আমার ঘাড়ের ব্যথা আর সারল না। অনেক ডাক্তার-বদ্যি হল, হাজার টেস্ট, মায়ের পীড়াপীড়িতে এক সিদ্ধপুরুষের মন্ত্রপূত জলও খেলাম, মাদুলি ধারণ করলাম এক তান্ত্রিকের; কিন্তু কিছুতেই কিছু নয়…
হরেন স্যরও বলতেন, ঘাড় ব্যথা করবে; টাটিয়ে বিষ হয়ে যাবে ঘাড়…।
বলতেন, এঁরা সবচরিত্রের কুতুবমিনার, বুঝলে বাবা! নেতাজি, গাঁধীজি, রামমোহন, বিদ্যাসাগর— এঁরা সব! ক্যারেকটারগুলো ভাব এক বার— সৎ আদর্শবাদী অকুতোভয়— জীবনমৃত্যু পায়ের ভত্য…।
আমরা হাঁ করে শুনতাম।
রোজ এক বার করে মহাপুরুষের বাণী স্মরণ করাতেন। অন্ধকার রাতে ভয়াল দামোদর সাঁতরে পার হচ্ছেন বিদ্যাসাগর, গাঁধীজির অসহযোগ আন্দোলন, নেতাজির আজাদ হিন্দ ফৌজ, নির্ভীক ক্ষুদিরাম…।
বলতেন, কী সব ক্যারেকটার ভাব এক বার! কুতুবমিনার দেখেছিস, কুতুবমিনার? হুই উঁচু, ওপর পানে তাকালে ঘাড়ে ব্যথা করে… এঁরা সবচরিত্রের কুতুবমিনার।
‘হুই উঁচু’ বলার সময় স্যরের থুতনিটা ওপর দিকে উঠে যেত। পুরনো দিনের স্কুলবাড়ি আমাদের, উঁচু সিলিং। পলেস্তারা খসা সিলিং-এর দিকে দৃষ্টি ফেলে স্যর বলতেন উঁচু উঁচু মানুষ সব— ভারতমাতার সন্তান…।
তখন আমাদের ক্লাস নাইন; নাইন থেকে কো-এড-এ পনেরো জন নতুন মেয়ে ভর্তি হয়েছে। ক্লাসরুমের এক দিকে ছেলেরা, অন্য দিকে তিনটে বেঞ্চে পনেরো জন মেয়ে। লাল পাড় সাদা শাড়ি, লাল ব্লাউজ। ওই তিনটে বেঞ্চকে মরূদ্যান মনে হত; ঠাণ্ডা খুশবুওলা বাতাস বয়ে আসত ওখান থেকে; স্যর যখন সিলিং দেখতেন, আমার দৃষ্টি চকিতে ঘুরে আসত।
স্যর বলতেন, ছাত্রানাং অধ্যয়নং তপঃ। মনোসংযোগ চাই, অধ্যবসায় চাই; বুনো রামদাস তেঁতুল পাতার ঝোল খেতেন, রাস্তার আলোয় পাঠাভ্যাস করতেন বিদ্যাসাগর, ছ’মাস পড়ে আই সি এস-এ নেতাজি ফোর্থ। নিষ্ঠা চাই, নিষ্ঠা।
ইতিহাস পড়াতেন স্যর। নস্যি নিতেন ঘন ঘন। স্যরের উচ্চতা ছিল কম। মাগড়া পড়ে লালচে হয়ে আসা পাঞ্জাবির বুকপকেটে নীল কালির ছোপ। চেয়ারে আগডুম-বাগডুম হয়ে বসতেন। পাশে ছাড়া হাওয়াই চটির গোড়ালি আর বুড়ো আঙুলের কাছে দেবে গিয়ে অন্য রং উঁকি দিত।
অমিত পাত্রর বাবা ডাক্তার; মোটর সাইকেলে চেপে ডাকে যায়। ঝকঝকে সাইকেল নিয়ে স্কুলে আসে অমিত; টোস্ট, ডিমসেদ্ধ, সন্দেশ, আপেল টিফিন আনে। তখন চাউ, ম্যাগি, চিপস বা কুড়কুড়ে কী বস্তু জানতাম না কেউ। পাঁচ-দশ পয়সায় এই এতগুলো মৌরি দেওয়া টিকটিকি লজেন্স পাওয়া যেত; চকলেট জানতাম বড়লোকের ছেলেরা খায়।
টিফিন বেলায় অমিতের সাইকেলটা ভাগাভাগি করে চাপতাম আমরা।
স্যর পড়াতে পড়াতে মাঝে মধ্যে অমিতের পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন। বলতেন, আজ টিফিন কী আনলি অমিত?
