ওপারে চরগাঁ। অন্ধকার! এপারে শহর। আলো ঝলমল! নদীর কূলজুড়ে উত্তরে-দক্ষিণে টানা নতুন রাস্তা। একেবারে মেইন রোড সমান্তরাল। লোকমুখে এই নতুন রাস্তার নাম বাঁধের রাস্তা। এই রাস্তার এমাথা-ওমাথায় নদীর ওপরে দুইখানা বিরিজ। আহা, কী চমৎকার! বিরিজের ওপরে আলো। মাঝনদীতে থাকলে সরাসরি সে আলো দেখা যায়। কিন্তু গফুর এতক্ষণে এপারের কমলে-কামিনী ঘাটের দিকে। সেখানে কিছুক্ষণের জন্য পানসি ভেড়াবে। নামে কমলে-কামিনী ঘাট, কিন্তু লোকে বলে বেমরতা ঘাট। এই ঘাটে এখন গফুরের কোনো কাজ নেই, তবু যদি হাজি সাবের মিলের ম্যানেজার নকুল বাবুরে পায়, তো দিন তিনেক আগে দেওয়া মাছের দাম চাইতে পারত। যদিও গফুর জানে, দাম আইজকে দেবে না। কবে (বলবে), ‘কাইল বাদে আসিস। কাইল হাটবার, সারা দিন খাটাখাটনি কইরে দেহি তোর ওই কয়ডা মাছের দাম দিতি পারি নাই (নাকি)?’ আসলে ঘুরানোর ধান্দা! টাকাপাতি হলি আবার মাছ দেও, তারপর পুরনো মাছের দাম নেও। শালার হিন্দুবেটার মাথায় যে কত পদের বুদ্ধি! ঠিলেয় অত বুদ্ধি না থাকলি হিন্দু মানুষ হইয়ে হাজির মিলে ম্যানেজারি করতি পারে?
গফুরের পানসি ততক্ষণে প্রায় ঘাটের কাছে। তখন হাজির মিলের সামনের চত্বর থেকে একজন বলে, ‘বাবু নেই, আইসে করবি কী?’
জোয়ার আসছে। স্রোত উল্টো দিকে। ভালোই হলো, গফুরকে আরো হাত পঞ্চাশেক উজানে বাইতে হলো না। নৌকোর মুখ ঘুরিয়ে এখন সে রত্নাচম্পার ঘাটে উঠবে। একবার ভেবেছিল, উঠবে ডাকবাংলো ঘাটে। ডাকবাংলো ঘাটে সব সময় সরকারি বোট বাঁধা থাকে। এমনিতে ওটা নৌকো বাঁধার ঘাটও না। তবে আশপাশে নদীর পাড়ের কোনো শেওড়াগাছে চাইলে নাও বাঁধা যায়। জোয়ারের সময় নাও বাঁধতেই সুবিধা। ভাটিতে আজকাল পানি যা নামে, তাতে লম্বা দড়ি ছাড়া ওখানে নাও বাঁধা যায় না।
ডাকবাংলো ঘাটের খানিক দক্ষিণে লঞ্চঘাট। তারপর আরেকটু নামায় রত্নাচম্পা, আরো বাদে কমলে-কামিনী ঘাট। গফুর উল্টো এই পথটুকু আসতে আসতে ভেবে নিল, লঞ্চঘাটে নাও ভেড়াবে, নাকি রত্নাচম্পায়। লঞ্চঘাটে নাও ভেড়ালে তাকে একটু হেঁটে রত্নাচম্পা ঘাটে আসতে হবে। রাস্তার উল্টো পাশে ম্যারাডোনা মোকসেদের দোকানে এক কাপ চা তাকে আজ খেতেই হবে। পরশু কী কাজে মোকসেদ ওপারে গিয়েছিল, চরগাঁর ঘাটের কাছে তখন গফুর একের পর এক বড়শি গেঁথে নৌকোয় উঠবে। মোকসেদ ঘাটের নৌকো থেকে ডাঙায় উঠতে উঠতে বলেছিল, ‘ও বিয়েই, তোমার বড়শিতে মাছ বাদে কিরম?’ বলে, গফুরের উত্তর শোনার আগেই আরো যোগ করে, ‘একদিন কয়ডা মাছ দিলি পারতা, খাইয়ে দেখতাম কেমন স্বাদ তোমার মাছের!’
সম্পর্কে বেয়াই মোকসেদ এ কথা বলতেই পারে। কিন্তু গফুরের কেন যেন মনে হয়, সঙ্গে সে একটু খোঁচাও দিয়ে দিল। সারা দিন এই নদীতে বড়শি-বাওয়া গফুর, অন্য সব মানুষের মতন বলতে গেলে কোনো কাজই করে না। সবাই বলে, অকম্মা গফুর। খালি আছে কথায় যোগ্যতা! আর পারেডা কী? সেই গফুরকে বেয়াই হোক কী ভায়রা হোক, মানুষ একটু খোঁচাবেই, তাতে গফুরের হয়রান হলে চলে?
গফুর হয়রান হয়ও না। মাছ ধরা নিয়ে সেই ছোটকাল থেকেই সে প্রায় অক্লান্ত। এই নদীর পানিতে বড়শি ছেড়ে অথবা বড়শি ছাড়তে ছাড়তে একটু উত্তরে-দক্ষিণে নাও ভাসিয়ে দিয়ে ওপরের আকাশে চোখ মেলে তাকাতে যে কী মজা-এপারের চরগাঁ গ্রামের আর ওপারের টাউনের মানুষজনের সে যদি বোঝাতে পারত!
