পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৪৩টি টেস্ট খেলে ৩২ দশমিক ৫৬ গড়ে ২৪৪২ রান করেছেন পঙ্কজ রায়। এর মধ্যে ৫টি সেঞ্চুরি। ১৯৫৬ সালে মাদ্রাজে ভিনু মানকদকে নিয়ে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম উইকেট জুটিতে যে ৪১৩ রান করেন, তা আজো রেকর্ড বইয়ের পাতায় অম্লান হয়ে আছে। উপর্যুপরি ব্যর্থতার মধ্যেও তিনি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারতেন। পরিসংখ্যানে কি আমরা প্রকৃত পঙ্কজ রায়কে চিনতে পারবো? পারবোনা বলেই বাঙালি টেস্ট ক্রিকেটার পঙ্কজ রায়কে তিনি আমাদের মানসপটে ছবির মত এঁকে দিয়েছেন। ভারতীয় ক্রিকেটের কিংবদন্তী সুঁটে ব্যানার্জি, মুস্তাক আলী, লালা অমরনাথ, বিজয় মার্চেন্ট, বিজয় হাজারে, রুসী মোদী, পল উমরিগড়, জি এস রামচাঁদ, দাত্তু ফাদকার, ভিনু মানকড়কে জীবন্ত করে রেখেছেন শঙ্করীপ্রসাদ বসু। এই ক্রিকেটাররা গেয়েছেন ভারতীয় ক্রিকেটের নবজীবনের গান। অপরিণত ভারতীয় ক্রিকেট দলকে এরাই দিয়েছিলেন নতুন পথের ঠিকানা। ১৯৩২ সালের জুনে লর্ডসে প্রথম টেস্ট খেলার প্রায় ২০ বছর পর ভারত ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাদ্রাজে ইংল্যান্ডের সঙ্গে পঞ্চম টেস্টে ইনিংস ও ৮ রানে প্রথম জয়ের মুখ দেখে। এই জয়ে ভিনু মানকদের অসাধারণ বোলিং, পল উমরিগড় ও পঙ্কজ রায়ের দায়িত্বশীল সেঞ্চুরি ছাড়াও লালা অমরনাথ, অধিনায়ক বিজয় হাজারে প্রমুখ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এদের অন্যতম মুস্তাক আলীর মধ্যে লেখক খুঁজে পেয়েছিলেন ‘রৌদ্রতপ্ত দূর ভারতের রহস্যময় সৌন্দর্য’। কল্পনা ও প্রতিভায় পূর্ণ এই ক্রিকেটার সহসা ঝলসে উঠে রাঙিয়ে দিতে পারতেন আকাশপ্রান্ত। তার দায়িত্বহীন সৌন্দর্য- বিলাস সবাইকে মুগ্ধ করতো। তার আউট হওয়া মানে চঞ্চল অথচ সুন্দরের মৃত্যু।

দশম উইকেটে চাঁদু সারাবতে এবং সুঁটে ব্যানার্জী ২৪৯ রান এখনো রেকর্ডের খাতায় জ্বল জ্বল করে রয়েছে।
মুস্তাক আলী আউট হওয়ার মুহূর্তটি লেখক যেভাবে তুলে ধরেছেন এখনও তা যে কাউকে আপ্লুত করবে: ‘মুস্তাক আলী নামলেন। ক্রিকেটের নবকুমারকে অভ্যর্থনা জানাতে সে কি বিপুল করতালি! সমস্ত মাঠ মেতে উঠল দিনশেষে মুস্তাকের উদয়ে। রামাধীন বল করতে শুরু করলেন- প্রথম বল- মুস্তাক সুন্দরভাবে আটকালেন। দ্বিতীয় বল- যথেষ্ট সংযম দেখিয়েছেন মুস্তাক-রামাধীনকে আর প্রশ্রয় দেয়া যায় না- বোলারের মাথার উপর দিয়ে উঁচু করে বলটি