ইস্কুল থেকে ফিরেই হইচই করে যে মেয়ে একেবারে বাড়ি মাতিয়ে তোলে আজ সে কেন এত চুপচাপ!
করবী গাছের ডাল থেকে অল্প ঝুঁকে খোঁজ খবর নিচ্ছিল কাঠবিড়ালি বউ — হ্যাঁ গো, শুনছো! মেয়েটার হলো কি?
— তাইতো!
তিনটে শালিক উঠোনে প্রতিদিনের মতো কিচিরমিচির করতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালো। তারা তো অবাক!
— কোনো সারা শব্দ পাচ্ছি না যে! এমন তো হয় না কোনদিন! মিষ্টু বিড়াল টাও যেন হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, — আজব ব্যাপার!
মা সামনে এসে দাঁড়াতেই চোখ ছল ছল করে উঠলো মেয়ের। ছুট্টে গিয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরল।
— কি হয়েছে ঝুম সোনা, কেউ কি বকেছে ইস্কুলে?
— আচ্ছা মা, তুমি কি জানো বড়োলোক কাকে বলে? আমরা কি কোনদিনও বড়োলোক হতে পারবো না?
কথা শুনে মা তো অবাক!
— দেখো মেয়ের কান্ড। এই নিয়ে এত মন খারাপ? এসব কথা কে বলল তোকে?
— জানো মা, আজ বাংলা ক্লাসের খাতা দেখতে দেখতে স্যার আমার হাতের লেখা দেখে খুব খুশি হয়েছেন। তখনই খাতাটা সবাইকে দেখিয়ে বলেছেন, দেখো এইভাবে লিখতে হবে। তারপরেই টিফিনের সময় সুমন আমাকে জিজ্ঞেস করছিল, ওদের মত আমাদেরও গাড়ি আছে কিনা। আমি বললুম, — না তো।
— ইশ! গাড়ি নেই? তাহলে তোদের ওয়াশিং মেশিন আছে, ইনভার্টার?
— না। আমার বাবার শুধু অনেক বই আছে, আলমারি ভর্তি বই।
হো হো করে হেসে উঠেছিল সুমন — বই দিয়ে কী হবে? শোন, তোর হাতের লেখা যতই ভালো হোক কিছুতেই তুই বড়োলোক হতে পারবি না কোনদিনও। বুঝলি?
— সত্যি মা? আমাদের তো ওসব কিচ্ছু নেই। তাহলে?
— ধ্যাৎ, বোকা মেয়ে। বড়োলোক হয়ে কিচ্ছু হয় না। আসল কথা হল বড়ো মানুষ হওয়া। যারা অনেক পড়াশোনা করে, যাদের মন অনেক বড়ো হয়ে যায়, যারা মানুষের জন্য কিছু করতে চায় তারাই বড়ো মানুষ। গাড়ি বাড়ি এসব দিয়ে বড়ো মানুষ হওয়া যায় নাকি?
ঝুম কি বুঝলো কে জানে! ইস্কুল থেকে ফিরে অব্দি মনটা ভারী হয়ে ছিল। এবার মায়ের কথায় যেন খানিকটা হালকা হল।
সন্ধ্যেবেলা পড়তে বসে মা যেই কথাটা তুললেন, বাবা তো হেসেই অস্থির। মেয়েকে আদর করে কোলে বসিয়ে তিনি বললেন, — ওই যে দেওয়ালে কার ছবি বলো তো? স্বামী বিবেকানন্দ। সারা জগতের মানুষ তাঁকে জানে। কেন বলো তো? আকাশের মত বড়ো তাঁর মন, আর পর্বতের মতো উঁচু ওই মানুষটা। জগতের সবাইকে এক কথায় ভাই বোন বলে কাছে টেনে নিতে পেরেছিলেন তিনি। মানুষের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিতে পেরেছিলেন। তাইতো আজও আমরা তাঁকে মনে রেখেছি। তাঁর কিন্তু গাড়ি, ওয়াশিং মেশিন এইসব কিছুই ছিল না। কিংবা এইসব ছিল কিনা তা জানবারও দরকার মনে করেনি কেউ।
ঝুম বোধহয় একটু লজ্জাই পেয়ে গেল নিজের বোকামতে। বাবাকে এইজন্যেই এত ভালো লাগে তার। বাবা কত কিছু জানে, আর এত সুন্দর করে বুঝিয়ে দেয়। ঝুম মনে মনে ভাবলো, সেও কিছু একটা করবে। হয়তো মহাপুরুষের মতো অত বড়ো কিছু সে করতে পারবে না। কিন্তু একদিন সে তার নিজের মতো করে ছোটখাটো অথচ দারুণ কিছু করবে। কিন্তু কি যে করবে ভেবে পায় না কিছুতেই।
দেখতে দেখতে বেশ কয়েকটা মাস কেটে গেল। ঝুম এ বছর ফাইভে উঠেছে। সেদিন নবীন বরণের অনুষ্ঠান হচ্ছে ওদের ইস্কুলে। কি মজা! অবশ্য এই ইস্কুলে সে নতুন আসেনি। কেননা এখানে প্রাথমিক আর মাধ্যমিক স্কুল দুটো একেবারে লাগালাগি। একটাই খেলার মাঠ। তাই হঠাৎ দেখলে একটা স্কুল বলেই মনে হয়। তবু নবীনবরণ বলে কথা! তাছাড়া আরও একটা সুখবর আছে। ওদের ইস্কুলের বিজয় মালিক এবারে মাধ্যমিকে জেলায় প্রথম হয়েছে। তাকে সম্বর্ধনা দেওয়া হবে। অনুষ্ঠানে ঝুম একটা কবিতা আবৃত্তি করবে। রবীন্দ্রনাথের ‘বীরপুরুষ’। মা-বাবা সবাই এসেছেন অনুষ্ঠান দেখতে।
