প্রায় ১৫০ বছর আগের কথা। বাংলায় প্লেগ মহামারির আগেই বর্ধমান জেলায় হয়েছিল এক মারণরোগ। সেও এক মহামারি। সেই জ্বরের নাম দেওয়া হয়েছিল বর্ধমান ফিভার। ১৮৭১ সালে লক্ষ্মীমণি দেবী ‘বামাবোধিনী’ পত্রিকায় এই মহামারিকে কেন্দ্র করে একটি কবিতাও লিখেছিলেন। ১৩০৫ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ ‘অনুসন্ধান’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে সেই সময়কার ভয়াবহতা সম্বন্ধে জানা যায়। এমনকি সেই সময়ে কোয়ারেন্টাইনও জারি হয়েছিল।
একটি পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ১৮৬৯ সালে বর্ধমানের জনসংখ্যা ছিল ৪৬,০০০। ১৮৭২ সালে তা কমে হয় ৩২,৬৮৭। কাটোয়ার একটি এলাকার পরিসংখ্যান বলছে সেই সময় কাটোয়ার ১৮টি গ্রাম এই মহামারিতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছিল। এই১৮টি গ্রামের জনসংখ্যা ছিল ১৪,৯৮২। তার মধ্য়ে ৬,২৪৩ জনের মত্যু হয় শুধু বর্ধমান ফিভারে। তারমানে ১৮টি গ্রামের প্রায় ৪২ শতাংশ মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ১৮৭৪ সালে প্রকাশিত ‘ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল গেজেট’ ওই মহামারিকে ‘বর্ধমান জ্বর’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছিল, যা আদতে ম্যালেরিয়া বলে খ্যাত ছিল। ব্রিটিশ শাসকের নথিপত্রে রোগটি পরিচিত পেল, ‘বার্ডওয়ান ফিভার’ নামে। বর্ধমানের তৎকালীন সিভিল সার্জেন মেজর জে.জি. ফ্রেঞ্চ অবশ্য তাঁর রিপোর্টে মন্তব্য করেছিলেন, ‘Calling fever by the name of the place in which it is raging is certainly objectionable.’
১৮৭২ সালের ২৮ জুন বর্ধমানের পরবর্তী জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সি টি মেটকাফ যে রিপোর্ট পেশ করেন তাতে এই ফিভারের ভয়াবহতার চিত্রটি আরও পরিষ্কার হয়ে পরে—’সরকারি অফিসগুলিতে কেরানি, আমলা, আর্দালি, চাপরাশি থেকে শুরু করে পদস্থ আধিকারিকরাও জ্বরে শয্যাশায়ী। কর্মীর অভাবে সব দপ্তর খাঁ-খাঁ। একজন-দুজনকে যদিও বা দেখা যায় তাদের চেহারা শীর্ণ, রক্তশূণ্য। জেল হাসপাতালে কয়েদি-রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। জ্বরেই মৃত্যু হয় ইউরোপীয় মহিলা গিসবার্ণের। তাঁর স্বামীর অবস্থাও মরণাপন্ন। জেলার স্বাস্থ্য পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে সিভিল সার্জন ছুটির গরখাস্ত করে বিদায় নিলেন। বর্ধমান ছেড়ে চলে গেলেন ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে কোম্পানির কর্মীরাও। অফিসে কর্মী নেই, গৃহ ভৃত্য-শূন্য, পুরসভার ঝাড়ুদার ও সাফাই কর্মী অমিল। অবস্থা এমন, যে পুলিস কনস্টেবলের পাহারায় আসামীকে পাঠানো হচ্ছে, সেই আসামীই হঠাৎ জ্বরের ঘোরে মূর্চ্ছা যাওয়া সিপাইয়ের পরিচর্যায় ব্যস্ত।’

২
ডাক্তার গঙ্গানারায়ণের কথা শুনে অবাক বিদ্যাসাগর। এ কেমন প্রস্তাব! ম্যালেরিয়ার রুগীর একমাত্র ওষুধ কুইনাইন। তা না দিয়ে সিঙ্কোনা দিয়ে রুগীর চিকিৎসা হবে কী করে? গঙ্গানারায়ণের পরামর্শ শুনে অসন্তুষ্ট বিদ্যাসাগর বললেন, ‘গরীবের রোগ বলে প্রকৃত ওষুধ ব্যবহার করবে না; এও কখনো হয়? দুঃখী, ধনী সবারই প্রাণ তো এক, পরন্তু রোগও এক যখন।’
