| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ইংরেজের চোখে আড়াইশ বছর আগের বাঙালি চরিত্রি (তৃতীয় পর্ব) : স্বর্ণাভা কাঁড়ার

Reporter
স্বর্ণাভা কাঁড়ার / ৬৬০ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২২

চার্লস গ্রান্টের প্রতিবেদন, বিভিন্ন জেলার বিবরণ

চার্লস গ্রান্টেরপ্রতিবেদন রচনার প্রায় দশ বছর পর ১৮০১ সালে তৎকালীন গবর্নর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলী বাংলার বিভিন্ন জেলার জজ ও ম্যাজিস্ট্রেটদের কাছে নতুন রাজস্ব ও বিচার ব্যবস্থার ফলাফল জানতে চেয়ে এক প্রশ্নাবলী প্রেরণ করেন। প্রশ্নাবলীর একটি অংশে প্রত্যেক জেলার অধিবাসীদের নৈতিক চরিত্র ও স্থানীয় অপরাধ সম্বন্ধে তাঁদের অভিজ্ঞতা জানতে চাওয়া হয়েছিল। তাঁরা যে জবাব পাঠিয়েছিলেন সেগুলি গ্রান্টের মতামতই সমর্থন করে। তাঁদের মতে বাঙ্গালীরা কপট, অকৃতজ্ঞ ও মিথ্যাচারী। নৈতিক অধঃপতনও অত্যন্ত প্রকট। চুরি, ডাকাতি, নরহত্যা সব জেলাতেই অত্যন্ত ব্যাপক। সাধারণ মানুষ অসহায়, নির্বিকার। এই অবস্থার উন্নতিবাধানে তাঁরা যে সব সুপারিশ করেছিলেন সেগুলিও অত্যন্ত মূল্যবান। যেমন মুর্শিদাবাদের আপীল ও সার্কিট আদালতের বিচারপতিদ্বয় টি প্যাটল এবং আর রোশ বলেছিলেন, একমাত্র শিক্ষার দ্বারাই এ জাতির নৈতিক চরিত্রের উন্নতি সম্ভব। অপর দিকে নদীয়ার জজ ও ম্যাজিস্ট্রেট সি ওল্ডফিল্ড পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন, মদের ওপরে চড়া হারে শুল্ক বসিয়ে পানদোষ বন্ধ করা সম্ভব নয়।

এখানে কয়েকটি প্রধান প্রধান জেলার বিবরণ সংক্ষেপে উল্লেখ করা হল। প্রসঙ্গত তৎকালীন বাংলার প্রশাসনিক বিভাগ সম্বন্ধে একটা কথা বলা দরকার। না হলে বুঝতে অসুবিধা হতে পারে। তখন কলকাতা বিভাগের অধীনে ছিল যশোহর, বীরভূম, হুগলী, নদীয়া, বর্ধমান ও ২৪ পরগনা জেলা। ঢাকা বিভাগের অধীনে ছিল বাখরগঞ্জ, ত্রিপুরা, সিলেট, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও ঢাকা-জালালপুর জেলা। মুর্শিদাবাদ বিভাগের অধীনে ছিল রাজসাহী, ভাগলপুর, পূর্ণিয়া, মুর্শিদাবাদ ও রংপুর। প্রত্যেক জেলায় সাধারণত জজ ও ম্যাজিস্ট্রেট পদে একজন করে ইংরাজ অফিসার থাকতেন। নিম্নের বিবরণগুলি তাঁদের রচনা ; তবে স্বতন্ত্রভাবে কারও নাম বা পদ উল্লেখ করা হল না। শুধু জেলার নামের পাশে বন্ধনীতে তাঁদের প্রেরিত চিঠির তারিখ নির্দেশ করা হল।

মেদিনীপুর (৩০ জানুয়ারি, ১৮০২)

