ক্রিকেট কি শুধু পরিসংখ্যানের খেলা? পরিসংখ্যানে কতটুকু সত্য থাকে? কোনো মহাকাব্যিক ইনিংস কি অনুভব করা যাবে পরিসংখ্যান দেখে? ১৯৬০ সালে ব্রিসবেনে অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যকার টাই টেস্টের পরতে পরতে যে উত্তেজনা ও অবিশ্বাস্য নাটকীয়ত স্নায়ুকে বিকল করে দিয়েছিল, তা কি ফুটে ওঠে পরিসংখ্যানের কঙ্কালে? ক্রিকেটের বর্ণাঢ্য চরিত্র ‘বুড়ো শয়তান’ খ্যাত ডব্লিউ জি গ্রেস কিংবা সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার হিসেবে সম্মানিত ডন ব্রাডম্যানকে পরিসংখ্যানে কতটুকু চেনা যায়? চেনা যায় না বলেই যুগে যুগে ক্রিকেট লিখিয়েরা তাদের মিষ্টি-মধুর কলমে পরিবেশন করেছেন ক্রিকেটের রূপ-রস-সৌন্দর্য। তাদের কলমের আঁচড়ে স্মরণীয় হয়ে আছে মহান ক্রিকেটারদের অমর কীর্তি আর মহাকাব্যিক ইনিংসের লাবণ্য ও সুষমা। সাহিত্যের অধ্যাপক হীরেন চট্টোপাধ্যায় যেমনটি বলেছেন : ‘আসলে ক্রিকেট খেলা সম্পর্কে লেখা মানে যে তার তথ্য ও পরিসংখ্যান পেশ করা নয়, তাকে যে প্রাণবন্ত করে তোলা যায়, একটি সুন্দর ইনিংস যে মোৎজার্টের একটি সিম্ফনি বা বড়ে গোলাম আলি খাঁ সাহেবের বিলম্বিত ও মধ্যলয়ের শাস্ত্রীয় রাগ-রাগিণীর সমগোত্রীয় হয়ে উঠতে পারে, এই আবিষ্কারই তো ওইসব লেখার প্রতি আমাদের মোহমুগ্ধ করে রেখেছিল।’ ক্রিকেট যেমন বৃটিশদের গর্ভজাত, তেমনি ইংরেজি ভাষায় ক্রিকেট সাহিত্যও তাদের দান। এ বিষয়ে রাখাল ভট্টাচার্যের অভিমত হচ্ছে : ‘খেলার রাজ্যে ভাবোদ্বেল সাহিত্য সৃষ্টির অবকাশ ক্রিকেটে যত আছে, এত আর কোনো কিছুতে নেই। ইংরেজি ভাষায় ক্রিকেট-সাহিত্য যারা পাঠ করেছেন, তারা একবাক্যে স্বীকার করবেন, মহাসমৃদ্ধশালী ইংরেজি সাহিত্যের প্রথম পংক্তিতে স্থান পাবার যোগ্যতা তার আছে। যে রসসমৃদ্ধ, অলঙ্কারমন্ডিত ও ছন্দময়। ক্রিকেটের বিকল্প নয় সে সাহিত্যপাঠ; ক্রিকেট দেখার থেকে সূক্ষ্ম রসানুভূতি মেলে তাতে। আমি তো বলি, ক্রিকেটের দীর্ঘ ও গৌরবময় ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ ইনিংস ব্যাট থেকে উৎসারিত হয়নি, তা হয়েছে একজনের কলম থেকে, তার নাম নেভিল কার্ডাস। কার্ডাস মূলত সঙ্গীত-সমালোচক। সঙ্গীতেরই তাল-লয়-যতি, মূড়-মূর্ছনা-গমক, সব তার কাছে ধরা পড়েছে, ক্রিকেটেও এবং এত কিছু যে ক্রিকেটে আছে, তারও খবর লোকে জেনেছে সঙ্গীত-সমালোচক কার্ডাসের ক্রিকেট-সমালোচনা পড়ে।’

পঙ্কজ রাজ ও ভিনু মাঁকড়