অমিত বলত, নলেনগুড়ের সন্দেশ স্যর, খাবেন একটা?
নাহ্, ডাক্তার মিষ্টি মানা করেছে আমায়।
চকচকে স্টেনলেস স্টিলের চৌকো টিফিন কৌটো খুলে অমিত বাড়িয়ে বলত, খান না স্যর একটা, কিছু হবে না।
স্যর লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলতেন, না রে; তুই খাবি বলে এনেছিস…।
অমিত জোর করে সন্দেশ গুঁজে দিত হাতে। স্যর গোটা সন্দেশ মুখে পুরে একেবারে ক্লাসের পেছনে গিয়ে দাঁড়াতেন। তার পর বলতেন, সবাই বই খুলে দেখ…।
মুখে সন্দেশ তাই একটু মোটা শোনাত স্যরের কণ্ঠস্বর।
যে সময়ের কথা বলছি তখন মোটর সাইকেল আরোহীর দিকে লোকজন সম্ভ্রমের দৃষ্টিতে তাকাত, গ্রাম-মফস্সলে টিভি ছ্যা ছ্যা হয়নি, বিশ্বকাপ ক্রিকেট জেতেনি ভারত। হরেন স্যর অবশ্য ক্রিকেট নিয়ে মাথা ঘামাতেন না; স্যর ছিলেন ইস্টবেঙ্গল; কিন্তু গোষ্ঠ পালকে রেসপেক্ট করতেন খুব। বলতেন, কী প্লেয়ার ভেবে দেখ, সাহেবরা বুট পরেও ভয় পেত— দা গ্রেট ওয়াল অফ চায়না…
মেয়েরা স্যরের নাম দিয়েছিল কুতুবমিনার। জানতে পারলাম, তনিমার কাছ থেকে। তনিমা পাল, রোল নম্বর সেভেনটিন; ফর্সা রং, কপালের ওপর দলছুট কুঁচো চুল, নাকে নাকছাবি, হাসলে গালে টোল পড়ে। তনিমা অন্য কারও সঙ্গে হেসে কথা বললে বুকে জ্বালা ধরে আমার। তনিমা এক দিন বলল, আমরা হরেনবাবুকে কুতুবমিনার বলি। বলেই হি-হি করে হাসল তনিমা। হাসলে বড় অদ্ভুত দেখায় ওকে; দু’গালে দুটো টোল কোন গভীর থেকে ভেসে ওঠে; কেমন যেন ম্যাজিক মনে হয়; রহস্যময় ওই টোলে হারিয়ে যাই আমি। অমন বেঁটেখাটো মানুষটার নাম কুতুবমিনার; ভারী মজার কথা তো! আমারও হাসি পায়। আমি হাসি তনিমার সঙ্গে।
আমাদের থার্ড বয় সুমনের বাবা মারা গেল এক দিন হঠাৎ। মাঝরাতে বুকে ব্যথা, পরেশ ডাক্তার ইনজেকশন দিল; হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলল তার পর। অত রাতে কে আর নিয়ে যাবে। সকালে রিকশা আসার আগেই সব শেষ। পরেশ ডাক্তার বলল, হার্ট অ্যাটাক।
গরিব সুমনরা আরও গরিব হয়ে গেল।
পরদিন ইস্কুল ছুটির পর আমরা সুমনের বাড়ি গেলাম। গলায় ঝোলানো কালো লোহার চাবিটা টানাটানি করতে করতে সুমন বলল, আর পড়ব না; কাজে লেগে যাব।
আমরা অবাক হয়ে তাকালাম ওর দিকে।
পালিত বলল, কী কাজ?
এখনও ঠিক হয়নি। সুমন বলল, মামা যা বলবে; আমাকেই তো সংসার দেখতে হবে…।
রুক্ষ চুলের গুরুদশাগ্রস্ত সুমনকে কত বড় মনে হয়েছিল সে-দিন।
ক’দিন পর দেখি সুমন ফের স্কুলে। মাথা ন্যাড়া। আমরা ঘিরে ধরলাম— কী রে, বললি যে পড়া ছেড়ে দিবি!
সুমন বলল, হরেন স্যর মানা করেছেন।
তাই!