যদি এখন বোঝাতে পারত কোনো দিন বাম পায়ে গোল দিতে না-পারা তার গ্রাম সম্পর্কে বেয়াই ওই ম্যারাডোনা মোকসেদকে। এখন তো চাইলেই মোকসেদকে বলতে পারত, ‘তা বিয়েই দেখাও তো তোমার খেলা, মাইনসি যে কী জন্যি তোমারে ম্যারাডোনা মোকসেদ কয়?’ কিন্তু কথায় যতই যোগ্যতা থাক, সময়মতো কথা হাতড়ে না-পাওয়া গফুর এখন অবশ্য মোকসেদকে বলতে পারল না কিছুই। বরং গাঙের কূলে যেভাবে দাঁড়িয়ে আরেকটি দিনের মাছ ধরার শুরু করতে চাইছিল, তা-ই করে। আর মাথাখানা নিচু করে রেখে মোকসেদকে বলে, ‘তা বিয়েই, মাছ দিয়ে আর হবেডা কী? এই গরিবের বাড়ি আইসে একদিন খাইয়ে গেলি পারো। তোমার বেয়াইন তো রান্দে খারাপ না।’
ফাঁকে গফুর সুফিয়ার রান্নার হাতের কথাও জানিয়ে দিল। মোকসেদও আর কোনো উল্টো ঠেলা দিল না। বরং বিনয়ই প্রকাশ করল, ‘হয়, হাজি সাবের মিলে যাও, তার বাদে বাজারে ওঠো মাছ নিয়ে নিয়ে-এদিক একদিন রত্নাচম্পার ঘাটে উইঠে আমার দোকানদে এক কাপ চা-ই খাইয়ে যাওয়ার সময় হলো না তোমার, আর আমি যাইয়ে তোমার বাড়ি মাছ খাওয়ার জন্যি উজোই। মানুষ শুনলি কবে কী?’
যাক, মোকসেদ কথা জানে। জানে ভদ্রতাও। বলামাত্র তার বাড়ি যাওয়ার জন্য লাফ দিয়ে পড়ল না। ফলে গফুরকে বলতে হয়েছিল, ‘হইচে বিয়েই, আর কথা দিয়ে ভিজোইয়ে কাজ নেই। তুমি থাহো সারা দিন ফুটবল লইয়ে, তোমারে পাওয়া যায় চার দোকানে?’
‘হইচে, ফাও কথা কইয়ে না। আসার ইচ্ছে থাকলি আসা যায়। যাক, এহোন হাঁটুতে ব্যথা, কয়দিন খেলাতিচি না, আইসেনে-আইজ বিকেলে নয় সইন্ধের পর আইসো, থাকপানে আমি।’
ম্যারাডোনা মোকসেদকে দেওয়া কথামতো গফুর রত্নাচম্পা ঘাটে ওঠাই স্থির করে। প্রয়োজনে ওই ঘাটে নৌকো রেখে একটু এগিয়ে আবার হাজির মিলের সামনে দিয়ে একবার ঘুরে আসা যাবে।
কিন্তু রত্নাচম্পা ঘাটে নৌকো ভেড়ানোর আগে আগে গফুরের মনে হলো, এই সন্ধ্যারাত্তিরে কেউর দোকানে যাইয়ে কিছু মাগনা খাওয়া যায়? গেলিই মোকসেদ কবে, ‘বিয়েই আইছো, দোকানের মদ্যি আইসে বসো, দুখোন বিস্কুট খাও, চায় এট্টু মালটোভা মিশোইয়ে দেব নাই (নাকি)? তারপর খাইয়ে দেইখেনে এই চার কী স্বাদ, জন্মের মতন জিব্বেয় লাইগে থাকপে।’
আবার সঙ্গে সঙ্গে এও মনে হলো, একটু ডাকবাংলো ঘাটের কাছে পরেশের সেলুনে যাবে কি না। পরেশকে একটা কথা বলা দরকার। এই সমস্ত ভেবে ডাকবাংলো ঘাট আর রত্নাচম্পার মাঝখানে একটা শেওড়াগাছে অনেকখানি দড়ি বাড়তি রেখে গফুর নাও বাঁধল। জোয়ার আসছে, খুব দ্রুত নদী ভরবে। জোগার গোন। এমনিতে দড়ি এতখানিক লম্বা না হলেও চলে। জোগার এই গোনে মাছের দেখা নেই। দিন দুই বাদে পূর্ণিমা। এখনই চাঁদ উঠবে। গফুর জানে এই সমস্ত হিসাব। নদীর পানি, পানির সমস্ত আচরণ তার মতন পানিতে থাকা মানুষ জানবে না তো জানবে কে?
গফুর বাঁধের রাস্তায় উঠে একটু উত্তরে গিয়ে দাঁড়িয়ে পরেশের সেলুনের গলিতে উঁকি দিল। পরেশ নেই। দোকানের সামনে অন্ধকার। দরজা দেয় কি না, এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু পরেশের সেলুনের পাশের সেলুনটা খোলা, তাকালেই বোঝা যায়। পরেশ গেল কই? পুঁজো গেইচে দিন তিনেক, এহোন সন্ধ্যার সময় সেলুন বন্ধ কইরে কোনো জায়গায় বেড়াতি গেল নাকি। গেলি যাক।
গফুর উল্টো ফিরে রত্নাচম্পার দিকে হাঁটে। নদীর পার ঘেঁষে হাঁটে, যাতে একটু আগেই দেখা যায়, মোকসেদ এখন তার চায়ের দোকানে আছে কি না। এখান থেকে মোকসেদকে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু চায়ের দোকানে যে ভিড় ভালোই, তা বোঝা যায়। দোকানের সামনে বেঞ্চিতে গফুরের মতন কয়েকজন, উল্টো পাশে রাস্তার নদীর কূল ঘেঁষে বসা শহরের কয়েকজন লোক। সেখানে দুটো বেঞ্চি। তাদের একজন দাঁড়িয়ে। গফুরের কেন যেন মনে হয়, এই সময় এসব মানুষের ভিড়ে সে মোকসেদের চায়ের দোকানে যাবে কি যাবে না। এ রকম হলে গফুর মাথার চুলে একবার-দুবার হাত চালায়। দুই হাতের তালুতে একবার মুখখানা ঘষে নেয়। গালে এক-দুই দিনের না-কামানো দাড়ি থাকলে হাতের তালুতে তার ঘষাও লাগে। তখন কেন যেন তার মনে হয়, এই দাড়ি-চুলের মুখে মানুষের সামনে গেলি মানুষ কবে কী? আসলে সারা দিন, কখনো সারাটা রাত্তির পানিতে থাকতে থাকতে গফুরের এ রকম বোধ হওয়াও যেন এখন স্বাভাবিক। কিন্তু এখন তার মুখে দাড়ি নেই। সকালে ওপারে খালের কূলে নাপিতের কাছে কামিয়েছে। তবু মোকসেদের দোকানের দিকে যেতে যেতে গফুরের পা একটু থামে, আবার চলে। বেঞ্চি পেতে এই সব শিক্ষিত লোকের সামনে গফুর এক কাপ চা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে কিংবা বসবে, তাতে তার কেমন যেন সংকোচ হয়।
এ সময় রাস্তার উল্টো দিকের বেঞ্চিতে বসা ওই লোকদের জন্য ছোট একটা থালার ওপর চারটে কাপ রেখে রাস্তা পার হওয়ার জন্য দাঁড়ায় মোকসেদ। তার সামনে থেকে একটু গতিতে একটা রিকশা যায়। মোকসেদ ডানে-বামে তাকায়। গফুর দেখেছে মোকসেদকে, মোকসেদ দেখেনি। রাস্তা পার হয়ে মোকসেদ গফুরকে দেখে, ‘আইচো বিয়েই পানির মানুষ, পানি থুইয়ে ডাঙায় আসলা?’