বাঙালির রক্তে ক্রিকেট নেই— পঙ্কজ রায় অল্প কিছু পরিমাণে এবং সৌরভ গাঙ্গুলি তা পুরোপুরি খণ্ডন করে দিয়েছেন। এখন তো বাঙালিদের একটি দল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্রিকেট খেলছে। তবে ক্রিকেট খেলায় নাম কুড়ানোর আগেই সমঝদার হিসেবে সুখ্যাতি পেয়েছে বাঙালিরা। যদিও কথাসাহিত্যিক শঙ্করের মত বাঙালিরা শুরুতে মনে করতেন : ‘ক্রিকেটটা কোনো খেলা নয়, কলোনিয়াল কালচারের একটি বর্বর প্রকাশ মাত্র, ফলে দু’জন লোক লাঠি হাতে সারাদিন খাটায় একাদশ নির্দোষ মানুষকে।’ অথচ একদিকে বাঙালিরা ইংরেজ খেদাও আন্দোলন করেছে, অন্যদিকে মজেছে ক্রিকেট রসে। আস্তে-ধীরে বাঙালিরা আত্মস্থ করে নিয়েছেন ‘ক্রিকেট-কালচার’কে। আর এ থেকেই জন্ম নিয়েছে বাংলা ক্রিকেট-সাহিত্যের। গত শতাব্দীর শুরুর দিকে কেউ কেউ এগিয়ে এলেও বাংলা ক্রিকেট সাহিত্যকে পূর্ণতা দিয়েছেন শঙ্করীপ্রসাদ বসু (জন্ম : ২১ অক্টোবর, ১৯২৮, হাওড়া, কোলকাতা)। ষাটের দশকটা ছিল শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র, চিত্রকলার উজ্জ্বল সময়। সে একটা সময় ছিল, যখন হেমন্ত-লতা-কিশোরের রোমান্টিক গান বুকে সুর হয়ে বেজেছে। উত্তম-সুচিত্রার মিষ্টি প্রেমের ছবি মনকে করেছে উতলা। সুনীল-শক্তির কাব্যরসে আপ্লুত হয়েছেন পাঠক। চিত্রকরের রঙিন ক্যানভাস রূপতৃষ্ণায় ভরিয়ে দিয়েছে দু’চোখ। সৃষ্টিশীল এমন এক সময়ে ‘গদ্যের মধ্যে পদ্য করে ক্রিকেট-সুন্দরীর গায়ে রঙ-বেরঙের নকশা’ কেটেছেন শঙ্করীপ্রসাদ বসু।
বিশিষ্ট সাংবাদিক অমিতাভ চৌধুরীর ভাষায়, ‘ক্রিকেট রসিক’ এই ভদ্রলোকের হাতে জন্ম সুনিপুণ ক্রিকেট সাহিত্যের। রাজকীয় ও কেতাদুরস্ত ক্রিকেটে ইংরেজি ভাষায় যতটা লাবণ্য ধরে, বাংলা ভাষায় কি ততটা মাধুর্য পাওয়া যায়? এমন একটা দোলাচল বরাবরই ছিল। সাহিত্যের অধ্যাপক শঙ্করীপ্রসাদ বসু বাংলা ক্রিকেট সাহিত্যের মরুভূমিতে শুধু ফুলই ফোটাননি, তারই হাতে পরিস্ফুটিত ও বিকশিত হয়েছে বাংলা ক্রিকেট সাহিত্যের সুবাসিত এক বাগানের। শঙ্করীপ্রসাদ বসু বাংলা ক্রিকেট সাহিত্যের যে সোনার খনির সন্ধান দিয়েছেন, তা থেকে পাঠকরা এখনও তুলে নিচ্ছেন মুঠো মুঠো সোনা। শঙ্করীপ্রসাদ বসু এবং তার ক্রিকেট সাহিত্য নিয়ে লিখতে যেয়ে প্রতি মুহূর্তে তারই লেখার স্মরণাপন্ন হতে হয়েছে। ক্রিকেট নিয়ে তার কল্পনা, তার সৃষ্টি, তার অনুবাদ এমনই আবিষ্ট করে রাখে যে, এর বাইরে নতুন ভাবনা কিংবা শব্দচয়ন খুবই দুর্বল ও অপ্রতুল মনে হয়। তাকে জানার সোজাপথ হলো তার লেখা পাঠ করা। এ কারণে এ লেখায় তার লেখার উদ্ধৃতি ও বাক্য অতিমাত্রায় ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ তিনি শুধু ক্রীড়া লেখক ছিলেন না। তার গবেষণার আলোয় আলোকিত হয়েছে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির নানা দিক। সাহিত্যের অধ্যাপক অমিয় দত্তের মতে : ‘বৈদগ্ধ্যের বৈভবে শঙ্করীপ্রসাদ বসুর ভাবমূর্তি হিমালয়-সদৃশ। কত দিকেই না তার মানসাভিসার। বৈষ্ণব সাহিত্যের রসময় আলোচনায়, ক্রিকেট সাহিত্যের সৌরভময় দুনিয়ায়, রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ-নিবেদিতা-সুভাস চন্দ্রের ঐতিহাসিক আবির্ভাবের গবেষণাধর্মী মহাগ্রন্থ রচনায় তার অসামান্যতা সর্বজনবিদিত।’

