ঠিক দু-দিন পর রাজ্যের চার আসনে উপনির্বাচন। এই চার কেন্দ্রের মধ্যে গত বিধানসভা নির্বাচনে দু’টিতে জিতেছিল তৃণমূল আর বাকি দু’টি দখল করেছিল বিজেপি। একুশের বিধানসভা ভোটের আগে বাংলায় তৃণমূল এবং অন্যান্য দল থেকে বিজেপিমুখী স্রোত বইতে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু ভোটে বিজেপির বিপুল পরাজয়ের পর সেই স্রোত উল্টো দিকে বইতে শুরু করে। বিজেপি ছেড়ে নেতা এবং কর্মীদের অনেকেই এখন তৃণমূল শিবিরে। সদ্য তিন কেন্দ্রের ভোটে পরাজয় হয়েছে, ফলে দলের কর্মীদের মনোবল ফের ধাক্কা খেয়েছে। এই নিয়েও দলের শীর্ষ নেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে চার কেন্দ্রে আগামী ৩০ অক্টোবরের উপনির্বাচনে দলের ফল কেমন হবে, তা নিয়ে বিজেপির একাংশের মধ্যে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। দলের ওই অংশের ধারণা, ভোটে জিততে পারাটা কঠিন, অন্তত পরাজয়ের ব্যবধান কমানো গেলেও মুখরক্ষা হবে।
উপনির্বাচনের চার কেন্দ্রের মধ্যে অন্যতম উত্তর ২৪ পরগনার ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের খড়দহ বিধানসভার আসন। এখানে ভোটে তৃণমূলের কাজল সিনহা জিতেছিলেন কিন্তু ফল প্রকাশের আগেই করোনা সংক্রমণের জেরে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। সে কারণেই উপনির্বাচন হচ্ছে। ভবানীপুর আসনে রাজ্যের কৃষিমন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় জয়ী হয়েও দলনেত্রীকে আসনটি ছেড়ে দেওয়ায় তিনিই খড়দহ আসনে প্রার্থী।
ভোটের মাত্র কয়েকদিন বাকি থাকতেই খড়দহ অঞ্চলে বিজেপি বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে। ভোটের ঠিক আগেই বিজেপি ছেড়ে পঞ্চাশ জনেরও বেশি কর্মী, সমর্থক যোগ দিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসে। এছাড়াও এই বিধানসভা কেন্দ্রের পঞ্চায়েত এবং পুরসভা এলাকায় হাজারের বেশি বিজেপি এবং সিপিএমের কর্মী–সমর্থক যোগদান করেছেন ঘাসফুল শিবিরে। এরপরও শতাধিক পরিবার বিজেপি ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান করতে চলেছে বলে খবর। বিধানসভা উপ নির্বাচনের আগে এ ধরণের ভাঙনের সম্মুখীন হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই অস্বস্তিতে পড়েছে গেরুয়া শিবির। এই যোগদানের পর উপনির্বাচনে বিজেপি যে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে সে কথা বলাই বাহুল্য।
শান্তিপুরে উপনির্বাচন রাণাঘাটের বিজেপি সাংসদ জগন্নাথ সরকার পদত্যাগ করার কারণেই। এখানে লড়াইয়ের ময়দানে বিজেপি, তৃণমূল কংগ্রেস ছাড়াও রয়েছে সিপিএম। বিজেপি এবার সাম্প্রতিক বাংলাদেশের দুর্গাপুজো ও হিন্দু মন্দিরে হামলার ঘটনাকে শান্তিপুরের উপনির্বাচনে ইস্যু করেছে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস তাঁতিদের পাশে থাকার কথা বলছে। এছাড়াও এখানে একাধিক স্থানীয় ইস্যু রয়েছে।