মোকসেদ তাদের চায়ের কাপ দেয়। ওই চারজন-যথাক্রমে জুয়েল, আশেক, সাগর আর জোসেফ-মোকসেদের এই কথায় গফুরের দিকে দেখে। গফুরের তাতে সংকোচ বাড়ে। তাদের পাশে একটু তফাতে রাখা বেঞ্চিটার কাছে সে দাঁড়ানো। তখন মোকসেদ বলে, ‘বসো, আসতিচি।’ তারপর তাদের বলে, ‘দেহেন, চিনিটিনি ঠিক মতন হইচে নিকি। নালি দোকানের ছওয়ালডারে পাঠাচ্ছি। আপনাগো একেকজনের চিনি তো একেক রহম—’
জুয়েল বলে, ‘এতকাল চা খাই, তা-ও তুমি এহোনো আমাগো কার কতটুকু চিনি লাগে সেইয়ে বুঝদি পারলে না—’
আশেক বলে, ‘বোঝবে কোয়ানদে, ও থাহে দোকানে? এই কয়দিন নয় পায়ে ব্যথা সেই জন্যি-নয়তো এহানে-ওহানে ফুটবল খেইলে বেড়াত।’
আসলে মোকসেদ এমন কোনো ফুটবল খেলোয়াড় না। ফুটবলপাগল মানুষ। ফুটবল খেলা থাকলে দেখতে যায়। বয়সে ছোটদের সঙ্গে এখনো যেকোনো মাঠে ফুটবল খেলতে নেমে পড়ে। আর কোনো একদিন, তখন সে সরুইর খন্দকারদের মাঠের পাশে থাকত, সেই মাঠের ছেলেরা তাকে ম্যারাডোনা বলে ডেকেছিল। শোনা যায়, মোকসেদই তাদের ডাকতে বলেছিল, কারণ তখন ম্যারাডোনাময় ফুটবলের জগৎ। সে বহুদিন আগের কথা। মোকসেদও তখন বালক কি কিশোর, কিন্তু ফুটবল খেলার বয়স পার হলেও মোকসেদ আজও সেই ম্যারাডোনার স্মৃতিতেই আছে।
আশেক তা মনে করিয়ে দিলে, চায়ের দোকান চলুক কি না চলুক, মোকসেদ খুশি হয়। এদিকে গফুর একটু বিস্মিত, তাহলে তার মোকসেদ বেয়াইর ফুটবল খেলার কথা জানে দেখি সবাই। গফুরের সামনে মোকসেদের ফুটবল খেলার কথা বলায় তার মুখে একটু সলজ্জ ভাব।
মোকসেদ গফুরকে বলে, ‘বিয়েই, বসো।’
কিন্তু এদের এত কাছে এখন গফুর বসে কী করে?
মোকসেদই জোর খাটায়, ‘ওই বেঞ্চিখানে এহোন কেউ বইসে নেই। কেউ আসলি তুমি নয় দোকানের ভিতরে যাইয়ে বইসানে, এহোন এইহানে বসোদিন—’
এ কথা বলা আসলে সাগর আশেক জোসেফ জুয়েলের কাছে একপ্রকার অনুমোদন চাওয়া। আবার তা-ও হয়তো নয়। তারা নদীর পাড়ে মুখোমুখি দুটো বেঞ্চিজুড়ে বসেছে, তার পাশে রাখা আরেকখানা একটা পায়ার দুর্বল ছোট বেঞ্চি। এখানে তো আর কেউ বসতেই পারে। বসেও তো কত সময়। কেউ বসে এক কাপ চা কি সঙ্গে একটা বনরুটি খেয়েই উঠে যায়। এরা সেদিকে তাকায়ও না। এখন গফুরের বসা না-বসার সংকোচে হয়তো মোকসেদ এ কথা বলেছে।
মোকসেদ রাস্তা পার হতে হতে বলে, ‘বসো। বিস্কুট-রুটি, সাতে কিছু খাবা? কত দিন তোমারে আসতি কই, আসো না আমার দোকানে।’
গফুর বলল, ‘না, খালি চা—’
‘হয়, খালি চা তোমারে দিতিচে কেডা? এট্টু মালটোভা মিশোইয়ে দেবানে, খাইয়ে দেইহো, তোমার বিয়েই খালি ফুটবল খেইলে বেড়ায় না, চা-ও ভালো বানায়।’
অথচ গফুর এতক্ষণে লক্ষ করেছে, মোকসেদ চা বানাচ্ছিল না। চা বানাচ্ছে সম্ভবত দোকানের কর্মচারী ছেলেটা। মোকসেদ রাস্তার ওপাশে গেল। একটু দাঁড়াল। ভিতরে লোক বেশ। ফাঁকা থাকলে হয়তো সেখানে ডাকত গফুরকে। দোকানের ছেলেটাকে কিছু একটা বলল। তারপর আবার ফিরে গফুরকে বলে, ‘দিতিচে।’
এ সময় গফুরের পাশের চারজন মোকসেদের ফুটবলপ্রীতি থেকে প্রসঙ্গ বদল করেছে। এখনকার প্রসঙ্গ যেন গফুরেরই বিষয়। তাই সে তাদের কথা মন দিয়ে শোনে। এখন মোকসেদ যদি একটু দেরি করেও চা দেয়, তাতে তার কোনো আপত্তি নেই।
আশেক বলে, ‘ও সাগর ভাই, আপনি জাগো সাথে কাজ করিলেন, ওই যে কানাডা না অস্ট্রিয়ান, যারা আইলো-তারা নদীর কূলে দুইখেন বিরিজ দেইছে যেন কী কইলো ?’
