আকাশে পেঁজা তুলোর মেঘ। নদীর ধারে, ধানের জমির পাশে সদ্য কাশ ফুলের দুলুনি। গাছের তলায় ঝরে পড়েছে শিউলি ফুল। প্রকৃতি বার্তা দিচ্ছে শরৎকালের উপস্থিতি।
অপেক্ষার আর কদিন। তারপরেই উমা সপরিবারে আসবেন মর্ত্যে। আপামর বাঙালি মেতে উঠবে তাঁদের শ্রেষ্ঠ উৎসবের আনন্দে। পুজো মানেই ঢাকের শব্দ, মন্ত্রপাঠ, প্যান্ডেল, চারপাশ আলোর রোশনাই, প্রতিমা …কত্তো কিছু। সব কিছুর জন্য চাই অর্থ। আর এই অর্থের যোগানের জন্য নেওয়া হয় চাঁদা।
এমনিতেই বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বন। তাই চাঁদার ব্যাপার কোন মরশুমেই কম নয়। পুজো করতে গেলে যে অর্থের প্রয়োজন তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। নতুন পথের দিশা দেখালো গুপ্তিপাড়ার ১২ জন বন্ধু ১৭৯০ সালে। প্রতিবেশীর থেকে চাঁদা তুলে ‘বারো’ ‘ইয়ার’ মিলে শুরু করে বারোয়ারী পূজো। শুরুতে যে পুজো কেবল ধনী গৃহেই আয়োজিত হতো, তা পরিণত হলো গনউৎসবে।
বারোয়ারি পুজোর সেই বারো জন মিলে পুজো আর হয় না এখন সব পুজোই ‘সার্বজনীন’, অর্থাৎ কিনা সর্ব জন বিদিত। গণতান্ত্রিক দেশ। সার্বজনীন বলেই না ছাপোষা মানুষটাকে বারো জায়গায় চাঁদা দিয়ে যেতে হয়। যদি মনে হয় চাঁদার বাড়াবাড়ি আধুনিক কালের অন্যতম মাইলস্টোন, তাহলে ফিরে দেখতে হবে কোম্পানির কলকাতায়।
সমাচার দর্পণে ১৮৪০ নাগাদ প্রায়ই খবর বার হত বেহালা অঞ্চলে নাকি বারোয়ারি পাণ্ডাদের চাঁদার জুলুমে পথ চলা দায় ছিল। পেটন সাহেব, চব্বিশ পরগণার জেলা-ম্যাজিস্ট্রেটের হস্তক্ষেপে তার সমাধান হয়।
চাঁদা তোলা নিয়ে অনেক ধরনের মজার গল্প শোনা যায়। উনবিংশ শতাব্দীর এমনই একটি ঘটনা “হুতোমের” বয়ানে শোনা যাক।
‘একদল বারোইয়ারি পুজোর অধ্যক্ষ সহরের সিংগি বাবুদের বাড়ি গিয়ে উপস্থিত, সিংগি বাবু সে সময় আফিসে বেরুচ্ছিলেন, অধ্যক্ষরা চার পাঁচ জনে তাঁকে ঘিরে ধরে “ধরেছি” “ধরেছি” বলে চেঁচাতে লাগলেন। রাস্তার লোক জমে গ্যালো। সিংগি বাবু অবাক—ব্যাপারখানা কি? তখন একজন অধ্যক্ষ বল্লেন, “মহাশয়! আমাদের অমুক জায়গার বারোইয়ারি পূজোয় মা ভগবতী সিংগির উপরে চড়ে কৈলাস থেকে আসছিলেন, পথে সিংগির পা ভেঙ্গে গ্যাছে; সুতরাং, তিনি আর আসতে পাচ্চেন না, সেই খানেই রয়েচেন; আমাদের স্বপ্ন দিয়েচেন যে, যদি আর কোন সিংগির যোগাড় কত্তে পার, তা হলেই আমি যেতে পারি। কিন্তু মহাশয়! আমরা আজ এক মাস নানা স্থানে ঘুরে বেড়াচ্চি, কোথাও আর সিংগির দেখা পেলাম না; আজ ভাগ্যক্রমে আপনার দেখা পেয়েচি, কোনমতে ছেড়ে দেব না— চলুন! যাতে মার আসা হয়, তারই তদ্বির করবেন।” সিংগি বাবু অধ্যক্ষদের কথা শুনে সন্তুষ্ট হয়ে বারোইয়ারি চাঁদায় বিলক্ষণ দশ টাকা সাহায্য কল্লেন।’
