| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বাড়ির পুজো : নন্দিনী অধিকারী

Reporter
নন্দিনী অধিকারী / ১০৪৮ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

অবয়বহীন একটি কাঠ। সে কাঠ দারুব্রহ্ম হয়ে ভক্তপ্রাণের প্রেমে জনসমুদ্রে নিজেকে ভাসিয়ে দেন। আরেক অবয়বহীন কাঠ সে পবিত্র রথযাত্রার দিন থেকেই তিলে তিলে তিলোত্তমা হয়ে ওঠেন। শিল্পী তাঁর নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে তাকে ঘিরে প্রতিমা গড়ে তোলেন। যদিও তিনি অবাংমানসগোচর। বাক্য এবং মনের অগোচর। আমরা তাঁর প্রতীকী রূপ দিই মাত্র, তাঁকে আপন করে নেবার জন্যে।

আমাদের বাড়ির পুজোয় রথযাত্রার দিনে কুমোরের পো তার গোলা থেকে একটি নতুন বংশদন্ড নিয়ে আসে। সেটিই প্রতিমার কাঠামোর প্রতীক। পুরুত মশাই সেখানে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে পুজোপর্বের নান্দীমুখ করেন। কাঠামো পুজোর সমস্ত ভোগপ্রসাদপ্রণামী যাবে সেদিন কুমোরবাড়িতে। জগজ্জননীর আঙিনায় কেউ যে বঞ্চিত থাকে না!

পুজোদালানেই ঐ বাঁশের সঙ্গে আরও বাঁশ-কঞ্চি বেঁধে আসল কাঠামোটি তৈরি হয়। কাঠামোর উপর খড় বাঁধলেই শরীরের আদল। তারপর মাটির প্রলেপ। এক-মেটে, দু-মেটে। মাটি শুকোলে রং লাগতেই প্রতিমা প্রতিভাত। বংশ পরম্পরায় একই শিল্পী পরিবারের হাতে ঠাকুরদালানেই মূর্তি প্রাণ পেয়ে ওঠে।

তিনি বরাভয়া। সিংহাসনে বসে দ্বিভুজা এক হাতে বর দেন। এক হাতে অভয়। পায়ের তলায় দুটি ছোট্ট ছোট্ট, নিরীহ সিংহ পুতুল। মহিষাসুরের বালাই নেই। একচালায় পুত্র-কন্যা নিয়ে যৌথ পরিবারের সুখচ্ছবি। মাথার উপর স্বামী ভোলা মহেশ্বরও আছেন পটচিত্রে।

প্রদীপ জ্বালানোর আগে সলতে পাকানোর মত এ অভয়ামূর্তি প্রতিষ্ঠার পিছনে এক পটভূমিকা আছে।

কোলকাতার রমরমার বহু আগে সম্ভবতঃ এখনকার মধ্যপ্রদেশ থেকে (যা রাজস্থানের সীমানার সঙ্গে সংলগ্ন) আমাদের পূর্বপুরুষ সপ্তগ্রামের বন্দর শহরে বাণিজ্য করতে এসে এখানেই বসতি স্থাপন করেন। তাঁদের প্রথম পারিবারিক মূল ব্যবসাটি ছিল সোনা লেনদেনের (স্বর্ণকার নয়)। তাই তাঁরা পরিচিত হলেন সুবর্ণবণিক রূপে।

ব্যবসাবাণিজ্য করে সপ্তগ্রামের সেই সুবর্ণবণিকরা প্রভূত অর্থ উপার্জন করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হন। এঁদের মধ্যে একজন ছিলেন সাগর লাল দত্ত। এই ধনবান মানুষটির কাছে ইংরেজরা পর্যন্ত ঋণ নিতেন। তাঁর দেবদ্বিজে, দানধ্যানে যথেষ্ট মতি ছিল। তাঁরই বদান্যতায় কোলকাতায় সাগর লাল দত্ত মেডিকাল কলেজ (সাগর দত্ত হাসপাতাল)।এই মানুষটির ধর্মশীলা স্ত্রী জহরমণি দত্ত তাদের ভদ্রাসন চুঁচুড়ায় একটি দেবালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এক সন্ন্যাসী জহরমণির সেবায় সন্তুষ্ট হয়ে একটি অষ্টধাতুর দুর্গামূর্তি তাঁকে দেন। তিনিই বারোমাসের অভয়া নামে এ বংশের কুলদেবী হয়ে নিত্য পূজিত। পরে জহরমণি স্বপ্নাদেশ পেয়ে দুর্গোৎসবের সূচনা করেন দত্তবাড়ির দেবালয়ে। আনুমানিক একশ সত্তর বছর আগে।