চালিয়ে দিলেন। কিন্তু হায়, যথেষ্ট উঁচু হলো না বল এবং খর্বকায় রামাধীন একটি অদ্ভুত লাফ দিয়ে বলটি ধরে নিলেন। কট আউট। সকলের হৃৎপিন্ড যেন লাফিয়ে উঠল। কণ্ঠে কণ্ঠে সাঁড়াশির চাপ— শব্দমাত্র নেই— শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ— কালির বোতল গড়িয়ে পড়েছে— এমন সময় সুমধুর রবে বেজে উঠল ভারতীয় ব্যান্ডের সুবিখ্যাত আনন্দগীত; তালে-তালে লুটোপুটি করতে লাগল সুর রঙ্গভরে। দর্শকরা এমন নিস্তব্ধ যে, শোনা গেল সুরের মৃদুতম ধ্বনি পর্যন্ত। সেই থেকে বন্ধ হয়ে গেল খেলার মধ্যে ব্যান্ডবাদ্য’ (ইডেনে শীতের দুপুর)। টেস্ট ক্রিকেটে ভারতের পক্ষে প্রথম সেঞ্চুরি করার গৌরব লালা অমরনাথের। ১৯৩৩-৩৪ মৌসুমে মুম্বাইতে ইংল্যান্ডের সঙ্গে তার অভিষেক টেস্টে এই সেঞ্চুরি করেন।
লেখক লালা অমরনাথকে বলেছেন, ‘প্রাকৃতিকতার ক্রীড়ারণ্যে সচল বনস্পতি’ এবং ‘সমুদ্র আর মরুভূমির মাঝখানে বিস্তৃত অমরনাথের জীবন’। ‘আত্মক্ষয়ী প্রতিভা’ লালা অমরনাথকে ‘সমুদ্র-সন্তান’ আখ্যা দিয়ে লিখেছেন: ‘মহান সি কে নাইডু সর্বাঙ্গীনতায় ভারতীয় ক্রিকেটে অনতিক্রান্ত। ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং, ক্যাপ্টেন্সি- কোথায় সি কে মহীয়ান নন? তার শক্তি অনেক সময়ই প্রাকৃতিক, তার ব্যাটিং ক্রিকেটের ধর্ম-সমাজে ‘ব্রাত্য’ সকল বেড়ার বাইরে। তবু, তাকে সম্মান জানিয়েই বলব, শক্তির উদ্ধত প্রকাশে অতুলনীয় সি কে-ও এক জায়গায় অমরনাথের কাছে হেরে গেছেন- শক্তির প্রকাশ-লাবণ্যে। সি কে আমাদের যখন স্তম্ভিত ক’রে রাখেন, তখন অমরনাথের ব্যাটে বিপ্লবের বীণা বাজে। ঝড়ের রাতের সেই সঙ্গীত অমরনাথের বিধিদত্ত’। (ইডেনে শীতের দুপুর)। অধিনায়ক বিজয় হাজারে ভারতীয় ক্রিকেটে অনেক শূন্যকে পূর্ণ করেছেন, অনেক ভগ্নকে করেছেন উত্তোলন। প্রয়োজনের বেদীতে বারবার বলি দিয়েছেন সৌন্দর্যকে।

সিএস নাইডু, সুঁটে ব্যানার্জী, চাঁদু সারাবতে
লেখকের মতে, ‘মুস্তাক আলীর মুখরতা, সি কে নাইডুর কোলাহল, সি কে’র অট্টহাস্য, অমরনাথের রণধ্বনি কিংবা মার্চেন্টের বিদগ্ধ বচন না থাকলেও ‘ক্রিকেট পৃথিবীতে মহৈশ্বর্যে নম্র ও সম্পদে ভীত এক শান্ত মহিমার নাম বিজয় হাজারে’। তার চওড়া ব্যাটে ও চওড়া বুকে সকল আঘাত সহ্য করতে পারতেন। লেখকের বর্ণনা গুণে বিজয় হাজারের খেলা ভেসে উঠে মানসনেত্রে: ‘অথচ হাজারে কী করেছেন— দিনের পর দিন দেখেছি বিষাক্ততম বোলিংয়ের বিরুদ্ধে তার অবিচলিত নিপুণতা। আহত সর্পের মতো