“আমার একটি মাত্র পরিচয় আছে। আমি কবি মাত্র।” — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কবিশ্রেষ্ঠ রবীন্দ্রনাথ বিশ্বের এক বিরাট বিস্ময়। রবীন্দ্রনাথের কাব্যে প্রতিফলিত হয় প্রাচীন উপনিষদ্, মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলী, কবীরের দোঁহা, লালন ও অন্যান্য বাউল কবিদের মানবতাবাদী গীতিকবিতা ও রামপ্রসাদ সেনের শাক্ত সাহিত্যের মর্মবাণী।
রবীন্দ্রনাথের জীবনধারায় প্রকৃতি যেন আবহমানকাল ধরেই কবির চিন্তাভাবনা অউপ্রেরণায় হাত বাড়িয়েছে। শিলাইদহ, সাজাদপুর ও পাতিসরে তাঁর আনাগোনা ও দিন কাটানো ত্রিস্রোতা পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার মতই প্লাবন ধারায় সিক্ত। রবীন্দ্রনাথ নিজেও বলেছেন, “আমার যৌবন ও প্রৌঢ় বয়সের সাহিত্য রস সাধনার তীর্থস্থান ছিল পদ্মাপ্রবাহ চুম্বিত শিলাইদহ পল্লিতে।” শিলাইদহ না থাকলে শান্তিনিকেতন হতো না, আবার শিলাইদহ না থাকলে হয়ত হতো না বাউলরবি — রবিবাউল গান।
বাউল দর্শন রবীন্দ্রনাথের চেতনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তিনি বাউল ফকিরদের গান শুনে আপ্লুত হতেন — নিজে শিলাইদহ ও ছেউরিয়া অঞ্চল হতে অনেক বাউল গান সংগ্রহ ও প্রচার করেছেন। তিনি বলেছেন, “আমার অনেক গানে আমি বাউলের সুর গ্রহণ করেছি এবং অনেক গানে অন্য রাগরাগিনীর সঙ্গে আমার জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে বাউল সুরের মিল ঘটেছে।” রবীন্দ্রনাথ যথাসাধ্য পরিমার্জনা করে ফকির লালন শাহের কুড়িটি গান সংগ্রহ করে সর্বপ্রথম প্রবাসী পত্রিকায় ১৯০৫ সালে (১৩১২ সনের আশ্বিন সংখ্যায় ‘হারামণি’ বিভাগে) প্রকাশ করেছিল।
তাঁর প্রায় ৬৬টি গান বাউল সুরের আঙ্গিকে রচিত। বাউল সঙ্গীতের ভাষার সরলতা, ভাবের গভীরতা ও সুরের আবেগ রবীন্দ্রনাথকে টেনে এনেছে বাংলার সোঁদা মাটিতে। ১৯১৬ সালে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর রবীন্দ্রনাথের একটি ছবি আঁকেন। ছবিটিতে দেখা যায় বাউল রবীন্দ্রনাথ একতারা হাতে বিভোর হয়ে নাচছেন। বাউলতত্ত্বে ‘সাধনা’র মূল বিষয় হলো দেহতত্ত্ব। দেহের ভিতর যে পরম সত্তার বাস, তাকে না চিনলে সাধনা সিদ্ধি লাভ হয় না। বাউলের গান আত্মতত্ত্ব, আত্মদর্শনের গান। বাউলের এই জীবনদর্শন এক সময়ে রবীন্দ্রনাথের জীবন দর্শনেও একাত্ম হয়ে গিয়ে কবি রবীন্দ্রনাথকে রবীন্দ্র বাউলে রূপান্তরিত করে ফেলে। কবি বাউলের গৈরিক বসনের রঙ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তাঁর শান্তিনিকেতনের রাঙা ধুলায়। আর লিখেছিলেন — গ্রামছাড়া ঐ রাঙা মাটির পথ, আমার মন ভুলায় রে … যেখানে আজও বাউল গেয়ে বেড়ায় কবির গান — আমার ভাঙা পথের রাঙা ধূলায় পড়েছে কার পায়ের চিহ্ন …।
রবীন্দ্রনাথের অনেক গানই বাউল গানের সুরে রচিত — একম কী “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি” বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতও ফকির লালন শাহের ভাবশিষ্য কুষ্টিয়ার গগন হরকরা তথা গগনচন্দ্র দাস রচিত “আমি কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যে রে”— এই বাউল গানটির সুর অবলম্বনে রচিত। রবি কবি সেই রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ-স্বাদ নিয়েই বুঝি আরও লিখেছিলেন — “আমি তারেই খুঁজে বেড়াই, যে রয় মনে আমার মনে” …। আবার বাউলগান — “দেখেছি রূপসাগরে মনের মানুষ কাঁচা সোনা” … এর অনুকরণে সৃষ্টির সাবলীলতায় তিনি রচনা করেছিলেন — “ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে …।” লাল ফকিরের দেহ সাধনা ও মন সাধনায় অনুপ্রাণিত হয়ে কবি লিখেছিলেন — “আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে …।”
