত। ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না, বজ্রাস ও চিত্রিণী এই পাঁচটি নাড়ির প্রতীক এটি। মন্দিরের তেরোটি চূড়া। এখানে শিবলিঙ্গ আছে ১৩টি। বর্তমানে মন্দিরটি রক্ষণাবেক্ষণের সম্পূর্ণ দায়িত্ব হল আর্কিওলজি ডিপার্টমেন্টের। গর্ভগৃহের সামনে রয়েছে একটি সুগভীর ফোয়ারা। এই ফোয়ারাটিতে একসময় জল আসত গঙ্গা থেকে। এখন অবশ্য ফোয়ারাটি শুকনো।

বামদিকে – দেবীর শান্ত রূপ, ডানদিকে – কালীপুজোর দিন দেবীর এলোকেশী রূপ (সৌজন্যে হুগলী হেরিটেজ)
দীপান্বিতা কালী পূজার দিন বার্ষিক উৎসব পালন করা হয়। বছরের ৩৬৪ দিন দেবীর শান্তমূর্তি কিন্তু দীপান্বিতা অমাবস্যায় একটি রাতের জন্য দেবীর এলোকেশী রূপের পূজা করা হয়। সেদিন সন্ধ্যাআরতির পর মায়ের মুখে পড়িয়ে দেওয়া হয় রুপোর মুখোশ ও সোনার জিভ। অঙ্গ-বস্ত্রর পরিবর্তে বেনারসি শাড়ি, ফুল-অলংকার সজ্জিত রাজবেশ পরানো হয়। সারা বছর দক্ষিণা কালিকার মতে পূজা হলেও এই দিনটিতে তান্ত্রিক মতে পূজা হয়। ঐদিন মাকে নিবেদন করা হয় খিচুড়ি, তরকারি, ভাজা, ঘি ভাত, পরমান্ন, চাটনি এবং মাছ (কেবলমাত্র মায়ের জন্য)। একসময় প্রচুর ছাগবলী হতো এখন তা আর হয় না।
প্রতিদিনই এখানে মায়ের ভোগ প্রসাদ হিসেবে পাওয়ার ব্যবস্থা আছে। সকাল দশটার মধ্যে কুপণ কেটে নাম নথিভুক্ত করা হয়। সাড়ে বারোটা থেকে ভোগ বিতরণ শুরু হয়। এই মন্দিরে মহালয়া থেকে দুর্গা দশমী, প্রতি পূর্ণিমা অমাবস্যায় এবং মঙ্গল, শনি ও রবিবার মাকে নিবেদন করা হয় খিচুড়ি তরকারি চাটনি আর পায়েস। আর প্রতি সপ্তাহের বাকি চার দিন হয় অন্নভোগ ও সঙ্গে অন্যান্য পদ। গোটা পৌষ মাস জুড়েও থাকে মায়ের জন্য ওই সব পদ। রাতে মাকে নিবেদন করা হয় লুচি-সুজি নারকেল নাড়ু, মিষ্টান্ন। যদি কোন ব্যক্তির ইচ্ছা জাগে সে একদিনের ভোগ নিবেদন করবেন, তাও সম্ভব।
রাজা নৃসিংহদেব নিঃসন্তান ছিলেন। তিনি কৈলাস দেবরায়কে দত্তক নিয়েছিলেন। বর্তমানে তাদের বংশধররাই মন্দিরের সেবাইতের কাজ করেন। প্রতি ১২ বছর বা এক যুগ অন্তর দেবীর অঙ্গরাগ করা হয়।
কুলকুণ্ডলিনী শক্তিকে মূর্তিতে জাগরিতা করেছিলেন রাজা নৃসিংহদেব। তাই আজও কলকাতা থেকে অনতিদূরে অগণিত ভক্তদের মনস্কামনা পূর্ণ করার স্থান বাঁশবেড়িয়া শহরের গৌরব হংসেশ্বরী মন্দির।
অজানা অনেক তথ্য জানতে পারলাম এই লেখা থেকে। দুই বার গিয়েছিলাম। কিন্তু এতো তথ্য জানা ছিলো না। খুবই সুন্দর লেখা।
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই ????
খুব সুন্দর লেখা। ভালো লাগল।
থ্যাঙ্ক ইউ মামা।
খুব ভালো লাগল। তথ্য সমৃদ্ধ লেখা।
ধন্যবাদ জানাই আপনাকে।