বর্ধমান ও হুগলি তে ম্যালেরিয়া জ্বরে আক্রান্ত হাজার হাজার। রুগীর সংখ্যা বাড়ছে প্রতিদিন। কোথায় পথ্য, কোথায় ওষুধ। কেই বা এতো যোগান দেবে। পথ্য যদিবা মেলে ওষুধ কই! গঙ্গানারায়ণ মিত্র বিদ্যাসাগরকে বললেন, কুইনাইন পাওয়া যাচ্ছেনা। দামও আয়ত্তের বাইরে। রুগীদের কুইনাইন এর বদলে সিঙ্কোনা দেওয়া হোক। যদি এতে কিছু কাজ হয়। গঙ্গানারায়ণ বিদ্যাসাগরের দাতব্য চিকিৎসালয় এর দায়িত্বে। বিদ্যাসাগরের অভিন্নহৃদয় বন্ধু প্যারীচাঁদ মিত্রের ভাইপো গঙ্গানারায়ণ। বর্ধমান জ্বরের মোকাবিলায় বিদ্যাসাগরের সঙ্গে প্রানপাত করছেন। কিন্তু কি করবেন গঙ্গানারায়ণ। তারও যে ক্ষমতা সীমিত। গঙ্গানারায়ণ জানেন সিঙ্কোনা ম্যালেরিয়া প্রতিরোধের উপাদান, এ কোন ওষুধ না। বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু যদি ঠেকানা যায় তাই তিনি বিদ্যাসাগরকে এই প্রস্তাব দিয়েছেন। আর বিদ্যাসাগর তাঁকে ভর্ৎসনা করছেন।
গঙ্গানারায়ণ বিদ্যাসাগরকে চিনতেন। তিনি জানতেন বিদ্যাসাগর কেমন মানুষ। বর্ধমান রাজের একান্ত সুহৃদ তিনি, কিন্তু এই সঙ্কটে তিনি রাজার প্রাসাদে নিরাপদে আশ্রয় না নিয়ে ছুটে এসেছেন সাধারণ মানুষের মধ্যে। বন্ধু প্যারীচাঁদ এর বারংবার অনুরোধ উপেক্ষা করে আলাদা বাড়ি ভাড়া করে রুগীদের সেবায় কাজে নেমেছেন। তিনি কুইনাইন এর অভাবে কাউকে মরতে দেবেন না। কেবল নামে নয়, কাজেও তিনি গরীবের ঈশ্বর।
সে সময় বর্ধমান এর আবহাওয়া ছিল স্বাস্থ্যোদ্ধারের উপযুক্ত স্থান। সময়, অর্থ ও কাজের চাপে যারা পশ্চিমের গিরিডি, মধুপুর যেতে পারতেন না তারা বর্ধমান যেতেন শরীরের অবস্থা ফেরাতে। উওরপাড়া থেকে ফেরার পথে গাড়ি উল্টে গেলে বিদ্যাসাগর আহত হন। তখন থেকেই তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়তে থাকে। বর্ধমান গিয়ে হৃত স্বাস্থ্য ফেরাবেন, এমন উদ্দেশ্য ছিল তাঁর। এই সময়েই বর্ধমানে দেখা দিল প্রাণঘাতী ম্যালেরিয়া। সময় ১৮৬৮-৬৯। বিভিন্ন সংবাদপত্রে বর্ধমানের ম্যালেরিয়ার খবর প্রকাশিত হতে দেখে তিনি চুপ করে বসে থাকতে পারলেন না। ছুটলেন সেখানে, আর্তের মাঝে। তিনি জানতেন, মুখে বলা কথা নয় কাজে করা। বিধবা বিবাহের সময় কবি ঈশ্বরগুপ্ত এই কথা বলেছিলেন। সেই ‘কাজে করা’ কথা তিনি ভোলেন নি। প্রাণের মায়া ত্যাগ করে বিদ্যাসাগর ছুটলেন বর্ধমান।
বর্ধমানের কালান্তক এই ম্যালেরিয়াকে বলা হচ্ছিল বর্ধমান জ্বর। হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত এই জ্বরে। অথচ বর্ধমানে এর আগে ম্যালেরিয়া কখনোই এত মারাত্মক আকার নেয়নি, যা বাংলার অন্যান্য অঞ্চলে দেখা যেত। জানা যায় এই রোগের উৎপত্তি যশোরের মহম্মদপুর গ্রাম সালটা ১৮২৪। ১৮২৫ সালে যশোরে ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব হয়। পরবর্তী ৪৪ বছর এর প্রকপ অব্যাহত থাকে। যশোর সংলগ্ন নদীয়া, বারাসতে এর তান্ডবে গ্রাম কে গ্রাম উজাড় হয়ে যায়। পরে ভাগীরথী নদী পার করে হুগলি ও বর্ধমানে ছড়িয়ে পড়ে ম্যালেরিয়া। তখন সামাজিক দূরত্ব কিংবা লকডাউনের ধারণা ছিলনা। সরকারের তরফেও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে কোন উদ্যোগ ছিলনা। সেকারণে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এর সংক্রমণ। বর্ধমানে এর প্রভাব পড়ে সবচেয়ে বেশী। রোগ ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত, রোগে ত্রাহি ত্রাহি রব, অথচ চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা নেই। কলকাতার সংবাদপত্রে মৃত্যুর খবর আসছে, আক্রান্ত বহু মানুষ, সরকার প্রায় উদাসীন।
