| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ব্যক্তিত্বময়ী জ্ঞানদানন্দিনী দেবী : বারিদবরণ ঘোষ

Reporter
বারিদবরণ ঘোষ / ১২৭০ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ৭ জুলাই, ২০২২

পুরুষজাতির প্রাধান্য অদ্যপি আমাদের বাঙালি সমাজকে শাসন করে চলেছে, একথা অস্বীকারের জো নেই। নইলে নারীমুক্তির জন্য আন্দোলন এখনও এতো সোচ্চার কেন? কিন্তু জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি বাংলাদেশের মৃত্তিকাজাত হলেও এর কথা যেন স্বতন্ত্র। এই পরিবারের পুরুষ, মেয়ে এবং বধূরা মিলে বাংলাদেশে একটা স্বশাসিত সমাজ গড়ে তুলেছিলেন। সমসাময়িককালে বাংলাদেশের সার্বিক জাগৃতিতে এই ত্রিবেণী সংগমের নজির একান্ত বিরল। বেথুন বিদ্যালয় স্থাপিত হলে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠা কন্যা সৌদামিনীই প্রথম এই বিদ্যালয়ে পাঠ নিতে যান। প্রথম মহিলা উপন্যাসিকের জন্মদান এই পরিবারের ইতিহাসেই। আর অসূর্যস্পশ্যা নারীসমাজকে অবরোধমুক্ত করে নীলাকাশের নীচে সূর্যস্নান করানোর দুঃসাহসিকতাও এই পরিবারের অপর কীর্তি। আজকের দিনে রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে যে অধিকারের জন্য লালায়িত হতে হচ্ছে, অনেক আগেই নারীকে আপন ভাগ্য জয় করবার সে অধিকার অর্জিত হয়েছিল এই পরিবারের বধূ জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর দৃঢ়চিত্তের উদারতায়। অবশ্য একবৃন্তে দুটি ফুল—সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাধনাও সমরেখায় স্মরণ্য।

জ্ঞানদানন্দিনীর প্রথম পরিচয়—তিনি ঠাকুর পরিবারের বধূ, তাঁর দ্বিতীয় পরিচয় তিনি প্রথম ভারতীয় আই.সি.এস. সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পত্নী এবং তাঁর তৃতীয় পরিচয় তিনি রবীন্দ্রনাথের মেজবৌঠাকুরন। আসলে এই পরিচয় তিনটি বিচ্ছিন্ন করে দেখাই যায় না। তবুও তিনকোণা একটা কাঁচের এক একটা তল দিয়ে এই বর্ণবহুল জীবনটিকে দেখার লোভ সম্বরণ করতে পারছি না। আসলে দেখার ফাঁক যাতে না থেকে যায়, সেজন্য এপিঠ-ওপিঠ এবং ভিতরটাকে তন্নতন্ন করে দেখে নিতে চাইছি। ফলে আমাদের আলোচনাও হয়ে পড়েছে ত্রিস্তরী। আমি প্রথমে জ্ঞানদানন্দিনীকে পরিবারের বৃহত্তরতায়, পরে রবির কিরণে এবং সর্বশেষ সাহিত্যের আশ্রয়ে স্থাপন করেছি। আনাতোল ফ্রাঁসের মত বহু চক্ষুবিশিষ্ট মনের অধিকারী আমি নই। আমার দেখার ফাঁক দিয়ে তাঁকে আরও দেখার সুযোগও এই প্রবন্ধে আমি সানন্দে দিয়ে গেলাম।

দুই

ঠাকুরবাড়ির বেশিরভাগ বধূ এসেছেন যশোর থেকে। এর কারণ দুটো। পীরালি ব্রাহ্মণকে মেয়ে দেবার জন্যে সবাই প্রস্তুত থাকতেন না। দেবেন্দ্রনাথের পরিবার ছিল পীরালি শ্রেণীভুক্ত। যশোরে এঁদের একটা ‘করণ’ গড়ে উঠেছিল। আর যশোরের মেয়েদের সুন্দরী বলে একটা খ্যাতিও ছিল। বাড়ির বড় ছেলে দ্বিজেন্দ্রনাথের বউ সর্বসুন্দরী—যশোরের নরেন্দ্রপুরের তারাচাঁদ চক্রবর্তীর মেয়ে। ঐ গাঁয়ের অভয়াচরণ মুখোপাধ্যায়ের একমাত্র মেয়ে জ্ঞানদানন্দিনী দেবী এলেন দেবেন্দ্রনাথের মেজছেলের বৌ হয়ে। বাড়ির পুরনো দাসীরা আনলো কনে পছন্দ করে। বউ দেখতে শুনতে মন্দ নয়—ভরাট গড়ন, টানা বড় বড় চোখ, একরাশ চুল, টিকলো নাক। অষ্টমবর্ষে গৌরীদান হয়েছে। পেটে একেবারে বিদ্যে নেই এমন নয়। অক্ষর পরিচয়টা তো ভাল মতই হয়েছে। আর হাতের লেখাও মুক্তোর মত ঝরঝরে। তবে ভারী লাজুক। নিয়ম, আচার, লজ্জা আর ভীরুতা নিয়ে একটা মোমের পুতুল। কিন্তু মোমবাতি তো জ্বলেও আবার। তার তেজ তার কমনীয়তায় থাকে আবৃত।