জোসেফ বলে, ‘নদীর দুই মাথায় দুইখেন বিরিজ দেকলি নদীর কী হয়, সেইয়ে বুজদি কানাডা আর অস্ট্রিয়া যাওয়া লাগে নাই (নাকি) ? নাকি নদী বিশেষজ্ঞ হওয়া লাগে, এই নদীতে সারা দিন নৌকা বায়, মাছ মারে এমন লেখাপড়া না-জানা মানুষও জানে, নদীর কী কইরে তেইশ মারা গেইচে-‘
গফুর খুশি হয়। এসব লোক তালি তাগো মতন মাইনসির কথাও জানে। দেহো, নদীর ওপর পর পর দুখোন বিরিজ হওয়ায় নদীর যে কী দশা হতিচে দিনকে দিন, সেইয়ে নিয়ে এরাও ভাবে, এরাও জানে। গফুর তাদের কথায় মনোযোগ দেয়।
সাগর বলে, ‘তারা আর এমন কী কইচে, ওই সবই আমাগো জানা কথা। তয় এইরম নদীঅলা দেশ তো তাগো না, সেই জন্যি আমাগো অপরিকল্পিত উন্নয়ন দেইহে কততা কয়! আবার বিদেশিরা যেসব কথা ঠিক কয় তা-ও না। সবাই যে আমাগো ভূগোল বুঝে, তা-ও না-তবু এই দেশে আসলি তো এটা কিছু কতি হয়, তাই কয়—’
জুয়েল বলে, ‘তারা তো নদীর কাজে আইলো না?’
‘না, তারা আইলো সুন্দরবনে, অন্য কাজে। একদিন নদীর কূলে ঘুরতি নিয়ে আসলি তহন কইলো, তোমাগো এই নদীর অবস্থা দিনকে দিন খারাপ হবে।’
আশেক বলে, ‘খারাপ হবে কী। এহোনই দেহেন, নদীর পাড় কত ভিতরে চইলে গেইচে—’
‘তা গেইচে!’ জুয়েল বলে, ‘দড়টানার দিকে ওই বিরিজের পাশে চর পড়িচে ভালোই। এহোন দিনে দিনে নদীর কূল দখল না হলি হয়।’
আশেক সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টা মজা করার দিকে নিয়ে যায়। বলে, ‘এর একটা উপায় আছে। আমি ভাইবে দেহিচি, সেদিন জোসেফ ভাইরে কইলাম।’
‘কী কইলি যেন? আমার মনে নেই।’
এই সময় মোকসেদ চা নিয়ে দোকানের উল্টো দিকে রাস্তার এপাশে গফুরের কাছে আসে। গফুর তখন এই চারজনের কথা শোনায় মশগুল। এমন কথা আগে শোনেনি সে। যারা ভোট চায়, তারা একরকম বলে। যারা রাজনীতির কথা বলে, তারা একরকম বলে। নদীর এপারে শহর, এখানে যত পদের গ্যাঞ্জাম-কাউতাল, ওপারে নেই; আর সে সারা দিন নদীতে থাকা মানুষ, তার এসব তেমন শোনাই হয় না। একটা একব্যান্ড ট্রানজিস্টর ছিল, সেটায় গান শুনতে শুনতে বড়শি বাইত। কোনো কোনো দিন গানের তালের চোটে বেলে মাছ বড়শি গিলে আদার খেয়ে চলে যেত, সে প্রায়শ খোঁট বুঝতেই পারত না। টেংরার খোঁটও গানের তালে সে প্রায় দেখতে পেত না। সেই ট্রানজিস্টরে খবর শুরু হলে গফুর কত দিন তা বন্ধ করে রেখে আবার মাছ ধরায় মনোযোগ দিয়েছে! আজকাল অনেকেই মোবাইলে গান শোনে, গফুরের মোবাইলে সে সুযোগ নেই। ফলে গানের জ্বালাতন নেই, নেই খবরেরও। এসব চায়ের দোকানের ভেতরে একটা টিভি। সারা দিন বাংলা ছবি চলে। ওই যে ভেতরে তাকিয়ে দেখো, একদল চা গেলে না কী করে, কিন্তু টিভিতে ওই ছবি দেখেই চলেছে। গাল হাঁ। ওখানে এখন এক গণ্ডা কি এক কুড়ি মাছ ঢুকলেও টের পাবে না!
অথচ এই চারজন যা যা বলছে, তা প্রায় আগে শোনেনি। পানিতে থাকা মানুষ, ডাঙায় কত পদের কথা হয়, শুনবে কোত্থেকে। এখন না হয় তারা সামনে বেঁধেছে। যদি সে এই মোকসেদের দোকানে না আসত, তাহলে তার শোনাও হতো না। এতক্ষণে তো চা খেয়ে আবার ওপার যাওয়ার কথা। বাড়ি থেকে হারিকেন ও গাঁথা বড়শিগুলো নেবে। তারপর আবার নদীতে নাও ভাসাবে। রাত একটু বাড়লে বাড়বে পানি। শান্ত স্রোতহীন স্থির নদী এই দড়াটানা, ভালো নাম নাকি ভৈরব। কিন্তু কেউরে কোনো দিন সে কথা বলতে শোনেনি। দড়াটানাই সই। ওই বামের হাতের যেখানে বেমরতার খাল ঢুকে গেছে, তারও একটু দক্ষিণে একটি দড়ি টেনে টেনে খেয়া পার হওয়ার ব্যবস্থা ছিল বলে নদীর এই নাম। এসব কতজনের কাছে ছোটকাল থেকে শুনেছে। কিন্তু এরা নদী নিয়ে যেসব কথা বলছে, তা কোনোকালেও যেন শোনেনি সে। এখন শুনছে। কিন্তু তা-ও কি মোকসেদের কথার ঘাপানে শোনার সুযোগ আছে?
মোকসেদ জানতে চাইল, ‘বিয়েই, আসলা!’
