বাংলার রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড়ের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংঘাত এতটাই চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মুখ্যমন্ত্রী বিরক্ত হয়ে রাজ্যপালের টুইট অ্যাকাউন্ট ব্লক করেন। এই ঘটনায় পাল্টা রাজ্যপাল জানান, ‘সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫৯-এ বলা আছে, সাংবিধানিক নিয়ম নীতি এবং আইনের শাসনকে কেউ ব্লক করতে পারেন না। দায়িত্বপ্রাপ্তদের উচিত সংবিধানের প্রতি আস্থা রাখা।’ যদিও তার পর থেকেই শাসক দলের সঙ্গে রাজভবনের বিরোধ অন্য মাত্রায় পৌঁছে যায়। শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস বাংলা থেকে ধনখড়কে সরানোর জন্য সংসদে সওয়ালও করেছে। উল্লেখ্য, রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড় এমন টুইট করেন তা পড়লে মনে হয়না যে সেটা একজন সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তির কথা। বরং মনে হয় বিরোধী রাজনীতিকের বক্তব্য।
অন্যদিকে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যপালের ভূমিকা নিয়েও ক্ষুব্ধ। কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ, বিশেষ করে রাজ্যপাল প্রসঙ্গে দেশের অন্য বিজেপি বিরোধী রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের যাতে এক ছাতার তলায় আনা যায় সে প্রচেষ্টাও শুরু হয়ে গিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যে অবিজেপি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছেন। রাজ্যপালকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে দলের সাংসদরা প্রধানমন্ত্রীকে আর্জি জানিয়েছিলেন।
বাংলার রাজ্যপাল এবং মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক যখন এই রকম সেই পরিস্থিতিতেও ফের একবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজভবনে আসার আহ্বান জানালেন রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড়। মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি লিখে তিনি প্রস্তাব দিয়েছেন এবং রাজ্যপাল চিঠি দেওয়ার কথা টুইট করে জানিয়েছেন। তবে ধনখড়ের সুর এবার অনেকটা নরম। তিনি মুখ্যমন্ত্রীর সময়–সুবিধাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। নরম সুর মনে হয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে মুখ্যমন্ত্রী নালিশ জানানোর পর। ধনখড় অবশ্য চলতি সপ্তাহেই মুখ্যমন্ত্রীকে রাজভবনে আসার অনুরোধ করেছেন।
রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড় ঠিক কী লিখেছেন চিঠিতে? মুখ্যমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে রাজ্যপাল চিঠিতে লিখেছেন, সম্প্রতি তিনি রাজ্য সরকারের কাছে বেশ কিছু বিষয়ে তথ্য চেয়েও পাননি। সেইসব তথ্য না পাওয়া গেলে রাজ্যে সাংবিধানিক অচলাবস্থা সৃষ্টি হতে পারে। যে পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা রাজ্যপাল এবং মুখ্যমন্ত্রী দুজনেরই সাংবিধানিক কর্তব্য। রাজ্যপাল উল্লেখ করেছেন, মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন কোনও জবাব না পাওয়ায় রাজ্যপালের সমস্ত ধরণের আলোচনার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। তাই তিনি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহের যে কোনও দিন মুখ্যমন্ত্রী রাজভবনে এসে যেন রাজ্যপালের সঙ্গে আলোচনায় বসেন।
প্রশ্ন রাজ্যপাল মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে টুইটারে পোস্ট করলেন কেন? তবে এ বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও প্রতিক্রিয়া এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তাছাড়া মুখ্যমন্ত্রী কিছুদিন আগেই রাজ্যপালকে টুইটারে ব্লক করেছেন। কেবল তাই নয়, নাম না করে তিনি ঘোড়ার পাল বলেছিলেন। যা নিয়ে রাজ্য-রাজনীতি ফের একবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এমনকী সাধারণতন্ত্র দিবসে রাজ্যপালের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী কোনও কথা বলেননি। চিঠি নবান্নে পৌঁছে গিয়েছে এখন দেখার মুখ্যমন্ত্রী রাজভবনে গিয়ে রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করেন কিনা।
গোড়া থেকেই সরকারের সঙ্গে রাজ্যপালের সংঘাত লেগেই ছিল। রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড় রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই অসহযোগিতার অভিযোগ করেছেন একাধিকবার। রাজ্যের প্রশাসনিক আধিকারিকদের বারবার তলব করেছেন। যদিও তারা অধিকাংশ সময়ে রাজভবনে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি। তা নিয়েও অভিযোগ করেছেন রাজ্যপাল। এবার জগদীপ ধনখড় সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীর সুবিধামত সময় বের করে আগামী সপ্তাহে যেন রাজ্যভবনে আসেন— এমনটাই রাজ্যপাল আমন্ত্রণ পত্রে লিখেছেন।
প্রসঙ্গত, ১০ মার্চ আবার অবিজেপি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা দিল্লিতে বৈঠকে বসছেন। সেখানে আলোচনা হবে রাজ্যপাল অপসারণের বিষয় নিয়ে। কারণ সব অবিজেপি রাজ্যেই রাজ্যপালরা নানা ভাবে রাজ্য সরকারের কাজে নাক গলিয়ে সংঘাত সৃষ্টি করছে। অভিযোগ বিল আটকে রাখা হচ্ছে। এই নিয়ে বিরোধীরা বাজেট অধিবেশনে সরব হয়েছিলেন। রাজ্য সরকারের অভিযোগ রাজ্যপাল বিল আটকে রাখছেন। রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড় বিধানসভায় দাঁড়িয়ে স্পিকারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলন। স্পিকার মিথ্যে দাবি করছেন বলেও তিনি অভিযোগ করেছিলেন। রাজভবনে কোনও বিল আটকে নেই।
অর্থাৎ সংঘাত অব্যাহত। ২০১৯-এর ৩০ জুলাই ধনখড় দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর দু’পক্ষের মধ্যে সংঘাত লেগেই ছিল। কিন্তু এবার রাজনৈতিকমহল মনে করছে, এই চিঠি ও টুইট আসলে তিনি মমতার সঙ্গে সংঘাত এড়াতে চাইছেন, তাই তার সুর এত নরম। তবে ধনখড়ের চিঠির উত্তর কি দেন মমতা, এখন সেই দিকেই তাকিয়ে গোটা রাজ্য।
আসলে রাজ্যপাল ধনখড় মমতার সঙ্গে সংঘাত এড়াতে চাইছেন, তাই তাঁর সুর এত নরম। তবে ধনখড়ের সঙ্গে মমতা কি করেন, এখন সেই
দিকেই তাকিয়ে গোটা রাজ্য।