সেটা বুঝতে পেরেছিলেন সেজ দেওর হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর। সেজন্যে এঁকে যত্নে শিক্ষিতা করে তোলায় প্রবল আগ্রহ দেখালেন। মাথায় কাপড় দিয়ে পড়তে বসতেন এই নবাগত বধূ। ঠাকুরপরিবারের এবং ভবিষ্যতের প্রথম ভারতীয় আই. সি. এস-এর পত্নীকে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। অন্তঃপুরে তখন স্ত্রীশিক্ষার একটা আয়োজন রীতিমত সোচ্চার। দেবেন্দ্রনাথ সিমলা পাহাড় থেকে ফিরে এসেছেন। মেয়েদের শিক্ষার প্রতি তাঁর দৃষ্টি যত্নশীল। বাঙালি খৃস্টান শিক্ষয়িত্রীর বন্দোবস্ত করেছেন মেয়েদের সুশিক্ষার জন্যে। পরে অন্দরমহলে স্ত্রীশিক্ষার কারণে এক অনাত্মীয পুরুষের ঘটেছে প্রবেশাধিকার। ইনি অযোধ্যানাথ পাকড়াশি। জ্ঞানদানন্দিনীকে এঁর কাছেও পড়তে হল। তবে হেমেন্দ্রনাথই তাঁর যথার্থ শিক্ষাগুরু। ধমকে দিলে চমকে উঠতেন বটে এই বৌদি, কিন্তু তাঁর যা কিছু বাংলা শিক্ষা তা এই সেজঠাকুরপোটির কাছে। এমনকি মাইকেলের কাব্য পর্যন্ত।

ইংরেজিটা তেমন বরদাস্ত হল না এখনও পর্যন্ত। অথচ সিভিল সার্ভিস উপাধিধারী স্বামীর বধূ। কর্মস্থল তাঁর সুদূর বোম্বাই প্রদেশ। স্বামীর কাছে ঘর করতে যেতে হল। অসামান্য সামর্থ্যবলে স্বামীর উপযুক্ত হবার সাধনায় হলেন একাগ্র। শিখলেন ইংরেজি। কতখানি? একটু ধৈর্য ধরুন, পরে জানবেন। আচ্ছা আমাদের মেয়েদের কজন শেলি, টেনিসন, টমাস মুরের কবিতা আত্মস্থ করেছেন?

এই ‘অল্প শেখা’ বিদ্যে নিয়ে বিলেত পাড়ি দিলেন একা। একটু মিথ্যা কথা বলেছি। দুটি সাহসী সঙ্গীও ছিল—বছর ছয়েকের এক পুত্র এবং বছর চারেকের এক কন্যা। একটা ভৃত্যও অবশ্য সঙ্গে ছিল। ১৮৭৭-৭৮ সালের কথা। জাহাজঘাটায় আত্মীয় জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুর এসেছিলেন তাঁদের নামিয়ে নিতে। জ্ঞানদাকে একা আসতে দেখে বিস্মিত কণ্ঠে বলে উঠেছিলেন—“সত্যন্দ্রনাথ এ কি করলেন? নিজে সঙ্গে এলেন না?”

সত্যেন্দ্র কী শুধু এইটুকুই করলেন? আরও করবেন না?

আর এতে এতো বিস্ময়েরই বা কী আছে। বিলেতে গিয়ে সত্যেন্দ্রনাথ অবরোধ প্রথারুদ্ধ ভারতীয় নারীর যন্ত্রণা অনুভব করতে পেরেছিলেন। তাঁর আদরের ‘ভাই বজিনি’কে ১৬ নভেম্বর ১৮৬৩ তারিখে এক চিঠিতে সত্যেন্দ্রনাথ লিখছেন—‘এখানকার জনসমাজের যাহা কিছু সৌভাগ্য, যাহা কিছু উন্নতি, যাহা কিছু সাধুসুন্দর প্রশংসনীয়—স্ত্রী লোকেদের সৌভাগ্যই তাহার মূল। আমাদের দেশে এইরূপ সৌভাগ্য কবে হইবে? যেখানে স্ত্রীলোকদের কোন বিষয়েই কর্তৃত্ব নাই, যেখানে দেশাচার, ভর্তার আদেশ ও পরের বাক্যই তাহাদের জীবনের নিয়ম, সেখান হইতে স্ত্রীসৌভাগ্য এখনও অনেক দূর। স্ত্রীলোক জীবনউদ্যানের পুষ্প—তাহাদের বায়ু ও আলোক হইতে লইয়া কেবল ঘরের মধ্যে শীর্ণ ও বিশীর্ণ করিয়া রাখিলে কি মঙ্গলের সম্ভাবনা। এদেশে সর্বদাই আমার এই প্রকার মনে হয়। আমার ইচ্ছা তুমি আমাদের স্ত্রীলোকের দৃষ্টান্ত স্বরূপ হইবে, কিন্তু তোমার আপনার উপরেই তাহার অনেক নির্ভর।’ (এই অংশটুকু বিবাহিত পাঠিকার পড়া উচিত হবে কি—বর্তমান লেখক)। বার বার এজন্য সত্যেন্দ্রনাথ পিতাকে চিঠি লিখেছেন, জ্ঞানদানন্দিনীকে বিলেত পাঠিয়ে দিন। কিছু ইচ্ছা তো অপূর্ণ থেকেই যায়। ইচ্ছাপূরণ হয়নি বিলেত যাবার আগে বোম্বাই যাবার সময়েও। স্ত্রীকে পাল্কির অবরোধের মধ্যেই জাহাজে উঠতে হয়েছিল। বাড়ির বউ পায়ে হেঁটে জাহাজে উঠবে প্রকাশ্যে?—ধরাতল রসাতলে যাবে না?