এখানে শঠতা, জালিয়াতি, আদালতে ঘুষ দেওয়া ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া খুবই সাধারণ ব্যাপার। আমলাদের মধ্যে ষড়যন্ত্র, দুর্নীতি এত বেশী যে সুবিচার কখনই হয় না। চুরি ও ডাকাতি ছাড়া অন্যান্য অত্যাচার, নৃশংসতা অনেক হ্রাস পেয়েছে। নারী, ভৃত্য ও ক্রীতদাসদের ওপর অত্যাচার প্রায় বন্ধ হয়েছে।

যে ব্যবস্থায় মুসলিম আইন প্রয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও প্রকৃত অপরাধী শান্তি পায় না (তখন মুসলিম আইন অনুসারে ফৌজদারী বিচার হত) সেখানে মদ্যপান, বেশ্যাবৃত্তি, অশালীনতা ও ভ্রষ্টাচার বৃদ্ধি পাবে এটা খুবই স্বাভাবিক। অবশ্য এই জেলায় এই সব অপরাধ ভয়ঙ্কররূপে প্রকাশ পায়নি।

মেদিনীপুর জেলায় বড় কোন শহর নেই। এই প্রসঙ্গে আমি একটা নিজস্ব অভিমত ব্যক্ত করতে চাই। তা হল, কোনও বিচারালয়ে নৈতিকতা শিক্ষার সুযোগ নেই। আমার এরূপ বিশ্বাস করবার যথেষ্ট কারণ আছে। কলকাতায় ইংরাজ আইন ও কড়া পুলিসী ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও সেখানকার লোকদের নৈতিক চরিত্র সবচেয়ে খারাপ। শহরের বিরাট আয়তন, বিপুল লোকসংখ্যা ও অসংহত সমাজ এর কারণ বলে মনে করি না। সুপ্রীম কোর্ট এর জন্য অংশত দায়ী। সুপ্রীম কোর্টের সঙ্গে যুক্ত এমন একজন নেটিভকেও জানি না যার আচরণ ও নৈতিকতা তার সংস্পর্শে কলুষিত হয়নি। এই ত্রুটি নির্দেশ করবার সময়ে আমি কোনও ব্যক্তি বিশেষকে দোষারোপ করছি না বা বিচার ব্যবস্থার প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করছি না।

মেদিনীপুরের বেশীর ভাগ অধিবাসীর চরিত্রে সরলতা ও নমনীয়তা বর্তমান। এরা হিন্দুদের বৈশিষ্ট্য রক্ষা করে চলেছে। পার্শ্ববর্তী জেলাগুলির অধিবাসীদের তুলনায় এরা অনেক কম কলহপরায়ণ এবং কম ঝামেলা সৃষ্টি করে। তবে একটু মামলাবাজ। আমার মনে হয়, কাছারীতে কী কারবর চলে এবং সেখানে দুর্নীতি যে কতটা ব্যাপক তা জানবার সুযোগ এদের ঘটেনি।

যশোহর (৭ ডিসেম্বর, ১৮০১)

নিম্ন শ্রেণীর অধিবাসীদের নৈতিক চরিত্রের উন্নতি হয়েছে বলে আমি মনে করি না। নরহত্যা, গৃহদাহ ও ডাকাতি খুব ব্যাপক। পুলিস সংগঠন ক্রুটিপূর্ণ হওয়ায় অপরাধ প্রমাণ করা কঠিন; জমিদারদের কর্মচারীদের সঙ্গে চোর-ডাকাতদের যোগসাজস থাকায় এবং সাক্ষ্য দিলে সাক্ষীর খুন হবার আশঙ্কা থাকায় লোকে সাক্ষ্য দিতে ভয় পায়। কাজেই কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা না করলে এই সব অপরাধ দমন করা সম্ভব নয়। নরহত্যা, গৃহদাহ ও অন্যান্য নৃশংসতার অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের ও তাদের সাহায্যকারীদের মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকা উচিত। আমি আরও মনে করি, জঘন্য অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের সদাচরণের উপযুক্ত মুচলেকা না দিলে তাদের আর সমাজে ফিরতে দেওয়া উচিত নয়।