বলগুলো ফণা বাড়িয়ে ছোবল দিতে চাইছে উইকেটে, আর অদ্ভুত সহজ কৌশলে পা এবং হাত বাড়িয়ে ফণার মুখে হাজারে পেতে দিচ্ছেন ব্যাটের ব্লেডটিকে। পিচের ‘লাল’ দাগ ফুটে উঠছে ব্যাটের কাষ্টদেহে, কিন্তু উইকেট অক্ষত। হাজারের খেলা দেখে কতবার মনে হয়েছে— কি আশ্চর্য, এই যোদ্ধা তরবারি ফেলে দিয়ে যেন শুধু ঢাল দিয়ে বিপক্ষের তরবারির আঘাত প্রতিহত করার কৌতুককর খেলায় মত্ত। তরবারির ফলক ঝিলিক দিয়ে এগিয়ে আসে দেহস্পর্শের জন্য, তার আগে পেয়ে যায় ঢালের নির্বিকার প্রতিরোধকে। তারপর একসময় দেখি, কখন যেন যোদ্ধা কুড়িয়ে নিয়েছেন তার তলোয়ার। তার আঘাতে খান খান হয়ে ভেঙে পড়ছে বিপক্ষের অস্ত্র। হাজারের ড্রাইভগুলো চোখ ধাঁধিয়ে ছুটে যাচ্ছে বাউন্ডারির সীমানায়’। (ইডেনে শীতের দুপুর)। ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অলরাউন্ডার ভিনু মানকদ। রেকর্ডবুকে তার সময়ে সবচেয়ে উজ্জ্বল ক্রিকেটার।
তিনি টেস্ট ক্রিকেটে দ্রুততম সময়ে ১০০ উইকেট এবং হাজার রানের কীর্তি গড়েন। ব্যাটসম্যান হিসেবে সাহসী ও কল্পনাপ্রিয় ভিনু মানকড় টেস্ট ম্যাচের উভয় ইনিংসে সেঞ্চুরি এবং দুটি ডাবল সেঞ্চুরি করা ভারতের প্রথম ক্রিকেটার। ভিনু মানকড়ের মধ্যে লেখক খুঁজে পেয়েছেন ভারতের জাতীয় চরিত্রকে: ‘ভিনুর দিকে একবার তাকান আর ভারতের জাতীয় স্বভাব স্মরণ করুন। এদেশের জীবনের ধীর লয়, অব্যস্ত গতি, প্রসন্ন সহিষ্ণুতা, শান্ত প্রতিরোধ, অহিংস অসহযোগিতা; এ দেশের প্রান্তর, কৃষক, গরুর গাড়ি, ধানকাটা, তাঁত বোনা; আর মনে করুন ভিনু মানকদকে। এদের মধ্যে কোথাও কি একটা ঐক্য নেই।’ (ইডেনে শীতের দুপুর)। এমন কাব্যময় বর্ণনা ক্রিকেট মাঠের একজন কবি ছাড়া আর কারো পক্ষে সম্ভব নয়। এ কারণে রাখাল ভট্টাচার্য লিখেছেন: ‘কবির দৃষ্টিতে অতি সাধারণ বস্তুও রূপময় হয়ে ওঠে। বর্তমান লেখকের কবিতা রচনার অভ্যাস আছে কিনা জানি না, কিন্তু বিভিন্ন ক্রিকেটারের খেলার ধরন অনুধাবন করে, তিনি যেভাবে তার বিশ্লেষণ করেছেন, জীবন ও প্রকৃতির বিভিন্ন প্রকাশের সঙ্গে উপমা দিয়ে তাকে বাক্সময় সাকার রূপ দিয়েছেন, তা যে কবিকৃতি, তাতে সন্দেহ নেই’।

ভিনু মানকড়, স্যার পতৌদি, লালা অমরনাথ, বিজয় মার্চেন্ট
১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয় শঙ্করীপ্রসাদ বসুর দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘রমণীয় ক্রিকেট’।