কিন্তু দেশে ফিরে এলেন যখন, তখন গায়ে নতুন হাওয়া। পাল্কির চতুষ্কোণে তাকে আবদ্ধ করে রাখা যায় না। সুতরাং ঘরের বৌ মেমসাহেবের মত গাড়ি থেকে নেমে এলেন হাঁটা পায়ে সদরে। ঠাকুরপরিবারের অন্দরমহলের সমবেত অস্ফুট ক্রন্দন তাঁকে অভ্যর্থনা করল। একী হলো গো? স্বগৃহে একঘরে হয়ে রইলেন মেজছেলে আর তার বৌ। ছায়া মাড়ালেও প্রায়শ্চিত্তি!

সত্যেন্দ্রনাথ কি বাড়াবাড়ি আরম্ভ করলেন! জ্ঞানদানন্দিনীকে নিয়ে গভর্নর-জেনারেলের হাউসের মজলিসে যাবার কী এমন তাড়া পড়েছিল? ‘ইতিপূর্বে কোন হিন্দুরমণী গভর্ণমেন্ট হাউসে যান নাই। তাঁহার অন্যরকম সভ্য-পরিচ্ছদ পরিধান পূর্বক গমন করিলে ভাল হইত।’ এমন সমালোচনা তো হবেই। আর সত্যেন্দ্রনাথ আহ্লাদে আটখানা হয়ে লিখছেন—‘শত শত ইংরাজ মহিলার মাঝখানে আমার স্ত্রী—সেখানে একটিমাত্র বঙ্গবালা…’। সভায় উপস্থিত প্রসন্নকুমার ঠাকুরের কান-মাথা গরম হয়ে উঠল রাগে-দুঃখে-লজ্জায়। ঘরের বউ প্রকাশ্য রাজসভায়! অব্রহ্মণ্যম্ অব্রহ্মণ্যম্ —দৌড়ে পালিয়ে গিয়ে আভিজাত্য বাঁচালেন তিনি।

শেষে সব উল্টেপাল্টে গেল। জ্ঞানদানন্দিনী একাকিনী বিলেত গেলেন। ‘সত্যেন্দ্র একি করলেন?’

আমরা ভাবছি বিলেত গিয়ে জ্ঞানদানন্দিনীর নতিজের একশেষ হয়েছিল। মোটেই তা নয়। বোম্বাইতে থাকতেই ইংরেজি বিদ্যেটা বেশ রপ্ত হয়ে গেছিল। অমন যে সতেরো বছরের ব্যাটাছেলে রবীন্দ্রনাথ বিলেত গেলেন, অথচ ‘হাবুডুবু’ খেলেন না তার কারণ রবীন্দ্রনাথের ভাষায়—‘তাহার আশ্রয়ে গিয়া বিদেশের প্রথম ধাক্কাটা আর গায়ে লাগিল না।…বউঠাকুরাণীর যত্নে এবং ছেলেদের বিচিত্র উৎপাত-উপদ্রবে আনন্দে দিন বেশ কাটিতে লাগিল।’

আমাদের মহিলাটি বেশ ফরোয়ার্ড। একালের তুলনাতেও সম্ভবত। ব্রাইটন থেকে জ্ঞানদা গেলেন ডেভনশিয়রে টার্কিনগরে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, এখানে ‘বউঠাকুরাণী যখন…ডাক দিলেন তখন আনন্দে সেখানে দৌড় দিলাম। সেখানে পাহাড়ে, সমুদ্রে ফুল বিছানো প্রান্তরে, পাইন বনের ছায়ায় আমার দুইটি লীলাচঞ্চল শিশু সঙ্গীকে লইয়া কী সুখে কাটিয়াছিল বলিতে পারি না।’

তারপর প্রত্যাবর্তন, অবগুণ্ঠন উন্মোচন এবং গড়ের মাঠে সফেন সমুদ্রের উত্তালতা। অশ্বখুরের ঘর্ষণে অবরোধের উড়নি গেল উড়ে। সেই উড়ন্ত দুরন্ত হাওয়ায় সেদিনও কি ধিক্কার-বাণী উচ্চারিত হয়নি—‘সত্যেন্দ্র-জ্ঞানদা একী করলেন’?