গফুর চায়ে একটা চমুক দিয়েছে। সত্যি মালটোভা দেওয়া চা, শেষ কবে খেয়েছিল মনে নেই। খুব ভালো বানিয়েছে। গালটা একেবারে ভিজে গেল। ওদিকে মোকসেদ বলে চলেছে, ‘কেমন হলো? নিজে বানাইনি। ভাবিলাম বানাব, কিন্তু দোকানের ছওয়ালডা আইজকাল আমার চাইয়েও ভালো বানায়, ওরে কইয়ে দেলাম তোমার জন্যি এস্পেশাল কইরে বানাতি, সেইরম বানাইচে।’
‘হ, ভালো হইচে। তোমার দোকান ভর্তি খদ্দের। সে গো সামলাও বিয়েই।’
আসলে গফুর পাশের চারজনের কথা শুনতে চায়। মোকসেদ এখন কথা শুরু করলে এই সব কিছুই শোনা হবে না। ওদিকে দেখো তারা বলছে :
—আচ্ছা, নদীর কূল ভরতিচে, তবু যদি এই জায়গায় গোলপাতা লাগাইয়ে দেওয়া যায়!
—উদ্ভট কথা কইস না।
—উদ্ভট না। গোলপাতা লাগাইয়ে দিলি খারাপ কী!
গফুর ভাবে, মোকসেদ তাকে দাওয়াত দিয়ে চা খাওয়াতি ডাকিছে, এর ভেতর মোকসেদের সাতে কথা না কইয়ে, এহোন এগো কথা শুনলি বেয়াই কিছু মনে করবে নিকি?’
যদিও মোকসেদ উঠে গেছে। দোকানে সত্যি ভিড়!
—উদ্ভট না তো কী?
—আপনি জানেন, গোলপাতা লাগালি কত উপকার!
—গোলপাতা তো আছে নদীর কূলে কোথাও কোথাও।
—না, একেবারে বাণিজ্যিকভাবে। চাষাবাদ—
—হ, তুই যা কবিয়ানে?
—না, গোলপাতা লাগালি নদীর কূলের জায়গা দখল হবে না।
—আর? কইয়ে যা তোর বানানো কথা।
—ওরে চেতাচ্ছো কেন, কতি দাও—
—তারপর ধরেন নদীর সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে। যে সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য দুই পাশে উত্তর-দক্ষিণে দুটো ব্রিজ, তারপর এক কোনায় পার্ক, ঈদগাহ, নতুন নতুন ঘাট করা হলো, আধুনিক পশু জবেহখানা, এইভাবে কত কিছু, একই গোলপাতা দিয়ে সবুজ গোলপাতা বনায়ন—
গফুর শোনে, কোনো কোনো কথার কিছু কিছু বোঝে না, তবে প্রায়টুকুই বোঝে। ভাবে, এরা দেখি সব জানে। বরং, তার চেয়ে বেশি জানে। গফুর তো উত্তরে মুনিগঞ্জ পর্যন্ত নদীর সব কিছু ভালো জানে না। দক্ষিণে দড়াটানা ঘাট পর্যন্ত নাও নিয়ে যায়নি কখনো। আর এদের তো সব জানা। হোক, কিন্তু এরা কি কখনো নদীর মাঝখানে বসে দুই ব্রিজের আলোগুলো জ্বলে উঠলে কেমন দেখায়, তা জানে!
গফুর লক্ষ করে তারা হাসছে :
—এবার আমি তোরে ক্ষতিগুলো কই।
—কিসের ক্ষতি, গোলপাতা লাগানোর ক্ষতি?
—হ।
—কন তালি।
—গোলপাতা ঝোপের চারপাশে যে গাছের গুঁড়ি রাখা হয় বিভিন্ন স মিলের, সেখানে বখাটেরা বসে আড্ডা মারতে পারবে।
—আর?
—সেখানে অনায়াসে ফেনসিডিলের বোতল লুকিয়ে রাখা যাবে। একই সঙ্গে বনায়ন ও ফেনসিডিল ব্যবসার একটা সুযোগ ঘটল।
—আর?
—ওখানে বসে অনায়াসে গঞ্জিকা সেবন করা যাবে।
বলামাত্র সাগর হো হো করে হেসে ওঠে। বয়সে সে বড়। হাসির প্রায় সঙ্গে সঙ্গে জানায়, তোমাগো থিসিস তো দারুণ!
গফুরের চা শেষ।
এই কথাটার কোনো অর্থ সে বুঝল না।
জুয়েল বলে, ‘আচ্ছা, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন, কী যেন নাম, বিপু ভাই তার নাম কইল, সেই ভদ্রলোক প্রফেসর না অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, আমার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করিছিলেন, তাঁরে বলব, যেন এই সব বিষয় বিবেচনা করেন!’
গফুর এ কথার কিছুই বুঝছে না।
এখন, যে গোলপাতা নিয়ে কথা বলছিল, সে জানায়, ‘আসলে এইয়ে কইয়ে আর কী হবে, নদী শুকোচ্ছে এইডে কন; আর নদীতে আবার মিষ্টি পানি, সাদা মাছের ক্ষতি-এই সব জানান।’
জোসেফ বলে, ‘নদীতে আবার মিষ্টি পানি? মানে কী?’
আশেক বলে, ‘জানেন না? এই তো ঢাকা থাকার ফল। এইহেনে থাকলি বুঝদি পারতেন। আমার মতন ঘেরভেড়ি করলি জানতি পারতেন। ওই যে একটা খাল ছেলে না, সুন্দরবনের দিক-ডেমার ভেতর দে প্লানের খাল-এই নদীর নিচ দে-বরিশালের দিক চইলে গেইচে-ওই খালে পড়িচে পলি—’
সাগর বলে, ‘পলি তো পড়বেই, চারদিকে যে হারে স্লুইস গেট। আর ওটা কাটা খাল-পলি পড়ার আগে ওই দিক দিয়ে লবণপানি আইসে এই দিকে ভইরে থাকত, অনেক লবণ বাড়িছে। তারপর আবার ওদিকে সেই পলি পড়িচে, এহোন আর ও পানি আসতি পারে না, এহোন-উত্তরের পানিতে নদীতে আবার মিষ্টি পানি—’
‘আবার যেই শ্যাওলা নদীতে তেলের ট্যাংকার ডোবল, এহোন আবার ওইটে কাটতিচে, ফলে আবার লবণপানি আসপে। এই চলতিচে—’
গফুর উঠবে উঠবে করে। মোকসেদ একবার এসে জানতে চেয়েছে, আরেক কাপ চা খাবে কি না? যদিও প্রায়ই দিন বিকেলে এই এক কাপ চা-ই খায় না সে। সেখানে দুই কাপ? চা খেলে তেমন ঘুম আসে না। কিন্তু মোকসেদকে সে একটু যেন অন্যমনস্কভাবে না বলেছে। মোকসেদ কিছু মনে করল না তো। কিন্তু গফুরের তো এদের কথা শুনতে ভালো লাগছে। কত দিন এই সব কথা শোনেনি। কঠিন কথা, কিন্তু গফুরেরই কথা।
তাদের একজন মোকসেদকে সিগারেট দিতে বলে। বেনসন। মোকসেদ গফুরকে সিগারেট খাবে কি না জানতে চেয়েছে, সে সিগারেট খায় না।
একজন বলছে, ‘এই যে নদীর পানির এই পরিবর্তন কিছুদিন আগে লবণাক্ততা আর লবণাক্ততা-সোজা কথায় নোনায় পানিতে হাত দেওয়া যায়নি, আবার এহোন মিষ্টি পানি, আবার ঢোকবে লবণপানি-জীববৈচিত্র্য কী পরিমাণে হ্যাম্পার হবে জানে না?’