বিজয় হাজারে
বাঙালির জীবনচর্যা ও সংস্কৃতিতে বহুল উচ্চারিত শঙ্করীপ্রসাদ বসুর লেখনী নিয়ে মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন কথাসাহিত্যিক হর্ষ বসু : ‘সে এক গভীর বিস্ময়, বাকরুদ্ধ স্তব্ধতা। কেবলই মনে হয়ছে, শুধু নিষ্ঠা বা মেধার জোরে এমন কালজয়ী কাজ করে ওঠা সম্ভব নয়। এর জন্য চাই জন্মগত বিরল প্রতিভা। শঙ্করীপ্রসাদ সেই বিরল প্রতিভাসম্পন্নদের মধ্যে একজন— যাঁরা সংখ্যায় মুষ্টিমেয়। কিন্তু যাদের সৃষ্টি প্রবহমান মানবসভ্যতাকে এক অপতিরোধ্য ঋণের জালে বেঁধে রেখেছে।’ জীবন ও সৃষ্টির নানাদিক নিয়ে মেতে উঠলেও শঙ্করীপ্রসাদ বসু স্বীকৃতি পেয়েছেন বাংলার ‘নেভিল কার্ডাস’ হিসেবে। ‘খেলার মাঠকে তিনি সারস্বত সাধনার ক্ষেত্রে পরিণত করেছিলেন।’ প্রথম যৌবনে তিনি যখন ছিলেন ক্রিকেট নেশাগ্রস্ত, তখন ‘ক্রিকেটের নেশা আমাকে যখন পেয়ে বসলো তখন একদিকে জীবনের মধুর শীতের দুপুরগুলি কাটাতে শুরু করলুম ইডেনের গ্যালারীতে বসে, অন্যদিকে বাড়ি ফিরে এসে চোখ ডুবিয়ে দিলুম ইংরেজিতে লেখা ক্রিকেটের অপূর্ব সব কাহিনীতে। ক্রিকেট যারা ভালবাসে- তারা খেলা কেবল মাঠেই দেখে না, বইয়ের পাতাতেও দেখে থাকে’— এমন অভিজ্ঞতা নিয়ে শঙ্করীপ্রসাদ বসু ক্রিকেটের রসকে কাগজে-কলমে রূপায়িত করেছেন। চোখের দেখা, ইংরেজি ক্রিকেট সাহিত্য আর পরিসংখ্যানের ফাঁক-ফোকড় গলিয়ে আহরণ করেছেন ক্রিকেটের মাধুর্য। মহাজীবনের গাঁথা (১৯৫৩), মধ্যযুগের কবি ও কাব্য (১৯৫৫) ও চন্ডীদাস ও বিদ্যাপতির (১৯৬০) লেখক শঙ্করীপ্রসাদ বসু ১৯৬০ সালে ‘ইডেনে শীতের দুপুর’ লিখে কাঁপিয়ে দেন বাংলার ক্রিকেটানুরাগীদের।

পঙ্কজ রায়
কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী লিখেছেন: ‘শঙ্করীপ্রসাদ বসুও সেই দুর্লভ বাকশক্তির অধিকারী, অন্যের মনশ্চক্ষুকে যা অতি অক্লেশে খুলে দেয়। ছাত্রমহল জানে, তিনি একজন খ্যাতিমান অধ্যাপক; ক্রীড়ামহল জানে, তিনি একজন দক্ষ দর্শক এবং পাঠকমহল জানে, তিনি একজন শক্তিমান লেখক, বাচনভঙ্গির চাতুর্যে নেপথ্যের ঘটনাকেও যিনি দৃশ্যমান করে তুলতে পারেন। আমি তার এই বই (ইডেনে শীতের দুপুর) পড়েছি এবং স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, ঘরে বসেই ক্রিকেট খেলা দেখেছি। দেখা সম্ভব হতো না, তার ভাষা যদি-না বর্ণনাময় এবং বর্ণনা যদি-না নিখুঁত হতো। আসল কথা, ক্রিকেটকে তিনি ভালবাসেন। ভালবাসার বস্তুটিকে তিনি প্রাণ দিয়েছেন। দূরের থেকে কাছে টেনে এনেছেন। এ অতি শক্ত কাজ, তাতে সন্দেহ নেই।’ লেখকের বসবাস কলকাতায় হওয়ায় ইডেন গার্ডেনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার মধুময় স্মৃতি। ইডেন গার্ডেনে কাছ থেকে খেলতে দেখেছেন বিশ্ব-সেরা ক্রিকেটারদের। কোনো কোনো ক্রিকেটার তার মন জয় করে নেন। তাঁদের ক্রিকেটশৈলী ও ব্যক্তিত্ব তাকে আবিষ্ট করে রেখেছে। মূলত এদেরকে কেন্দ্র করে ‘ইডেনে শীতের দুপুর’-এ যেন শব্দ দিয়ে বাজানো হয়েছে হৃদয়ের সুর। ক্রিকেটের আলোয় খুঁজে পাওয়া যায় জীবন-জগতের নতুন ব্যঞ্জনা। ‘এর নাম ইডেন গার্ডেন’ শিরোনামের লেখায় ফিরে ফিরে আসে শৈশব-কৈশোরের মধুমাখা দিনগুলো। লেখক তার গুণেনদার হাত ধরে সেই কবে গিয়েছিলেন ইডেন গার্ডেনে, সেই থেকে যাবার পর প্রতিবারই ফিরে আসার সময় চোখের তৃষ্ণা পিছনে ফেলে এসেছেন। তারই তাড়নায় আবার গিয়েছেন। এমনি চলেছে বছরের পর বছর। ইডেন গার্ডেনের মায়া থেকে নিস্তার পাননি। পাননি বলেই ভুলতে পারেননি জীবনের সেইসব আনন্দময় দিনগুলোর কথা : ‘কিভাবে শীতের সকালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলা দেখতে লাইন দিয়েছি ইডেন গার্ডেনে। খুব ভিড়ের সম্ভাবনা, সিজন টিকিটের পয়সা জোটেনি। ভোর-ভোর বেরুতে হয়েছে। যখন মাঠে পৌঁছেছি, অলস ঘুমের মতো তখনও কুয়াশা জড়িয়ে আছে পাইন-দেবদারুর পাতায় পাতায়। ওধারে হাইকোর্টের চূড়োটি কেমন মায়াময়। আবছা আলোয় গড়ের মাঠ। কালো নোঙর-করা নৌকোর মত টেন্টগুলো। ওয়ার মেমোরিয়ালের সামনে মাথা-নামানো ব্রোঞ্জের সৈনিক দুটোর ভঙ্গিতে সুকোমল নমস্কার। দৌড়ে-দৌড়ে আসতে হয়েছে। ইতোমধ্যে লাইন খুব কম হয়নি। আমরা আছি পাঁচজন। তাড়াতাড়ি লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ে দু’জনকে পাঠিয়ে দেয়া হলো খোঁজ-খবরে আমাদের লাইনটা ঠিক লাইন কি না, অন্য গেটে ছোট লাইন আছে কি না, চেনাশোনা কেউ আগে আছে কি না, সেখানে ঢোকার চান্স কি রকম? কাঁধের ঝোলাগুলো, একবার নেড়েচেড়ে নিই। ঠিক আছে’।
ক্রিকেটের নেশায় বুঁদ হয়ে যারা ছুটে যান ক্রিকেট মাঠে, এ তো তাদের জীবনের দিনলিপি— যা চমৎকারভাবে এঁকেছেন শঙ্করীপ্রসাদ বসু। তখন সময়টা আসলেই অন্যরকম ছিল। সবকিছুতেই ছিল সুরুচির একটা প্রচ্ছন্ন ছাপ। ভাল বই, ভাল গান আর ক্রিকেট ছিল বাঙালির মন্থর নগর জীবনের প্রধান বিনোদন। তবে সবার পক্ষে ক্রিকেট মাঠে যাওয়া সম্ভব না হলেও বেতারের ধারাবিবরণী কানে মধবৃষ্টি বর্ষণ করতো। সংবাদপত্রে খেলার বিবরণী কিছুটা তৃষ্ণা মেটাতে সক্ষম হতো। কিন্তু শঙ্করীপ্রসাদ বসু যেন বাঙালিদের ক্রিকেট রসে মজিয়ে দেন। দৈনিক পত্রিকার গতানুগতিক রিপোর্টিং- এর বাইরে নতুন এক ধারার প্রবর্তক তিনি। এ যে ক্রিকেট সাহিত্য! বাঙালির আটপৌঢ়ে জীবনে এক নতুন রসদ।