দেবীপক্ষের সূচনায় কলসস্থাপনা দিয়ে আমাদের ঠাকুরবাড়ির দুর্গোৎসব শুরু হয়। আমরা বলি ঘটের ঘরের পুজো। ষষ্ঠীর রাতে মায়ের বোধন। মাতৃশক্তির আরাধনা হলেও পুজোর পদ্ধতিতে বৈষ্ণবীয় ধারা চলে আসছে। পশুবলির কোন স্থান নেই। দেবীপক্ষের শুরু থেকে অষ্টমী তিথি অবধি আমাদের নিরামিষ ভোজন।

আমাদের আরেক পূর্বপুরুষ ছিলেন চৈতন্যদেবের সাক্ষাত শিষ্য শ্রী উদ্ধারণ দত্ত। সম্ভবতঃ তাঁরই প্রভাব পড়েছে পুজোর পদ্ধতিতে। প্রেমের ঠাকুর রাধাকান্তও মা অভয়ার সঙ্গে নিত্যপূজিত হন ঠাকুরবাড়িতে। অষ্টধাতুর তৈরি রাধারাণী, তাঁর কান্তটি কষ্টিপাথরের। নাড়ুগোপাল, নৃত্যগোপাল, দাঁড়ে গোপালরাও আছেন ঠাকুরঘর আলো করে। আছেন চালের খুঁচির মালক্ষ্মী।

এঁদের নিত্যসেবার জন্যে আমাদের পূর্বপুরুষরা তাঁদের সঞ্চিত অর্থ দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে রেখে গেছেন। সেই অর্থেরই সিংহভাগ ব্যয় হয় নিত্যপুজোয়, দোল-দুর্গোৎসবে। এই উদ্যমী মানুষগুলি ব্যবসাবাণিজ্য করে প্রভূত অর্থ উপার্জন করেছিলেন। তাঁরা দানধ্যান, ধর্মকর্ম ছাড়াও গঙ্গাপাড়ের এই প্রাচীন শহরটিতে পেল্লায় পেল্লায় বাড়ি বানান। এইসব বাড়িগুলোতে এখনো নয় নয় করে কিছু মানুষজন রয়ে গেছেন। বাকি কিছুজন ভাগ্যান্বেষণে কোলকাতায় পৌঁছে গেছিলেন অনেককাল আগেই। তাঁদের বাড়ি গোটা বছর তালাবন্ধ থাকে। পুজোর ক’টি দিন সেসব বাড়ির তালা খোলে, ঝাড়পোঁছ হয়। কোলকাতার চোখধাঁধানো পুজোপ্যান্ডেল ছেড়ে সেবায়েতরা জড়ো হন পারিবারিক ঠাকুরদালানে। মা অভয়ার আগমনে সাগর দত্তের বংশধরদের এ এক মিলনোৎসব।

ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি পুজোর পাঁচদিন পুরুষরা কোরা ধুতি আর পাঞ্জাবি পরে উঠোন আলো করে আছেন। একটু রক্ষণশীলরা পরেন গরদের জোড়। ঊর্ধাঙ্গে উত্তরীয়। সেলাই করা কাপড় পুজোআর্চায় চলে না।