অবশ্য হয়েছিল। এ আশঙ্কা অনেক আগেই জননী সারদা দেবী করেছিলেন—‘তুই মেয়েদের নিয়ে মেমদের মত গড়ের মাঠে বেড়াতে যাবি নাকি?’ সেই আশঙ্কা সত্যে পরিণত করলেন সত্যেন্দ্রনাথ। তামাশা দেখবার জন্য লোকেরা জমালো ভীড়। কিন্তু হাওয়া বড়ো ছোঁয়াচে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথও একদিন স্ত্রীকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন গড়ের মাঠের স্বাস্থ্যকর বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে। একটা জিজ্ঞাসা আমাকে গ্রাস করছে। সত্যেন্দ্রনাথ কি এই বিলিতিয়ানা আমদানি করলেন বিলেত থেকে? অথবা…। সত্যেন্দ্রনাথকে প্রশ্ন করা যাচ্ছে না এখন। অবশ্য উত্তরটা তৈরি আছে তাঁর বিলেত থেকে লেখা ‘ভাই বিজনি’কে দেওয়া একটা চিঠিতে। এর অংশ বিশেষও উদ্ধার করবো না, মন্তব্যও করবো না। কেবল এই প্রবন্ধে কিছু আগে এই চিঠির যেটুকু উদ্ধার করেছি, একটু কষ্ট করে উল্টে সেটুকু পড়ে নিন।

তিন

স্বভাবতই সন্দেহ জাগে, এমন বউ কি শ্বশুর ঘর করবে আর? এমন স্বাধীনভর্তৃকা আর নিলাজা! তা বাড়াবাড়ি জ্ঞানদার সবতাতেই। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে এসে সত্যেন্দ্রনাথ থাকতেন না। দক্ষিণ কলিকাতায় কখনও পার্কস্ট্রীটে, কখনও উড্ স্ট্রীটে অথবা বির্জিতলায় অথবা অন্য কোথাও বিশাল বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকতেন তিনি। একটু স্বাধীনতালোভী মানুষের মত স্ব-তন্ত্রে স্বতন্ত্র। সত্যেন্দ্রনাথ থাকতেন, বলাটা শতকরা একশো ঠিক হবে না। তিনি থাকতেন দূর বোম্বাই প্রদেশে কর্মব্যপদেশে। জ্ঞানদানন্দিনী একাকী থাকতেন পুত্রকন্যাদের উপযুক্ত শিক্ষার্থে কলকাতায়। ছেলে পড়তো সেন্ট জেভিয়ার্সে, মেয়ে লরেটো কনভেন্ট। ঠাকুর পরিবারে এমন সাহেবী কেতায় এর আগে কোনও ছেলেমেয়ে মানুষ হয়নি। এই ছেলেকে নিয়েও জ্ঞানদানন্দিনীর বাড়াবাড়ির একশেষ। বিয়ে দেবেন ছেলের, সুন্দর কনে চাই, সেই নিয়ে তল্লাসীর অবধি নেই। সুন্দর কনে দেখলে ঘরে পর্যন্ত এনে রেখে দিতেন। ছেলে বড়ো হয়েছে, অথচ চোখের আড়াল হতে দেবেন না। এমনিতে এতো উদার আর সাহসী, কিন্তু তাই বলে সুরেন একা বিলেত যাবে প্রথম যৌবনে? মায়ের বুক গুরগুর করে ওঠে। ছেলেদের নিয়ে গর্বের অবধি ছিল না তাঁর। বিদেশি মতে আনুষ্ঠানিকভাবে সন্তানদের জন্মদিন পালনের সূচনা আপন পরিবারে তিনিই প্রথম করেন। কিন্তু এর পরিধি বিস্তৃত হয়েছিল দু-পুত্র-কন্যার সীমা থেকে পরিবারের বৃহৎ পরিধি পর্যন্ত। সবাইকে নিয়ে ভূরিভোজন তো হতোই। আরো যা হোত, তাকেও কি বাড়াবাড়ি বলব? পুত্র সুরেন্দ্রনাথের জন্ম হয়েছিল বর্ষাকালে—সুতরাং বাড়ীর চাকরবাকররা প্রত্যেকে পাক একটা করে ছাতা। আর পাক একটা করে কম্বল শীতকালে, কারণ ইন্দিরার জন্ম শীতকালে—পরের দুঃখ দূর না হলে পরে/আনন্দ তার আপনারি ভার/সইবে কেমন করে?

এই মঙ্গল-ইচ্ছা সমগ্র ঠাকুর পরিবারের বৃহত্ত্বেও বিস্তৃত হয়েছিল স্বচ্ছন্দে। বাড়ির শিশুরা অবলীলাক্রমে তাঁদের অন্তরের প্রার্থিত সঙ্গীটিকে খুঁজে পেয়েছিল তাঁর আন্তরিকতায়। বলেন্দ্রনাথের বিয়ে হবে, তার আয়োজন করবে কে?—না, প্রফুল্লময়ীর মেজদি। কলকাতায় প্রথম প্রদর্শনীর প্রচলন হয়েছে—বাড়ির মেয়ে-বৌদের কে নিয়ে যাবে? নতুন বৌ মৃণালিনী দেবীকে বাসন্তী রঙের জমিতে লাল ফিতের উপর জরির কাজ করা পাড় বসানো শাড়ি পরিয়ে (বোম্বাই অঞ্চলে পার্শী মহিলাদের পরিচ্ছদের শালীনতায় মুগ্ধ হয়ে তাকে আদর্শ করে এদেশের সৌন্দর্যবোধ এবং সামাজিক পরিবেষ্টনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে তিনি এই ‘আধুনিক’ শাড়ি পরার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন।) অন্য মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে সেখানে চললেন মেজবৌ জ্ঞানদানন্দিনী। মৃণালিনী দেবী সন্তানসম্ভবা। নিশ্চিন্ত নিরাপদ আশ্রয় মেজবৌঠানের। রেণুকা অসুস্থ, কবি যাচ্ছেন আলমোড়ায় মীরা আর শমী থাকুক মেজজেঠিমার নীড়ের আশ্রয়ে। দোলের দিন রং খেলা সাঙ্গ করে পুকুরে নেয়ে এসে ছেলেরা সবাই পরল মেজমায়ের দেওয়া নতুন কাপড়। তারপর পদ্মপাতায় পেট ভরে খাওয়া। শুধু কি তাই। বুড়োরাও কি বাদ যাবে? বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মা প্রফুল্লময়ী দেবী গদগদ চিত্তে তাই সাক্ষী দেন ‘ছায়াচিত্রকর (Photographer) ডাকিয়া আমার বড় জার শাশুড়ীর এবং বাড়ির সকলের ছবি’ তুলিয়াছিলেন তাঁর মেজজা’। অবরোধ প্রথা ভাঙ্গার আন্দোলনে যিনি অগ্রণী ছিলেন, তাঁর এই বাড়াবাড়ির ভূমিকা কি নিতান্ত বেমানান?