১৯৬০ সালের ৯ থেকে ১৪ ডিসেম্বর অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে অনুষ্ঠিত হয় ‘দ্য ফ্রাঙ্ক ওরেল ট্রফি’র পাঁচ ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্ট। মহান অধিনায়ক ফ্রাঙ্ক ওরেলের নেতৃত্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজ মুখোমুখি রিচি বেনোর অস্ট্রেলিয়ার। টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে গ্যারি সোবার্সের সৌন্দর্যপূর্ণ ঔদ্ধত্যের সঙ্গে করা ১৩২, সলোমন ৬৫, ফ্রাঙ্ক ওরেল ৬৫, আলেকজান্ডার ৬০ ও ওয়েস হলের ৫০ রানের সুবাদে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসে সংগ্রহ ৪৫৩। অস্ট্রেলিয়ার ডেভিডসন নেন ৫টি উইকেট। জবাবে অস্ট্রেলিয়া নর্মান ও’নীলের কষ্টসাধ্য ১৮১, সিম্পসনের ৯২ ও ম্যাকডোনাল্ডের ৫৭ রানে ৫০৫ রান করে প্রথম ইনিংসে এগিয়ে যায়। ওয়েষ্ট ইন্ডিজের ওয়েস হল ৪টি উইকেট নেন। দ্বিতীয় ইনিংসে ফ্রাঙ্ক ওরেলের ৬৫, রোহান কানহাইয়ের ৫৪ রানে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২৮৪ রান করলে জয়ের জন্য অস্ট্রেলিয়ার টার্গেট দাঁড়ায় ২৩৩ রান। অস্ট্রেলিয়ার ডেভিডসন ৬টি উইকেট নেন। কিন্তু বুনো বোলিংয়ে ভয়ঙ্কর ওয়েস হলের তা-বে ৯২ রানে অস্ট্রেলিয়ার ৬টি উইকেটের পতন ঘটলে ক্যারিবীয়দের পুরু ঠোঁটে ক্যালিপসো সুর ভাসতে থাকে। কিন্তু ষষ্ঠ উইকেট জুটিতে ডেভিডসন ও অধিনায়ক রিচি বেনো ক্যারিবীয়দের সুর থামিয়ে দেন। সলোমনের দুর্দান্ত থ্রোতে ডেভিডসনকে ৮০ রানে ফিরিয়ে দিলেও বেনো থাকায় জয়ের তরী অস্ট্রেলীয় বন্দরে ভেড়ার অপেক্ষায় থাকে। শেষ ওভারে অস্ট্রেলিয়ার প্রয়োজন ৬ রান। হাতে ৩টি উইকেট। বল হাতে ‘দানবীয়’ হল। হলের বাউন্সারে বেনো ধরাশায়ী হলে, যন্ত্রণার-আবেগের-উৎকণ্ঠার লাভা গড়িয়ে পড়তে থাকে মাঠে। ২৩২ রানের মাথায় অস্ট্রেলিয়ার শেষ দুই ব্যাটসম্যান গ্রাউট ও মেকিফ রান আউট হলে ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথমবারের মত ‘টাই’ হয়। ‘মানুষের সাধনা ও বিধাতার বাসনার যৌথ সৃষ্টি ঐ ‘টাই’।

এমসিসি-র বিপক্ষে ব্যাট করছেন বিজয় মার্চেন্ট সেই ম্যাচে করেছিলেন ১৪৮ রান