দালানে মহিলাদের পরনে সাদাসিধে করে পরা নতুন তাঁতের শাড়ি। বেশিরভাগই বাঙালি মায়ের সিগনেচার সাদা শাড়ি লালপাড়। ব্লাউজের লাল ম্যাচিং ব্যাপারটা অবশ্য সবসময় একরকম ছিল না। তবে তা নেহাতই সাদামাটা নয়। বেশ রঙচঙে জরিদার। কপালে রুপোর পাতাকাটা সিঁদুরে হরতন, ইস্কাপন, রুইতন, চিঁড়েতনের নক্সা। আজকাল টিভি সিরিয়ালে ভিলেনরা যেভাবে ফ্যামিলীপ্ল্যানিংয়ের নক্সাকরা সিঁদুর পরেন, অতটা ভয়ঙ্কর অবশ্য নয়! কপালে আঠা লাগানো কাঁচপোকার খয়েরি টিপ (তখনও স্টিকার বিন্দি দূর অস্ত) বা গোল লাল সিঁদুর টিপ। নাকে ফাঁদি নথ। হাতে ষষ্ঠী থেকে শুরু করা একগোছা লাক্ষার রুলি। (এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে রাজস্থানের মহিলারাও ‘লাখ কি চুড়িয়াঁ’ পবিত্র মনে করেন)। সে চুড়ি লক্ষ্মীপুজো অবধি পৌঁছতে পৌঁছতে অধিকাংশই দেহ রাখেন। আমার ছোটোবেলায় ঠিক পুজোর আগে আগে একটি ষণ্ডামার্কা লোক মাথায় রুলির ঝুড়ি নিয়ে আমাদের পুরনো বাড়ির বারান্দায় এসে বসত। হিন্দি মেশানো ভাঙা বাংলায় মা ঠাকুমার সঙ্গে দরাদরি করত। পুজোর সময় সধবা আত্মীয়াদের সিঁদুর, আলতা আর ঐ একজোড়া রুলি ছিল প্রীতি উপহার। রঙ বেরঙের চুড়ির মোহে আমিও বসে থাকতাম ঐ চুড়িওলার সামনে।

রুলির পর সীমন্তিনীদের হাতভর্তি চুড়ি-বালা-বাউটি। শাঁখা পরার রেওয়াজ তেমন ছিল না। গলার হার, দুল, আংটি কমন। পুজোর জন্যে তোলা বা ভারি গয়নাটাই বা’র হত দেরাজ থেকে। পুজোর ক’দিন চুলে তেল পড়বেনা (ফ্যাশান নয়, নিয়ম), তাই ঘষামাথায় লাল কার দিয়ে খোঁপা বাঁধা (পুজো দালানে কালো শাড়ি, মাথায় কালো কারের অনুপ্রবেশ নিষিদ্ধ)। পায়ে আলতাদিদির পরিয়ে দেওয়া আলতা আর জেলের কয়েদীদের মত রূপোর ভারী মল। কুমারী মেয়েদের কানের রিঙ বদলে ছোটো ঝোলানো দুল বা হাতে দু-এক গাছি চুড়ি। এই ছিল পুজোর সাবেকী সাজ। এখন কালের নিয়মে অনেক পরিবর্তন হয়েছে।

পুজোর কাজকর্মের সাহায্য করতে মুখে পান উৎকলবাসী ব্রাহ্মণ বংশপরম্পরায় প্রতিবছর আসেন। তাদের ডাক নাম বাবাজী। আরো কিছু মানুষ, ঢাকি, তার কাঁসরবাজানো শ্যামলকিশোর ছেলে আসে দঃ চব্বিশ পরগনার সুন্দর বন অঞ্চল থেকে। এদের পরিবারও বছরের পর বছর এই পুজোর টান উপেক্ষা করতে পারেনি।

পুজোর খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারটা না বললে এ লেখা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