ছবির কথা উঠতেই আমার মনে পড়ছে বিনয়িনী দেবীর কন্যা, অবনীন্দ্রনাথের ভাগ্নী প্রতিমা দেবীর কথা। সতেরো বছরে পড়তেই তাঁর বিয়ে হয়ে গেল। পড়াশুনো উঠল শিকেয়। ‘ছবি আঁকায় একটু হাত আছে দেখে মেজজ্যাঠাইমা জ্ঞানদানন্দিনী দেবী কুমুদনাথ রায়চৌধুরীকে বলে আমার জন্য আর্ট টিচার ঠিক করে দিলেন। তিনি ছিলেন ইটালিয়ান, নাম মিস্টার গিলহার্ডি। এইভাবে আমার জীবনে শিল্প শিক্ষার গোড়াপত্তন হল’—এ স্বীকারোক্তি স্বয়ং প্রতিমাদেবীর। বিখ্যাত শিল্পী হ্যাভেল সাহেবের সঙ্গেও জ্ঞানদানন্দিনীর যথেষ্ট পরিচয় ছিল। কার মুখে খবর পেয়েছিলেন এক লোক দেশী স্টাইলে ছবি আঁকছে। সেই আর্টিস্টের খবর নেবার জন্য হ্যাভেল উপস্থিত হয়েছেন কার কাছে?—জ্ঞানদানন্দিনীর কাছে। আসলে এই সৌন্দর্যবোধ ও শিল্পরুচিই জ্ঞানদানন্দিনীর জীবনরচনার পুঁজি ছিল। জ্ঞানদানন্দিনী বিশাল পরিবারের বিশাল হৃদয় বধূ।

চার

যেটুকু কথা বলেছি তাতে রবীন্দ্রনাথ অনিবার্য ভাবে এসেছেন। জ্ঞানদানন্দিনী এবং রবীন্দ্রনাথ দুটি জীবনকে নিয়ে আরও কিছু ভাবনার অবকাশ প্রার্থনা করি। কবি ছিলেন তাঁর মেজবৌঠানের কাছে বিবিধ বিষয়ে ঋণী। রবীন্দ্রনাথের জন্মকালে জ্ঞানদার বধূজীবন অতিক্রম করেছে দু-বছর। কিছুদিন পরে তাঁকে যেতে হয়েছে স্বামীর কর্মক্ষেত্র বোম্বাই প্রদেশে। ইতোমধ্যে বেড়ে উঠেছেন উদীয়মান কবি। বাড়ির লোক ভাবেন, তাঁকে বিলেত থেকে ব্যারিস্টার করিয়ে আনার দরকার। তারও আগে দরকার বিলিতি আদব-কায়দা রপ্ত করার। অতএব পাঠাও সত্যেন্দ্রনাথের কাছে। আমেদাবাদে। জ্ঞানদানন্দিনী তখন বিলেতে। লণ্ডন থেকে পঞ্চাশ মাইল দূরে সাসেক্স জেলার ব্রাইনে তাঁর বাসা। কবি চললেন সেখানে। বিদেশের মাটিতে মেজবৌঠান পরমস্নেহে দেবরকে টেনে নিলেন তাঁর উদার কক্ষপুটে। প্রবন্ধের গোড়ার দিকে সে কথা বলে এসেছি। কৃতজ্ঞ কবি পরে তাঁর ১৯ তেকে ২৩ বছরের সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধের সংগ্রহ ‘সমালোচনা’ (১২৯৪) ‘পূজনীয়া শ্রীমতী জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর করকমলে স্নেহের সামান্য প্রতিদান স্বরূপ’ উৎসর্গ করেছেন। জ্ঞানদানন্দিনী যখন কলকাতায় থেকেছেন, তাঁর স্নেহের আশ্রয় কবিকে বার বার আকর্ষণ করেছে। আসলে জ্ঞানদানন্দিনীর ‘শাসনাধীন সুব্যবস্থিত গৃহশৃঙ্খলার মধ্যে আদরযত্নে লালিত’ হবার লোভ কবিকে বারংবার হাতছানি দিয়েছে।

