কালো রঙের দুর্গা সাধারণত ভাবা যায় না কারণ এদেশে তাঁর পুজো প্রায় নেই বলা যায়। তবে দক্ষিণ ভারতের দুর্গা মারিয়াম্মার গাত্রবর্ণ কালো। এই বাংলায় কালো দুর্গার পুজো হয় বেলেঘাটার ভট্টাচার্য বাড়িতে। যদিও এই পরিবারে কালো রঙের দুর্গার পূজা শুরু হয়েছিল পূর্ববঙ্গের স্থলবসন্তপুরে। নাটোরের রানি ভবানীর আমলে।
তবে শুধু বেলেঘাটায় নয়, দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং এলাকাতেও কালো দুর্গার পুজো হচ্ছে প্রায় ৪০০ বছরের বেশি সময় ধরে। এখানেও ভট্টাচার্য পরিবারের দুর্গার মুখের রং কালো। এই বাড়ির আদি পুজো প্রায় ৪৩১ বছর আগে শুরু হয়েছিল ঢাকার বিক্রমপুরের বাইনখাঁড়া গ্রামে।
বেলেঘাটার ভট্টাচার্য পরিবারে দুর্গা পুজো শুরুর অনেক আগে কালী পুজো হত। এই পরিবারের পূর্বপুরুষ হরিদেব ভট্টাচার্য নিজে ছিলেন কালী ভক্ত। তিনি স্বপ্নাদেশ পেয়ে দুর্গা পুজো শুরু করেন। দুর্গা নাকি হরিদেবকে স্বপ্নে আদেশ দিয়েছিলেন কালো দুর্গামূর্তির পুজো করতে। হরিদেব স্বপ্নাদেশ পেলেও তাঁর কাছে দুর্গার কালো রূপ অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। পরবর্তীতে অনেকে অনেক রকম বিধান দেন। কিন্তু কোনওটিই হরিদেবের মনঃপুত হয়নি। ঘুরতে ঘুরতে বেনারসের গঙ্গার ঘাটে এক গ্রীষ্মের দুপুরে হরিদেবের সঙ্গে এক সাধুর দেখা হয়। কথায়-কথায় সাধু তাঁকে বলেন, দুর্গার এই রূপের ব্যখ্যা নাকি রয়েছে চণ্ডীতে। সেখানে তিনি ভদ্রকালি। বলা যায় এখান থেকেই শুরু। তারপর এতগুলি বছর পেরিয়ে গিয়েছে ভট্টাচার্য পরিবারের এই কালো রূপের দুর্গা পুজো।
ভট্টাচার্য পরিবার ১৯৪৭ সালে ওপার বাংলা থেকে আসানসোল চলে আসে। সেখানেও কালো দুর্গা পুজো হত। তারপর স্থান পরিবর্তন করে কখনও দুর্গাপুর, কখনও সল্টলেকে তাদের ঠিকানা হয়েছে। কিন্তু সেসব জায়গাতেও পরিবারের সদস্যরা পারিবারিক পূজো চালিয়ে গিয়েছেন। বছর কুড়ি ধরে বেলেঘাটার রামকৃষ্ণ নস্কর লেনের ফ্ল্যাট বাড়ির নীচে ফাঁকা জায়গায় পুজো হচ্ছে। স্বাধীনতা, দেশ ভাগ বহু কাল আগেই হয়েছে। সমাজে বহু পরিবর্তনও হয়েছে। কিন্তু এই পুজোয় কোনওদিনই কোন বাধা পড়েনি। হরিদেব ভট্টাচার্য কালো যে কালো দুর্গা পুজোর শুরু করেছিলেন, সেই ঐতিহ্য পদ্মা পেরিয়ে এখন বইছে গঙ্গা তীরেও।

