অন্যান্য অঞ্চলের কথা বলতে পারব না, পশ্চিমবাংলার কেক রাজত্ব দুটি থাকবন্দীতে নিবদ্ধ এক ধরণের কেক ভদ্রবিত্তিয় সমাজের চাহিদার কথা ভেবে তৈরি হয়। সাজানোগোজানো, কেতা দুরস্ত, উপনিবেশিক অভিজাত্যের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলে; মূলত বাংলায় রাজধানী চালিয়ে যাওয়া ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কৃষ্টি অনুসরণ করে তৈরি হয় ফ্রুট কেক বা বাহারি ক্রিম কেক। এই সব কেক পাউন্ডপ্রতি কয়েকশ টাকায় প্রাতিষ্ঠানিক কেক দোকানে বিক্রি হয় মূলত উৎসবে উপহারে এবং বিশেষ করে খ্রিষ্টমাস উৎসবে। অন্য কেকটি স্রেফ জনগণীয়, ফুটপাথিয়, দামে, ভারে, গন্ধে, সাজসজ্জায় তীব্রতম নিম্নমধ্যবিত্তিয়। সাধারণ মানুষের মতই অবাহারি, অদেখনদারি, সর্বোপরি খাদকের বটুয়া-বান্ধব; একে আমরা বলতে পারি টিফিন কেক বা গুরুগম্ভীর লব্জে বলা যায় পিপলস কেক, জনগণের রোজকার খাদ্য।
গত কাল পেজফোরনিউজের পাতায় আলোচনা করেছি অভিজাত নিউ মার্কেটিয় কেকের দোকান ইম্পিরিয়াল, রহমানস এবং ভারত; আজ আলোচনা করব একান্তই জনগণের সাধ আর সাধ্যের মধ্যে থাকা বাপুজি কেকের কথা। সাংবাদিকতাকালেই আমার সুস্বাদু বাপুজী কেকের সঙ্গে পরিচয়। রাস্তায় রাস্তায় ঘোরা আর ফুটে চায়ের সঙ্গে লেড়ো বিস্কুট এবং/অথবা বাপুজী কেক নিত্য খিদে মারার অবধারিত সঙ্গী ছিল। কিছু দিনের মধ্যেই হকার ইউনিয়নের হোলটাইমারির জীবন শুরু। তখন আন্দাজ করতে পারলাম বাপুজীর জনপ্রিয়তা। ২৫ বছর পরেও সেই জনপ্রিয়তার একটুও ভাটার টান লক্ষ্য করছি না, বরং নিজস্বতা অবলম্বন করে তার চাহিদা উত্তরোত্তর ক্রমবর্ধমান।

মাখন কাগজের মোড়কে গোলাকার NHB অক্ষর তিনটে বাপুজী কেকের অবিসংবাদী পরিচয়। NHB ওরফে ‘নিউ হওড়া বেকারি বাপুজী প্রাইভেট লিমিটেড-এর যাত্রা শুরু ১৯৭৩-এর রাষ্ট্রবিপ্লব চলাকালীন হাওড়ায়। নতুন উদ্যমী আলোকেশ জানার হাত ধরে। বাপুজী নামটার জন্ম দিয়েছিলেন আলোকেশবাবু সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রবণতা থেকে হটকে গান্ধীজীর জনআন্দোলনের অনুপ্রেরণায়। কেকের চরিত্রও তাই জুড়লেন— জনগণীয়। কয়েক বছর বেকারির কাজে হাত পাকিয়ে হাওড়ার পল্লবপুকুরে চলা শুরু হল প্রথম কারখানার। কেকের উৎপাদন বাজারে আসামাত্রই জনসাধারণের মন জয় করে নিল বাপুজী। এর পরে অলকেশবাবুকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয় নি। চাহিদা বাড়তে থাকায় হাওড়ার পরে কারখানা তৈরি হল কলকাতার লেকটাউনে, তারপরে হুগলির শ্রীরামপুরে। ততদিনে আক্ষরিক অর্থে দক্ষিণ বাংলার দৈনন্দিনের জনজীবনে বাপুজী পাকাভাবে ঠাঁই করে নিয়েছে। বর্তমানে বাপুজী কেকের হাল