২০২১ সালের অষ্টমীর সকাল। ফোন করলাম মালা রায় কে। ওপার থেকে ভেসে এলো সেই চেনা পরিচিত আন্তরিক স্বর — ‘কেমন আছো?’ কুশল বিনিময়ের পর প্রথমেই জানতে চাইলাম ‘তমলুকে নিজের বাড়ির পুজোয় কবে যাচ্ছেন? মালাদি জানালেন, ‘আজ অর্থাৎ অষ্টমীর দিন রওনা হব। ইতিমধ্যে বাড়ির অন্য সদস্যরা ওখানে গিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। আমি প্রতিবছরের মতো এবছরেও অষ্টমীর অঞ্জলী তমলুকের বাড়িতেই দেব।’
মালা রায়, আমাদের প্রিয় মালা দি, ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে দক্ষিণ কলকাতা কেন্দ্র থেকে জয়লাভ করেছেন। তখন তিনি কলকাতা পুরসভার চেয়ারপার্সন তথা ৮৮ নম্বর ওয়ার্ডের নির্বাচিত প্রতিনিধিও বটে। ১৯৯৫ সাল থেকে একটানা কাউন্সিলরের দায়িত্ব পালন করেছেন বর্তমানে সাংসদ তথা ৮৮ নম্বর ওয়ার্ডের কো-অর্ডিনেটর মালা রায়। সমাজকর্মী ও সমাজসেবী হিসেবও মালাদি অত্যন্ত সুপরিচিত। নানা ধরনের সামাজিক কাজের সঙ্গে তিনি যুক্ত থাকেন। দল-মত নির্বিশেষে যে কোনও মানুষ প্রয়োজনে মালাদির সাহায্য থেকে বঞ্চিত হন না। সারা বছর বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক কাজে ব্যস্ত থাকলেও দুর্গাপুজোর সময় অষ্টমী থেকে পর পর কয়েকদিন কাটান চারশো বছরের পুরনো তাঁর বাড়ির পুজোয়, তমলুকে।

বর্তমান সময়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিষয়টি যে কোনো সচেতন ও সংবেদনশীল মানুষকে বিভিন্ন ভাবে নাড়া দিচ্ছে। বিশেষ করে আমাদের দেশের বিগত কয়েক বছরের বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহ এই বিষয়টি নিয়ে আলাদা করে ভাবতে বাধ্য করছে নাগরিকদের। শারদোৎসব ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সম্পর্কে মালাদির মত, “পুজো আমাদের সকলের — শারদোৎসবই হোক বা অন্য কোনো পুজোই হোক। সারা বছর ধরে আমরা অনেক পুজো করে থাকি, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ কোনো পুজোই বাকি থাকে না। ইতু পুজো যেমন করি একই ভাবে রামনবমী অথবা বিপদতারিণী পুজোও বাঙালি মহিলারা করে থাকেন। সুতরাং বলাই যায় সব পুজোই পশ্চিমবঙ্গবাসী নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন।বড়দিন ও মহরমেও আমরা সামিল হই।শারদোৎসবের জন্য তো আমরা সারা বছর ধরে অপেক্ষা করে থাকি। তবে করোনা এখনও সম্পূর্ণ ভাবে আমাদের ছেড়ে যায়নি। তৃতীয় ঢেউ আসার সম্ভাবনাও আছে। তাই করোনার নিয়ম-বিধি মেনে, মাস্ক পড়ে, শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে আমাদের এই উৎসবে সামিল হতে হবে। শারদোৎসবকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক বিধি ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়। বস্ত্র ব্যবসায়ী, প্যান্ডেল তৈরির ডেকরেটর, আলোক সজ্জার শিল্পী, প্রতিমা শিল্পী, পুজোর উপকরণ তৈরির সঙ্গে যুক্ত মানুষ, ঢাকি সম্প্রদায়ের সকলে — এই উৎসবের অঙ্গ।