পুজো হোক বা অনুষ্ঠান বাড়ি বাপ্পি লাহিড়ীর গান ছাড়া সবই যেন ফিকে। উৎসবের আয়োজনে ‘উরি উরি বাবা, কি দারুন’, ‘গুটুর গুটুর’, ‘উলালা উলালা’, ‘তুনে মারি এন্ট্রিয়াঁ তো দিল মে বাজে ঘণ্টিয়াঁ’ … লারেলাপ্পা গানের অনুপস্থিতি যেন ‘সবই বৃথা তোমায় ছাড়া’।
মধ্য কলকাতার ক্যানিং স্ট্রিটের বাগড়ি মার্কেট ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮ বিশ্বকর্মা পুজোর দিন। ঠিক তার আগের দিন ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ছয়তলা বাড়ির হাজার খানেক দোকান নষ্ট হয়ে যায়। আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি যে, গোটা এলাকা কালো ধোঁয়ায় ঢেকে থাকে পরের দিনও। দমকল, ব্যবসায়ী, স্থানীয় মানুষ, পুলিশ, প্রশাসনের ব্যস্ততা যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, বাগড়ির ঠিক উল্টোদিকের গলির বস্তিতে তারস্বরে বক্স বাজছে ‘পাগ ঘুংরু বান্ধ কে’, ‘তাম্মা তাম্মা লোগে’, ‘আমি কলকাতার রসগোল্লা’…..
পরনে লুঙ্গি বা সস্তার ম্যাক্সি, গলায় গামছা ঝুলিয়ে একদল মুটে-মজুরের দল নেচে চলেছে বিরামহীন গানে। কোথায় সেই পোড়া গন্ধ, জীবন-জীবিকার অনিশ্চয়তা, দুঃখ দুর্দশার কথা! পুজোর আয়োজনে আনন্দের এই উৎস বাপ্পিদার গান আর কোমড় দুলিয়ে নাচ।

উন্নাসিক অনেকেই বলেন বাপ্পি লাহিড়ীর গ্রহণযোগ্যতা নাকি শুধু খেটে খাওয়া নিম্নবিত্ত অশিক্ষিত মানুষগুলির মধ্যে। তিনি নাকি দেশবিদেশের হিট গান কপি করতেন। হতে পারে বা না হতেই পারে। অতশত জানি না। কিন্তু অন্যদেশের সুর এদেশের শ্রোতার ভালো লাগার মতো করে তৈরি করে উপহার দেওয়াটাও একটা শিল্প। সেই ভালোলাগার আবেশে ভাসতে কজনই বা পারে!
‘ইয়ার বিনা চ্যান কাঁহা রে’, ‘তাম্মা তম্মা লোগে’ … জলসার তথাকথিত ‘মাচা’ গান। এই জনপ্রিয় সুরের উপর নির্ভর করে রয়েছেন অসংখ্য গায়ক গায়িকা বা যন্ত্রীরা। ছোট আকারে হলেও এক অসংগঠিত অর্থনীতি চলেছে এই শিল্পের উপর ভরসা করে। এই শিল্পবৃত্তের জন্মদাতা বাপ্পি লাহিড়ী।
তবে, তথাকথিত এলিট ক্লাস, সংষ্কৃতিপ্রিয় বাঙালির যাপনে লারেলাপ্পা গানের জনক বাপ্পি লাহিড়ী। ফ্লিম ইন্ডাস্ট্রিতে আজও রিমিক্সে, রিক্রিয়েশনে নাম্বার ওয়ানে তাঁর লারেলাপ্পা গান।

কেন জানিনা, আজো মুড ভালো করতে বাপ্পি লাহিড়ীর গান ম্যাজিকের কাজ করে আমার কাছে। “প্যায়ার মাঙ্গা হ্যায় তুমহি সে না ইনকার করো’ — বাপ্পি লাহিড়ীর সুরে কিশোর কুমারের কন্ঠে গাওয়া এই গানটা ছিলো আমার কিশোরী বেলার সিগনেচার টিউন।
তাঁর সঙ্গীত পরিচালনায় বাংলা সিনেমার রোমান্টিক গানে যতটা শিল্প ছিলো, আবেদন ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি। ‘ওগো বধূ সুন্দরী’-র বেশ কয়েকটি গান এখনো জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। একসময় লতা মঙ্গেশকরের কন্ঠে “মঙ্গল দ্বীপ জ্বেলে” গানটি প্রার্থনা সঙ্গীতে পরিণত হয়েছিল। সুরকার হিসেবে এখানেই বাপ্পি লাহিড়ীর সার্থকতা।
তার বাংলা উচ্চারন আহামরি ছিল না কিন্তু ‘বলছি তোমার কানে কানে’ গানে প্রসেনজিতের গলার সঙ্গে বা ‘মালবিকা, অনামিকা’ গানে রঞ্জিত মল্লিকের গলার সঙ্গে নিজের গলাকে এক করে দিয়েছিলেন। বাপ্পি লাহিড়ীর গায়কি ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, একবারের একটা নিজস্ব স্টাইল।