তারপর তিনি কবে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের সঙ্গী হয়ে গেছেন। একটু পরে ‘সাহিত্যচর্চা’ প্রসঙ্গে সেকথা বলবো। তার আগে, রবীন্দ্রনাটকের আদিযুগের পৃষ্ঠপোষকতায় জ্ঞানদানন্দিনীর ভূমিকা স্মরণ না করলে ‘হয় মোর কৃতঘ্নতা দোষ’। ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী ‘রবীন্দ্রস্মৃতি’তে লিখেছেন ‘মা আত্মীয়স্বজন নিয়ে ঘরোয়া অভিনয় করতে খুব ভালবাসতেন।’ ঘরোয়া ধরণের বেশির ভাগ নাটক সত্যেন্দ্রনাথের বিরজিতলার বিশাল বাড়িতে অভিনীত হত (এখন সেখানে ক্যালকাটা ক্লাব! ‘নিলাজ কুলটা ভূমি, যখন যাহার, তখন তাহার!’) এই বাড়ির একতলায় ঢুকতেই একটা লম্বাচওড়া বারান্দা ছিল, নাটক অভিনয়ের ব্যবস্থা হত তারই একধারে স্টেজ খাটিয়ে। সুরেন্দ্রনাথকে কবি উৎসর্গ করেছিলেন ‘বিসর্জন’ নাটক। সেটি এবাড়িতেই পড়ে শোনানো হয়। উৎসর্গপত্রে রবীন্দ্রনাথ যেখানে লিখেছেন,—‘কেদারায় বসি ঠাকুরাণী’—তিনি আর কেউ নন, মেজবৌঠান জ্ঞানদানন্দিনী দেবী। লেডি লান্সডাউনের সম্মানে ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ অভিনয়ের রিহার্সেল হয় এই বাড়িতেই। রিহার্সেলে সবাই full present হতেন, কারণ অভিনয় রসের চেয়ে জ্ঞানদানন্দিনীর সুপক্ব হস্তের পক্বান্নের আকর্ষণ অধিক। ‘মায়ার খেলা’র অভিনয়ও হয় এখানেই। ‘রাজা’র অভিনয়ও প্রথম এবাড়ির উঠোনেই হয়।

কিন্তু সবচেয়ে জমেছিল ‘রাজা ও রাণীর’ অভিনয়। বই ছেপে বেরোয় ১৮৮৯ সালের আগস্ট মাসে। কিছু পরেই এল পুজোর ছুটি। সত্যেন্দ্রনাথ এসেছেন কলকাতায়। সুতরাং বির্জিতলার বাড়ি ‘রাজা ও রাণী’ অভিনয়ের প্রসঙ্গে সরগরম। এক মাস ধরে খাওয়াদাওয়ার বড়ো ধূম। পার্ট তৈরি হয়ে গেছে সবার, তবু রিহার্সেল বন্ধ হয় না। পাছে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়।

ভূমিকালিপি উদ্ধার করি। একটা উদ্দেশ্য আছে—

দেবদত্ত—সত্যেন্দ্রনাথ

ত্রিবেদী—অক্ষয় মজুমদার

সুমিত্রা —জ্ঞানদানন্দিনী

কুমার — প্রমথ চৌধুরী

রাজা —রবীন্দ্রনাথ

ইলা — প্রিয়ম্বদা দেবী

সেনাপতি — নীতীন্দ্রনাথ

অবন ঠাকুর লিখছেন—‘একদিন আবার আর এক কান্ড—অভিনয় হচ্ছে, হতে হতে ড্রপসিন পড়বি তো পড় একেবারে মেজো জ্যাঠাইমার মাথার উপরে প্রায়। রবিকাকা তাড়াতাড়ি মেজো জ্যাঠাইমাকে টেনে সরিয়ে আনেন। আর একটু হলেই হয়েছিল আর কী।’

এই অভিনয়ে লুকিয়ে বাইরের কিছু লোকও ছদ্মবেশে ঢুকে গিয়েছিলেন। নইলে অভিনয়ের পরের দিন ‘বঙ্গবাসী’ কাগজে ‘ঠাকুরবাড়ির নতুন ঠাট’ নামে লেখা বের হবে কেন? ‘তাতে প্রত্যেক ভূমিকায় অবতীর্ণ পাত্রের নাম পাশে পাশে দেওয়া’ ছিল। ‘তার অর্থ এই যে কোন কোন নিষিদ্ধ সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী সেজেছিলেন, সেইটে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া—যথা ভাসুর ভ্রাতৃবধূ।’ বাংলা দেশটা কি বিলেত হয়ে গেল? বঙ্গবাসী এক্কেবারে ধুরধুরি নেড়ে দিল। ‘হায় বঙ্গবাসী! হায় যোগেন্দ্রচন্দ্র বসু! তুমি কোথায়? একবার এসে দেখে যাও, জ্ঞানদানন্দিনী যে বাংলার ঘরে ঘরে।’