রবীন্দ্রনাথ তাঁর গান নির্মাণে সুরের দুটি গাঢ় রঙ দিয়ে ছবি আঁকেন — রাগের সুরের রভ এবং কীর্তন — বাউল সুরের গ্রামীণ মেটে রং। রবীন্দ্রনাথ রাগের রঙে রাঙানো, গানের ছবিতে, কীর্তন-বাউল সুরের রঙের পাত্রে তুলি ছুঁইয়ে দিলেন দু-চার পোঁচ, হয়ে গেল এক অনির্বচনীয় সুরসঙ্করের আবির্ভাব। কখনও বা রাগের রঙে কীর্তন-বাউলকে এনে ডুবিয়ে নিলেন, কীর্তন-বাউল যখন উঠে দাঁড়াল তখন বাউল-কীর্তনের গেরুয়া-হরিদ্রায় এমন সুরের টান ধবল যা অশ্রুতপূর্ব রাগরঙিন। যেমন —
“আকাশ জুড়ে শুনিনু ওই বাজে ওই বাজে/তোমারি নাম সকল তারার মাধে।”
গানটি বেহাগের সুরে বাঁধা। বেহাগের চালটি ঠিক আছে, চলনটিতে এসেছে বাউল। আবার,
“আমার শেষ পারাণির কড়ি কণ্ঠে নিলেম/একলা ঘাটে রইব না গো পাড়ি।”
এটি খাম্বাজ রাগের সুরে ভর করে এসেছে বাউল। এত সুন্দর স্বাভাবিকভাবে এসেছে যে রাগের উচ্চাঙ্গতার গ্রামীণতার রূপ ধরতে কোথাও বাধে না।
স্বদেশী আন্দোলনের প্রবল উত্তেজনার মাঝে রবীন্দ্রনাথ একা ভিন্নপথে হাঁটার চেষ্টা করলেও স্বদেশী কবিতা ও সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে দেশবাসীর মনে আবেগ জাগাবার চেষ্টা করেন। আকস্মিক বন্যার মতো তাঁর গীতধারা উৎসারিত হলো। এর মধ্যে বহু গানই বাউলাঙ্গের। ১৩১২-র ভাদ্র ও আশ্বিনে তাঁর ১৫টি গান প্রকাশিত হয়, কার্তিক ও ফাল্গুনে আরও দুটি। গানগুলি হলো — এবার তোর মরা গাঙে বান এসেছে, যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে, মা কি তুই পরের দ্বারে, তোর আপন জনে ছাড়বে তোরে, ছি ছি চোখের জলে, যে তোরে ছাড়ে ছাড়ুক, যে তোরে পাগল বলে, ওরে তোরা নাই বা কথা বললি, যদি তোর ভাবনা থাকে ফিরে যানা, আপনি অবশ হলি তবে, জোনাকি কি শুখে ঐ ডানা দুটি, বাংলার মাটি বাংলার জল, ওদের বাঁধন যতই শক্ত হবে, বিধির বাঁধন কাটবে তুমি, ওরে ভাই মিথ্যা ভেব না, পূজার লগ্ন, এখন আর দেরী নয়।
“প্রায়শ্চিত্ত” নাটকের ধনঞ্জয় বৈরাগী এবং “ফাল্গুনী”র অন্ধ বাউলও আমাদের দৃষ্টি এড়ায় না। আবার শিলাইদহের পদ্মার তীরে বাউল সাধকের একতারা হাতে চলার দৃশ্য অমর হয়ে আছে কবির কবিতায় —
“কতদিন দেখেছি ওদের সাধককে
একলা প্রভাতের রৌদ্রে সেই পদ্মা নদীর ধারে।
যে নদীর নেই কোন দ্বিধা
পাকা দেউলের পুরাতন ভিত ভেঙ্গে ফেলতে
দেখেছি একতারা হাতে চলেছে গানের
ধারা বেয়ে
‘মনের মানুষকে সন্ধান করবার
গভীর নির্জন পথে।’
রবীন্দ্রনাথ আমাদের চিন্তায়, চেতনায়, মননে সব সময় জীবন্ত কিংবদন্তি হিসাবে আছেন। তিনি এমন কথাই বলে গেছেন, যা শুনলে মন উদাস হয়ে যায় —
“কে বলে গো, সেই প্রভাতে নেই আমি,/আসব যাব চিরদিনের সেই আমি।”
তাঁর মধ্যে বাউলদের মানবপ্রেমের ও ঈশ্বরপ্রেমের প্রভাব বিস্তার লাভ করেছে। তিনি হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বমানবতাবাদী, বিশ্বের কবি — বিশ্ব কবি ও বিশ্ব নাগরিক।