বীরভূম (২৫ মার্চ ১৮০২)

এই জেলার অধিবাসীদের নৈতিক চরিত্র সন্বন্ধে আমার ধারণা খুব খারাপ। আমি মনে করি ব্রিটিশ সরকার যে কোমল শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছেন তা এদের দুঃশীল চরিত্রে উপযুক্ত প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। একমাত্র ভয়ই এদের দুঃস্বভাব দমনে রাখতে পারে। বর্তমানে বিভিন্ন অপরাধের জন্য যে শাস্তির ব্যবস্থা আছে তার প্রতি এদের ভয় খুব কম।

নদীয়া (৬ জানুয়ারি, ১৮০২)

অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে যে, এই জেলার অধিবাসীদের নৈতিক চরিত্র আমার মতে মোটেই ভাল নয়। সরকার যে শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছেন তার ফলে এদের নৈতিক চরিত্রের কোন উন্নতি তো ঘটেই নি, বরং অবনতি ঘটেছে। বর্তমান অবস্থা এদের পক্ষে খুবই কোমল; কারণ, ছোটবেলা থেকে এরা নিঠক প্রবৃত্তির তাড়নায় চালিত হয়. আর এদের শিক্ষাও সম্পূর্ণ উপেক্ষিত।

ডাকাতি ও নরহত্যা এ অঞ্চলের প্রধান অপরাধ। এর কারণ প্রধানত গ্রামের গোমস্তা বা প্রধানেরা দুর্বৃত্তদের শাস্তি দেওয়ার ব্যাপারে কোনরকম সহযোগিতা করে না। তাছাড়া অভিযোগ দায়ের করলে ফরিয়াদীর সপরিবারে প্রাণনাশের আশঙ্কা থাকে (অন্তত হিন্দুদের পক্ষে ত বটেই); আবার হলফনামা পাঠ করে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ারও ভয় আছে। এদের চরিত্র এমন কাপুরুষোচিত যে কোনও ব্যক্তি বা গ্রামের ওপরে ডাকাতেরা সদলে আক্রমণ করলে গ্রামবাসী পরস্পরকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে না; বরং খবর পেলে সঙ্গে সঙ্গে কাছেভিতে অঞ্চলে বা অন্য কোথাও গিয়ে লুকিয়ে থাকে। চৌকিদার ও পাহারাদার হিসেবে যাদের নিয়োগ করা হয় তারাও অত্যন্ত দুর্বৃত্ত। পুলিস অফিসারের ওপর এত বিস্তৃত এলাকার ভার থাকে যে তার পক্ষে সকল অধিবাসীর নিরাপত্তা বিধান করা সম্ভব নয়।

দেশী মদের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি করায় মদ্যপান মোটেই কমেনি। শুল্ক দ্বিগুণ বৃদ্ধি করলেও ফল হবে বলে আমি মনে করি না। নেটিভরা যে মদ খায় তা এত সহজে ও অল্প খরচে তৈরি করা যায় যে যারা নেশাখোর তাদের পক্ষে উপযুক্ত পরিমাণে পানীয় সংগ্রহ করা মোটেই কঠিন নয়। শুল্কের হার যদি এমন অসম্ভব রকমে বৃদ্ধি করা হয় যে, লাইসেন্সপ্রাপ্ত দোকান থেকে মদ ক্রয় করা নিম্ন শ্রেণীর লোকের পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়ায় তাহলে তারা সরকারি আইন ফাঁকি দিয়ে বনেজঙ্গলে গিয়ে চোলাই তৈরি করবে।

বর্ধমান (৯ মার্চ, ১৮০২)

