ইনকিলাব জিন্দাবাদ, হসরত মোহানির এই স্লোগান বংলায় ঢুকে পড়েছে বহুদিন আগে। কোনও সন্দেহ নেই বামপন্থীরাই জনপ্রিয় করেছে ভগত সিংদের এই স্লোগান। এই স্লোগানের মধ্যেই বেঁচে আছেন রামপ্রসাদ বিসমিল, আসফাকুল্লা খান, ভগত সিং, চন্দ্রশেখর আজাদরা। ইনকিলাব জিন্দাবাদ, এই স্লোগানের শব্দগুলো আমাদের এখন আর উর্দু শব্দ বলে মনে হয় না, সুদীর্ঘ সময়ের উচ্চারণে যেন বাংলাই হয়ে গিয়েছে। এই যে উর্দু শব্দের বাংলা হয়ে যাওয়া, এই প্রসঙ্গে বলা যায়, বিদ্রোহী কবি নজরুল বাংলা ভাষাকে অনেক আরবি, ফারসি এবং উর্দু শব্দ উপহার দিয়েছেন। যেমন, ‘না শিখে আদব এলি বেহশতে/ কোন বন হতে রে মনহুশ?’ বা, ‘তীর্থপথিক দেশ বিদেশের/ আরফাতে আজ জুটল কি ফের?’ এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। বাংলাকে গজল উপহার দিয়েছিলেন নজরুল। সঙ্গে, তাঁর ‘বলবীর বল উন্নত মম শির’, ‘কারার ওই লৌহ কপাট ভেঙে ফেল কররে লোপাট’ আজও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা।
১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থার পর যখন ভোট এল, অর্থনীতিবিদ অশোক মিত্র বলেছিলেন তাঁরা ক্ষমতায় এলে সব রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দেবেন। রাসবিহারী কেন্দ্রে তিনি প্রার্থী ছিলেন। ওই সময় দেখেছি বন্দিমুক্তির দাবিতে নকশালপন্থী এবং অন্যান্য বামপন্থী যুবকদেরে মিছিল, আর সেই মিছিলে গলা মিলিয়ে সবাই গাইছেন নজরুলের ‘কারার ওই লৌহ কপাট, ভেঙে ফেল কররে লোপাট…’। হিন্দু-মুসলমান প্রশ্নে, আজ ফের সময় এসেছে নতুন করে নজরুল চর্চার। এই প্রসঙ্গে নজরুলের চরিত্রের একটি কম জানা দিক নিয়ে এই লেখা।

‘ভক্তিগীতি মাধুরী’ নামে নজরুলের ৫০১টি ভজন, কীর্তন, শ্যামাসঙগীত এবং ইসলামি গানের নির্বাচিত সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল বহু বছর আগে। করুণা প্রকাশনীর বই। কিছুদিন আগে বইটির পিডিএফ হাতে আসে। ইন্টারনেটে করুণা প্রকাশনীর যে বুকলিস্ট পেলাম তাতে সার্চ দিয়ে দেখলাম বইটি এখন ছাপানো নেই। অর্থাৎ আউট অফ প্রিন্ট। সেই বইটির ভূমিকা হিসেবে নজরুলের যে লেখাটি আছে সেটা পড়ে জানা যায়, নজরুল একজন হিন্দু গুরুর কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন। তাঁর নাম বরদাচরণ মজুমদার। নজরুল লিখছেন, ‘তিনি (বরদাচরণ মজুমদার) এই গ্রন্থ-গীতার উদগাতা’। অর্থাৎ এই যে ভজন, কীর্তন, শ্যামাসঙ্গীত এবং ইসলামি গানের সংকলন, তাকে তিনি বলছেন ‘গীতা’। এবং বরদাচরণের ভাবনায় এই বইয়ের প্রকাশ। সম্ভবত নজরুল ভেবেছিলেন ভজন, কীর্তন আর ইসলামি গানের সুরে, কথায় রচিত হবে নতুন এক সংস্কৃতির ধর্মগ্রন্থ। কে এই বরদাচরণ মজুমদার?

