চার্লস গ্রান্টের প্রতিবেদন, বিভিন্ন জেলার বিবরণ
বাখরগঞ্জ (৭ জানুয়ারি, ১৮০২)
এই জেলার অধিবাসীদের নৈতিক চরিত্র অতি জঘন্য। এর ব্যতিক্রম খুব কম। এমন কোন জুয়াচুরি বা দুষ্কর্ম নেই যা উচ্চ শ্রেণীর মধ্যে দেখা যায় না। আর নিম্ন শ্রেণীর ক্ষেত্রে এর সঙ্গে যোগ দিতে হবে ডাকাতি, নরহত্যা ইত্যাদি। এমন কি যদি বলি যে এ জেলার প্রত্যেকটি লোক ডাকাত তাহলেও খুব বেশী বাড়িয়ে বলা হবে না। কারণ, নিম্ন শ্রেণীর মধ্যে খুব কম লোকই কোন ব্যবসা, বৃত্তি বা কৃষিকার্যে নিযুক্ত থেকে জীবিকা অর্জন করে। চুরি, ডাকাতিই এদের বাঁচার প্রধান পথ। সব জমিদার ও তালুকদার (অল্প কিছু সংখ্যক বাদে) গোপনে ডাকাত দল পোষণ ও রক্ষা করে। জমি বা জমির সীমানা নিয়ে কোন বিরোধ বাঁধলে ঐ চোর-ডাকাতেরাই হয় তার প্রধান নায়ক। সরকার যে ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছেন তার ফলে এদের নৈতিক চরিত্রের বিশেষ কোন উন্নতি ঘটেনি। ভীতিই এই অঞ্চলের নেটিভদের ক্ষেত্রে একমাত্র কার্যকর অস্ত্র। শাস্তির ভয় এদের অপরাধ প্রবৃত্তিকে সংযত করতে পারে। কোনও রকম নীতি শিক্ষা বা আদর্শ এঁদের কখনই সৎ পথে চালিত করতে পারবে না। প্রকৃত ন্যায়বিচার ও কঠোর দণ্ডই তাদেরকে ঠিক রাখতে পারে। ডাকাতি ও নরহত্যা এই জেলার প্রধান অপরাধ। অনেক ক্ষেত্রে ডাকাতরা মশাল জ্বালিয়ে এসে ঘরদোরে অগ্নিসংযোগ করে। কখনও বা গোপন ধনের খবর আদায় করবার জন্য বাড়ির কর্তার বুকের ওপর একটা ও পিঠের নীচে আর একটা বাঁশ বেঁধে ক্রমাগত চাপ দিতে থাকে। চাপে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, অনেক সময় পাঁজরার হাড় ভেঙ্গে যায়। আবার কখনও চোখেমুখে লঙ্কার গুঁড়ো ছিটিয়ে দেয়।
এ জেলার সাধারণ লোক, বিশেষ করে নিম্ন শ্রেণীর লোক — নারী ও পুরুষ উভয়েই — অত্যন্ত কামুক। নারীদের অবিশ্বস্ততা ও পুরুষের ঈর্ষা ব্যাপক নরহত্যার প্রধান কারণ। তবে অতি তুচ্ছ কারণে ছেলেমেয়েদের ঝগড়া নিয়ে বা সামান্য একটা ছেলেমেয়েদের ঝগড়া নিয়ে বা সামান্য একটা হুঁকো নিয়েও খুনোখুনি হয়ে যেতে পারে। অনেক সময়ে কামুকতা আত্মহত্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমি যে সব অঞ্চলে থেকেছি তার মধ্যে এই জেলাতেই আত্মহত্যার ঘটনা সবচেয়ে বেশী।
ডাকাতির কারণ দুটি। প্রথমত ডাকাতেরা নিজেদের একটা স্বতন্ত্র জাতি বা বৃত্তির লোক বলে মনে করে। অনেকে বংশপরম্পরায় ডাকাতি করে চলেছে। আমি একটা ঘটনার কথা জানি। প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত জনৈক ডাকাত ফাঁসি-কাষ্ঠে ঝুলবার ঠিক পূর্ব-মুহূর্তে তার ছেলেকে বলেছিল, আমার অবস্থা দেখে ভয় পেও না, আমার মতই ডাকাতি চালিয়ে যেও। দ্বিতীয়ত এরা ছিঁচকে চুরি দিয়ে শুরু করে। তারপর ক্রমে বড় চুরি ও ডাকাতি রপ্ত করে।
ত্রিপুরা (২৯ অক্টোবর ১৮০১)