দুর্গাপুজো উপলক্ষ্যে বাঙালি একদা নির্মল আনন্দের জোয়ারে ভাসতো। আড়ম্বর ছিল সেদিনও। কিন্তু সেটা মাত্রাছাড়া নয়। গ্রামে অনেক ক্ষেত্রেই পুজোর খরচের জন্য জমি দান করা হয়। দেবোত্তর জমিগুলির আয় থেকে দেবীর সারা বছরের নিত্যসেবা ও বাৎসরিক অনুষ্ঠানের খরচ অধিকাংশ উঠে আসে। বাকি খরচ অল্প চাঁদা তুলে মেটাতে হয়।
অতিমারীর প্রকোপে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বহুমানুষ। এদের সিংহভাগই গরিব, নিম্নবিত্ত, বস্তিবাসী, অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমজীবী মানুষ।
দুর্গাপুজো তো নিছক বাঙালির প্রিয় উৎসব নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে বহু মানুষের রুটি-রুজি আর স্বপ্ন। যেমন, পুজোর মুখ চেয়ে বসে থাকেন বহু থিম শিল্পী, মৃৎশিল্পী, প্যান্ডেল, আলোকসজ্জা ইত্যাদি বহু কর্মীরা যাদের সারাবছরের অন্ন-সংস্থান হয় এই উৎসব থেকে।
করোনার প্রকোপে অর্থনীতিতে মন্দার কালো মেঘ ঘনিয়েছে। তার ফলে বেশিরভাগ পুজো কমিটি গুলো সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাজেট কমানোর। অনেক কমিটিই বাড়ি বাড়িতে গিয়ে চাঁদা সংগ্রহ নয় অনুরোধ করা হচ্ছে পুজো মণ্ডপে গিয়ে চাঁদা দেওয়ার। এমনকি চাঁদা পেটিএম করে দেওয়া যাচ্ছে।
করোনার প্রকোপে নানা নিয়মের বেড়াজালে পূজো হয়েছিল গতবছর। এ বছর পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে। ভ্যাক্সিনেসন চলছে পুরোদমে। রাজ্যসরকারের পক্ষ থেকে এবছরও দুর্গাপুজা কমিটি পিছু পঞ্চাশ হাজার টাকা করে অনুদান দেবে। পুলিশ প্রশাসনকে প্রস্তুত থাকার কথা বলা হয়েছে। করোনাবিধি নিয়ম মেনে মণ্ডপ তৈরি, মাস্ক পরা, স্যানিটাইজার ইত্যাদি সচেতনতা মেনে চলতে হবে।
সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, এবছরও গতবারের মতো পুজো কমিটিগুলোর কাছ থেকে পুরসভা বা পঞ্চায়েত কোনো কর নেবে না। ফি নেবে না দমকলও, মিলবে পঞ্চাশ শতাংশ ছাড় বিদ্যুৎ বিলে।
পুজোর সঙ্গে জড়িত থাকে ছোট ছোট নানা পেশার মানুষের রুজি-রোজগার। আজ এই হিন্দু দেবীর আরাধনা নিজস্ব ধর্মের গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও বিস্তারিত অন্য ধর্মীয় অনেক মানুষের কাছে। দেবীর সার্বজনীন রূপ নিয়েছে সমাজের বিভিন্ন অর্থনৈতিক স্তরে।
শারদোৎসবের আনন্দমেলায় শুধু একটাই কামনা—কারোর আনন্দ যেন অন্যের নিরানন্দের কারণ না হয়। জীবনপ্রবাহের সাথে উৎসব অনুষ্ঠানের ধারাও সমান্তরাল ভাবে বয়ে চলবে অনন্তকাল।