ইন্টারনেটে খুঁজতে খুঁজতে একটি অনলাইন বুকশপে পাওয়া গেল. ‘পথহারার পথ ও দ্বাদশ বাণী’ নামে বরদাচরণ মজুমদারের একটি বই। বইয়ের মূল বিষয় ‘যোগসাধনা’। বরদাচরণ ছিলেন যোগসাধক। নজরুল তাঁর এই গুরু সম্পর্কে ভক্তিগীতি মাধুরীর ভূমিকায় লিখেছেন, ‘সহসা একদিন তাঁহাকে দেখিলাম।…শুভক্ষণে আনন্দবাসরে আমার সে ধ্যানের দেবতাকে পাইলাম।…আজ আমার বলিতে দ্বিধা নাই, তাঁহারই পথে চলিয়া আজ আমি আমাকে চিনিয়াছি। আমার ব্রহ্ম-ক্ষুধা আজও মেটে নাই কিন্তু সে ক্ষুধা এই জীবনেই মিটিবে, সে বিশ্বাসে স্থিত হইতে পারিয়াছি’। এই লেখাটি নজরুল প্রথম লিখেছিলেন ‘পথহারার পথ ও দ্বাদশ বাণী বইয়ের প্রথম সংস্করণের ভূমিকা হিসেবে। পরে তা ব্যবহার করা হয় ‘ভক্তিগীতি মাধুরী’ সংকলনের ভূমিকা হিসেবে। ‘পথহারার পথ ও দ্বাদশ বাণী’-র আধুনিক যে সংস্করণ আমার হাতে এসেছে, তাতে নজরুলের ভূমিকাটি নেই। সেখানে ভূমিকা লিখেছেন প্রশান্ত চক্রবর্তী নামে এক ভক্ত। তবে উল্লেখ আছে যে এই বইয়ের প্রথম সংস্করণের ভূমিকা লিখেছিলেন ‘বিদ্রোহী কবি’।

‘পথহারার পথ ও দ্বাদশ বাণী’ বইয়ের ভূমিকায় বলা হয়েছে, ‘…বরদাচরণের হৃদয়ের একটা বৃহৎ অংশ জুড়ে যে মানুষটি বিরাজমান ছিলেন তিনি হলেন বাঙালির চির-বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। যোগীবরের প্রাণপ্রতিম ‘কাজী ভায়া’। …তাই বরদাচরণের ‘পথহারার পথ’ গ্রন্থের প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় কাজী লিখেছিলেন, ‘তাঁহারই চরণতলে বসিয়া, যিনি আমার চিরকালের ধ্যেয়, তাঁহার জ্যোতিরূপ দেখিলাম। তিনি আমার হাতে দিলেন যে অনির্বাণ দীপশিখা, তাহা হাতে লইয়া আজ বারো বৎসর ধরিয়া পথ চলিতেছি- আর অগ্রে চলিতেছেন তিনি পার্থ-সারথী রূপে। … তাঁহারই পথে চলিয়া আমি নিজেকে চিনিয়াছি। …আমার যাহা কিছু শক্তির প্রকাশ হইয়াছে- কাব্যে, সঙ্গীতে, আধ্যাত্মজীবনে তাহার মূল যিনি, আমি যাহার শক্তি প্রকাশের আধার মাত্র, তাঁহাকে জানাইবার আজ আদেশ হইয়াছে বলিয়াই জানাইলাম। লোকে শ্রীরামচন্দ্রকেই দেখে, তাঁহার পশ্চাতে যে ব্রহ্মর্ষি বশিষ্ঠ, যাহার সাধনার ফল শ্রীরামচন্দ্র, তাঁহার কথা কয়জন ভাবে’।
নজরুলের সঙ্গে বরদাচরণের প্রথম দেখা হয় মুর্শিদাবাদের নিমতিতায়। একটি বিয়ের আসরে। সেখানে বরদাচরণ শিক্ষকতা করতেন। সেই প্রসঙ্গে নজরুলের মন্তব্য, ‘শুভক্ষণে-আনন্দবাসরে আমার সেই ধ্যানের দেবতাকে পাইলাম।‘ সময়টা কবিপুত্র বুলবুলের মৃত্যুর সামান্য কিছুদিন পরে বলেই মনে হয়। বরদাচরণের কথায় কবির মন শান্ত হয়েছিল। নজরুল বিশ্বাস করতেন, মৃত বুলবুলের সঙ্গে তাঁর দেখা করিয়ে দিয়েছিলেন বরদাচরণ। ‘পথহারার পথ ও দ্বাদশ বাণী’ বইয়ের ভূমিকায় নজরুলের কথায়, ‘..ধর্মরাজ আমার পুত্রকে শেষবার দেখাইয়া হাসিয়া চলিয়া গেলেন’। গভীর বেদনার সময়ে কবির এই উপলব্ধির বিরুদ্ধে এখানে কোনও যুক্তিবাদী প্রশ্ন করতে চাই না। এই ঘটনার উল্লেখের কারণ শুধু এই, কাজী নজরুলের উদারতা, সব ধর্মকে সমান চোখে দেখার এই শিক্ষা আজকের সময়ে অতীব জরুরি। ঈশ্বরে আস্থা যার যার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু আজকের ধর্মীয় বিদ্বেষের যুগে কাজী নজরুলের এই যে ধর্মের বেড়াবিহীন ঈশ্বর ভাবনা, তা এক নতুন মানুষের কথা বলে।
কাজী নজরুল ইসলামের একটি অজানা দিকের উপর আলোকপাত হয়েছে এই লেখায়।