এই জায়গাগুলো গফুর বুঝল না। তার বোঝার বাইরে কথা চলে যাচ্ছে। সে এখন উঠবে। তার যা বোঝার বোঝা হয়ে গেছে। বিরিজ হয়ে নদী শেষ। লবণ ঢোকায় নদী শেষ। মিষ্টি পানি ঢোকায় আবার আরেকভাবে শেষ। এদিকে এদের যদি বলা যেত, নদীতে এখন মাছ প্রায় ধরা পড়ে না। ফাইর্সে (পারশে) বাঁধে না। যদিও ও মাছ বড়শিতে বাঁধত না, কিন্তু যারা জালে ধরত, তাদের জালেও আজকাল বাঁধে না। বাইলে (বেলে) মাছ এখন আকারে ছোট। টেংরা আগের চেয়ে ছোট। ভেটকি-পাতাড়ি আজকাল প্রায় নেই। কাঁকড়াও ধরা পড়ে না। কাঁঠালি চিংড়িও আগের মতন নেই।
কিন্তু গফুরের কথা তারা শুনবে কেন?
মোকসেদ সিগারেট দিতে এলে আশেক তার কাছে জানতে চায়, ‘ও মোকসেদ ভাই, এই নদীতে এহোন আগের মতন সাদা মাছ ধরা পড়ে?’
মোকসেদ ঘুরে দাঁড়ায়। সাগরের দিকে বলে, ‘ওদা, এইয়ে আমারে জিগোলি হয়, মাঝেমদ্যি এইহেনে কেউ মাছ নিয়ে উটলি কিনি, আর নয় এক পা আগুলি বাজার।’ এই পর্যন্ত বলতে বলতে মোকসেদের মনে হয়, পাশেই তার বেয়াই গফুর। তার কথা বললেই হয়। সে জানায়, ‘এই যে আমার বিয়েই, সারাটা জীবন এই নদীতে বড়শি বাইয়ে জীবন কাটাইয়ে দেলো, তার ধারে জিগ্যেস করেন।’
গফুরের সংকোচ হয়। মোকসেদ আর বাকি চারজন এখন তার দিকে ফেরে। গফুরের সংকোচ আরো বাড়ে। দুপায়ের মাঝখানে দুই হাত দিয়ে এক প্রকার কাঁচুমাচু দিয়ে বসে। মোকসেদের দোকান থেকে ঠিকরে আসা আর একটু দূরের লাইটপোস্ট থেকে পড়া আলোয় গফুরের ওই মুখ একই সঙ্গে সংকোচে পূর্ণ আর উজ্জ্বল। তার মতো মানুষ মোকসেদ বিয়েইর কারণে গুরুত্ব পেল। এমন না যে এই মানুষদের সঙ্গে আগে কখনো কথা বলেনি। কত বলেছে! শিক্ষিত ভদ্দরলোক সে চেনে। কিন্তু একেবারে তার বিষয় নিয়ে, এই নদীতে মাছ ধরা নিয়ে তার সঙ্গে কথা! গফুর মোকসেদের দিকে চেয়ে হাসে। বলে, ‘আমি ধরি নদীতে বড়শি দিয়ে মাছ আর বিয়েই ওনাগো সাথে কী কথা কতি কও?’
—আপনি এই নদীতে মাছ মারেন?
—হ।
—বড়শি দিয়ে?
—হয়।
‘এই যে দেইচেন ওদা, কথা নাকি কতি পারে না?’ মোকসেদ তাঁর পূর্বপরিচিত সাগরকে বলে। সাগর হাসে, তার গফুরের মতন মানুষ সম্পর্কে ভালোই ধারণা আছে। নিজের পুকুর ঘেরভেড়ি আছে, আছে ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানা, সেখানে কাজের জন্য সময়ে সময়ে গফুরের মতো কতজনকে প্রয়োজন পড়ে, প্রথম প্রথম তাদের অনেকেই একটু লাজুক ভাব দেখায়, কেউ শুরু থেকেই প্রগলভ, গফুরকে একটু মুখচোরাই মনে হয়। আবার জুয়েল এইমাত্র, অন্য ধারণা করেছে, সারাটা দিন নদীতে কাটিয়ে জলে মাছের খোঁটের নেশা ধরা মানুষ এই গফুর-চরগাঁয় পার্টির কাজে গিয়ে সে জানে, ফলে অন্য সব মানুষের সঙ্গে তার একপ্রকার দূরত্ব তো আছেই। সাগর হঠাৎ মোকসেদের কাছে প্রসঙ্গটা হালকা করার জন্য যেন বলে, ‘বউ-ছওয়াল-মাইয়ের সাথে কতা কতি পারে তো তোমার বিয়েই, ও মোকসেদ!’
মোকসেদ বলল, ‘বউর সাথে পারে, তয় বাড়ি থাহে কতক্ষণ? থাহে তো নদীতে। আর আমার বিয়েইর কোনো ছওয়াল-মাইয়ে নেই!’
সঙ্গে সঙ্গে গফুরের মুখখানা একটু ছোট হয়ে গেল, সে মুখে খুব আলো পড়ে নেই অথবা একেবারে আলোর কোনো আভাসই নেই, কিন্তু আধো অন্ধকারের ভেতরেও একপ্রকার অন্ধকারই হয়ে গেল ওই মুখ।
ওদিকে মোকসেদ তখনো বলে চলছে, ‘আর বেয়াই পারে সারা দিন খালি মাছের সাথে কতা কতি!’