পঞ্চমীর রাতে ভিয়েনের বাড়িভরা সুবাস নিয়ে শুতে যেতাম। তার আগে একবার ছুট্টে গিয়ে দেখে আসতাম মাটির উনুনের গনগনে আগুনে, লোহার কড়াইতে ভাজা হচ্ছে পানতুয়া। টগবগ করে রসে ফুটছে রসগোল্লা। কাঠের বারকোশে ঠাসা হচ্ছে সন্দেশের ছানা। চ্যাপ্টা, কানাউঁচু লোহার কড়াই বা ‘তোই’তে ভেসে উঠছে মালপোয়া। লম্বা কাঠের পিঁড়িতে হাতের জোর আর বেলুনের টানে চিত্তঠাকুর খাজার ধপধপে সাদা ময়দা বেলছে। ঠাকুমারা মা-কাকিমাকে ট্রেনিং দিচ্ছেন লবঙ্গলতিকার ভাঁজটা কেমনভাবে হবে। পেঁড়াকির ধারের বিনোনো কতটা নিঁখুতভাবে করলে মজবুত আর সুন্দর হবে। জোড়ামন্ডা, খাজা, গজা, দরবেশ, মুগের নাড়ু, মুগের বরফি, বোঁদে যাবতীয় মিষ্টি তৈরী হবার মাটির হাঁড়িতে রেখে, নতুনকাপড় দিয়ে তার মুখ ঢাকা হয়। তাতে খড়ি দিয়ে মিষ্টির নাম লিখে, কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উঠে দোছত্রীতে তুলে রাখার পরে মায়েদের দায়িত্ব সেদিনের মত শেষ। তারপরে তারা যখন শুতে আসবে, তখন আমরা আধো ঘুমে।

ষষ্ঠীর সকাল থেকেই এবাড়ি ওবাড়ির একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া। ওবাড়ির কড়িবড়গা দেওয়া, লালমেঝের টানা বারান্দায়। সেদিনের সকালের জলখাবারে লুচি, কুমড়োর ছক্কা আর আগের রাতে তৈরি হওয়া বোঁদে। ষষ্ঠী সপ্তমীতে দুপুরের মেনুতে ভাত, ডাল, শাকভাজা, ছাঁচিকুমড়োর শুক্তো, মটরডালের রসা, ধোঁকার বা ছানার ডালনা, পোস্ত দেওয়া আমড়ার অথবা চালতার চাটনি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। পরম বৈষ্ণব উদ্ধারণ দত্তের বংশধরদের পুজো। তাই বৈষ্ণবপন্থী। মহালয়ায় ঘট বসার দিন থেকেই নিরামিষ ভোজন শুরু হয়ে গেছে। রাতের খাওয়াতে পোড়া রুটিও চলবে না। যার যার নিজস্ব হেঁশেলটি শুধু চা করার জন্যে সকাল বিকেল খোলা হবে।

অষ্টমীর দিন লুচিকচুরী। সেদিন থেকেই বাড়ির মেয়েজামাই, আত্মীয়কুটুমরা এসে যোগ দেন। তাই খাবারের তালিকায় বিশেষ সংযোজন। আলুরদম, ঘুগনি, রাবড়ি। সঙ্গে আদা বা শসার জারক, ভেজানো মুগডাল। এত তেল, ঘি, মিষ্টি হজম করতে তো হবে!

নবমী দশমীতে মৎস্যমুখ। তবে নবমী পুজোর পরেই মাছের কড়া উনুনে চাপবে। ইলিশ মাছের ঝাল, পোনামাছের কালিয়া, দশমীতে চিংড়ি মাছের কালিয়ার বিশেষ পদ। এছাড়া কমলান্ন, ছ্যাঁচড়া, মাছের মাথা দিয়ে মুগের ডাল, পাঁচভাজা, পায়েসে জমজমাট পুজোর ভোজ।

অব্রাহ্মণ বাড়ির দুর্গাপুজো, তাই সেখানে অন্নভোগ চলে না। একমণি চালের নৈবেদ্য দেওয়া হয় পাঁচদিন ধরে। অন্নপূর্ণার সে প্রসাদী চাল বিলিয়ে দেওয়া হয় দীনজনের মাঝে।

এছাড়া সময়ের ফল, বাড়িতে তৈরি মিষ্টান্ন, বিনা নুনের ঘিয়ে ভাজা সিঙাড়া, বেগুনি, লুচি, বেগুনভাজা দিয়ে মা অভয়ার দুবেলার ভোগ সাজানো হয়।

ফল মিষ্টি আর দশমীর দধিকর্মাতে আমাদের চারদিনের ব্রেকফাস্ট।

ভোগের ঘরের চারদিন চেঁচামেচিতে কানপাতা দায়। মেয়ে খাবে দরবেশ, তো নাতির পছন্দ রসগোল্লা, নাতনীর খাজা, পো’নাতির পেঁড়াকি তো ছেলের পানতুয়া। বৌমাদেরও পছন্দ থাকে কিছুকিছু। জামাইকে অবশ্য চাইতে হয় না। তার ফলের পাতায় সাজানো হয় সরেস মিষ্টান্ন।