এখানকার অধিবাসীদের নৈতিক চরিত্র অতি শোচনীয়। খুব কম খরচে জীবিকা নির্বাহ করা যায়; সরকারী ব্যবস্থায় এদের স্বাধীনতা ও বিষয়-সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু তার ফলে এদের মন সৎ কর্মের দিকে যায়নি; বরং আরও অলস হয়ে উঠেছে। অন্যের পাওয়া ফাঁকি দেওয়ার যদি কোনও সুযোগ থাকে অথবা পরিবারের মধ্যে যদি মামলা করার কোনও পথ থাকে তবে এরা যে কত দূর যেতে পারে তা বিশ্বাস করা কঠিন। নতুন আইন চালু হওয়ার আগে কি জমিদার, কি রায়ত, সকলেই রাজস্ব ফাঁকি দিত। সরাসরি বিচার প্রবর্তনের ফলে বিস্ময়করভাবে তা বন্ধ হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে সুফল পাওয়া যেত। এদেরকে সৎ পথে আনতে হলে দ্রুত সরাসরি বিচার চালু করতেই হবে। নিম্ন শ্রেণীর মধ্যে যে কর্মবিমুখতা রয়েছে তা দূর করতে হলে মূলে আঘাত করতে হবে অর্থাৎ মজুরীর হার বেঁধে দিতে হবে। অত্যাবশ্যক পণ্যের মূল্যহারের অনুপাতে মজুরীর হার নিরূপণ করা দরকার।
বিভিন্ন লোকের সঙ্গে কথাবার্তা বলে আমার এই বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছে যে, মজুরীর হার বেঁধে দেওয়ার জন্য কোনও না কোনও ব্যবস্থা নিতেই হবে। বর্তমানে জীবিকা নির্বাহের ব্যয় খুব কম এবং সেই অনুপাতে মজুরি বেশি হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যের খুব ক্ষতি হচ্ছে। কারণ মজুর নিয়োগ করে কোনও একটা কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ হবে বলে কেউ নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকতে পারে না। বেশ কিছু টাকা রোজগার করবার পর অনেক মজুরই আর কাজ করতে চায় না। যেমন, এক মাস কাজ করলে সেই টাকায় অনায়াসে তিন মাস বসে খাওয়া চলে। অনেকে একমাস কাজ করবার পর দুই মাস বসে থাকে। তাই প্রায়ই দেখা যায়, মাঠে পাকা ধান পচছে বা গরুতে খেয়ে নষ্ট করছে। অথচ মজুরের অভাবে ধান কেটে আর ঘরে তোলা যাচ্ছে না। আবার খুব বেশী মজুরী দিয়ে লোক লাগালে মোট খরচা ধানের বাজার দর অপেক্ষা অনেক বেশী পড়ে যায়। এই একই কারণে তাঁতবস্ত্র উৎপাদনের পরিমাণও হ্রাস পেয়েছে। যাঁরা বস্ত্রের ব্যবসা করেন তাঁদেরই এই অভিজ্ঞতা। তাঁরা বলেন, আকাল পড়লেই বস্ত্র প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। মজুরীর হার যে এখন খুবই চড়া এটা তারই একটা প্রমাণ। এই হার নিয়ন্ত্রণে ম্যাজিস্ট্রেটের কিছু ক্ষমতা থাকা দরকার।
নিম্ন শ্রেণীর মেয়েদের মধ্যে আত্মহত্যা খুব বেশী। অতি সামান্য কারণে, এমন কি সংসারের কাজে ত্রুটি হলে স্বামী যদি বকাবকি করেতা হলেও অনেকে আত্মহত্যা করে। দরিদ্র্য বা ঈর্ষাজনিত কারণে — আত্মহত্যা ঘটেছে এমন একটি ঘটনার খবরও পাওয়া যায়নি।
ময়মনসিংহ (২০ জানুয়ারি, ১৮০২)
কিছু সংখ্যক হিন্দু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে নিষ্ঠাবান। তবে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে এ সব লোকদেখান ব্যাপার বলে মনে হয়।