এরপর ১৯৮৬-৮৭ মৌসুমে চেন্নাইতে অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের মধ্যেকার দ্বিতীয় ‘টাই’ হলেও প্রথম ‘টাই’ ম্যাচে যে আবেগ-উত্তেজনা-উচ্ছ্বাস ও স্নায়ুর চাপ সৃষ্টি হয়েছিল, তা তুলনারহিত। লেখকের বর্ণনায় ঝরে পড়ে মুগ্ধতা : ‘১৯৬০ সালের ডিসেম্বর মাসের ব্রিসবেন টেস্ট সম্বন্ধে লিখতে আমার সংকোচ হচ্ছে। যে খেলা সম্বন্ধে বলা হয়েছে- না দেখলে তাকে সত্য বলে বিশ্বাস হবে না, দেখলেও বিশ্বাস হওয়া শক্ত যে খেলা দেখতে দেখতে রসিক দর্শকের মনে অপূর্ব অব্যক্ততার চেতনা সঞ্চারিত হয়েছে ক্ষণে ক্ষণে সে খেলার সত্যরূপ ফোটাব কি ক’রে? আমি তো ছার, স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাকে কলম দিলেও তিনি কুন্ঠাবোধ করবেন, কারণ স্রষ্টাও শেষ পর্যন্ত সৃষ্টির সব রহস্য জানেন না। তাছাড়া, সৃষ্টির ব্যাপারে তার ভূমিকা অনেকটা নাট্যকারের মতো। নাট্যকার নাটক লেখেন কিন্তু সে নাটক প্রাণ পায় অভিনয়ে। ক্রিকেট-বিধাতা অদৃশ্য থেকে ব্রিসবেনের টেস্ট নাটকটি লিখে দিয়েছিলেন- কিন্তু সে নাটকের মাঠ রূপের সফলতা এনেছিলেন কয়েকজন ক্রিকেটার-অভিনেতা, তাদের অভিব্যক্তির স্বাধীনতায়।’ …‘চঞ্চলতায়, বিহ্বলতায় আন্দোলিত খেলা— বৈদ্যুতিক উত্তেজনা এবং স্নায়ুধ্বংসী সংকটে পূর্ণ— বেনো ভাবছিলেন— আশা নৈরাশ্যের অবিরত ওঠাপড়ার যন্ত্রণা— এ কী ক্রিকেট। যা দেখলুম। যা খেললুম! ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানরা কিভাবে অনিবার্য পরাজয়কে রক্তজমা ‘টাই’-এ পরিবর্তিত করল। তাদের সাহসের শক্তি, তাদের প্রয়াসের মহত্ত্বে বেনো প্রশংসাবোধ করেন। ‘নৈরাশ্য’? হ্যাঁ, নৈরাশ্য একই সঙ্গে মনে জাগে- এত লড়াইয়ের পরেও আমরা জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় একটি মাত্র রান জোগাড় করতে পারলুম না’। (রমণীয় ক্রিকেট)।
শঙ্করীপ্রসাদ বসু ক্রিকেটকে মনে করেন ‘খেলার রাজা’, ‘ক্রিকেট মহান খেলা’। কারণ, ‘ক্রিকেটের সাহিত্য আছে। খেলার সাহিত্য যদি একমাত্র ক্রিকেটের থাকে, তাহলে বুঝতে হবে ক্রিকেটই সবচেয়ে জীবনময় খেলা’। …‘জীবন বলতে কেবল উত্তেজনা বোঝায় না। জীবন অনেক ব্যাপক। উত্তেজনা, আবেগ ও ধীরতার নানারূপী বিন্যাস সেখানে। জীবনে আছে সূচনা ও সমাপ্তি। উভয়ের মধ্যে ক্ষণে-ক্ষণে পরিবর্তনের তরঙ্গ গতি। ক্রিকেট সেই খেলা। ক্রিকেট জীবনের ক্রীড়া-সংস্করণ’। তিনি অসাধারণ যে দৃশ্যপট এঁকেছেন, তাতে ক্রিকেট রাজ্যে সবাই রাজা: ‘এসব কথাও ভুলে যান। মনে রাখুন একটি শীতের অপরাহ্নকে। সোনালী রোদের মদ। সবুজ মাঠ। আতপ্ত সুতৃপ্ত অবসর। আপনি সেই অবসরের অধীশ্বর। আপনার ইচ্ছার সম্মানে সাদা ফানেলে ঢাকা ব্যাট-বল হাতে কয়েকটি অভিনেতা। আপনি রাজা, সত্যই রাজা। রূপকথাগুলো এখনো বাজেয়াপ্ত হয়নি— স্বপ্নে ও কামনায় একটি নিতান্ত রাজা। রাজা হয়ে বসে আপনি খেলা