ধরেছেন অলকেশবাবুর পরবর্তী প্রজন্ম দুই পুত্র অমিতাভ জানা এবং অনিমেষ জানা। তারাও পূর্ববর্তী প্রজন্মের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে এগিয়ে নিয়ে চললেন ব্রান্ডের মহিমাকে। কেকের সঙ্গে সঙ্গে বাজারে এল বেশ কিছু হাতে তৈরি বিস্কুট এবং পাঁউরুটিও। প্রতিষ্ঠার ৫০ বছরের মাথায় দৈনিক ৫০ হাজার মানুষের উদরপূর্তি করে বাপুজীর টিফিন কেক। বাঙালির ব্যবসা ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বাপুজী টিফিন কেক।

ফ্রুট কেকের একটা বর্গ টিফিন কেক হলেও টিফিন কেকের ধারণা বহু আগে থেকেই বর্তমান; কিন্তু আটের দশক থেকে কলকাতা এবং শহরতলীর নানান এলাকায়, অদম্য প্রচেষ্টায় টিফিন কেকের একটা নির্দিষ্ট বাজার তৈরি করে দিল বাপুজী কেকের রঙিন মোড়ক, অনির্বচনীয় স্বাদ আর অসামান্য গুণমান। টিফিন কেক এমন একটা কেক, যা খিদে পেলেই চায়ের সঙ্গে অনুপান হিসেবে অথবা পকেটের রেস্তর কথা না ভেবেই খালি মুখে কিছুক্ষণের জন্যে উদরপূর্তি করা যায়; বা নির্ভয়ে সকালে বিদ্যালয়ে যাওয়া বাচ্চাটির হাতে তুলে দেওয়া যায়। বাপুজীর বাজার সাফল্য আরও বহু উদ্যমীকে পথ দেখাল— পথ বেয়ে বাজারে এল আরও বেশ কিছু টিফিন কেকের ব্রান্ড। সকলের লক্ষ্য পাড়ার দোকান। গত কয়েক বছরে বাজারে এসেগেছে কর্পোরেট বেকারিগুলোর রংচঙে কাগজে মোড়া বাহারি স্বাদ আর গন্ধের নানান ধরণের টিফিন কেকের সম্ভার। তারাও বাপুজীর তৈরি করা বাজারের ভাগ পেতে চায়। কিন্তু পাইওনিয়ারের মর্যাদাই আলাদা। তারা বাজারে আসার আগেই বাবুজী টিফিন কেকের বাজারে থেকে যাওয়ার প্রতিশ্রুতিময় বাঙালি ব্রান্ড হয়ে উঠেছিল, প্রতিযোগীদের পক্ষে তাকে সহজে বাজার থেকে হঠিয়ে দেওয়া বেশ কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়াল। আপাতত বাপুজি ব্রান্ডে বাজারে চলছে দুধরণের টিফিন কেক— একটি লাল মোড়কে, অন্যটি সবুজ মোড়কে দুটোই ডিম দেওয়া কেক।ডিম ছাড়া কেক বাজারে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হচ্ছে— বললেন অমিতাভ জানা। প্রত্যেকটি কেকের ওজন ৬০/৭০ গ্রামের আশেপাশে। দাম ৫টাকা আর ৬টাকা।

মাথায় রাখতে হবে মোড়কওয়ালা বাপুজীর মূল লড়াই পাড়ার আর ফুটের দোকানগুলোয় মোড়ক ছাড়া বিক্রি হওয়া স্লাইস কেকের সঙ্গে। এই প্রাইস সেন্সিটিভ বাজারে বাপুজীকে প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে টক্কর করেই পণ্য বিক্রি করতে হয়। মোড়ক ছাড়া কেকগুলো মূলত আঞ্চলিক বেকারিজাত, কম দামি। বাপুজীর উদ্যমীরা প্রাথমিকভাবে দাম কম রেখে কীভাবে মূল পণ্যের গুণমান নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে নজর দেন। আজও এই বিশ্বায়নের গলাকাটা বাজারে বাপুজীর ফ্রুট কেক খেটে খাওয়া প্রলেতারিয়েত থেকে ইস্কুলে যাওয়া শিশু পড়ুয়ার সকাল বিকেলের খাওয়ার নিত্য সঙ্গী।
