লাল উলের নরম বলের মতো গড়ানে সূর্যটা আবার বেরিয়ে এসেছে কুয়াশার ঝুড়ি থেকে। সেই প্রাকৃত রমণীয় অস্থির আঙুলে ঘড়ির কাঁটার মতো উলের কাঁটা দুটো পরস্পর ঠোঁটে ঠোঁট লাগিয়ে যে ঘন ওমের বাসা বানাচ্ছিল ক্যালেন্ডারের সীমানা ছুঁয়ে তাতে এখন ফুটে উঠেছে জীবনের নতুন প্যাটার্ন। বড়দিন এসে পড়েছে গির্জায় গির্জায় ঘন্টাধ্বনি তুলে। কলকাতার খাবার টেবিলে চলে এসেছে নতুন বাজারের কেক, আর রঙবেরঙের গরম জামা। ঘরে ঘরে মণিমুক্তোখচিত রূপকথার অলৌকিক গাছ। বিশ্ববন্ধু স্যান্টা ক্লজ তাঁর তুষারশুভ্র মূর্তি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন চিরকালের শিশুর স্বপ্নরাজ্যে। চিরকালের শিশুর সেই কলকাতা, সেই সাহেব জমানার বড়দিন, সেই চৌরঙ্গির চতুরঙ্গ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেই শিশু নেই, শৈশব নেই, শিশুর পিতারাও অদৃশ্য হয়ে গেছেন পথের বাঁকে। শৈশবের সেই বিস্ময় হারিয়ে গেছে চিরকালের মতো। দিন দুনিয়া বদলে গেছে বিলকুল। পৌষ মাস এখন বাঙালীর জীবনে সর্বনাশের সূচনা ছাড়া কিছু নয়। আমাদের ছেলেবেলার সঙ্গে এই ছেলেবেলার কত ফারাক সেই কথাটাই আবার মনে পড়ল। একদিন কবির অভিযোগ ছিল, রেখেছ বাঙালী করে মানুষ করনি। আজকে মনে হয় তাদের শুধু যে মানুষ করা হয়নি তাই নয়, তাদের বাঙালী করাও হয়ে ওঠেনি বোধহয়।

খেলার জগৎটাও ছিল আজকের দিনের চেয়ে একেবারে আলাদা। ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টনের র্যাকেট হাতে ধরতে পারলেও, বেশি সংখ্যায় খেলনা ছিল না। রিমোট কন্ট্রোলে রোবট নাচেনি, মোবাইল বা স্মার্ট ফোন কী বস্তু আমরা জানতাম না। রং-বেরঙের কাচের কিংবা নকশা পাথরের মার্বেল, ডাংগুলি, লাট্টু, জলছবির সঙ্গে আমাদের পরিচয় ছিল। কেমন ছিলাম আমরা? বোধহয় ভালোই ছিলাম। আমরা সবাই যে গরীব ছিলাম তা নয়, কিন্তু গরীবীআনা ছিল। খানাপিনায়, পোশাকে প্রাচুর্য ছিল না, প্রশ্রয় ছিল না, পক্ষপাতী স্নেহাধিক্য ছিল না। অভাব ছিল অবশ্যই তবে অভাববোধ ছিল না। কাকা-কাকিমা, জ্যাঠা-জ্যেঠিমার শাসন ও সোহাগ উভয়ই ছিল। বাবা-মা ড্যাডি-ম্যামি হয় নি। সিঙারা সামোসা হয়নি, পান্তুয়া গোলাবজামুন হয় নি। তবে নিয়ম মেনে এখনের মতো তখনও কলকাতায় বড়দিন এসেছে। সঙ্গে এসেছে শাল, মাফলার, নরম বিছানা, উষ্ণ আমেজ, উষ্ণ পানীয়, উষ্ণ সান্নিধ্য। জোর আড্ডা। সান্ধ্য মজলিশ। মধুর রোদে পিঠ রেখে চৈলচর্চা। বহুতর খাদ্যের আয়োজন। শীত আসে ধনীকে সুখের ছোঁয়া দিতে। খাইয়ে দাইয়ে ভ্রমণ করিয়ে তৈল চিক্কন শরীরটিকে হাঁসফাঁস গ্রীষ্ণের হাতে তুলে দেবার আগে সামান্য আয়েস। শীতকাল আর শীতলতা আমাদের এই গরম দেশে বড় আদরের বড় বিলাসের জিনিস। বিলেতের লোকেরা সাদর অভ্যর্থনা বোঝাতে বলেন ‘ওয়ার্ম ওয়েলকাম’ বা ‘ওয়ার্ম রিসেপসান’। আর আমাদের চন্ডীদাস তাঁর মনের মানুষকে বলেছিলেন — ‘শুন রজকিনী রামী / ও দুটি চরণ শীতল বলিয়া / শরণ লইনু আমি।’