তুনে মারি এন্ট্রিয়াঁ তো দিল মে বাজে ঘণ্টিয়াঁ
৯,০০০ এর বেশি গান তৈরি করেছেন বাপ্পি লাহিড়ী। ১৯৮৬ সালটা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। সেই বছর ৩৩টি ছবিতে ১৮০টি গান গেয়েছিলেন তিনি। ডিস্কো সংস্কৃতি বাপ্পি লাহিড়ী-ই প্রথম বলিউডে এনেছিলেন। ভারতীয় সংগীত আর ডিস্কোকে নিপুণভাবে একই সুরে বেঁধেছিলেন। ডিস্কো ড্যান্সার ছবির একটি ঘটনা বলি।
ডিস্কো ডান্সার ছবির “ইয়াদ আ রাহা হ্যায়” গানটি এইচএমভি-র স্টুডিওয় রেকর্ড হওয়ার কথা ছিল। তখন দুটো ট্রাক ছিল — মিউজিক ট্রাক আর সাউন্ড ট্র্যাক। এইচএমভির স্টুডিও তখন কাফ প্যারেডে বিল্ডিং-এর তিনতলায় স্টুডিও। গানটি গাওয়ার কথা ছিল কিশোর কুমারের। সেই সময় কিশোরকুমারের হার্টের সমস্যা ধরা পড়ে যার জন্য তার সিঁড়ি ভাঙ্গা বারণ ছিল। দুর্ভাগ্যবশত সেদিন লিফ্ট খারাপ হয়ে পরায় স্টুডিওতে পৌঁছতে পারেন না কিশোরকুমার। চিত্র পরিচালক বক্কর সুভাষকে ডেকে বলেন ,গানটা রেকর্ড করে নিতে, পরে তিনি দু-তিন দিন পর ডাব করে নেবেন। বাপি লাহিড়ী সেদিন গানটি গেয়েছিলেন। শুধু গিয়েছিলেন বলা ভুল, অসাধারণ গেয়েছিলেন। কিশোরকুমার বাপ্পি লাহিড়ীকে সন্তানের মত স্নেহ করতেন। গানটি শোনার পর বাপি লাহিড়ীর কন্ঠে গানটি রাখতে বললেন কিশোরকুমার। হিন্দি ছবির সেরা গানগুলোর মধ্যে এটি একটি।

গত চার দশক ধরে একের পর এক সুপারহিট গান উপহার দিয়ে গেছেন এই শিল্পী। তথ্য ঘাঁটলে দেখা গেলো ১৯৮৬ সালে বাপ্পি লাহিড়ীর শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার এ ভূষিত হন। ৬৩ তম ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড জিতেছিলেন বাপ্পিদা। কিন্তু এইটুকুই প্রাপ্তি!!
তবে পুরস্কারের ঝুলি ভরিয়ে দিয়েছে তাঁর গুণমুগ্ধ ভক্তরা। ইউটিউবে “তু নে মারি এন্ট্রিয়া” গানের ২০ কোটির ভিউ বুঝিয়ে দিল ১৯৮২ হোক বা ২০১২ — কোন গানের মন্ত্রে শ্রোতা আপ্লুত, তাঁর চেয়ে ভালো আর কেউ বোঝে না।
এ বছরের ১৫ ই ফেব্রুয়ারি অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিরঘুমের দেশে চলে যান ‘ডিস্কো কিং’ বাপ্পি লাহিড়ী। আজ তাঁর ৭০ তম জন্মদিন। সোনার গহনা পরতে ভালোবাসতেন মানুষটি। সোনার কণ্ঠের মতো, তাঁর হৃদয়টিও ছিলো সোনার। সোনার মতো মূল্যবান তাঁর সৃষ্টি চিরকাল আমাদের হৃদয়ে একটাই সুর তুলবে “কভি আলবিদা না কহে না”।
আমার অন্যতম ভালো লাগার গায়ক,,, ভালো লিখেছেন????????????
অনেক ধন্যবাদ ????
খুবই ভালো লেখা
থ্যাংক ইউ
অসাধারণ সব তত্ব পেলাম, ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন, আর এমন সব সুন্দর জিনিস উপহার দেবেন
অনেক ধন্যবাদ।