পাঁচ

সব শেষে আমরা জ্ঞানদানন্দিনীর সাহিত্যপ্রীতি নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করি। একথা বোধকরি বেশ দুঃসাহসিকতার সঙ্গেই বলা যেতে পারে যে, ঠাকুরবাড়ির ছেলেমেয়েরা সাহিত্যসাধনায় ব্রতী হয়েছিলেন জ্ঞানদানন্দিনীর আগ্রহেই। আবার জ্ঞানদানন্দিনীর এই আগ্রহ জন্মে তাঁর নিজের ছেলেমেয়েদের ঘিরে। ইন্দিরা দেবীর স্মৃতিচারণ—‘বিলেত থেকে ফিরে আসার পর মা আমাদের নিয়ে বছরখানেক সিমলে পাহাড়ে ছিলেন। তখন আমার বোধহয় সাত বছর বয়স। স্পষ্ট মনে আছে—মনে করে নিজেই আশ্চর্য হই, সেই বয়সেই মা আমাদের শেলির Sensative Plant আর The Cloud, টেনিসনের May Queen আর The Brook পড়াতেন, কারণ এই কবিতাগুলি তিনি ভালবাসতেন।…. শিক্ষা সম্বন্ধে মায়ের কতকগুলি মত ছিল, তাই তিনি বাংলায় অক্ষর পরিচয় না করিয়েই কোলে বসিয়ে একেবারে ভারতী পত্রিকা পড়িয়ে যেতেন। আর আঁকাবাঁকা অক্ষরে আমারই সমবয়সী ঊষাদিদি, সুপ্রভাদিদি প্রভৃতি বোনেদের চিঠি লেখাতেন।’ জ্ঞানদা আরও ভালবাসতেন টমাস মুরের লেখা বিখ্যাত কাব্য Lallah Rookh। এবার বেশ বোঝা গেল, ইংরেজিটা ভদ্রমহিলা ভালরকমই রপ্ত করেছিলেন। আর জীবনস্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথের সকৃতজ্ঞ স্মৃতিচারণা —‘বালকদের পাঠ্য এক সচিত্র কাগজ বাহির করিবার জন্য মেজ বউঠাকুরাণীর বিশেষ আগ্রহ জন্মিয়াছিল। তাঁহার ইচ্ছা ছিল, সুধীন্দ্র, বলেন্দ্র প্রভৃতি আমাদের বাড়ির বালকগণ এই কাগজে আপন আপন রচনা প্রকাশ করে। কিন্তু শুধুমাত্র তাহাদের লেখায় কাগজ চলিতে পারে না জানিয়া তিনি সম্পাদক হইয়া আমাকেও রচনার ভার গ্রহণ করিতে বলেন।’

—অবশ্য মেজ বউঠাকুরাণীকে অগ্রণী করে রবীন্দ্রনাথই অগৌণে পত্রিকার সম্পাদনভার গ্রহণ করেন। ‘বালক’ পত্রিকা পরিচালনের বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের কৃতিত্ব অনেকেই স্মরণ করেছেন। কিন্তু যদি এর লেখকসূচীর দিকে একবার লক্ষ্য করি, এক উদার হৃদয় আমাদের চিত্তকে স্পর্শ করবে। পত্রিকা ১২৯২ বঙ্গাব্দের বৈশাখ থেকে চৈত্র এই বারো মাসের জীবনযাপন করে বন্ধ হয়। এর বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ এবং আষাঢ়—এই তিন সংখ্যায় মাত্র দুটি লেখার লেখিকা ছিলেন জ্ঞানদানন্দিনী। প্রথম বৈশাখ সংখ্যায় ‘ব্যায়াম’ নামে এবং দ্বিতীয় একটা দীর্ঘ ধারাবাহিক রচনা—‘আশ্চর্য পলায়ন’ পর পর তিন সংখ্যায় প্রকাশিত। সারা বছরের মধ্যে জ্ঞানদানন্দিনী আর লিখলেন না। কারণ এই পত্রিকা তিনি বের করেছিলেন প্রধানত ঠাকুরবাড়ির ছেলেদের সাহিত্যচর্চার জন্য, আত্মপ্রচারের জন্য নয়। নতুন পত্রিকার আবির্ভাব সম্ভব করে রবীন্দ্রনাথের লেখনীতে সঞ্চার করলেন নবতর প্রেরণা।

অথচ তাঁর একটা সাহিত্যমন বর্তমান ছিল। আমাদের বিস্মরণের অভাবিত শক্তি তাঁর সাহিত্যচর্চাকে স্মরণীয় করে রাখেনি। তাঁর সাহিত্যচর্চার কিছু নজির হাজির করি। ‘ভারতী’ পত্রিকায় ‘ইংরাজ নিন্দা ও দেশানুরাগ’ রাজনীতিতে তাঁর অধিকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় (শ্রাবণ ১২৮৮)। পঞ্চায়েৎ সভা প্রভৃতির প্রয়োজন অনুভব করা তৎকালীন পুরনারীর পক্ষে বিস্ময়াবহ। ঐ পত্রিকার আশ্বিন ১২৮৮ সংখ্যায় লিখলেন ‘স্ত্রীশিক্ষা’ এবং অগ্রহায়ণ সংখ্যায় প্রকাশিত হল ‘কিন্টারগার্টন’ শীর্ষক শিক্ষামূলক দুটি রচনা। শিশু-মনস্তত্ত্বের উপর এমন সুন্দর প্রবন্ধ আজকালও দেখতে পাই না। সর্বাপেক্ষা উল্লেখয়োগ্য সরাসরি মারাঠী থেকে অনূদিত ধারাবাহিক রচনা (ভারতী, মাঘ-চৈত্র ১২৯০-৯১) ‘ভাউ সাহেবের কথা’। জ্ঞানদানন্দিনীর রচনা বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল দুটি শিশু-সাহিত্য গ্রন্থের কথা এখানে বলে নিতে হবে। ‘সাতভাই চম্পা’ আর ‘টাক্ ডুমাডুম্’ বই দুটির কথা। প্রথমটির ভূমিকা লিখে অবনীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘আমাকে ছবি আঁকতে তিনিই প্রথমে ঠেলে পাঠান’। দ্বিতীয়টির ছবি আঁকেন নন্দলাল বসু স্বয়ং। এতে সেই বিখ্যাত গান আমরা ভুলিনি কখনও—নাকুর বদলে নরুন পেলাম/টাক্ ডুমা ডুম্ ডুম্। বড় নাতি সুবীরের জন্য এসব লেখা। পুরানো রূপকথা নাটকে রূপ পেয়ে নতুন রসে সঞ্জীবিত হল।

