সৈকত সুন্দরী দীঘা যাওয়ার পথে কাঁথি ছাড়িয়ে কিছুটা এগিয়ে গেলেই পড়বে লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনের অন্যতম পীঠস্থান পিছাবনী। পিছাবনী-র ব্রিজ পার হলেই এসে পড়বে চাউলখোলা বাসস্টপ। চাউলখোলা বাসস্টপ, এর বাঁদিকে চলে যাওয়া রাস্তায় গাড়ির স্টিয়ারিঙে বসে অ্যাক্সিলেটরে একটু চাপ দিলেই মিনিট দশকের মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যায় রাজ্যের আর এক সৈকত পর্যটন কেন্দ্র মন্দারমণিতে। মন্দারমণিতে ঢোকার মুখের একটু আগেই বাঁদিকে নজরে পড়বে এক খন্ডহরের। যতদূর চোখ যায় শুনশান সৈকততটে নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা খন্ডহরেই চাপা পড়ে গেছে বাংলার শিল্পাচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের নেতৃত্বে বাংলা আর বাঙালির শিল্প ভাবনা আর শিল্পোদ্যোগের এক গৌরবজ্জ্বোল ইতিহাস। গৌরবজ্জ্বোল সেই ইতিহাস জানতে গেলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে সেই তিরিশের দশকে।

তিরিশের দশকে সূর্যের আলোর তাপে সমুদ্রের জল থেকে লবণ তৈরীর স্বপ্ন দেখেছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের সেই স্বপ্নকে সার্থক রূপ দিতে এগিয়ে এসেছিলেন কলকাতার হাটখোলার অজ্ঞাত পরিচিত এক তরুণ বাঙালি শিল্পদ্যোগী যুবক মনুজেন্দ্র দত্ত। ১৯৩০ সালে মহাত্মা গান্ধীর লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলন ও ডান্ডি অভিযানে সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে পড়েন তরুণ শিল্পোদ্যোগী যুবক মনুজেন্দ্র দত্ত। শুধু অনুপ্রাণিত হওয়াই নয়, লবণ সত্যাগ্রহের ঠিক পরের বছরেই ১৯৩১ সালে লবণ তৈরির কারখানা স্থাপনের বীজও মনে রোপিত হয়েছিল মনুজেন্দ্রের। লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনের জেরে পিছু হটে ব্রিটিশ প্রশাসন লবণ আইন প্রত্যাহারের পাশাপাশি ভারতীয়দেরও সমুদ্র উপকূলে লবণ উৎপাদনের সম্পূর্ণ অধিকার দেয়। লবণ তৈরির অধিকার পাওয়ার পরেই প্রফুল্লচন্দ্র রায় বাংলার যুবসমাজ কে লবণ তৈরি-সহ ব্যবসায় উৎসাহিত করতে উদ্যোগী হন। তরুণ শিল্পোদ্যোগী মনুজেন্দ্র দত্ত কলকাতার সার্কুলার রোডে সায়েন্স কলেজে গিয়ে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের সঙ্গে দেখা করে লবণ তৈরির কারখানা বা সল্ট কোম্পানি গঠনের মনোবাসনার কথা জানান।

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের বয়স তখন সত্তর পেরিয়েছে। সত্তরোর্দ্ধ বয়সেও আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় শিল্পোদ্যোগী যুবক মনুজেন্দ্র দত্তের মনোবাসনাকে পূর্ণ সমর্থন জানানোর পাশাপাশি লবণ কারখানা তৈরির ব্যাপারে সর্বতোভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন। বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা মেদিনীপুর জেলার উপকূলবর্তী রামনগর থানার দাদনপাত্রবাড়ের নির্জন সমুদ্র পাড়ে সমুদ্রের নুন মিশ্রিত জল জমিয়ে সূর্যের তাপকে কাজে লাগিয়ে লবণ তৈরির স্বপ্ন দেখা এক বৃদ্ধ আর এক তরুণের যৌথ স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটলো ‘বেঙ্গল সল্ট কোম্পানি লিমিটেড’ নামে লবণ তৈরির কারখানার আত্ম প্রকাশের মধ্য দিয়ে। কোম্পানির চেয়ারম্যান হলেন প্রফুল্লচন্দ্র রায় আর ম্যানেজিং এজেন্ট হন হাটখোলার দত্ত পরিবারের সেই তরুণ শিল্পোদ্যোগী মনুজেন্দ্র দত্ত। বঙ্গোপসাগরের উপকূলে প্রায় এক হাজার ছ’শো একর জমির উপর বিশালাকৃতির একাধিক ভেড়ি তৈরি করে তাতে সমুদ্রের নোনাজল জমিয়ে সূর্যের তাপকে কাজে লাগিয়ে শুরু হল বহু আকাঙ্ক্ষিত লবণ তৈরির কাজ।বেঙ্গল সল্ট কোম্পানিতে রাজ্য ও ভিন রাজ্য থেকে আসা প্রায় পাঁচশো জন শ্রমিক লবণ তৈরির কাজে যুক্ত হলেন।

দেশের স্বাধীনতা লাভের প্রায় দেড় দশক পর দাদনপাত্রবাড়ে রমরমিয়ে চলতে থাকা বেঙ্গল সল্ট কোম্পানি পরিদর্শনে আসেন রাজ্যের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধানচন্দ্র রায়। লবণ কারখানা পরিদর্শনের পরে লবণ শিল্পের উন্নতির জন্য ফরাসী বিশেষজ্ঞদের নিযুক্ত করেনতিনি। বিশেষজ্ঞদের দেওয়া রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে বেঙ্গল সল্ট কোম্পানির ২৩ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শিল্প দফতর। তার পরের দু’দশক ভালোভাবেই চলতে থাকে বেঙ্গল সল্ট কোম্পানির ব্যবসা-বাণিজ্য। প্রতি সপ্তাহে লরি লরি লবণ বোঝাই হয়ে রাজ্যের ও রাজ্যের বাইরে বিভিন্ন জায়গায় রফতানি হত বেঙ্গল সল্ট কোম্পানির লবণ।
বেঙ্গল সল্ট কোম্পানির প্রাক্তন সুপার ভাইজার মদনমোহন দাসের কথায়,শিল্পাচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের পরামর্শে সমুদ্র উপকূলে গড়ে উঠা বেঙ্গল সল্ট কোম্পানি রাজ্য সরকারের ২৩ ভাগ মালিকানা আর রাজ্য সরকারের এক প্রতিনিধি নিয়ে দীর্ঘ ৫০ বছর সুষ্ঠুভাবে চলার পর পরিচালন ব্যবস্থায় দুর্নীতির প্রবেশ ঘটে। ১৯৮৭ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে রুগ্ন হতে শুরু করে। নব্বুইয়ের দশকের গোড়া থেকেই বাড়তে থাকে কোম্পানির লোকসানের বোঝা। ৯০ সাল থেকে শুরু হয় কর্মী ও শ্রমিকদের প্রতি অবহেলা আর বঞ্চনা। সেই থেকেই শ্রমিকরা বেতন, গ্র্যাচুইটি, বোনাস কোন কিছুই পাননি।

১৯৯০ থেকে কোন রকমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলার পর ২০০০ সালে বন্ধ হয়ে যায় বেঙ্গল সল্ট কোম্পানি। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নিজেদের প্রাপ্ত টাকা বেশ কয়েক বছর অপেক্ষা করেও না পেয়ে শ্রমিকেদের অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটানো শুরু হলে কয়েকজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। কাজের পাওনা গন্ডা না পাওয়া ও সহকর্মীদের মৃত্যুতে অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে আসা শ্রমিকরা বিফল মনোরথে দেশে ফিরে গেলেও কোম্পানির চত্বরেই থেকে যান ৬টি পরিবার।
সেই ৬ পরিবারের একজন লক্ষ্মী গোড়লা। চল্লিশের দশকে লক্ষ্মীর পূর্বপুরুষরা বেঙ্গল সল্ট কোম্পানিতে শ্রমিক হয়ে অন্ধ্রপ্রদেশের নিকাকোলাম থেকে দাদনপাত্রবাড়ে আসেন। তারপর থেকে বংশানুক্রমিক ভাবে তারা বেঙ্গল সল্ট কারখানাতেই রয়ে গেছেন। লবণ কারখানার প্রাক্তন মহিলা শ্রমিক লক্ষ্মী গোড়লার লবণ কারখানার চাকরি গেছে দুই দশক আগেই। একশো দিনের মাটি কাটা আর দিন মজুরির মধ্যেই কোনরকমে কাটে ‘দিন আনি, দিন খাই ‘জীবন।

রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে খন্ডহরে পরিণত বেঙ্গল সল্টের পতিত ১৬০০ একর জায়গার মধ্যে ৭০০ একর জমিতে ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বিশিষ্ট বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হলেও আজ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত করা যায় নি।
বন্ধ হয়ে পড়ে থাকা লবণ কারখানা ও কর্মচ্যুত কর্মীদের সৌভাগ্য ফেরানোর আশায় বছর কয়েক আগেও জন্মসূত্রে তেলেগু লক্ষ্মী গোড়লা সঙ্গীসাথীদের নিয়ে সৌভাগ্যের দেবী ‘মা লক্ষ্মী’র আরাধনার আয়োজন করতেন। বাঙালির চিরাচরিত লক্ষ্মী পুজোর দিন অন্ধ্রপ্রদেশের নিয়ম ও আচার রীতি মেনে বটগাছের নীচে ব্রহ্মা, বিষ্ণু আর মহেশ্বরের ছবির সামনে বটপল্লব, সিঁদুর, ধূপ আর ডাব দিয়ে ঘট সাজিয়ে সৌভাগ্যের দেবীকে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করতেন। কয়েক বছর ধরে তাও বন্ধ। লক্ষ্মী গোড়লার কথায়, কী আর হবে সৌভাগ্যের দেবী আরাধনায়। অলক্ষে যে অলক্ষ্মী বাসা বেঁধে ফেলেছে বেঙ্গল সল্ট কোম্পানির লবণ কারখানায়।
ছবি : সোহম গুহ।
সুব্রত গুহ বাবুকে অসংখ্য ধন্যবাদ এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে সকলের সামনে তুলে ধরার জন্য। ২০২০-২১ শেষ বেঙ্গল সল্ট কোম্পানির শ্রমিকদের স্বার্থে আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়েছিলাম। তাই সরকারি আশ্বাস বাস্তবায়িত ঠিক কবে নাগাদ হবে, সেই অপেক্ষায় অনেকেই…..