স্যর তো এখন আমাকে রোজ পড়াচ্ছেন।
সে-দিন স্যরের ক্লাসে হইচই হল না একটুও। স্যর নাকি বলেছেন, সংসারও সাধ্যমতো দেখবেন। আমরা স্যরকে দেখছিলাম; স্যরের কথা মন দিয়ে শুনছিলাম। স্যর বলছিলেন, এ ম্যান লিভস নট বাই ইয়ার্স, বাট বাই ডিডস। …বিবেকানন্দ বেঁচেছিলেন মাত্র উনচল্লিশ বছর; ডিরোজিও তেইশ বছর…।
আমার অবশ্য তখন সবই ওলট-পালট। তনিমার হাসিমুখ, রহস্যময় টোল, ফর্সা কপালে ছটফটে দস্যি চুল, আমার ইংরিজি টেনস, ভয়েস
সব ঘেঁটে দিল, উপপাদ্য প্রমাণ করতে গিয়ে গোলকধাঁধায় পথ হারিয়ে ফেললাম, ব্যাঙের পৌষ্টিকতন্ত্র আঁকতে গিয়ে দেখি কী করে যেন তনিমার মুখ হয়ে গেছে।
এ সবের মধ্যেই এসে গেল পরীক্ষা। সংস্কৃত বই থেকে শব্দরূপ ধাতুরূপ ছিঁড়ে পকেটে রেখে দিলাম। পলাশের মোটাসোটা চেহারা; ওর চওড়া পিঠের আড়াল নিয়ে সবেমাত্র ভাঁজ করা কাগজটা বের করেছি, অমনি দেখি সামনে কুতুবমিনার।
ছিঃ ছিঃ, বাবলু, নকল করছ তুমি!
আমার মাথা হেঁট।
আমাকে তুলে আনলেন সামনের বেঞ্চে। ফের বললেন, ছিঃ ছিঃ!
সে-বার পরীক্ষায় আমার যাচ্ছেতাই রেজাল্ট। গার্জেন কল হল। সংশোধনের জন্যে মামার বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হল আমায়।
পরীক্ষায় ফার্স্ট হল সুমন। মার্কশিট নিয়ে প্রথমেই প্রণাম করল স্যরকে। ওর মাথার চুল তখন বড় হয়ে গেছে। স্যর মাথায় হাত দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে বিড়বিড় করে কী যেন বললেন।
মামার বাড়ি মানিয়ে নিলাম ধীরে ধীরে। দিদিমার আস্কারা, মেজমামার কড়া শাসন, মাইমার অবহেলা— এ সবের মধ্যে পড়াশোনা, খেলা, লুকিয়ে সিগারেট খাওয়া। এমনিতে বাড়ির কথা মনে পড়ত কম; যেটুকু মনে পড়ত, তা তনিমার কথা। ওর টানেই মাঝে মাঝে ছুটে যেতাম।
ফাইনাল পরীক্ষায় মাঝারি রেজাল্ট হল। মাঝারি রেজাল্ট খুব গোলমেলে, মানুষকে বড় দ্বিধায় ফেলে দেয়; পড়াশোনায় ইতি টানতে মন কেমন করে, আবার বড় কোনও দরিয়ায় নৌকো ভাসানোর মুরোদ থাকে না।
কলেজে পাস কোর্সে ভর্তি হয়ে বাড়ি গেলাম। শুনলাম, দুর্দান্ত রেজাল্ট করে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেছে সুমন। দেখলাম, আমাদের স্কুল বিল্ডিং দোতলা হচ্ছে, বাজারের রাস্তাটা পাকা হচ্ছে, ইস্কুল মাঠের ছোট কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়া গাছ দুটো বেশ বড় হয়ে গেছে। ইংরিজিতে কম্পার্টমেন্টাল পেয়েছে তনিমা।
তনিমার সঙ্গে দেখা করলাম। তনিমা বলল, বাড়িতে বলছে বিয়ে দিয়ে দেবে; ছেলে দেখছে।
কলেজে ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লাম। কিছু দিনের মধ্যেই কেউকেটা নেতা। আমার কর্মপরিধি অনেক বিস্তৃত এখন; আমার তাজা এবং ঝাঁঝালো বক্তৃতার সুনাম চার দিকে। ছাত্র-স্বার্থে আমাদের লড়াইয়ের কথা স্মরণ করাই, শিক্ষাক্ষেত্রে সুস্থ পরিবেশের অঙ্গীকার করি, বুর্জোয়া শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে ফেলার আহ্বান জানাই। অধ্যাপকরা আমাকে সমীহ করেন, ছাত্রছাত্রী অনর্গল তোয়াজ করে, যখন তখন প্রিন্সিপালের ঘরে ঢুকে যেতে পারি আমি।