দেখছেন- দেখছেন খেলার রাজাকে। আমরা সবাই রাজা আমাদের এই খেলার রাজত্বে। (রমণীয় ক্রিকেট)। এছাড়া ‘রমণীয় ক্রিকেট’ গ্রন্থে ‘চায়ের পেয়ালায় ক্রিকেট’, ‘রমণীয় ক্রিকেট’, ‘নাতি রমণীয় ক্রিকেট’, ‘সমালোচকের সমালোচক’, ‘অস্ট্রেলিয়ানিজম’, ‘ক্রিকেটের কুরুক্ষেত্র’, ‘ক্রিকেটারের বউ’, ‘কলমে ক্রিকেট’, ‘ইডেন-গার্ডেনে’ লেখাগুলো ভিন্ন স্বাদের।

১৯৪৬ ওয়ারউইকশায়ারের বিপক্ষে ব্যাট করছেন মুস্তাক আলি
১৯৬২ সালে প্রকাশিত ‘বল পড়ে ব্যাট নড়ে’ গ্রন্থে ঠাঁই পেয়েছে ক্রিকেট ইতিহাসের সব মহান ও মহৎ চরিত্ররা। ডব্লিউ জি গ্রেসের মত এতটা আকর্ষণীয়, রোমাঞ্চকর এবং অবিশ্বাস্য সব কীর্তি ও কুকীর্তি আর কোনো ক্রিকেটারের ঝুলিতে নেই— এ কথা নিঃসন্দেহে বলে দেয়া যায়। ভিক্টোরীয় যুগে ইংল্যান্ডের ক্রিকেটগাঁথার এই নায়কের গোটা জীবনটাই ক্রিকেটময়। ২২টি টেস্ট ম্যাচ খেললেও ৪৪ বছরের প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট ক্যারিয়ারে ১২৪টি সেঞ্চুরি ও ২৫১টি হাফ-সেঞ্চুরিসমেত ৮৭০ ম্যাচে ৫৪ হাজার ২১১ রান, ২৮০৯টি উইকেট আর ৮৭৬টি ক্যাচ নিয়ে তিনি এক কিংবদন্তী হয়ে আছেন। ‘দ্য ডক্টর’ নামে খ্যাত গ্রেসকে বলা যায়, আধুনিক ব্যাটিং পদ্ধতির প্রবর্তক। বিশাল চেহারা, লম্বা দাঁড়ি ও অফুরন্ত প্রাণশক্তির এই ক্রিকেটার তার মহত্ব, তার চালাকি ও তার অনবদ্য ছেলেমানুষি দিয়ে ক্রিকেটের রূপকথার নায়কে পরিণত হয়েছেন। ক্রিকেটের সবচেয়ে বর্ণাঢ্য এই চরিত্র ডব্লিউ জি গ্রেসকে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন চমৎকারভাবে: ‘ক্রিকেট, গ্রেসের কাছে ক্রীড়ামাত্র ছিল না, ছিল জীবনের অঙ্গ। ক্রিকেট এবং জীবনবোধ- একই কথা এবং জীবন যেহেতু সাজানো ড্রইংরুম নয়, তাতে কৌতুক আছে, কৌশল আছে, ভদ্রতা এবং পরিমিত মাত্রায় ইতরতা- সবই আছে- গ্রেসের ক্রিকেটেও তাই ছিল। আনন্দোচ্ছ্বল দুর্বৃত্ততার গুণে জিতে গিয়েছিলেন গ্রেস। তার চরিত্রও ঐ রকমই ছিল। সাধারণ ইংরেজদের চরিত্রও তাই- সহানুভূতি, সহৃদয়তা, সংকীর্ণতা ও রক্ষণশীলতার বিচিত্র সমন¦য়। অন্য বিখ্যাত খেলোয়াড়রাও অনেকে খেলার মধ্যে নিজেকে ব্যক্ত করেছেন, কিন্তু তাদের সেই ব্যক্তিরূপ তাদের জাতিরূপের একাংশকে মাত্র প্রকাশ করেছে। অপরপক্ষে ডা. গ্রেস ছিলেন সকল সাধারণ ইংরেজের প্রতিনিধি। সুতরাং সাধারণের স্বভাব অনুযায়ী তিনি খেলা থেকে কৌতুকময় দুষ্টুমি বা ভদ্র স্বার্থপরতা বাদ দিতে পারেননি।’ (বল পড়ে ব্যাট নড়ে)। (চলবে)