অধিকাংশ জমিদার অপদার্থ। তাদের ম্যানেজার ও এজেন্টরাও খুব সৎ চরিত্রের লোক নয়। তবে জমিদার ও রায়তদের তারা ছলচাতুরীতে এমন মুগ্ধ করে রাখে যে তাদেরকে মূল্যবান কলে গণ্য করা হয়। তাদের অধস্তন কর্মচারীরা মূর্খ। তবে তারাও নিজেদের ক্ষমতা অনুযায়ী ম্যানেজারদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলে। নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদে তারা অত্যন্ত হিংস্র হয়ে উঠতে পারে; সামান্য কারণেও অনেক সময় খুনখারাপি হতে দেখা যায়।
রাজশাহী (১০ এপ্রিল, ১৮০২)
যুবা থেকে বৃদ্ধ সকলের মধ্যেই শঠতা ও ছলচাতুরীর প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এই দোষ সংশোধন করা কঠিন।
ডাকাতি, নরহত্যা ও জালিয়াতি অত্যন্ত ব্যাপক। ডাকাতির সময় যাকে সম্মুখে পায় তাকে খুন করাই এখানকার ডাকাতির একটা বৈশিষ্ট্য। বাড়ির কর্তা যদি প্রথমে পালিয়ে যেতে পারে এবং পরে যদি কোনমতে ধরা পড়ে তবে ডাকাতেরা তার গায়ে তেল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেবে।
উদ্দেশ্য হল, গোপন ধনের সন্ধান আদায় করা।
মুর্শিদাবাদ (১৩ ডিসেম্বর, ১৮০১)
এই জেলার অধিবাসীদের নৈতিক চরিত্র খুব খারাপ বলে মনে হয়। এমন কোন গুণের নাম করা কঠিন যা এদের চরিত্র বিদ্যমান; অথচ লোভ, প্রতিহিংসা, মিথ্যাচার, ছলচাতুরী, অকৃতজ্ঞতা বস্তুত এমন কোন দোষ নেই যা এদের মধ্যে নেই। এরা ভয়ঙ্কর রকমে কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং অত্যন্ত অলস। তবে মোটেই ওপর আমার মনে হয়, মুসলমানদের তুলনায় হিন্দুরা ভাল লোক।
সকল রকম অপরাধের মধ্যে ডাকাতি অত্যন্ত ব্যাপক। নরহত্যাকে প্রায়ই ঘটে থাকে।
রংপুর (১৩ এপ্রিল ১৮০২)
আমার মতে এখানকার লোকেরা অধিকাংশই অত্যন্ত অলস, অজ্ঞ ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন; হীনচেতা ও অকৃতজ্ঞ এবং অনেক সময়েই প্রতিহিংসাপরায়ণ, স্বার্থপর, মিথ্যাচারী ও নির্লজ্জ। শিশুকাল থেকেই শেখান হয় যে, বিষয়-সম্পত্তি সঞ্চয় করাই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। তাছাড়া শঠতা, প্রবঞ্চনা প্রভৃতি পরিবেশের মধ্যে এরা বড় হয়ে ওঠে। জালিয়াতি ও ফাঁকিবাজিকে এরা খুব বাহবার কাজ বলে মনে করে। যে ক্ষেত্রে লালসা বা প্রতিহিংসা-প্রবৃত্তি অবাধে চরিতার্থ করা যায় সেখানে এই হীন আচরণে এদের ক্লান্তিবোধ নেই।
এর ফলে প্রত্যেক গোষ্ঠী, এমন কি প্রত্যেক পরিবারে একে অপরকে বিশ্বাস করতে পারে না। তবে এ কথা স্বীকার করতেই হয় যে, পিতামাতার প্রতি এদের সশ্রদ্ধ কর্তব্যবোধ যথেষ্ট। পিতামাতা বৃদ্ধ হলে বা অন্য কোনও কারণে নিজেদের ভরণপোষণে অশক্ত হলে ছেলেরাই তাদের ভাব গ্রহণ করে। এদের আর একটি বড় গুণ হল এদের পানদোষ নেই। উচ্চশ্রেণীর লোকেরা কখনও মদ স্পর্শ করে না। আরক খুব সস্তা আর অতি সহজে যে কোনও সময়ে পাওয়া যায়। কাজেই মনে হতে পারে নিম্নশ্রেণীর মধ্যে পানদোষ ব্যাপক। বাস্তবে কিন্তু এদের মধ্যে মাতলামি খুব কম দেখা যায়। ধর্মীয় নীতির একটা সুফল এই পরিমিতাচার।
বিবরণ কি যথার্থ?