—এর সঙ্গে অবশ্য তাঁর ‘ছেলেবেলার কথা’ স্মৃতিচিত্রের কথা না বললেই নয়। এই স্মৃতিমূলক রচনাপাঠে আমার তো ইচ্ছে করে জ্ঞানদানন্দিনীকে সোজাসুজি কথক ঠাকুরাণীর পিঁড়িটিতে বসিয়ে দিতে। শুনবেন নাকি একটুখানিঃ ‘যখন বাড়ি থাকতুম একা একা খেলনা নিয়ে খেলা ছাড়া আমার আর এক আমোদ ছিল ফাঁদ পেতে পায়রা ধরা। আমাদের পশ্চিমের ঘরে কেউ বাস করতেন না, সেখানে ধান চাল ও নানারকম জিনিস থাকত। তারই সামনের উঠোনে একটা লম্বা দড়ির একমুখে ফাঁস দিয়ে তার মধ্যে ধান ছড়িয়ে রাখতুম, আর তার আর এক মুখ ধরে আমি ঘরের দরজায় বসে থাকতুম। যেই একটা পায়রা ধান খেতে আসত অমনি আস্তে আস্তে দড়িটা ধরে টানতুম,….অনেক সময় পায়রা ধান খেতে আসতে দেরি করত কিম্বা মোটেই আসত না তখন আমি মনে মনে খালি মা কালীর কাছে বার বার মানত করতুম। ‘হে মা কালী, একটা পায়রা ধান খেতে আসুক; হে মা কালী তোমায় জোড়া পাঁঠা আর এক বোতল মদ দেব, একটা পায়রা ধান খেতে আসুক’।

কাজেই দেখা যাচ্ছে জ্ঞানদানন্দিনীর মনের দু’টি দিক— তার শিশুচিত্ততা এবং পরিণত মনন—উভয়ই বাংলা সাহিত্যের দিগন্ত বিস্তারে প্রসন্ন সহযোগিতা জানিয়েছে।

ছয়

কথায় কথায় অনেক বেলা বেড়ে গেল, আমরা এখন শেষের কথায় এসে পড়ি। ঠাকুর পরিবারের এক সলাজ বধূ ধীরে নিজের জীবন বিকাশের পথে তারা বা ফুল কাউকে ভোলেননি। দূরত্বজ্ঞাপক গুরুজনেরা এবং হৃদয়ের সন্নিকৃষ্ট পুষ্পসম শিশুরা তার উদার হৃদয়ে সমভাবে স্থান পেয়েছিল। সলাজ বধূ একসময় স্বামীর সঙ্গে কথা বলতে পর্যন্ত সরমরাঙা হয়ে উঠতেন। (সত্যেন্দ্রনাথের জবানীতে—‘আমার মনে আছে তুমি কেমন লজ্জাশীলা ছিলে—তোমাকে কত বলিয়া একটু নতুন কাপড় কি জুতো কি মোজা পরিতে দিলে তুমি পরিতে চাহিতে না। আমার সামনে এতটুকু খেতেও লজ্জা করিতে।’) পরে তিনিই আপনযোগ্যতা বলে স্বামীর উপযুক্ত সহধর্মিণীতে উন্নীত হলেন। ঠাকুরবাড়িতে তাঁর নিজের সৌন্দর্যবোধ দিয়ে একটা সৌন্দর্যলোক রচনা করলেন কথা, গানে, প্রকৃতিতে, মানুষে, বেশবাসে। নিয়মশৃঙ্খলার প্রতি দৃষ্টি কঠোর অথচ ‘বলির পাঁঠা আর হাড়কাট দেখলে বড় ভয় ও দুঃখ হত।’ জানি না ‘বিসর্জন’-এর অপর্ণার কথা রবীন্দ্রনাথ কার কথা ভেবে লিখেছিলেন। এখন সেই একই প্রশ্ন—‘এত রক্ত কেন?’

তারপর সত্যেন্দ্রনাথ চলে গেলেন ১৯২৩-এ। তাঁর সাধের ‘বজিনি’ পরে রইলেন আরও আঠারো বছরের নিঃসঙ্গতায়। নব্বই বছরের বৃদ্ধা জ্ঞানদানন্দিনী চলে গেলেন ঠাকুরবাড়ির চত্বরে বেড়ে ওঠা সবগুলো শিকড়ে টান দিয়ে। আশ্চর্য লাগে যখন ভাবি রবীন্দ্রনাথকেও এই বছরেই চলে যেতে হয়েছিল।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev