চৈত্র শেষ হয়ে বৈশাখের শুরু হয়ে গেছে। বাংলার পথে প্রান্তরে ব্রতের সমারোহ। লিঙ্গপুরাণ, বৃহদ্ধর্মপুরাণ এবং ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ অনুযায়ী বৈশাখ মাসের মূল আরাধ্য দেবতা হলেন দেবাদিদেব মহাদেব। মহাদেবের সঙ্গে অন্যান্য দেবদেবীও পুজিত হন এই সময়। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন সূর্যদেব। জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুসারে সূর্য হলেন সৌরমণ্ডলের রাজা। সেই কারণেই সূর্যের পূজা করলে নবগ্রহের রোষ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। সূর্য পূজা করলে জীবন সুখ শান্তি ও সমৃদ্ধিতে ভরে ওঠে। পশ্চিমবঙ্গের কিছু অঞ্চলে, পূর্ববঙ্গে (মূলত চট্টগ্রামের আনোয়ারা অঞ্চলে) বৈশাখ মাসে সূর্য পূজিত হয় বেলভাতা নামে। আর তাঁকে উদ্দেশ্য করে যে ব্রতটি অনুষ্ঠিত হয় তার নামই বেলভাতা ব্রত বা কাল-বেলকুমার ব্রত।
সূর্যদেবের সঙ্গে ব্রহ্মা-বিষ্ণু, শিব-দুর্গা-সরস্বতী সবারই বন্দনা করা হয়েছে এই ব্রত কথাতে। অর্থাৎ সব দেবতাকেই প্রণাম জানিয়ে এই ব্রতের শুভারম্ভ।
“প্রণমোহ গিরিসুতা-সূতের পদেতে।
প্রণমোহ সূর্যদেব বন্দিয়া শিরেতে ।।
সরস্বতী দেবী বন্দম ভকতি করিয়া।
গুরুর চরণ বন্দম যুগপানি হইয়া।।
ব্রহ্মা-বিষ্ণু শিব দুর্গা বন্দিয়া শিরেতে।
ত্রিভুবন দেব বন্দম হইয়া হরসিতে।।
অষ্ট লোক পাল বন্দম করি পরিহার।
মাতা পিতার চরণেতে করি নমস্কার।।”
বৈশাখ মাসে যে কোন রবিবার দিন সূর্য পূজা শেষে পুরোহিতের এই ব্রতের ‘পূর্ণা’ দেন। ব্রতের দিন ব্রতিনী আত্মীয়-স্বজন নিয়ে একসঙ্গে আহার করেন। ব্রতি কিছু পদ রান্না করে, আহারের পূর্বে একটি কলা পাতায় কিছুটা ভাত ঘি ও সেই ব্যঞ্জন, দুটি জবা ফুলের মালা দুটি বাঁশে ঝুলিয়ে কোন পুকুরের পাড়ে পুঁতে বা রেখে দেয়। একে বেলভাতা বাড়ানো বলে। ব্রতিনী সেদিন একবেলা আহার করেন। বেলভাতা বাড়ানোর পর কেউ কেউ দিনে দুবার, কেউ কেউ একবার আহার করেন। তবে সূর্যাস্তের পর আহার গ্রহন নিষিদ্ধ। প্রচলিত বিশ্বাস বেল বা বেলায় অর্থাৎ সূর্যকিরণে ভাত খাওয়া হয় বলে এর নাম বেলভাতা। লোকবিশ্বাস এই ব্রত পালন করলে ধন-সম্পদের সঙ্গে পুত্র সন্তানও লাভ হয়। ব্রতের একটি পাঁচালী আছে, তার গদ্যরূপে এরকম —
সত্যযুগে এক নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ ছিলেন। ঘরে অন্নের অভাব ছাড়াও বড় দুঃখের কারণ ছিল ব্রাহ্মণের — তিনি সন্তানহীন। সন্তান লাভের আশায় দেবদেবী পূজা অর্চনা করতেন। অবশেষে একদিন ব্রাহ্মণের মুখে হাসি ফুটিয়ে দেবতা কৃপায় ঘরে একটি কন্যা সন্তানের জন্মদান ব্রাহ্মণী। কন্যাটি সামান্য বড় হলে ব্রাহ্মণীর হঠাৎ মৃত্যু হয়। বৃদ্ধাবস্থায় ব্রাহ্মণ কন্যাকে আঁকড়ে বেঁচে থাকে। ধীরে ধীরে কন্যা বিবাহযোগ্য হলে দরিদ্র ব্রাহ্মণের চিন্তার শেষ থাকে না। বিবাহের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ পাবে কোথায়? মনে মনে বিধির কাছে প্রার্থনা করলেন উদ্ধারের জন্য।
একদিন ব্রাহ্মণ যখন ভিক্ষা করতে গেছেন, সন্ন্যাসীর বেশ ধরে বিধাতা নিজেই উপস্থিত হলেন ব্রাহ্মণের গৃহে। ভিক্ষা দিতে এলো ব্রাহ্মণ কন্যা। তাকে দেখে সন্ন্যাসীর বেশ ভালো লাগলো। তিনি নিজের শরীরের তেজযুক্ত ঘাম ব্রাহ্মণের কুটির বাইরে নিক্ষেপ করলেন। সেই ঘাম থেকেই দ্রুত লালশাকের চারা গজিয়ে উঠলো। ব্রাহ্মণ কন্যা লোভাতুর হয়ে সেই চারা তুলে নিয়ে এসে রান্না করে খেলেন। কিছুদিনের মধ্যেই তার শরীরে গর্ভের লক্ষণ ফুটে উঠলো। কুমারী মেয়ের গর্ভের লক্ষণ গুরুতর অপরাধ তাই রাজা তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করলেন।

এক শুভক্ষণে ব্রাহ্মণ কন্যা দুটি সুন্দর দেখতে যমজ শিশুর জন্ম দিল। জন্মগ্রহণ করেই তার দুই পুত্র মাকে বললেন, তারা জন্মেছেন ধরণীতে পূজা লাভ করতে। তাঁরা হলেন কাল ও বেলকুমার। ব্রতীনিরা বৈশাখ মাসের যে কোন রবিবার ব্রত পালন করবে। যেদিন ব্রত পালন করবে সেদিন, আম দিয়ে লালশাক রান্না করে অবশ্যই খাবে। একটি কাঠের আসনে ফুল ও দূর্বা দিয়ে ঘট স্থাপন করবে। ব্রতের আগে গণেশ পূজা, তারপর ষোড়শোপচারে পূজা। রান্না করা অন্ন দুটি ভাগে ভাগ করে এক ভাগ জলাধারে দেবে এবং বাকি অন্ন সকলে ভাগ করে খাবে। যে সকল ব্রতীনিরা সমস্ত বৈশাখ মাস ধরে ব্রত করবে তাদের সম্পদ ও পুত্র সন্তান লাভ হবে।
এই বলে কাল ও বেলকুমার মায়ের কাছ থেকে রাজার কাছে চলে গেলো। সেখানে রাজাকে স্বপ্নে নিজেদের পরিচয় দিয়ে ব্রাহ্মণকন্যা কে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়ার আদেশ দিলেন। কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন ব্রাহ্মণকন্যা। রাজা ও রানী সেই ব্রত পালন করে সম্পদ ও পুত্র সন্তান লাভ করেন। সেই থেকেই এই ব্রতের শুরু। পয়লা বৈশাখ থেকে শুরু করেন শনি, মঙ্গলবার ছাড়া সোম, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্রবার এই ব্রত পালন করা হয় এবং প্রতিপদ দেখে বেলকুমারকে ভোগ দিয়ে এই ব্রতপুজো শেষ করেন।
মেয়েদের পালিত ব্রত অনুষ্ঠানের মধ্যে আদিম জনমানসের ইতিহাস লুকানো রয়েছে। ব্রতের কাহিনীর উপর নানামুনির আঁচড়, নানা দিকথেকে নানা জঞ্জাল পড়েছে, তাই অনেক ক্ষেত্রেই সঠিকটা জানা সম্ভব হয় না। ব্রতের সঙ্গে মিলিত হয়েছে হিন্দুর শাস্ত্রীয় অনুষ্ঠান। ব্রতের ছড়ার মধ্যে দিয়ে নারীর সতীত্ব রক্ষা, পুত্রের কামনা, সংসারে মঙ্গল অর্থাৎ নারীর আদিম কামনাগুলি মূর্ত হয়ে ওঠে।
বেলভাতা ব্রত পালনের সম্ভাব্য লক্ষ্য হলো, ঋতু পরিবর্তনের প্রভাবে উপবাসে থাকলে শরীর-স্বাস্থ্য ভালো থাকে। গ্রীষ্মকালে খাদ্যতালিকায় গাঢ় রংয়ের লালশাক খাওয়া খুবই উপকারী। শরীরে আয়রণ, ভিটামিন-এ, প্রোটিন, খনিজের চাহিদা মেটায় লালশাক। ব্রত উপলক্ষে মেয়েদের বছরের ফল (বিশেষ করে আম) ও অন্যান্য জিনিস খাওয়া হয়। সংসারের কর্মব্যস্ততার মধ্যে বিশ্রাম লাভ করা হয়। সর্বোপরি সকলের মনে ভক্তি, একাগ্রতা, ত্যাগ, তিতিক্ষা, নিয়ম, সংযম ও নিষ্ঠার আদর্শ গড়ে ওঠে।
ছবি সৌজন্য : মুন দাশ, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ।
খুব ভালো লাগলো।