একুশের বাংলা বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল ভোটে জিতে তৃতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার পর সর্বভারতীয় রাজনীতিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গুরুত্ব অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে। গেরুয়া শিবির বাংলা দখলে মরিয়া হয়ে উঠেছিল ঠিকই। কিন্তু একা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মোদী-শাহ-নাড্ডাদের সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন। তারপর থেকেই তৃণমূল সুপ্রিমো ও তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেস বাংলার সীমা পেড়িয়ে অন্যরাজ্যেও দলের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে তৎপর হয়ে উঠেছে।
বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর লক্ষ্য ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি সরকারকে কেন্দ্রের ক্ষমতা থেকে সরানো। সেই লক্ষ্য পূরণেই তৃণমূল প্রথমে নজর দিয়েছে ছোট ছোট রাজ্যের দিকে। ইতিমধ্যে ত্রিপুরায় পদক্ষেপ করেছে এরপর তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নজর পড়েছে উপকূলের রাজ্য গোয়াতে। আগামী বছর সেখানে রয়েছে বিধানসভা নির্বাচন। এখন আরব সাগর পারের সেই রাজ্যকে পাখির চোখ করেছে তৃণমূল। ইতিমধ্যেই তারা গোয়ায় প্রভাব জমাতে শুরু করেছে। সমুদ্র রাজ্যে ঘাসফুল ঝড় তুলতে আগামী ২৮ অক্টোবর গোয়া যাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
উত্তরবঙ্গ সফর সেরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গোয়া রওনা হবেন। সমুদ্র রাজ্যে সফরের আগেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় টুইটে লিখেছেন, “আগামী ২৮ অক্টোবর গোয়া সফরে যাচ্ছি। বিজেপিকে রুখতে প্রত্যেক দল, ব্যক্তি, সংস্থাকে এক হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।” মমতা আরও একটি টুইটে লিখেছেন, “আমরা সবাই একসঙ্গে গোয়ায় নতুন সরকার তৈরি করব। গত ১০ বছর ধরে গোয়ার মানুষ অনেক কষ্ট সহ্য করেছে। নতুন সরকার গোয়ার মানুষের মন বুঝে উন্নয়নের লক্ষ্যেই কাজ করবে।” মমতার এই বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন যে তৃণমূল সুপ্রিমো এটাই বুঝিয়ে দিতে চাইছেন যে তাঁর দল গোয়াতে বিজেপির জন্য কতটা চাপ বৃদ্ধি করতে চলেছে। সেই সঙ্গে গোয়ার মাটিতে পা রাখার পর গোয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে সেকথাও মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
একদিকে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে মমতার নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করা অন্যদিকে বিজেপি শাসিত সমস্ত রাজ্যে তৃণমূলের সংগঠনকে মজবুত করা। এই দুটি লক্ষ্যে মমতা এগিয়ে চলেছেন। আগামী বছরেই গোয়ায় বিধানসভা নির্বাচন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপি শাসিত এই রাজ্যে তাঁর দলের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্য গোয়া বিধানসভা নির্বাচনের দিকে নজর রেখেছেন। মমতার গোয়া সফরে অনেকেই তৃণমূলে যোগদান করতে পারেন বলে জানা গিয়েছে। গোয়ায় তৃণমূলের অগ্রগতি শুরু হয় সমুদ্র রাজ্যের দু-বারের মুখ্যমন্ত্রী এবং সাতবারের কংগ্রেস সাংসদ লুইজিনহো ফালেরিও তৃণমূলে যোগদানের পর। তারপর একে একে অনেকেই গোয়ায় ঘাসফুল শিবিরে যোগ দেওয়া শুরু হয়ে যায়। মমতার সফরে গোয়া ফরওয়ার্ড পার্টি এবং মহারাষ্ট্রবাদী গোমান্তক পার্টি তৃণমূলে যোগ দিচ্ছে বলেও গুঞ্জন তৈরি হয়েছে। সেই চর্চার মধ্যে মমতা উপকূলীয় রাজ্যে পৌঁছতে চলেছেন। উল্লেখ্য, মমতার গোয়া সফরের আগে উপকূলীয় রাজ্যে একটি স্লোগান শোনা যাচ্ছে— ‘গোয়াঞ্চি নাভি শোকাল’ অর্থাৎ গোয়াতে নতুন সকাল।
ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন, সুখেন্দু শেখর রায়, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মন্ত্রী মনোজ তিওয়ারিকে উপকূলীয় রাজ্যে দলের এজেন্ডা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য গোয়ায় নিযুক্ত করেছেন। ধীরে ধীরে উপকূলের রাজ্যে মূল শক্ত করছে তৃণমূল। তাদের লক্ষ্য ৪০ আসনের নির্বাচনে জয়ী হওয়া। রাজনৈতিক মহল মনে করছে, লুইজিনহো ফ্যালেইরোর মতো অভিজ্ঞ এবং বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদকেই সর্বভারতীয় স্তরে রেখে এগিয়ে যেতে চায় তৃণমূল। বিজেপির সঙ্গে লড়াইয়ে যথেষ্ট অভিজ্ঞতাও রয়েছে ফ্যালেইরোর। আর সেই অভিজ্ঞতাকেই সর্বভারতীয় স্তরে বিজেপির বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে চান মমতা।
ইতিমধ্যে সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন মাটি কামড়ে সে রাজ্যে পড়ে রয়েছেন। এখন সে রাজ্যে প্রায় প্রত্যেকদিন যাতায়াত শুরু করেছেন একাধিক মন্ত্রীরাও। এবার সেই তালিকাতে যোগ হতে চলেছেন বাবুল সুপ্রিয়। জানা যাচ্ছে, বাবুল গোয়া দখলের ক্ষেত্রে গুরু দায়িত্ব পেতে পারেন। যে কারনে রবিবারেই তিনি গোয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হচ্ছেন। কথা যেমন এগচ্ছে তাতে স্থানীয় বেশ কিছু রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট বাঁধতে পারে তৃণমূল। আর সেই লক্ষ্যেই বাবুলের এই সফর বলে খবর। তারপরই উত্তরবঙ্গ থেকে গোয়ায় যাবেন মমতা। ২০২২-এ গোয়া বিধানসভা নির্বাচন যে বেশ হাড্ডাহাড্ডি হবে তা এখন থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
তৃণমূল নেত্রীর গোয়া সফরের আগেই লুইজিনহো ফালেইরোকে সর্বভারতীয় পদে বসিয়েছে তৃণমূল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোয়া সফরের ঠিক আগে ফালেইরোকে গুরু-দায়িত্ব দেওয়া রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত বলই মনে করছেন। জানা গিয়েছে, তৃণমূল আগামী সোমবার থেকে গোয়ায় বিধানসভা নির্বাচনের প্রচার শুরু করতে চলেছে। সেই প্রচারেও বেশ কিছু চমক থাকতে পারে বলে খবর। গোয়ায় জোর গুঞ্জন, ফালেইরোকে সামনে রেখেই এবার বিধানসভা ভোটে লড়বে তৃণমূল।