তাছাড়া আমরা যারা কারিগরি ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা করি, ডিপগ্রিন প্রযুক্তির কথা বলি, তাদের কাছে বাপুজীর অন্যতম আবেদন হল তার প্রকৃতি নির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা। প্রথমেই বলতে হয় মাখন কাগজের মোড়ক। বিখ্যাত বহু বিজ্ঞাপিত টিফিন কেক মোড়া হয় বাতাস নিরোধী প্লাস্টিকের ঠোঙ্গায় তার শেলফ লাইফ বাড়াতে। কর্পোরেটরা কেকের যে মিশ্রণ তৈরি করেন তাতে অবধারিতভাবে রাসায়নিক প্রিজার্ভেটিভ মেশাতে হয়। বাপুজীর কেকে সেই বালাই নেই। কর্তৃপক্ষ জানেন দোকানে জনপ্রিয়তম বাপুজীর অবস্থিতি মাত্র হাতে গোনা দিনের। বাপুজী কেকের চকচকে দোকানে রেখে শেলফ লাইফ বাড়াবার দায় নেই— ফলে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি বসিয়ে হাওয়া বাতাস আটকানো আর হালকা করার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টার প্রয়োজন নেই। গ্রাহক জানেন বাপুজীর যে কেকটা তিনি খাচ্ছেন তাতে রাসায়নিক প্রিজার্ভেটিভের উপস্থিতি নগণ্য। বাপুজী কেক আজও যে কোনও কেকের তুলনায় স্বাস্থ্যকর। এখনও বাপুজী কেক প্রস্তুতির সময় কাঠের জ্বালানির ব্যবহার করা হয়। এতে উৎপাদনের উপকরণের পুষ্টিগুণ নষ্ট হয় না, আর ক্ষতিকারক জীবানুও জন্মাতে পারে না। ফলে কর্পোরেটের ৫টাকায় ২০ গ্রামের রাসায়নিক কেকের তুলনায় বাপুজীর ৬ টাকায় ৬০/৭০ গ্রামের কেক অনেক বেশি উপযোগী এবং স্বাস্থ্যসম্মত।

৫০ বছর জাতির জীবনে খুব বড় সময় না হলেও আমরা যারা বাপুজী কেকের সমসাময়িক প্রজন্ম, এবং বাংলার অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসা বিষয়ক গবেষক, তাদের কাছে দীর্ঘ ৫ দশক ধরে কোনও একটি ব্যবসায়িক উদ্যম সফলভাবে টিকে থাকা একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আর কয়েক বছরের মধ্যেই বাপুজী কেক প্রতিষ্ঠান, ‘নিউ হওড়া বেকারি বাপুজী প্রাইভেট লিমিটেডএর ৫০ বছর পূর্ণ হবে। জনগণের কেকের অন্যতম রূপকার বাপুজীর হাত ধরে জনগণের স্বাস্থ্যকর টিফিন করার ৫০ বছর পূর্ণ হওয়ার অনুষ্ঠানের প্রতি আগাম শুভেচ্ছা জানানো গেল।
Good post.
দারুণ সুন্দর তথ্যসমৃদ্ধ প্রতিবেদন।
BAPUJI CAKE is best ,best and best cake in the world . I loving ❤ eat ????
আরেকটি কেক ছিল Phillips bakery র।বাপুজীর সম মানের।ওটি কেন উঠে গ্যালো বলতে পারবেন?
আমি তো রোজ খাই ।বাঙালির জীবনে বাপু কতটা আছেন জানিনা, তবে বাপুজী বহাল তবিয়তেই আছে
কলেজ কালে খুব খেয়েছি