আমার এত ক্ষমতা, তবুও তনিমার বিয়েটা আটকাতে পারলাম না।
খুব ধনী এক পরিবারে বিয়ে হয়ে গেল তনিমার।
কাজলপুরের পিছুটান অনেকটা ক্ষীণ হয়ে গেল, আরও বেশি করে আন্দোলন, অবরোধ-বিক্ষোভে জড়িয়ে পড়লাম। আরও ছড়িয়ে পড়ল আমার খ্যাতি। প্রায় এক বছর পর গেলাম বাড়িতে।
এক বছরে আরও বদলে গেছে কাজলপুর। ব্যাঙ্ক হয়েছে একটা; চূড়ায় ত্রিশূল লাগানো বিশাল মন্দির বাজারের পাশে, নতুন রং হয়েছে কাজলপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের।
একেবারেই মন টিকল না কাজলপুরে। এক দিন থেকেই ফিরে এলাম। বাসস্ট্যাণ্ডে পলাশের সঙ্গে দেখা। পলাশ পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে এখন পারিবারিক মুদির দোকান সামলাচ্ছে।
ওর কাছেই শুনলাম তনিমার বরের মোটর গাড়ি আছে; মাঝে মাঝে সেই গাড়ি চেপে আসে তনিমা।
পলাশ দুঃখ করল, তোরা সব আছিস বেশ; আর আমাকে দেখ, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ডাল-তেল-নুন ওজন করতে করতে চলে যাচ্ছে, কিন্তু কারবারে কোনও উন্নতি নেই— আসলে ক্যাপিটাল বড় না হলে…।
বাসে উঠে পড়েছি, হঠাৎ পলাশ বলল, শুনেছিস তো?
কী?
হরেন স্যরের খবর?
না তো! আমি অবাক।
সুমনের মায়ের সঙ্গে জোর চলছে…।
আমি তো হাঁ।
বাস ছেড়ে দিয়েছে তখন; মনে মনে বললাম, শালা কুতুবমিনার!
দু’মাস পর ফের কাজলপুর গেলাম। দেখলাম, স্কুলমাঠে কৃষ্ণচূড়া রাধাচূড়া গাছ দুটোয় দেদার ফুল; ভেলভেটের মতো হয়ে আছে গাছের তলাটা— কাজলপুরে বদল বলতে এটুকুই। এ ছাড়া ছ’মাস আগের কাজলপুরই হুবহু আছে; শুধু হরেন স্যরের কেচ্ছাটা আরও জবজবে হয়ে উঠেছে। সুমন হস্টেলে, তবু স্যর যখন-তখন চলে যায় ওদের বাড়ি। স্যরের বাড়িতেও নাকি বিস্তর অশান্তি।
পরের দিন বিকেলবেলা কালুদার চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছি; পুরনো কয়েক জন জুটেছে, হঠাৎ টুবাই বলল, ওই দেখ…!
দেখলাম হরেন স্যর যাচ্ছেন। সেই লালচে হয়ে যাওয়া ধুতিপাঞ্জাবি। একটু যেন রোগা হয়ে গেছেন।
টুবাই বলল, কুতুবমিনার চলেছে অভিসারে।
একটু মজা করতে ইচ্ছে হল। বেশ চিৎকার করে বললাম, স্যর কোথায় যাবেন?
স্যর একটু থামলেন। বলল, বাবলু না! কবে এলে?
আমি বললাম, এ দিকে কোথায় যাচ্ছেন স্যর?
এই একটু কাজ আছে। স্যর এড়িয়ে গিয়ে বললেন, পড়াশোনা মন দিয়ে করছ তো?
কী কাজ স্যর? একটু বিকৃত গলায় বলল টুবাই।
শব্দগুলো যেন স্যরের পিছনে ধাক্কা দিয়ে গতি বাড়িয়ে দিল হঠাৎ। হন হন করে হাঁটতে লাগলেন স্যর।
সবাই জোরে হেসে উঠলাম।
স্যর এক বার তাকাল আমার দিকে। একটু ঘৃণা, দৃষ্টিতে। আমি সেই সে-দিনের ছিঃ শব্দটা শুনতে পেলাম যেন।
সন্ধে পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে উঠলাম আমরা। কুনাল বলল, স্যর কি আজ রাতে সুমনের মায়ের কাছে থেকে যাবে নাকি?
