শীত : “মাঘের সূর্য উত্তরায়ণে পার হয়ে এল” — চলি।
বসন্ত : কেন তুমি যাবে কেন?
শীত : আমাকে তো যেতেই হবে, আমি তো বেশী দিনের জন্য আসি না এখানে।
বসন্ত : আমি তো এখনও যাই নি, তবে ভাবলাম, তোমার সঙ্গে দেখা হবে, তাই এবারে যাবো ভাবছি। আর তুমি এখনই চলে যাবে?
শীত : তোমার সঙ্গে দেখা হলেই আমি চলে যাব, তার আগে নয়, আসলে কি জানো? আমি না গেলে, তোমার আসাটা সম্পূর্ণ হয় না।
বসন্ত : কি যে বল!
শীত : ওমা! ভুল তো বলি নি। দেখছ না, চারিদিকে শুধু এখন পাতা ঝরাচ্ছি আমি, যাবার সময় হল বলেই তো, সব কিছু ত্যাগ করতেই হবে আমাকে। আমি পাতা ঝরাবো, তবেই না নতুন পাতারা তোমার অভ্যর্থনার জন্যে তৈরী হবে। পত্রে-পুষ্পে তোমার অর্ঘ্য তো সাজাতে হবে তাদের।
বসন্ত : জানো, এই যে প্রতি বছর তুমি চলে যাও, ঠিক এই সময়টাতে আমার মন খুব খারাপ লাগে। সারা বছর তো অপেক্ষা করি, তোমার সঙ্গে দুটো প্রাণের কথা বলব বলে। অথচ এমনই ব্যাপার — আমি পা বাড়ালেই তুমি যাই যাই কর।
শীত : ঠিক বলেছ, কি জানো। আমি চলে যাই তোমার আসন সাজানো হবে বলে। সবাই তো আমি আসলেই জবু থবু হয়ে পড়ে — তাই এই যাবার সময় আমি সকলকে একবারে ঝেড়ে-মুছে দিয়ে যাই — যাতে তোমার জন্য তারা আনন্দে মশগুল হয়ে উঠতে পারে। হাজার হোক্, তুমি তো আমাদের বসন্ত সখা।
বসন্ত : হু, সে তো ঠিক। তবুও ব্যথা জাগে মনে। কেবল মনে হয় বিদায় বেলার মালাটা তোমার গলায় পরাবার আগেই তুমি যেন কেমন চঞ্চল হয়ে যাও, মুখ ফিরিয়ে নাও আমার দিক থেকে।
শীত : এভাবে কেন বল? আমার কষ্ট হয় না? তোমার পায়ের নূপুর বাজে যখন, তখনই তো আমি যাই। আমি তো শুনতে পাচ্ছি তোমার নূপুরের আওয়াজ।
বসন্ত : আমি এত নিঃশব্দে আসি, তুমি কি করে বোঝো বল তো?
শীত : ওগো, তোমার পদধ্বনি আমি না শুনলে, বুঝলে কি চলে?
বসন্ত : আচ্ছা, শোনো — তোমার পাতা ঝরানো কি শেষ হয়ে গেল?
শীত : বাঃ, পলাশের লাল আভাস কি চোখে দেখতে পাচ্ছো না? নিজের এত রঙ বলে, তুমি কাকে ছেড়ে কাকে দেখবে, তাই নিয়েই মেতে আছো।
বসন্ত : সম্পূর্ণ রঙ ধরতে আরো দু-টো দিন সময় দাও।
শীত : তোমার সময় থাকলেও, আমার নেই গো। আমাকে যেতে হবে। তোমার এখন সাজবার সময়, সাজো, সকলকে সাজাও। খেলা তোমার শুরু হল — আমাকে বিদায় দাও। তোমার স্পর্শ পেলাম কাল বিকেলে।
বসন্ত : পেয়েছিলে না কি ? তবু-ও তোমার মন ভার কেন ?
শীত : “না চাহিলে যারে পাওয়া যায় তেয়াগিলে আসে কাছে, দিবসে সে ধন হারায়েছি আমি পেয়েছি আঁধার রাতে”।
বসন্ত : জানো, কাল শশধর কানে কানে কি বলল আমায় ? বলে কি — “নিবিড় অমা-তিমির হতে বাহির হলো জোয়ার-স্রোতে শুক্ল রাতে চাঁদের তরণী”
শীত : জানি বাবা, তোমার সব কথা জানি। তুমি সুন্দরের রাজা, তাই সকলেই তোমায় ভালোবাসে। তোমার নেশা সকলকে পেয়ে বসে। আনন্দ দান করা তো তোমার কাজ। দেখছ না, — সবার মন কেমন উঁচাটন হয়ে আছে !
বসন্ত : তোমার বুঝি অভিমান হয়েছে তাই ?
শীত : মোটেই না। আমি তো জানি আমি আসলেই আমার পিছনে পিছনে তুমিও আসবে। মান-অভিমান আমার নেই, তোমায় শুধু একটু কাছে পাবার আশা নিয়েই আমার সারাবছর কেটে যায়।
বসন্ত : এসো তবে। ভালো থেকো। তোমার যাবার পথে আর বাধা হয়ে দাঁড়াবো না।
শীত : তুমিও ভালো থেকো। রাঙিয়ে নিও তোমার আপন রঙে সকলকে। ফুলে ফুলে ভরে দিও তোমার সৌরভ।
বসন্ত : তথাস্তু। দেখা হবে বেলা শেষের প্রহরে। আবার এসো, — এসে আমার প্রাণে প্রদীপের আলো জ্বেলে দিও।
“আজু, সখি, মুহু মুহু গাহে পিক কুহু কুহু,
কুঞ্জবনে দুঁহু দুঁহু দোঁহার পানে চায়।
যুবনমদবিলসিত পুলকে হিয়া উলসিত,
অবশ তনু অলসিত মুরছি জনু যায়”।
শীতের বিদায় ও বসন্তের আগমনী বার্তায় দুজনের এক অসাধারণ সংলাপ।