এটা শুনে মুহূর্তে আবার গফুরের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হলো, কিন্তু তা-ও এই অন্ধকারে বোঝা গেল না। ওদিকে তখন জোসেফ জানতে চাইছে, ‘সত্যি, কন দেহি ও ভাই, আগের মতন নদীতে মাছ বাঁদে না?’
জুয়েল জোসেফের কথায় কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তার আগে গফুর জানায়, ‘তা তো বাঁদেই না, আর ওই যে পানির কতা কলেন, সেই জন্যি কয় বছর ধইরে নোনাপানির মাছ আগের চাইয়ে সাইজে ছোট হইয়ে গেইচে!’
জুয়েল এ কথায় নিজের কথা বলতে পারল, ‘ওরে মাছ যে আগের চাইয়ে কম পাওয়া যায়, সেয়া আমাগো মুনিগঞ্জ মালোপাড়ায় গেলি হয়, নদীর পাড়ে যেহানে যেহানে জালটানা জাইলেরা মাছ নিয়ে ওঠে, সেখানে গেলিও হয়।’
‘হয়, ও জুয়েল ভাই, এই জন্যি কেউর আর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।’
গফুর আবার ধন্দে পড়ে। রাত বাড়ছে, তাকে উঠতে হবে। মোকসেদ আবার দোকানে গেছে। তাদের জন্য আবার চা আনবে। গফুরের কেন জানি মনে হয়, এবার তার জন্যও এক কাপ চা আসবে। এর ভেতরে জোসেফ আবার জানতে চায়, ‘কোন কোন মাছ সাইজে ছোট হইয়ে গেইচে?’
গফুর বলে, ‘সব। টেংরা, বাইলে। আগে চিংড়ি গাঁইথে দিলি পাতাড়ি বাঁদত প্রায় বিঘেৎ খানেক কি মুঠুম। এহোন বাঁদে না। বাঁদলিও এহেবারে ছোট ছোট-‘
আশেক জানতে চায়, ‘পুঁটি বাঁদে না?’
‘বাঁদে, কম। আমাগো এদিক তো ওইয়ে কম, আগে তো বড়শিতে কখনো কখনো বাইনও বাঁদত!’
‘সারা দিন নদীতে থাহেন?’
‘গোনের ওপর। নদীর ওই জায়গা দে বেমরতা খালের গোড়া, এই হেনে-তয় জোগার গোনে রাত্তিরেও নৌকায় থাহি-‘
গফুর প্রায় নিজের প্রতিদিনের ফিরিস্তি দিতে শুরু করে। এতক্ষণ তারা যেসব কথা আলোচনা করছিল, তার সঙ্গে তার এই নৌকায় থাকা না-থাকার সম্পর্ক কী, সে জানে না। কিন্তু তারা তার কথা কত মনোযোগ দিয়ে শোনে। শুধু মোকসেদ যদি এইভাবে তার বাড়িঘর ছল-মাইয়ে-এই সবের কথা না বলে দিত, তা-ই যেন ছিল ভালো। আরো ভালো হতো, যদি না বলত, এই যে সে বাড়িঘর সব থুইয়ে সারা দিন, কখনো সারা রাত্তির সব সময় নায়ে কাটায়, নদীর পানিতে এই যে তার দোস্তি! এ কথা মানুষকে জানানো যায়? মোকসেদ, তুমিও তো দোকান থুইয়ে কখনো কখনো ফুটবল খেইলে কাটাও। এক দিন এক দিন খেলা দেখতি চইলে যাও এহানে-ওহানে। খুলনা যাও, তখন ওই ছেমড়া তোমার দোকানের কী বিক্রি করে আর কী রাহে, সেয়া কেউ দেখতি আসে?
সত্যি এবার পাঁচ কাপ রং চা আসে। মোকসেদ আনে। সব শেষ কাপ তাকে দেয়। গফুরের মনে হয়, বাকিরা রং চা খাবে, তাই তাকেও রং চা দিল।
সাগর বলে, ‘ওরে, শোনো’, কথাটা বাকিদের বলছে, গফুর খেয়াল করে, ‘পানির এট্টা টান আছে। একেকজনরে পানিতে টানে। এই যে এই লোক, এরে টানে দড়াটানার পানিতে-সেই টানে নৌকোয় উঠলি, বড়শি ছাইড়ে দিলি তার আর কিছু খেয়াল থাহে না।’
গফুর কথাটা শুনতে শুনতে লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই লোক তো প্রায় তার মনের কথা জানে। তার যে এই সব হয়, তা সে জানল কিভাবে? যদি এরা কেউ একদিন এই নদীতে এইভাবে মাছের খোঁট টের পাতো, তালি আর নদী থুইয়ে ডাঙায় আসত না। কিন্তু এরা চাকরি করা মানুষ। কত দেশ-বিদেশের মানুষের কথা জানে, তারা কি আর নদীতে আসপে।
গফুরের হঠাৎ নদীতে যেতে ইচ্ছে করে। আবার মনে হয়, নৌকোয় বড়শি নেই। বড়শি আনতে বাড়ি যেতে হবে। রাত্তির কত হয়ে গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে একবার চরগাঁর দিকে তাকায়। নদীর ওপারে অন্ধকার, মনে হয় কত রাত্তির। এপারে আলো। এহোনো মনে হয় যেন সন্ধ্যা। অথচ সে এখানে এসেছে সন্ধ্যায়। এতক্ষণ এই এদের কথার ভেতরে আটকে ছিল। এখন যেতে হবে। তারা কি আর কিছু জানতে চাবে? সে উঠবে।
গফুর ওঠে। দাঁড়িয়ে মোকসেদকে খোঁজে। মোকসেদ কোথায় গেল। দোকানের ভেতরে। গফুর গলা অল্প তুলে ডাকে, ‘ও বিয়েই?’
তারপর খেয়াল করে এরা তার কাছে আর কিছু জানতে চায় কি না। তারপর ‘যাই আমি’ বলে মোকসেদের কাছে এগোয়। মোকসেদ বেরোলে বলে, ‘বিয়েই, যাই। আইসেনে একদিন-আমার ধরা মাছ খাইয়ে যাইয়েনে।’
‘এহোনই যাতিচো?’