ভিনু মানকড়
বাঙালিরা যে ক্রিকেট খেলতে পারেন, এটা প্রমাণ করেছিলেন, পঙ্কজ রায়। বর্তমানে ভারতের সর্বকালের সেরা অধিনায়ক ও ক্রিকেটার ‘বাঙালি-বাবু’ সৌরভ গাঙ্গুলির আগে পঙ্কজ রায় ছিলেন শ্রেষ্ঠ বাঙালি ব্যাটসম্যান। সে সময়কার ভেতো ও ভীতু বাঙালি ব্যাটসম্যানদের মধ্যে ‘চরিত্রশক্তিতে অনন্যভাবে সমৃদ্ধ’ ছিলেন তিনি। বলা যায়, পঙ্কজ রায়কে দিয়ে বাঙালির ক্রিকেটে নববসন্তের সূচনা। এ কারণে অন্য অনেকের মত পঙ্কজ রায় ছিলেন লেখকের প্রথম জীবনের ভালবাসা। তাকে পেয়েছিলেন ‘ক্ষ্যাপা আনন্দের জগতে নন্দন চরিত্ররূপে’। ভালবাসার মানুষটিকে বাঙময় করে তুলেছেন এভাবে: ‘কিন্তু সেদিন পঙ্কজের মধ্যে যা দেখেছিলুম, তা আর দেখবার আশা করি না। ছেলেটির সমস্ত দেহের মধ্যে থেকে একটা জিনিস বিচ্ছুরিত হচ্ছিল আত্মবিশ্বাস। চলা-ফেরা, ব্যাট ধরা, স্ট্রোক করা- সবকিছু সহজ দর্প এবং প্রফুল্লতার ভঙ্গিতে বাঁধা। কোনো বলই তার কাছে সমস্যা নয়। তাই বলে কি সেগুলিকে নিরন্তর বাউন্ডারিতে পাঠাচ্ছিলেন? মোটেই নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শুধু থামাচ্ছিলেন, মারছিলেন মাত্র মারবার বলটি। কিন্তু যেভাবে ক্রিজের উপর ঘোরাফেরা করলেন, যে প্রত্যয়ের অনায়াস গতিতে, সে জিনিস একমাত্র তার পক্ষেই করা সম্ভব, যে জীবনের প্রসন্ন মুখ দেখেছে, সেই গৌরবর্ণ খর্বকায় বাবু চেহারার যুবকটি আমাদের মনে একটি সানন্দ মহিমার অনুভূতি সৃষ্টি করেছিল। (ইডেনে শীতের দুপুর)। (চলবে)
ঋণস্বীকার : ক্রীড়াজগত, ১ ফেব্রুয়ারি ২০০৫
দুলাল মাহমুদ মহাশয়ের এই বিশ্লেষণ ক্রিকেট প্রেমী পাঠককে শঙ্করীপ্রসাদ বসুর “ক্রিকেট সমগ্র” গ্রন্থটি সম্পর্কে নিশ্চিত ভাবেই আগ্রহী করে তুলবে। বর্তমান সময়ের গতিশীল জীবনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে টি ২০ ক্রিকেটে আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে পঞ্চ দিবসের আমেজ আমরা ভুলে গেছি। আসল মৌতাত কিন্তু সেখানেই। তাই আজ সকালেও (জানুয়ারি ২০২১) ভারত – অস্ট্রেলিয়া টেস্ট ম্যাচের খবর নিতে আমাদের ভুল হয় না। শঙ্করীপ্রসাদ বসুর লেখনীর এখানেই সার্থকতা। ক্রিকেট যে রামধনুর রঙে রাঙানো এক নস্টালজিয়া, সেটা শঙ্করীপ্রসাদ বসু আমাদের শিখিয়েছেন। দুলাল মাহমুদ মহাশয় কে অনেক অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।