এই জেলায় ডাকাতি খুব বেশী। ডাকাতি এক শ্রেণীর লোকের বংশগত বৃত্তি বিশেষ, যেমন নিম্ন শ্রেণীর হিন্দুরা অন্যান্য বৃত্তি অনুসরণ করে থাকে। এরা ধনসম্পত্তি লুঠ করবার জন্য বড় বড় দল বাঁধে। আর এরা জানে যে এদের ধরে শাস্তি দেওয়া খুবই কঠিন। তাই ডাকাতি করাই বেশী পছন্দ করে।

২৪ পরগনা (১ জুলাই, ১৮০২)

এই অঞ্চলের অধিবাসীদের সম্বন্ধে অনুকূল মত প্রকাশ করতে পারছি না বলে দুঃখিত। নিম্ন শ্রেণীর লোকেরা সাধারণত ইন্দ্রিয়পরায়ণ ও দূরাচারী। উচ্চ শ্রেণীর লোকেরাও নৈতিক কর্তব্য পালন করে না। সকলেই অত্যন্ত মামলাবাজ। মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া সকল শ্রেণীর মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত।

হিন্দুধর্মে যে নীতি ও সদাচার শিক্ষা দেওয়া হয়, সেগুলি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করাই নেটিভদের চারিত্রিক অধঃপতনের জন্য অনেকাংশে দায়ী। মুসলিম সরকারের আমলে হয় এগুলিকে নেহাৎ অর্থোপার্জনের উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, আর না হয় সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। এখন শুধু ধর্মের বহিরঙ্গ আচরণ করতে দেখা যায়। পূর্বে মদ্যপান, ইন্দিয়পরায়ণতা ও অন্যান্য অপরাধ দমনের জন্য কঠোর ব্যবস্থা ও শাস্তির বিধান ছিল। এখন সকল শ্রেণীর লোকই অবাধে এই সব অসদাচরণ করে চলেছে।

ঢাকা শহর (৯ ডিসেম্বর, ১৮০১)

বাংলার অধিবাসীদের মনের অত্যধিক দুর্বলতা হীনবৃত্তিগুলি দমনে সাহায্য করে না, বরং উদ্দীপ্ত করে তোলে এবং এগুলিকে প্রশ্রয়দানের ফলে নীতিবোধ প্রায় লোপ পেয়ে যায়। তবে স্বীকার করতে বাধা নেই যে ঢাকার লোকেরা কর্তৃপক্ষের কাছে বাধ্য থাকে।

এই শহরে মারাত্মক অপরাধ তেমন নেই। যাদের টাকাপয়সা খরচ করবার মত ক্ষমতা আচে তারা সাধারণত ইন্দ্রিয়পরায়ণ। এই অধঃপতন খুব সম্প্রতিকালের।

ঢাকা-জালালপুর (২৮ জুলাই, ১৮০২)

ফৌজদারী মামলার ফাইলপত্তর ঘেঁটে মনে হয় যে, এই জেলার প্রধান অপরাধগুলি হল ডাকাতি, নরহত্যা, চুরি, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া ; আর জমিদারদের প্রধান অপরাধ হল জোর করে অন্যের সম্পত্তি দখল করা। এদিকে পেশাদার গোয়েন্দারা ডাকাতিতে উস্কানি দেয়, ডাকাতদের আগলে রাখে এবং তার বদলে ডাকাতি-করা ধনে ভাগ বসায়। স্থানীয় অধিবাসীদের ভীরু স্বভাবই ডাকাতির সুযোগ করে দেয়। বাল্যকালে নীতি শিক্ষার কোন ব্যবস্থা নেই; ইন্দ্রিয় সংযমের শিক্ষাও দেওয়া হয় না। এটাই অপরাধ প্রবণতার কারণ বলে মনে করি।