ভট্টাচার্য পরিবারের কালো দুর্গা পুজোতে সপ্ত সিন্ধু ছাড়া অন্য জল ব্যবহার করা হয় না। প্রত্যেক বছর সাত নদীর আসল জল সংগ্রহ করে রাখা হয়। সেই জলেই হয় কালো দুর্গার পুজো। দেশভাগের পর ও-পার বাংলার পুজো এ-পার বাংলায় এলেও, নিয়ম নীতিতে কোনও ভাঁটা পড়েনি। সময় পেরনোর সঙ্গে সঙ্গে পরিবার বৃদ্ধি পেয়েছে। পুজোও ছড়িয়ে গিয়েছে পরিবারের মধ্যে। কালীঘাটের পটুয়া পাড়া অঞ্চলে রয়েছে ভট্টাচার্য পরিবারের দয়াময়ী কালী মন্দির, যেখানে নিত্যপুজোর আয়োজন হয়। এক সময় নিজেদের বাড়িতেই আয়োজন করা হত মাতৃবন্দনার। কিন্তু, এখন তা হয় অ্যাপার্টমেন্টের নীচেই। পুজো হয় তন্ত্রমতে। দুর্গার গায়ের রং কালো হলেও তাঁর চার ছেলেমেয়ের গায়ের রঙ স্বাভাবিক। মহিষাসুর সবুজ রঙের। লক্ষী, সরস্বতী, কার্তিক আর গনেশের অবস্থানও আলাদা। দুর্গার ডানপাশে লক্ষ্মী ও কার্ত্তিক, বামপাশে সরস্বতী এবং গনেশ।
শুধু বেলেঘাটায় নয়, দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং এলাকাতেও কালো দুর্গার পুজো হচ্ছে প্রায় ৪০০ বছরের বেশি সময় ধরে। এখানকার পুজোও করে আরেক ভট্টাচার্য পরিবার। এই ভট্টাচার্য পরিবারের দুর্গার মুখের রং কালো। প্রায় ৪৩১ বছর আগে এই পুজো শুরু হয়েছিল ঢাকার বিক্রমপুরের বাইনখাঁড়া গ্রামে। এখন আর ওই পুজোয় সেই আড়ম্বর নেই ঠিকই তবে বনেদিয়ানা রয়ে গিয়েছে।
কথিত আছে, বাইনখাঁড়া গ্রামে পুজো শুরু হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই অঘটন ঘটেছিল। পরিবারের বর্তমান সদস্যদের কথা অনুযায়ী, তখন দুর্গা মন্দিরের পাশে ছিল মনসা মন্দির। পুরোহিত মনসা পুজো সেরে দুর্গাপুজো করতে এলে একটি কাকও সে সময় উড়ে এসে বসে। এরপরই কাকটি মনসা মন্দিরের ঘিয়ের প্রদীপের সলতে নিয়ে উড়ে যায়। কিন্তু কোনওভাবে সেটি দুর্গা মন্দিরের শনের চালে পড়ে যায়। আর তাতেই পুড়ে যায় দুর্গা মন্দির ও প্রতিমা।
পুজোর মধ্যে এমন ঘটনায় বাড়ির প্রবীণরা পুজো বন্ধ রাখেন। এক রাতে স্বপ্নাদেশ পেলেন পরিবারের তৎকালীন গৃহকর্তা রামকান্ত ভট্টাচার্য। ওই পোড়া রূপেই যেন তিনি পুজো পান। দেবীর আদেশ পাওয়ার পর থেকে পোড়া মুখ ও ঝলসানো শরীরের মূর্তিতেই চলে আসছে মাতৃ আরাধনা। ভট্টাচার্য বাড়িতে গণেশ বাম দিকে থাকেন। আর ডানদিকে থাকেন কার্তিক। কার্তিকের ঠিক পাশেই থাকে নবপত্রিকা। এখন আর পাঁচটা বাড়ির পুজোর মতো আর্থিক কারণে কিছুটা আড়ম্বর কমেছে। সেই ঘাটতি নিষ্ঠা দিয়েই মেটান বর্তমান পরিবারের সদস্যরা। যে আন্তরিকতার টানে শুধু এলাকার বাসিন্দারা নন, দূরের মানুষ এই পুজোয় আসেন। ঢাকায় যে কাঠামোয় পুজো হত, এখনও সেভাবে একচালা মূর্তিতে পুজো হচ্ছে।
অজানা তথ্য। ভাল লাগল।
তুমি যে কত ধরণের ফিচার লিখতে পার এটা তারই একটা, এরকম আরও নতুন নতুন ফিচার আমাদের সামনে তুলে ধরো
আর সুস্থ থেকো ভাল থেকো, তোমার কারণে আমরা আরও সমৃদ্ধ হই, ভাল থাকি।