বিজয়কে নিয়েই আলোচনা সবার মুখে মুখে। খুব কষ্ট করে লেখাপড়া করেছে ছেলেটা। ওর বাবা নেই কিনা! মা অনেক কষ্ট করেছে ছেলের লেখাপড়া চালানোর জন্য। সেই ছেলে আজ এত ভালো রেজাল্ট করেছে, ভাবতেই ভালো লাগছে সবার। অনুষ্ঠান শুরুর পর বিজয় সম্পর্কে এইসব কথাই বলছিলেন হেড স্যার। তারপর তাকে ফুল, উপহার আর মানপত্র দিয়ে তার দিকে মাইক এগিয়ে দিলেন তিনি। এবার সে কিছু বলবে। বিজয় প্রথমে স্যারদের কথা বলল। তাঁরা ইস্কুলে খুব যত্ন করে পড়িয়েছেন, অন্য সময়ও পড়া বুঝিয়ে দিয়েছেন, উৎসাহ দিয়েছেন। স্যারদের কাছ থেকে এত সাহায্য আর ভালোবাসা পেয়েছে যে কোনদিন ভুলতে পারবে না তাঁদের কথা। সে তার মা -র কথা বলল, এত গরিব তারা তবু মা খুব কষ্ট করে তার পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন। দিনরাত তার জন্য পরিশ্রম করেছেন, তবু পড়া বন্ধ করতে দেয়নি। তারপর বলল — আজ যার কথা সবচেয়ে বেশি করে বলতে ইচ্ছে করছে সে হলো আমাদের এক ছোট্ট বোন পায়েল, পায়েল বসু। আমি ফর্ম ফিলাপের টাকা জোগাড় করতে পারছিলাম না। খুব চিন্তায় পড়েছিলাম সেই সময়। আমার বন্ধুদের কাছে গল্প করেছিলাম সেই নিয়ে। সেই কথাটাই কিভাবে জেনে একদিন লুকিয়ে আমার হাতে চারশো টাকা দিয়েছিল। বলেছিল, টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে জমিয়েছে। আমি প্রথমে নিতে চাইনি। লজ্জা হচ্ছিল খুব। ওইটুকু মেয়ের কাছ থেকে টাকা নিতে কারো ভালো লাগে, বলুন? আমি না করতেই এমন অভিমানে তাকালো আমার দিকে! দেখি ওর চোখ দুটো জলে ভরে গেছে। ভারী কষ্ট হচ্ছিল আমার। তাই বাধ্য হয়ে — আসলে টাকাটা আমার খুব দরকারও ছিল। ওটা নিতেই সারা মুখ একেবারে আলো হয়ে উঠল তার। সে যে কি খুশি হল কি বলবো! সেই থেকে সব সময় তার সেই হাসি মুখটা শুধু মনে হতো আমার। ভয় হত, যদি রেজাল্ট খারাপ হয়! ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াবো কি করে? দিনরাত চেষ্টা করেছি — কিছুতেই হেরে যাওয়া চলবে না। ওর জন্যেই লড়বার শক্তি পেয়েছি মনে মনে। তাই আজকের এই খুশির দিনে আমার এই উপহার আমি আমার সেই প্রিয় বোনের হাতে তুলে দিতে চাই, যার জন্য আমি পরীক্ষাটা দিতে পেরেছিলাম।
এতকিছু তো জানা ছিল না কারো! সব শুনে হেড স্যার এগিয়ে এলেন। হঠাৎ আনন্দে তাঁর চোখ দুটো যেন ভিজে এলো। তিনি মাইকের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
— পায়েল আমাদের গর্ব। সে যে এত বড়ো একটা মন পেয়েছে, ভাবতেই আমাদের বুক ভরে উঠছে। তার মতো ছাত্রী পাওয়া ভাগ্যের কথা। সে অনেক বড়ো হোক, মানুষের মত মানুষ হোক, আমরা প্রাণ ভরে তাকে আশীর্বাদ করছি। পায়েল তুমি মঞ্চে উঠে এসো।
সবাই একেবারে চুপ। তখন দারুন লজ্জায় যেন কুঁকড়ে গিয়ে ধীরে ধীরে মঞ্চে উঠে আসছে ঝুম। সে কোন রকমে একবার শুধু মুখ তুলে তাকালো দূরে বসে থাকা তার বাবার দিকে। কি খুশি যে লাগছে বাবাকে! কেবলমাত্র ঝুমের বন্ধুরাই নয়, সারাটা ইস্কুল প্রচন্ড হাততালিতে যেন একেবারে ফেটে পড়ছে তখন। শুধু সুমনকে আর দেখা গেল না কোত্থাও!
অসাধারণ সুন্দর । ভীষণ ভালোই লাগল। অসীম শুভেচ্ছা।
খুব ভাল। বড় লোক আর বড় মানুষের পার্থক্যটা গল্পের মাধ্যমে খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। অশেষ ধন্যবাদ ও শুভ কামনা প্রিয় লেখককে।