গত লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে এরাজ্যে সিপিএমের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও শান্তিপুরে তিনবারের কাউন্সিলর সৌমেন মাহাতোকে প্রার্থী করেছে সিপিএম। ভোটের দিন বিরোধী দল সব বুথে এজেন্ট দিতে পারবে কীনা সেটাই একটা বড় প্রশ্ন। এই অবস্থায় সিপিএমের দাবি তারা শান্তিপুরে জিতছে। তৃণমূল-বিজেপি, সেকেন্ড-থার্ড পজিশন নিয়ে লড়াই করছে। তৃণমূল সিপিএমের এই দাবি হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন আর বিজেপি নেতৃত্ব সিপিএম প্রার্থীর জামানত থাকবে কিনা তা নিয়েই সন্দেহ প্রকাশ করেছে।
চতুর্মুখী লড়াইতে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী ব্রজকিশোর গোস্বামী শান্তিপুরের ভূমিপুত্র হলেও রাজনীতিতে নতুন মুখ৷ অন্যদিকে বিজেপির প্রার্থী নিরঞ্জন বিশ্বাস দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক যোদ্ধা এবং এলাকারই বাসিন্দা৷ উপনির্বাচনে প্রার্থী বদল করেছে তৃণমূল কংগ্রেস৷ রাজনৈতিক বিশেষঙ্গদের মতে, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব দূরে রাখতেই ব্রজকিশোরকে প্রার্থী করেছে তারা৷ এছাড়া গোস্বামী বাড়ির ছেলেকে প্রার্থী করায় হিন্দু ভোটের একটা বড় অংশই তৃণমূলের দিকে থাকবে বলে মনে হচ্ছে৷
নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসছে গোসাবায় রাজনৈতিক পারদ ক্রমশ চড়ছে। ভোট প্রচারে শাসক কিংবা বিরোধী একে অন্যের বিরুদ্ধে রণকৌশল ঠিক করতে মরিয়া হয়ে উঠছে। সময় নষ্ট না করে সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে রাজনৈতিক দলগুলি। এখন তাদের কাছে মূল লক্ষ্য মানুষের সঙ্গে জনসংযোগ গড়ে তোলা। গোসাবা বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে বিজেপির বাজি রায়দিঘির অন্যতম নেতা পলাশ রানার উপর। তৃণমূলের প্রার্থী ভূমিপুত্র সুব্রত মণ্ডল। অন্যদিকে এই কেন্দ্রের আরএসপি প্রার্থী অনিলচন্দ্র মণ্ডল। ফলে ত্রিমুখী লড়াই।
বেশ কয়েকটি দ্বীপ নিয়ে গোসাবার মানুষের দাবি, বছর বছর বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে পড়তে হয় গোসাবার মানুষকে। খড়কুটোর মতো ভেসে যায় তাদের জমির ফসল-ঘরবাড়ি। গোসাবায় স্থায়ী নদীবাঁধ এখনও হয়ে ওঠেনি। তাই এবারের ভোটেও শাসক-বিরোধী সব দলই স্থায়ী নদীবাঁধ নির্মাণকে হাতিয়ার করে ভোট ময়দানে নেমে পড়েছে।
একুশের বিধানসভা নির্বাচনে দিনহাটা কেন্দ্রে সামান্য ভোটে কোনওভাবে জিতেছিলেন নিশীথ প্রামাণিক। কিন্তু বিধায়ক পদ তিনি ছেড়ে দেন। সে কারণেই এই আসনে উপনির্বাচন হচ্ছে। দিনহাটা কেন্দ্রে উদয়ন গুহকে পরাজিত করেছিলেন যিনি সেই অশোক মণ্ডলকে এবারের উপনির্বাচনে উদয়ন গুহর বিরুদ্ধে প্রার্থী করে বিজেপি একটা মাস্টার স্ট্রোক দিতে চাইছে। ভোটারদের কাছে অশোক মণ্ডলও পরিচিত নাম। তাঁর বাবা উমেশ মণ্ডল ১০ বছর দিনহাটার বিধায়ক ছিলেন।
অন্যদিকে, উদয়ন গুহ যেদিন থেকে ফরওয়ার্ড ব্লক ছেড়ে তৃণমূলের পতাকা ধরেছেন সেদিন থেকেই উত্তরবঙ্গে বেশ সক্রিয়। তৃণমূল সাংগঠনিক দিক থেকে এই কেন্দ্রে অনেকটা এগিয়ে, যদিও উদয়ন গুহকে ঘিরে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ রয়েছে। সেই ক্ষোভ যদি যদি ভোটের বাক্সে গিয়ে পড়ে তাহলে ফলাফলে তফাৎ গড়ে দিতে পারে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। সব মিলিয়ে দিনহাটার কুর্সি দখলের লড়াই যে জমে উঠেছে বলার অপেক্ষা রাখে না।