বিক্রী হতে চলেছে বেঙ্গল কেমিক্যালস। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই বছরে বেঙ্গল কেমিক্যাল বিক্রীর জন্য দরপত্র চাওয়া হবে। জেশপ, ব্রেথওয়েট, বার্ণ এন্ড কোম্পানী, ডানলপ, ইন্ডিয়ান ষ্ট্যান্ডার্ড ওয়াগন, জয় ইঞ্জীনিয়ারিং, গেষ্ট কীন উইলিয়ামস, মেটাল বক্স, বঙ্গলক্ষ্মী কটন মিল, ইউনিয়ন জুট মিল, হিন্দুস্থান শিপিং, কিনিসন জুট মিল, সোনাজুলি টি এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ, হিন্দুস্তান পিলকিংটন গ্লাস ওয়ার্কস, বেঙ্গল ল্যাম্প, ভারত ইলেকট্রিকাল, এ্যালুমুনিয়াম কর্পোরেশন, হনুমান কটন মিলস্, বেঙ্গল পেপার মিল, ন্যাশনাল ট্যানারি, রিষড়া ষ্টীল, শালিমার রোপ ওয়ার্কস, নিউ টোব্যাকো কোং, বেঙ্গল পটারিজ, ইষ্ট এন্ড পেপার, সাইকেল কর্পোরেশন, ভারত ব্রেকস এন্ড ভালভস্ প্রভৃতি ৪৫৪টি শিল্প কারখানা ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। এ সবই বন্ধ হয়েছে বামফ্রন্টের আমলে—চলবে না চলবে না, আর ঘেরাও-এর রাজনীতি জন্য। এবার খতমের তালিকায় বেঙ্গল কেমিক্যাল। কেন বিক্রী করা হবে শতাব্দী প্রাচীন স্বদেশী ঐতিহ্যমন্ডিত দেশের প্রথম ওষুধ কারখানা?
ঊনবিংশ ও বিংশ শতকের সন্ধিক্ষণে অনেকগুলি ‘স্বদেশী’ কারখানা গড়ে ওঠে। প্রেসিডেন্সী কলেজ (এখন বিশ্ববিদ্যলয়)-এর রসায়ণের অধ্যাপক প্রফুল্লচন্দ্র রায় গড়ে তুললেন দেশের প্রথম স্বদেশী ওষুধ কারখানা, বেঙ্গল কেমিক্যাল এন্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস্। এই কোম্পানী তৈরীর জন্য তাঁর যাবতীয় সঞ্চয়-অর্থ, ৭০০ টাকা ১৮৯২ সালেই বিনিয়োগ করেন। প্রথমে মাণিকতলায় (১৯০১), তারপর পানিহাটি (১৯২০), মুম্বাই (১৯৩৮), কানপুর (১৯৪৯)-এ চারটি কারখানায় ওষুধ ও অন্যান্য রাসায়নিক সামগ্রীর উৎপাদন শুরু হয়। বিখ্যাত হয়ে ওঠে বেঙ্গল কেমিক্যালের ক্যান্থারাইডিন কেশ তেল, অ্যাকাওয়া টাইকোটিস, ফেনল, ন্যাপথলিন ইত্যাদি ব্র্যান্ড। এছাড়াও অন্যান্য ওষুধ ও রাসায়নিক দ্রব্যও বিদেশী কোম্পানীকে টেক্কা দিয়ে বাজার দখল করে। শুধু তিনটি প্রডাক্ট ১৯৫০ সালের হিসেবে কোম্পানীকে বছরে দেড় কোটি টাকা রাজস্ব এনে দিত। কিন্তু আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের মৃত্যু ও নানা কারণে পাঁচের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে লোকসান শুরু হয়। ১৯৭৭ সালে সরকার এই কোম্পানীর পরিচালনভার হাতে নেয়। ১৯৮০ সালে জাতীয়করণের পরে কম্পানীর নাম হয় ‘বেঙ্গল কেমিক্যালস এন্ড ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড’ (বিসিপিএল)। ১৯৯২ সালে লোকসানের বহর বেড়ে যাওয়ায় ‘রুগ্ন শিল্প’ হিসেবে বিআইএফআর-এর অধীনস্থ হয়ে পড়ে। এই ধারাবাহিক পতনের মূল কারণ হলো— (১) প্রশাসক মন্ডলীর চুড়ান্ত অপদার্থতা ও দুর্নীতি; (২) চরম শ্রম-অশান্তি; (৩) আধুনিকীকরণ ও উৎপাদন সামগ্রী বিক্রীর ক্ষেত্রে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থতা।

কিন্তু গত কয়েক বছরে ধুঁকতে থাকা বেঙ্গল কেমিক্যাল হঠাৎই যেন ফিনিক্স পাখির মত জেগে উঠল। ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষ থেকে কোম্পানী লাভের মুখ দেখতে শুরু করে। এতদিন কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হত, অলাভজনক সংস্থাকে কতদিন ভরতুকি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হবে? যেমন বলা হচ্ছে এয়ার ইন্ডিয়া সম্পর্কে। কিন্তু সেই যুক্তি তো বেঙ্গল কেমিক্যালে খাটে না। কারণ, তিনবছর ধরে ধারাবাহিক লাভের পরিমাণ বাড়তে থাকায় কোম্পানীর পক্ষে আশা প্রকাশ করা হয়েছে, আগামী ২০২২ সালের মধ্যে এটি ‘মিনিরত্ন’ কোম্পানীতে পরিণত হতে চলেছে। অথচ এই তথ্য সামনে আসতেই যিনি কম্পানীর প্রশাসক ছিলেন তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হল। আর তড়িঘড়ি মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নিল, চলতি বছরের মধ্যেই বেঙ্গল কেমিক্যাল বিক্রীর প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। উল্লেখ্য, কোম্পানীর চারটি কারখানার যে অস্তাবর সম্পত্তি আছে তার বর্তমান বাজার মূল্য পাঁচ হাজার কোটি টাকারও বেশী। শুধু মুম্বাইয়ের প্রভাদেবীতে যে ফ্যাক্টরী আছে তার দাম কমপক্ষে আড়াই হাজার কোটি টাকা। তাহলে সরকার জমি বেচে টাকা সংগ্রহের জন্যই এই সিদ্ধান্ত নিল। বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার এখন সব অর্থেই ‘বিক্রেতা সরকার’। ২৮টি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিক্রীর প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। লাভজনক সংস্থা জীবন বীমা কর্পোরেশনের শেয়ার আবারও বিক্রী হবে। তা দেশের প্রথম স্বদেশী ওষুধ কারখানা যা দীর্ঘ সময় লোকসানের পরে পুনরুজ্জীবিত হয়েছে, তারও মৃত্যু ঘোষণা করা হবে? আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, যিনি শুধু রসায়নবিদ ছিলেন তা নয়, অধ্যাপক থেকে উদ্যোগপতি, যিনি সমস্ত দেশবাসীকে শেখালেন কীভাবে বিদেশী কোম্পানীর সঙ্গে পাল্লা দিতে হয় তাঁরই স্মৃতিবিজড়িত প্রতিষ্ঠানকে জমি-হাঙ্গরদের কাছে বিক্রী করে দেওয়া হবে? বিজেপির নেতা-মন্ত্রীরা তো কথায় কথায় নিজেদের হিন্দুত্ববাদী বলে দাবী করেন। ওরা কি জানে যে, আচার্য রায় শুধু অধ্যাপনা বা বেঙ্গল কেমিক্যাল গড়ে তোলেন নি। তিনি প্রাচীন হিন্দু চিকিৎসাশাস্ত্র সম্বন্ধে এত জ্ঞান অর্জন করেন যে ১৯০২ সালে তাঁর লেখা প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘A History of Hindu Chemistry from the Earliest Times to the Middle of Sixteenth Century’ দেশ-বিদেশে সাড়া ফেলেছিল। একবারও ঐ গ্রন্থের পাতা উল্টে দেখেছেন ওদের কেউ? উৎসবের প্রাক্কালে দেশ জুড়ে শুরু হয়েছে ‘SALE’। সরকারও ‘সেল’ শুরু করেছে। তাই বেঙ্গল কেমিক্যালের টুঁটি চেপে ধরেছে এই বিক্রেতা সরকার। ধিক্।
সত্যি খুবই দুর্ভাগ্যজনক । আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের মত স্বদেশী কতজন ছিলেন সে যুগে? মেক ইন ইন্ডিয়ার তিনি সূচনা করেছিলেন। আর আজকের ভেকধারীরা শুধু শ্লোগান তুলে নিজেদের স্বদেশীয়ানার প্রমান দিতে চাইছে। এমন দেশবিরোধী সিদ্ধান্ত তারা কেন নিল? জবাব চাই। জবাব দিতে হবে দেশবাসীকে। আজ নয় তো কাল।