খেয়াল হল, সত্যিই তো; স্যর এখনও ফিরলেন না!
ছিঃ শব্দটা কানে ভাসছিল আমার; রাগও বাড়ছিল। সন্ধের পর শুনলাম দোকানে রাজ্যের মোদো মাতালের আড্ডা। লোক খ্যাপাতে আমি ওস্তাদ; কত সামান্য ব্যাপারে তুলকালাম বাধিয়ে দিই এখন; এই গুণই আমাকে এত ওপরে তুলেছে; আর এটা তো রীতিমতো ওজনদার একটা বিষয়। ওদের বললাম, মাস্টার লোক হয়ে যদি এমন অনাচার করে; তোমাদের ছেলেপুলেরা কী শিক্ষা পাবে!
পরের ঘটনাবলি ঘটল হুবহু আমার পরিকল্পনা মতোই।
হইহই করে একদল লোক ঘিরে ফেলল সুমনদের বাড়ি। চিৎকার-চেঁচামেচি সঙ্গে যথেচ্ছ গালিগালাজ। মোদ্দা দাবি— ভদ্রলোকের পাড়ায় এ সব অন্যায় বরদাস্ত করা হবেনা।
কাজলপুর অনেক দিন পরে বেমক্কা একটা উৎসব পেয়ে গেল। গ্রাম উজাড় করে লোক জড়ো হল আমোদ দেখতে।
হরেন স্যর মাথা হেঁট করে বেরিয়ে এলেন। মাটির দিকে চোখ রেখেই ওই বিষাক্ত ভিড় ঠেলে যেতে হল তাকে। বিষে চোবানো তির ছুটে এল সাঁইসাঁই করে—
জামাই মুখটা একটু তোলো…
ছেলের মুখেভাতে যেন নেমন্তন্ন হয়…
এক একটা তির আরও একটু করে যেন অবশ করে ফেলছিল স্যরকে। একটু যেন টলমল করছিলেন স্যর; মনে হল যে কোনও সময় পড়ে যাবেন।
আমি গলা চড়িয়ে বললাম, ছিঃ!
একটু চমকে উঠলেন স্যর। গলাটা বোধ হয় চিনতে পেরেছিলেন।
মা অনেককরে দুটো দিন থাকতে বলল; কিন্তু সম্ভব নয়, সামনেই কলেজে ইলেকশন— প্রচুর কাজ। পর দিন সকালে বাসস্ট্যাণ্ডে দাঁড়িয়ে আছি, সোজা কলেজে যাব, হঠাৎ দেখলাম অনেকেই স্কুলের দিকে ছুটছে। চোখে-মুখে উত্তেজনা। শুনলাম, হরেনস্যর সুইসাইড করেছেন।
আমিও দৌড়ালাম।
স্কুলে পৌঁছে দেখলাম, একটা ঘরের সামনে ছোটখাটো ভিড়।
আগের দিন রাতে বাড়িতে ঢুকতে দেয়নি ছেলেরা; দু’এক জন বলল, স্যরকে এ-দিকে আসতেও দেখেছে তারা।
ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম।
উঁচু সিলিং থেকে ছোটখাটো মানুষটা ঝুলছে। স্যরের উচ্চতা কম; তাই টেবিলের ওপর চেয়ার বসিয়ে ফাঁস বাঁধতে হয়েছিল। চেয়ারটা মুখ থুবড়ে অসহয়ায় ভাবে পড়ে আছে এক পাশে। ঘরে বেশ দুর্গন্ধ; কেউ এক জন বলল, পাইখানা করে ফেলেছে—
চোখগুলো ঠিকরে বেরিয়ে আসছে স্যরের।
আবছা আলোয় দেখলাম, অক্ষিগোলক দুটো থেকে ছোট্ট দুটো শব্দ ছিটকে আসছে আমার দিকে।
ঘাড় উঁচু করে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম আমি। একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলাম। শব্দ দুটো পড়ছিলাম বার বার।
কতক্ষণ এ ভাবে ছিলাম মনে নেই। বোধ হয় অনেকক্ষণ। কেউ এক জন আমাকে টেনে বের করে আনল ঘর থেকে।
বাইরে এসে দেখলাম স্কুলমাঠ লোকে লোকারণ্য।
পুলিশের জিপ এল একটা।