শীতের পড়ি-পড়ি ভাব অনেক জিনিস দিয়েই টের পাওয়া যায়। যেমন দিন ছোট, রাত বড় হওয়া, কার্তিকের শিশির ভেজা ঘাস, বাজারে ফুলকপি আর শীতের আনাজের উঁকি-ঝুঁকি। এই সময় মগ দিয়ে ঠাণ্ডা জল মাথায় ঢালবার আগে হাতটা দু-চার বার আপনিই থেমে যায়। গরমকালের মতন রবীন্দ্রনাথের ভাষায় সূর্য অস্তাচলে গেলে পশ্চিম দিগ্বধু আর সোনার স্বপন দেখে না। বরঞ্চ কোলরিজের কথাই সত্যি — দি সানস রীম ডীপস/ দি স্টারস রাশ্ আউট/ অ্যাট ওয়ান স্ট্রাইড কামস্ দি ডার্ক। অর্থাৎ সূয্যি ‘গবাস’ করে ডুবতেই — সব অন্ধকার।

যদিও একশ বছর আগের বাঙালিদের স্মৃতি কথা আর অজস্র শীতের বিবরণ পড়ে মনে হয় দৈর্ঘ্য আর তীব্রতার দিক থেকে শীত আগের তুলনায় কমে গেছে। ব্যাপারটির তুল্য-মূল্য বিচার আবহাওয়া দপ্তরের নথিপত্র দেখলেই নিঃসন্দেহে যাচাই হয়ে যায়। রাজনারায়ণ বসু তাঁর আত্মচরিতে লিখেছিলেন যে, তিনি ছেলেবেলায় গাঁয়ের বয়স্কদের মুখে শুনেছিলেন, তাঁদের ছোটবেলায় বোড়ালে ঘোর শীতে ভোরবেলায় ঘাসে জল জমে সাদা সাদা হয়ে পড়ে থাকত। তবে পরশুরামের নকুড়মামার মতন চিরকালই কিছু শীত-কাতুরে বা শীতভীতু লোক থাকত যাদের শীতের আধিক্যের কথা সাক্ষ্য হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না। নকুড়মামা দার্জিলিংয়ের গরমকালের ঠাণ্ডায় তিতিবিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, ঠাণ্ডা চাইলে ত’ লোকে কলকাতায় এক মণ বরফ কিনে তার ওপর অয়েলক্লথ পেতে শুয়ে থাকতে পারে, আর উঁচু চাইলে তালগাছে ওঠে না কেন।

পক্ষান্তরে না গিয়ে আবার ফিরে আসা যাক বড়দিনের কথায়। বিগত কয়েক বছর সারা বিশ্ব-জুড়ে বড়দিনের বড়-ব্যাপারও একটু ফিকে বৈকি! এখনতো আবার আমরা করোনা নামক মহামারির কবলে পড়েছি। করোনার কারণ সন্ধান করতে গিয়ে ও তার আগমন কী ভাবে হলো বা কোন শক্তিধরের জন্য হলো — এই নিয়ে তর্ক-বিতর্ক, যুক্তি-প্রতিযুক্তি দেখে মনে হয়, নিৎসের কথাই ঠিক, ঈশ্বর মারা গেছেন। পশ্চিমের যীশু, প্রাচ্যের বুদ্ধ, শ্রীচৈতন্য, মার্টিন লুথার, মহাত্মা গান্ধি নিউক্লিয়ার যুগে পট্টবস্ত্রের মতো। ঈশ্বর এখন আমেরিকা আর চিন। বিশ্বের দুই স্তম্ভ-শক্তি। মন্দির নয়, মসজিদ নয় ঈশ্বর এখন ক্যাম্পে বসবাস করছেন। যীশু একালে ইনটেলেকচুয়াল সিম্বল। বুদ্ধিজীবীরা সাহিত্যে, সিনেমায়, মানুষের যন্ত্রণা বঞ্চনা বোঝাতে গিয়ে ক্রুশবিদ্ধ যীশুর মূর্তি তুলে ধরেন। শ্রীচৈতন্যের উত্তোলিত বাহু প্রেম স্নিগ্ধ মুর্তি আমাদের দেয়ালের ক্যালেন্ডারে, তবু বধু হত্যা, নারী নির্যাতন বন্ধ হয় নি। এ কার কৌশল জানা নেই, বা জানা থাকলেও কিছু করার নেই, যে কোন কারণে দেশে দেশে আর দেশের ভেতরে নিজেদের মধ্যে লাগাতার একটা যুদ্ধ, ধর্ম বিদ্বেষ আর রাজনৈতিক অস্থিরতা চলতেই থাকছে। বিভিন্নতা আর বিচ্ছিন্নতাকে দাবার ঘুঁটি করে কথায় কথায় নিরীহ মানুষ মারার চাল চেলে কিস্তি মাতের চেষ্টা চলছে। গুটি কতক ব্যবসায়ী দেশের অধিকাংশ সম্পদের মালিক হচ্ছে। ব্যাঙ্কের সুদ কমছে, জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। তারপরেও দামী রেস্তোরাঁ আলোর মালা পড়ে বড়দিনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। কাঁচের জানালায় সান্টাক্লস বিদ্যুতায়িত হয়ে সাইকেল চালাচ্ছে। তবে ফুটপাথের শিশু হাত পাতলে তার মোজা থেকে কোনও উপহার বেরচ্ছে না। যীশু জানতেন, মঙ্গলকামী মুক্তি সন্ধানীর পুরস্কার — একটি ক্রুশ ও চারটে গজাল পেরেক।
বাস্তব কে তুলে ধরে দারুন লেখা হয়েছে। আমি অভিনন্দন জানাই স্বর্ণাভা কা৺ড়ার কে।