‘হয়, যাই। নদীতে পানি উঠতিচে। জোগার গোন, রাত্তিরে বাইরোতি হবে।’
‘কয় কী সাগরদারা? তোমার ধারে কী জিগলো?’
‘এই নদীর কতা।’
‘ও।’
‘তয় বিয়েই, নদীর কতা নদীতে না নামলি কোনোভাবে বোঝা যায় না।’
আবার রাস্তার এপার এলে জোসেফ বলে, ‘আবার এইদিন আসলি দেহা হবেনে, আইসেন সন্ধ্যার পর।’
গফুর বলে, ‘হয়। আপনাগো কতা শুইনে কত কিছু জানলাম।’
জুয়েল বলে, ‘এবার চাইয়ে আপনি ভালো জানেন। নদীর কথা যে নদীতে থাহে সেই ভালো জানে।’
গফুর উল্টো ঘুরতে ঘুরতে ভাবে, এই লোক তার একটু আগের কথা জানল কিভাবে?
কিন্তু মাত্র কয়েক পা হেঁটে, এতক্ষণে প্রায় ভরা নদীতে নৌকোয় ওঠার পর গফুরের মনে হলো, তারা আসলে কিছুই জানে না। এই নৌকোয় উঠলি বোঝা যায় নদীর রাগ কত কমে গেছে। নৌকো ভাসিয়ে দিয়ে বোঝা যায়, স্রোত কত কম। পানিও যেন আগের চেয়ে হালকা। পানিতে আগের সেই লবণ লবণ গন্ধ নেই। আবার যদি সেই কোনো এক খাল কাটা হয়, তহোন আবার আগের গন্ধ পাবে! গফুর দক্ষিণের সেই সব জায়গার হিসাব বোঝে না। তার জানা নেই। এই নদীর এইটুকু জায়গা ছাড়া জীবনে আর কোথাও গেছে? বর্ষায় নদীর পানিতে বৃষ্টি পড়লে যে শব্দ হয়, তখন পানির যে ওম বের হয়, আর পানির ওপরের রং ধীরে ধীরে যেভাবে বদলে যায়, এসব তারা জানবে কিভাবে? কিন্তু নদীর শুকিয়ে যাওয়া নিয়ে তারা যা বলেছে, তা সত্যি, সত্যি নদীর তেইশ প্রায় মারা সারা।
মাঝনদীতে থাকতে থাকতে গফুর ভাবে, সুফিয়াকে এই সব বলবে। কিন্তু সুফিয়া যদি এতক্ষণে ঘুমিয়ে থাকে। না, ঘুমালেও তো উঠবে। আজ রাতে নৌকো নিয়ে সে বেরোবে। ভাত খাবে।
কিন্তু বাড়ি ফিরেই এতক্ষণের ভাবনা তার দলা পাকায়। মনে হয়, নদী ছেড়ে আসা ঠিক হয়নি। এখনই আবার যেতে হবে। বিকেলে গাঁথা বড়শি, টোপ-সবই গুছিয়ে রাখা আছে। সুফিয়া ভাত দিলে হয়।
কিন্তু সুফিয়া ভাত দিয়ে সামনে এক বাটি ছোট ছোট বেলে আর টেংরার ঝোল রাখে। গফুর প্রায় পুরোটাই তুলে নেয়। বাটির নিচে আকৃতিতে কিছুটা বড় একটা বেলে মাছ। ছোট চার্জার লাইটের আলোয় সে মাছ খোঁটে। নদী শুকালে এই মাছ থাকবে না। ভাবে, সুফিয়াকে এই কথা বলবে।
সে বলে, ‘জানো, আইজকে কাড়াপাড়ার মোকসেদ বিয়াইর দোকানে চা খাতি গেইলাম—’
‘তুমি আইকাল ওপার চা খাতিও যাও? গাঙে তোমার চা পাওয়া যায় না?’
‘শোনো না?’
‘কও! কী কবা—’
‘কয়জন মানুষ, মনে হয় চাকরিটাকরি করে, লেখাপড়া জানা, একজনরে চিনি কমিউনিস্ট করে মনে হলো, অন্ধকার তো-কয় দুইখোন বিরিজ হইয়ে নদীর তেইশ মারা গেইচে—’
‘ঠিকই তো কইচে। সেয়া তো তুমি আগেও কতা—’
‘আর কয়, নদী শুকোইচে আর লবণপানি ঢোকপে-মাঝে মিষ্টি পানি ঢুকিচে-এই সব নাকি কোন কাগজে-পত্রে লেহা আচে—’
‘তাতে হলো কী!’
‘না, আমি ভাবি, যদি আগের মতো মাছ না থাহে!’
‘মাছ তো আগের মতন নেই।’
‘হয়।’
‘মাছ তো তোমার জানপ্রাণ, গাঙ তোমার বাড়িঘর-‘
‘হইচে—’
‘হইচে না। এই যে যাও, এতকাল ধইরে যাও, একদিনও রাত্তিরে তোমার বউয়ের কতা মনে পড়ে?’
গফুর কোনো কথা বলে না। বাটির বেলে মাছটা পাতে নেয়, ‘কী যে কও। আমি গাঙ আর বাড়ি ছাড়া যাই কোনোখানে?’
‘হইচে—’
‘মাছ আগের চাইয়ে ছোট হইয়ে গেইচে—’
যেন সে বিড়বিড় করল।
‘সেয়া তো সবাই জানে, তাতে তোমার কী?’
‘আমার আর কী? একদিন নদীতে যাইয়ে যদি দেখতা। বাইলে মাছ আদার গিলে ফেলায়, কখনো খোঁট দে না, টেংরার খোঁট ছোট ছোট-ওই আদার গিলে ফেলানো বাইলে মাছের খোঁট আমি আজও বুঝদি পারলাম না, তার মদ্যি নদীডা শুকোইয়ে যাতিচে!’
বিস্ময়ে সুফিয়ার নজর গফুরের মুখে নুয়ে পড়ে। সে এমন উদ্ভট কথা কখনো গফুরকে বলতে শোনেনি!…
প্রথম প্রকাশ : বুধবার ২২ জুলাই ২০১৫, ৭ শ্রাবণ ১৪২২