শারদোৎসবকে নিয়ে সারা বছরের একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মজবুত হয়। অনেকের কাছে সেটি ১২ মাসের গ্রাসাচ্ছাদনের মাধ্যম হয়ে ওঠে। বহু শিল্পী ও কারিগরের সারা বছরের আয়ের অধিকাংশটাই এই পুজোকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। সুতরাং দুর্গাপুজো তথা শারদোৎসব শুধুমাত্র প্রতিমার কাছে দাঁড়িয়ে পুষ্পাঞ্জলী দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, এর ব্যাপ্তি সুদূরপ্রসারী। দুর্গাপুজো সব সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে উৎসবের বার্তা পৌঁছে দেয়। সমস্ত ধর্মের, সমস্ত ভাষাভাষীর মানুষ আনন্দ ভাগ করে নেন শারদোৎসবকে কেন্দ্র করে। যার যার ধর্ম তাঁর কাছে, কিন্তু উৎসব আমাদের সকলের।”

কথা বলতে বলতেই মালাদি পৌঁছে গেলেন শৈশবের স্মৃতিতে। জানালেন, “আগেকার দুর্গা পুজো একটু অন্য ধরনের ছিল। সেই সময় বারোয়ারি পুজোর এত প্রচলন ছিল না। আমাদের ছোটোবেলায় অধিকাংশ দুর্গাপুজো বাড়িতে হতো। বাড়ির পুজোর মধ্যে বাড়ির সংস্কৃতি ফুটে ওঠে। অনেক বাড়িতেই বংশ-পরম্পরায় পুরোহিত পুজো করেন, ঢাকিরা ঢাক বাজান, প্রতিমা শিল্পীরা প্রতিমা তৈরি করেন বা রাঁধুনিরা ভোগ রান্না করেন। বাড়ির কিছু বিধি-বাঁধনের মধ্যে পুজো সম্পন্ন হয়। বারোয়ারি পুজোর ক্ষেত্রেও পুরোহিতের বিধান মানা হয়। তবে বাড়ির পুজোর থেকে বারোয়ারি পুজোকে কেন্দ্র করে মানুষের ভিড় বেশি হয়। বারোয়ারি পুজোরও একটা আলাদা আমেজ আছে। চাঁদা তোলা থেকে শুরু করে ভোগ বিতরণ বা প্যান্ডেলের লাইন সামলানো — সব কিছুর মধ্যেই আনন্দের ছোঁয়া মিশে থাকে। এখন তো মহিলাদের পুজো খুব জনপ্রিয় হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নানা রকম ভাবে মহিলাদের পুজোকে উৎসাহিত করেন। পুজোকে কেন্দ্র করে মহিলাদের যোগদান এখন বিশেষ মর্যাদা পাচ্ছে — আগে তা দেখা যেত না। মহিলা প্রতিমা শিল্পী, মহিলা ঢাকি থেকে শুরু করে মহিলা পুরোহিত-ও আমরা দেখছি।নিজে নারী হয়ে সমাজের নারীদের এগিয়ে আসাটা আমাকে খুব উজ্জীবিত করে।আমাদের নিজেদের বাড়িতেও পুজো হয়। ৪০০ বছর ধরে একটানা এই পুজো হয়ে আসছে নিষ্ঠার সঙ্গে। এত ব্যস্ততার মধ্যেও প্রতিবছর তমলুকে আমি আমার বাড়ির পুজোয় অংশগ্রহণ করি। আত্মীয় স্বজনরা সবাই আসেন।না যেতে পারলে খুব মন খারাপ হয়। আমার দাদু বলে গিয়েছিলেন — ‘কখনো অর্থনৈতিক ভাবে অসুবিধার সম্মুখীন হলে পুজোর ছয় মাস আগে থেকে এক বেলা খাবে, একবেলা উপোস করবে কিন্তু পুজো কখনোই বন্ধ করবে না। বাড়ির পুজোকে রক্ষা করবে।’ সেই রকম দিন যদিও আসেনি। দাদুর কথা মেনে আজও আমরা নিষ্ঠার সঙ্গে বাড়ির পুজো করে চলেছি বংশপরম্পরায়।
সকল পাঠককে শারদোৎসবের শুভেচ্ছা জানাই। সকলে ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, করোনার বিধি মেনে উৎসবে সামিল হোন।”