আমি ধীরে ধীরে ফের বাসস্ট্যাণ্ডে চলে এলাম। এক ভাবে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ধরে গিয়েছিল আমার পাগুলো; হাঁটার সময় একটু এলোমেলো পড়ছিল। ঘাড়ের কাছটা ব্যথা করছিল; ভাবলাম, এক ভাবে অতক্ষণ ঘাড় উঁচু করে দাঁড়িয়েছিলাম, তাই ব্যথা ঘাড়ে…।
দিন-মাস-বছর গেল। আস্তে আস্তে পায়ের ছন্দ ফিরে পেলাম। ঘাড়ের ব্যথাটা কিন্তু গেল না আমার। রাজনীতির দৌলতেই চাকরি পেলাম এক দিন; বিয়ে করে সংসারী হলাম। কত বদলে গেল কাজলপুর; স্কুল বিল্ডিং তিন তলা হল, স্কুলে বিদ্যুৎ এল, কম্পিউটার বসল।
পৃথিবীতে কম্পিউটার না জানা লোকের সংখ্যা ক্রমশ কমতে লাগল।
প্রচণ্ড এক কালবৈশাখীতে রাধাচূড়া গাছটা পড়ে গেল, হেডস্যর গোলকবাবু রিটায়ার করে হোমিওপ্যাথি প্র্যাক্টিস শুরু করলেন, রাজনীতির সঙ্গে যোগাযোগ দিনে দিনে ক্ষীণ হয়ে এল আমার।
এত কিছুর মধ্যে ঘাড়ের ব্যথাটা কিন্তু গেল না আমার। মাঝে মাঝে তীব্র হয়।
স্বামীর সঙ্গে মিলমিশ নেই; তাই দু’মেয়ে নিয়ে তনিমা এখন এখানেই থাকে। মাঝে মাঝে দেখা হয়। প্রথম দিকে একটু দ্বিধা ছিল, আস্তে আস্তে কেটেও গেল তা। তনিমা বলে, যাস না বাবলু এক দিন বাড়িতে…।
রোজ ভাবি যাব; যাওয়া হয় না।
এক দিন চলেই গেলাম বিকেলে। বেশ জীর্ণ দশা ওদের বাড়িটার; বোঝা যায় মেরামত হয়নি বহু দিন।
তনিমা দাঁড়িয়ে ছিল দরজায়। দেখে আমি খুব অবাক হয়ে গেলাম। ও কি জানত, আমি আজ আসব? জিজ্ঞেস করতে হাসল তনিমা।
তনিমার সঙ্গে গিয়ে ওর ঘরে বসলাম। কত গল্প হল। স্কুলবেলার গল্প।
তনিমা বলল, কুতুবমিনার যে এ’রম করবে, কে জানত বল… আমি তো তখন শ্বশুরবাড়ি… পরে এসে শুনেছি…।
হঠাৎ তনিমার ডাকে চমকে উঠলাম। এতক্ষণ রাস্তাতেই দাঁড়িয়ে আছি আমি। তনিমার দরজার বাইরে এসে ডাকছে আমায়। ওরা ভয় পেয়ে গেছে খুব। তনিমার বড় মেয়ে আমাকে অনেকক্ষণ বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে; ভেবেছে কোনও বদ লোক।
তনিমা বলল, এত দিনে তোর সময় হল, আয় ভেতরে…।
না থাক, অন্য এক দিন যাব।
তনিমা অবাক হয়ে বলল, ওমা, তাই আবার হয় নাকি!
কিছুক্ষণ চুপ করে তনিমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম আমি। তার পর বললাম, খুব শরীর খারাপ লাগছে রে, ঘাড়ে বড় ব্যথা…।
ভ্যাট, বাজে কথা।
তনিমার শত অনুরোধেও ঢুকলাম না ওদের বাড়ি। ফিরে আসার সময় এক বার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম। তনিমা স্থির মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। খুব অবাক হয়ে গেছে মনে হয়।
আমি অবশ্য তনিমাকে দেখছিলাম না। কেবল বোঝার চেষ্টা করছিলাম, তনিমাদের বাড়িটা একদল ক্ষিপ্ত মানুষ ঘিরে ধরলে কেমন দেখাবে।