বিদ্যাসাগর ছুটে এলেন বর্ধমান। আলাদা বাড়ি নিয়ে তিনি ডিসপেনসারি খুললেন। সাধ্যমতো শুরু করলেন রুগীদের চিকিৎসা। সঙ্গে প্যারীচাঁদের ভাইপো ডাক্তার গঙ্গানারায়ণ। সরকারি সাহায্য বলতে কিচ্ছু নেই। জানতে পারলেন স্থানীয় সিভিল সার্জেন ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে কোন ব্যবস্থাই নিচ্ছেন না। কলকাতায় সরকারি মহলে অভিযোগ করলেন বিদ্যাসাগর। কিন্তু তিনি জানতেন এতে কাজ হবেনা। তিনি নিজে এলেন কলকাতায়। দেখা করলেন বাংলার ছোটলাট উইলিয়াম গ্রে সাহেবের সঙ্গে। দাবি একটাই— সরকার কিছু একটা করুক। হাজার হাজার মানুষকে বিনা চিকিৎসায় মরতে দেওয়া যায় না। অভিযোগ করলেন সিভিল সার্জেনের নিষ্ক্রিয় ভূমিকার বিরুদ্ধে। সরকার উপযুক্ত পরিমান চিকিৎসক ও ওষুধ পাঠাক এক্ষুনি— গ্রে সাহেবকে জানালেন বিদ্যাসাগর।
গ্রে’র আশ্বাস পেয়ে বিদ্যাসাগর কলকাতায় বসে থাকলেন না। ফের চলে এলেন বর্ধমান। শুরু হল ভাড়া বাড়িতে বিদ্যাসাগরের নিজের ডিসপেনসারির কাজ। ম্যালেরিয়া আক্রান্ত মানুষকে ওষুধ, পথ্য, প্রয়োজনে পোশাক দিয়ে সাহায্য করতে লাগলেন। যারা অশক্ত, দুর্বল তাদের কাছে গিয়ে তিনি সেবা পৌঁছে দিতে থেকেন। যে কোন মুহূর্তে তিনি আক্রান্ত হতে পারেন, এমন চিন্তা তিনি আমল দেননি। কিন্তু সাধ আর সাধ্য এক নয়। কতজনকে তিনি সাহায্য করতে পারবেন! ম্যালেরিয়ার একমাত্র ওষুধ কুইনাইন অমিল। আর পাওয়া গেলেও দাম ধরাছোঁয়ার বাইরে। অসহায় গঙ্গানারায়ণ একারণেই বিদ্যাসাগরকে সিঙ্কোনার কথা বলেছিলেন।
যারা আক্রান্ত হয়নি তাদের অন্যত্র সরিয়ে রেখে তিনি রোগের ছোঁয়াচ থেকে বের করে আনার উদ্যোগ নেন। সংক্রমণ যাতে ছড়িয়ে না পরে সেদিকে তাঁর সতর্ক দৃষ্টি ছিল। বিদ্যাসাগর বুঝতে পেরেছিলেন ম্যালেরিয়া মহামারীর আকার নিলে চিকিৎসার সুযোগই পাওয়া যাবেনা। এই অভিজ্ঞতা তাঁর আগেই হয়েছিল যখন মেদিনীপুর ও হুগলি জেলায় ১৮৬৭ তে মন্বন্তর-এর মত পরিস্থিতি হয়। তাঁর নিজের গ্রাম বীরসিংহ ও অন্যত্র তিনি অন্নসত্রের ব্যবস্থা করেন। জাতি ধর্ম বর্ণের ভেদাভেদ না রেখে তিনি সকলের ভাত ডালের ব্যবস্থা করেছিলেন। বাংলার সরকার বিদ্যাসাগরের এই কাজের স্বীকৃতি জানিয়েছিল। বর্ধমান বিভাগের কমিশনার চিঠি দিয়ে বিদ্যাসাগরকে ‘সরকারের গভীর কৃতজ্ঞতা’ জানান।
বর্ধমান জ্বর একসময় প্রশমিত হয়, বর্ধমান অবশ্য ভাল জল হাওয়ার গৌরব হারায়। তৎকালীন সংবাদপত্রে বিদ্যাসাগরের সেবার কথা বারবার বলা হলেও তিনি নীরব থাকেন। কারণ বিদ্যাসাগর কোন প্রশংসা বা নিন্দার ধার ধারতেন না, যা ভাল মনে করতেন তাই করতেন। আর্তের, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানোকে তিনি মানুষের কাজ বলেই মনে করতেন। কেন তাঁর প্রশংসা হলনা বলে অভিযোগ করা, হিংস্র প্রতিক্রিয়া দেখানোকে তিনি মনুষ্যেতর কাজ বলে মনে করতেন।
নিন্দার /প্রশংসার/প্রচারের ধার না ধারার এই ঐতিহ্য বিদ্যাসাগরের সময়েও বিরল ছিল। অধুনা বিলুপ্ত। (আমার) অজানাকে জানানোর জন্য লেখককে কৃতজ্ঞতা জানাই।