এভাবেই পুজোর পাঁচদিন সম্মিলিত ভোজনের আনন্দ। যেখানে মিশে থাকে হাসি ঠাট্টা আদর-আবদারের কলধ্বনি। মা অভয়ার টানে যৌথপরিবারের হারানো দিনগুলিকে ফিরেপাওয়া যায়। খুঁজে নেওয়া যায় সেই আনন্দ যা বন্ধ দরজার অভিজাত ফ্ল্যাটে সুইগি, জোম্যাটোরা এনে দিতে পারে না।

আমাদের ঠাকুরবাড়ির পুজোর বিধিতে আছে নবপত্রিকা স্নান, হোমযজ্ঞ, পুজোপাঠ। এছাড়াও একটি বিশেষ মেয়েলি প্রথা, ধুনো পোড়ানো। মহিলারা শুদ্ধবস্ত্রে, ভূমিতে বসে দুহাতে এবং মাথায় মাটির মালসায় ধুনোর আগুন জ্বালান। একাজে পুত্রস্থানীয় কেউ তাঁকে সাহায্য করে। পরিবার এবং সন্তানের মঙ্গল কামনায় জগজ্জননীর সামনে আটপৌরে মায়ের এই কৃচ্ছসাধন।

দশমীর সকালে মাছভাত খেয়ে সীমন্তিনীরা পায়ে আলতা, শুদ্ধবস্ত্রে মাকে বরণ করেন। মা অভয়ার হাতে পানের খিলি, মুখে সন্দেশ, কপালে সিঁদুর ছুঁইয়ে কানে কানে বলেন “আবার এসো মা”।

দশমীর সকালে পুরুত ঠাকুর ধরা গলায়, ধুতির খুঁট দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে মন্ত্র পাঠ করেন, — “গচ্ছ গচ্ছ পরমস্থানং, স্বস্থানং পরমেশ্বরী / যতপূজিতং ময়া দেবী, পরিপূর্ণং তদস্তু মে /গচ্ছ গচ্ছ পরমস্থানং যত্র দেব মহেশ্বরঃ / সমবৎসর ব্যতিতেতু, পুনরাগমনায় চ।।”

সুতো ছিঁড়ে, ঘট নড়িয়ে, দর্পণে মায়ের প্রতীকী বিসর্জন হয়। আদরের মেয়েকে স্বামীর ঘরে পাঠিয়ে সামনে বছর আবার বাপের বাড়ি আসার আবদার জানানো হয়। ঢাকের কাঠিতে বোল বাজে, “ঠাকুর থাকবে কতক্ষণ, ঠাকুর যাবে বিসর্জন”। কান্না বড় ছোঁয়াচে। গোটা পুজোদালানে সে কান্নার রেশ ছড়িয়ে পড়ে।

সন্ধ্যেয় বেহারাদের কাঁধে চেপে সবাইকে আর একবার কাঁদিয়ে ঘরের মেয়ে চোখের আড়ালে চলে যান। ছোটবড় ফাটল, মনোমালিন্য ভুলে পরিবারের সবাই একে অন্যকে আলিঙ্গন করে। ছোটোরা বড়দের পায়ের ধুলো নেয়। মিষ্টি মুখ করে। পুরোহিত শান্তিবারি ছিটিয়ে পরিবারের মঙ্গল কামনায় স্বস্তিবচন উচ্চারণ করেন।

আপনার মতামত লিখুন :

6 responses to “বাড়ির পুজো : নন্দিনী অধিকারী”

  1. Manasi Ganguli says:

    খুব ভাল লাগল গো। অপূর্ব বর্ণনা দিয়েছ।

  2. Kamal Banerjee says:

    অপুর্ব লেখা । আপনাদের এই পুজো কি চুঁচুড়াতে হয়?

  3. মহুয়া মীল। says:

    ভালো লাগলো দিদি।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev