বসিরহাটের ধান্যকুড়িয়ার জমিদার বল্লভদের পেল্লাই অট্টালিকা রয়েছে বেলগাছিয়া রোডে আর জি কর হাসপাতালের কাছে। এঁদের মূল ব্যবসা ছিল পাট আর নুনের। তিনশ বছরের পুরনো ধান্যকুড়িয়ার মূল রাজবাড়িটিও অপরূপ স্থাপত্যের নিদর্শন। আবার প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ১৮১৮-এ কোম্পানির লবণ-দেওয়ানের চাকরি পান বসিরহাটের বাগুণ্ডি গ্রামে। বল্লভদের বেলগাছিয়া রোডের খালপারের নুনের গুদামগুলি পরিত্যক্ত অবস্থায় এখনও আছে। শ্যামবাজারের গায়েই বেলগাছিয়ার এই নুনের গুদামগুলি। ‘শ্যাম’ মানে সামুদ্রিক লবণ, ‘বসির’ মানেও সামুদ্রিক লবণ। এক জায়গায় বাজার, এক জায়গায় হাট।
অর্থাৎ শ্যামবাজার যদি নুনের বাজার হয়, বসিরহাট নুনের হাট। দ্বারকানাথ ঠাকুর বেলগাছিয়ার বাগানবাড়ি এক ইতালীয়র কাছ থেকে কেনেন ১৮২৩ সালে। উদ্দেশ্য ছিল ব্যবসা বাড়াতে ইউরোপীয় সাহেবসুবোকে পানভোজনে আপ্যায়িত করা। বেলগাছিয়ার এই খাল দিয়ে ইছামতীতে পড়া যায় কিনা জানি না, তবে ইছামতীর তীরে টাকির জমিদার কালীনাথ রায়চৌধুরীর আতিথ্য নিতেন দ্বারকানাথ, বাগুণ্ডিতে গেলেই। এদিকে ধান্যকুড়িয়ার জমিদার বল্লভরাও বেলগাছিয়ার নুনের গুদামে নুন মজুত করতেন। তা বিক্রি করে ফুলে ফেঁপে উঠলেন। বৌবাজারের বিশ্বনাথ মতিলাল এখান থেকেই নুন নিতেন। শ্যামবাজার আর বসিরহাটের মধ্যে নুনের একটা হটলাইন ছিল, এটা বেশ বোঝা যাচ্ছে!
কলকাতার ভাগীরথী-তীরে নুনের গন্ধ পেতে গেলে ঠকতে হবে। কলকাতা শহরের ঢাল পশ্চিম থেকে পূর্বে। পূর্বদিকে অতি প্রাচীনকাল থেকে আছে সল্ট ওয়াটার লেক। আদিগঙ্গাই ছিল তখন গঙ্গার মূলস্রোত। ১৭৭৫-এ মেজর টালি আদিগঙ্গাকে বিদ্যাধরী নদীর সঙ্গে যুক্ত করেন। এই বিদ্যাধরীর সঙ্গে মিশেছে ইছামতী। দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত বঙ্গোপসাগরমুখী এই বিদ্যাধরী। এই নদী দিয়েই সম্পন্ন হত লবণবাণিজ্য। একটি জার্মান গবেষকদল সুন্দরবনে তিনশ বছরের পুরনো লবণকারখানা খুঁজে পেয়েছেন। এই সব অঞ্চলে সমুদ্রের জল থেকে তৈরি হত লবণ। বিদ্যাধরী ও ইছামতী দিয়ে সেই নুন উত্তরে চলে আসত। শ্যামপুর, শ্যামবদল, বসিরহাট, শ্যামবাজার , শোভাবাজার, বড়বাজারে বিক্রি হত সেই নুন।
১৯৩৪ এর আগে পর্যন্ত সল্ট লেকের ধাপা থেকে পোর্ট ক্যানিং পর্যন্ত বিদ্যাধরীর নাব্যতা ছিল। যার ফলে স্বদেশী আন্দোলনের সময় সল্টলেকের মহিষবাথানের প্রামাণিকদের নেতৃত্বে যে লবণসত্যাগ্রহ হয়, সেটি সম্ভবপর হয়েছিল। বিদ্যাধরীর লোনাজল ফুটিয়ে এলাকার লোক নুন তৈরি করত গত শতকের তিনের দশকেও। ‘বসির’ শব্দের অর্থ সামুদ্রিক লবণ। বসিরহাট হল ইছামতীর তীরে লবণব্যবসার মোকাম। দ্বারকানাথ ঠাকুরের প্রথম সরকারি পোস্টিং ছিল নিমকদেওয়ান হিসেবে বসিরহাটের বাগুন্ডিতে। ‘শ্যাম’ শব্দটির অর্থও সামুদ্রিক লবণ। গোসাবার শ্যামপুর, সল্টলেকের চৌবাগা অঞ্চলের শ্যামবদল আর কলকাতার শ্যামবাজারে নুনের আড়ত ছিল।
১৭৮০ তে বড়লাট ওয়ারেন হেস্টিংস নুনের উপর কর চাপালে দেশি নুন তৈরি আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে যায়। শুরু হয় বিলেতি নুনের রমরমা। বৌবাজারের বিশ্বনাথ মতিলাল, শ্যামবাজারের বসুপরিবার, কাঁচরাপাড়ার অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির পূর্বপুরুষরা এই বিলেতি নুনের কারবার করতেন। কলকাতার নুনের কথা একদিনে বলে শেষ করা যাবে না। রাধারমণ মিত্র কলিকাতা-দর্পণে কলকাতার পুরনোকালের বেশ কয়েকটি সরকারি নুনের চৌকির কথা উল্লেখ করেছেন।
বছর কুড়ি আগে যখন বসিরহাট নিয়ে কাগজে লিখি তখন বসিরহাটের ব্যুৎপত্তি নিয়ে আবোলতাবোল তত্ত্ব ছিল উইকিপিডিয়া ও বইগুলিতে। বসির খানের হাট, বসুর হাট, বাঁশের হাট ইত্যাদি নানারকম উদ্ভট তত্ত্ব ছিল সেখানে। বসির মানে যে সামুদ্রিক লবণ, সেদিকে কোনও নজর ছিল না। এখন অবশ্য উইকিপিডিয়া বা স্থাননামের বইগুলি আমার তত্ত্বটিকে সাদরে গ্রহণ করেছে।