বাঙ্গালী চরিত্রের এই বিবরণ এ যুগের বাঙ্গালীর কাছে এক প্রচণ্ড আঘাতস্বরূপ। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় একে সাম্রাজ্যবাদী শোষক শ্বেতাঙ্গদের স্থানীয় কালা নেটিভদের প্রতি স্বভাবজ ঘৃণা ও বিদ্বেষের প্রতিফলন বলে মনে হবে। অবশ্যই প্রশ্ন হতে পারে সব মানুষের মত বাঙ্গালীর চরিত্রেও কিছু দোষ ছিল ও আছে। কিন্তু ইংরেজরা তৎকালীন বঙ্গের বাঙ্গালীদের চরিত্রে কি কিছুই ভাল দেখতে পাননি? এটা অস্বাভাবিকও অসম্ভব। তাদের এই বিবরণ গ্রহণীয় নয়।
কিন্তু বিষয়টি একটু বিশদ বিচার করে দেখা দরকার। প্রথমত কিছু দায়িত্বশীল কর্মচারী সরকার বা কোম্পানীর কাছে তাঁদের মতামত ব্যক্ত করেছেন সরকারী চিঠি বা গোপন রিপোর্টে। তাঁদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল দেশ শাসনকার্যে বাস্তবসম্মত নীতি নির্ধারণে সরকারকে সাহায্য করা। কাজেই বিবরণ রচনায় নিজস্ব বুদ্ধি, বিচারশক্তি ও অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ প্রয়োগ করা হয়েছিল। লক্ষণীয় যে, অনেকেই উত্তরদানে দীর্ঘ সময় নিয়েছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ প্রচুর নথিপত্র ঘেঁটেছিলেন অনেক ক্ষেত্রেই সে কথা স্পষ্ট করে উল্লেখ করা আছে।
কালা নেটিভদের প্রতি ইংরাজদের ঘৃণা ও বিদ্বেষ থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। বৈদিক যুগের দেখি আর্য ঋষিরা স্থানীয় আদিম অধিবাসী দাস গোষ্ঠীকে ঘৃণাভরে ‘কৃষ্ণযোনীঃ’ অর্থাৎ কালা আদমী বলে উল্লেখ করেছেন (ঋগ্বেদ ২/২০-৭)। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সরকারকে সহায়তা করবার উদ্দেশ্য নিয়ে যখন কলম ধরেছিলেন তখন ইংরাজ কর্মচারীরা সম্পূর্ণভাবে ঘৃণা ও বিদ্বেষের দ্বারা পরিচালিত হয়েছিলেন এ কথা বিশ্বাস করা সঙ্গত হবে না। দ্বিতীয়ত এই বিবরণগুলি তখন ছিল গোপনীয়, সাধারণ্যে প্রকাশের কোন সম্ভাবনাই ছিল না। তাই তাঁরা যা বিশ্বাস করেছেন সে কথাই নির্ভয়ে লিখেছেন। তৃতীয়ত মিথ্যা রিপোর্ট দিলে পরিণামে সরকারের তথা ইংরাজ স্বার্থেরই ক্ষতি হবার সম্ভাবনা এবং তাতে নিজেদেরও বিপদ ডেকে আনা হবে। কাজেই বিদ্বেষবশেই হোক বা অন্য কোনও কারণেই হোক তাঁরা জেনেশুনে ভুল রিপোর্ট পাঠাবেন এ ধারণা যুক্তিগ্রাহ্য নয়। চতুর্থতসদ্য অধিকৃত দেশ সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রীয় নীতি রচনাকালে প্রজাবৃন্দের চারিত্রিক ক্রুটিবিচ্যুতিই বেশী জানা দরকার। প্রধানত সেই কারণেই হয়তো তাঁরা বাঙ্গালী চরিত্রের ঘাটতি দিকটাই বড় করে দেখিয়েছিলেন। তবে সৎ গুণাবলীর কথা কেউ কেউ যে উল্লেখ করেননি তা নয়।