এর আগে এক পত্রে (৩০ আগস্ট, ১৭৯৯) জেলার জজ ও ম্যাজিস্ট্রেট লিখেছিলেন, “এদের মন অসংস্কৃত। নৈতিক কর্তব্য সম্বন্ধে এদের কোন ধারণা নেই। সাধারণ লোকে যে রকম ছলচাতুরী করে চলে তাতে এদের হৃদয়ের দৈন্যই প্রকাশ পায়। এরা অলস ও ইন্দ্রিয়পরায়ণ; নৃশংস অথচ কাপুরুষ; উদ্ধত আবার হীনমনা। এরা ধর্মবোধহীন, কুসংস্কারাচ্ছন্ন। বর্বর জীবনের সব দোষই এদের আছে, কিন্তু তার কোন গুণ এদের নেই। একটু ওপরের মহলে দৃকপাত করলে সেই একই নীতিহীনতা লক্ষ করা যায়; তবে তার রূপ কিছুটা পরিমার্জিত। আত্ম স্বার্থ ছাড়া আত্মিক যোগ বলে এদের কিছু নেই।”

হিন্দুদের এই অধঃপতনের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেছেন, “মুসলমানেরা বিজিত হিন্দুদের কাফের বলে গণ্য করেছে এবং তাদের ওপর নিরন্তর অত্যাচার ও নিপীড়ন চালিয়েছে। তারা মনে করতো হিন্দুদের অপমান বা আঘাত করলে আল্লা খুশি হন। ধ্বংসাত্মক অন্ধ বিশ্বাসে চালিত হয়ে তারা হিন্দুদের গ্রন্থ ও শিক্ষার ওপর আঘাত হেনেছে। ব্রাহ্মণেরা ক্রমাগত অত্যাচারে বিব্রত হয়ে নিজেদের ক্রিয়াকর্ম ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে।

নূতন বংশধরদের সুফথে চালিত করার কেউ ছিল না। তাই তারা বিজেতাদের আচার-আচরণই অতিরিক্ত মাত্রায় অনুসরণ করেছে। ক্রমে স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠায় নৈতিকতাবোধ লোপ পায়। এইভাবে কালক্রমে দেশবাসীর মনের সম্পূর্ণ বিবর্তন ঘটে যায়। পাঠান শাসনে সেই অবস্থায় কয়েক শতাব্দী অতিবাহিত হয়। সুপ্রাচীন নিয়ম-শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়ায় তাদের ক্রমাবনতি ঘটতে থাকে এবং বিজেতাদের ঘৃণা ও অবজ্ঞার পাত্র হয়ে ওঠে। নিম্ন শ্রেণীর অনেকেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে; নূতন ধর্ম যে তাদের পূর্বতন ধর্মের চেয়ে অধিক যুক্তিবাদী এই বিশ্বাস থেকে তারা ধর্মান্তর গ্রহণ করেনি। শাসকদের অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা পাবে বলেই তারা নূতন ধর্মের আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু এর ফলে তাদের মানসিক উন্নতি ঘটেনি। শাসকদের নির্মম স্বেচ্ছাচারিতার কাছে তারা পদানতই থেকে গিয়েছে। যে ভাষায় তাদের ধর্মকথা লিখিত সে ভাষায় তাদের কোন জ্ঞান ছিল না। কাজেই ধর্মাচরণ কয়েকটি বাহ্যিক অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো।

মোঘল আমলে সম্রাটের পারসিক প্রতিনিধিরা ছিল শিয়া। তারা সুন্নি আইনের খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামাতো না। তাদের বিচার ছিল সংক্ষিপ্ত; শাস্তি ছিল নির্মম, খেয়ালখুশিমত। তারা বিশ্বাস করতো ত্রাসের সৃষ্টি করে অপরাধ দমন করা যায়, প্রতিরোধ করা যায়। কিন্তু যে ব্যবস্থায় এই ত্রাস সৃষ্টির প্রয়োজন হয় না তা তারা উপেক্ষ্য করতো।” (আগামীকাল শেষ)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev