| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্য : শৌনক দত্ত

Reporter
শৌনক দত্ত / ১৪২১ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ২০ জুন, ২০২৫

“পৃথিবীতে মানব সংস্কৃতির ধারাবাহিক ইতিহাসে জীবনচর্যার দ্রষ্টব্য ও শ্রোতব্য শিল্প-কল্পনাকে যদি বৃক্ষের উপমা দিই তবে সে বৃক্ষের প্রথম উদ্গত শাখাগুলির অন্যতম হবে শিকার-চিত্র ও গোয়েন্দার গল্প। শিকারির কাজ ও গোয়েন্দাগিরি দুই-ই এক ব্যাপার — গোপন অনুসন্ধান করে ফাঁদ পেতে অথবা আঘাত করে আয়ত্ত করা।” —সুকুমার সেন।

রহস্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ চিরন্তন। বিশেষত তার সাথে যদি অপরাধ মিশে থাকে। শৈশব তার অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে রাত জেগেছ রহস্যের সন্ধানে। নিশুতি রাতগুলো কেটেছে গভীর উত্তেজনায়। সদ্য পড়তে শেখা কৈশোর গুলোর তাই অন্যতম পছন্দ অপরাধমূলক কাহিনি বা গোয়েন্দা সাহিত্য। এ এক অন্য অনুভূতি। পড়তে পড়তে হারিয়ে যাওয়া আলো-আঁধারি রহস্য-রোমাঞ্চের চোরা গলিতে। পুরুষালি চেহারা, বলিষ্ঠ কাঠামো, ক্ষুরধার বুদ্ধি, বুদ্ধিদীপ্ত চোখ, কখনো ‘মগজাস্ত্র’, কখনো বা আগ্নেয়াস্ত্র, সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা অ্যাসিস্টান্ট বা সহকারী- এমনই একটা চেনা ছক নিয়ে বিশ্ব তথা বাংলা সাহিত্য পাঠকদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিল একাধিক গোয়েন্দা চরিত্র। যাদের দাপুটে রাজত্ব আজও অমলিন। শুধু পুরুষ চরিত্রই নয় কালক্রমে রহস্যের সন্ধান করেছেন কখনো নারী কখনো আবার শিশু চরিত্র। এডগার অ্যালেন পো-র (১৮০৯-১৮৪৯) রচিত Murders in the rue morgue ফিলাডেলফিয়া থেকে গ্রাহামস ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয় ১৮৪১-এর এপ্রিল মাসে এবং এটাকে পৃথিবীর প্রথম গোয়েন্দা কাহিনি বলে ধরা হয়। ডিটেকটিভের নাম ছিল মঁসিয়ে দুপ্যাঁ (Dupin)। মজার কথা, এর এক বছর পরেই ১৮৪২ সালে ইংল্যান্ডে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ বিখ্যাত স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড খোলা হয়। চার্লস ডিকেন্সের Bleak house-এর রেশ ধরে উইলকি কলিন্স রচনা করেন The woman in white (১৮৫৯) ও The moonstone (১৮৬৮)। এর পরে এসেছেন আর্থার কোনান ডয়েল ডিটেকটিভ শার্লক হোমস ও সহকারী ডাঃ ওয়াটসনকে নিয়ে। তার লেখা গল্পগুলি The adventures of Sharlock Holmes (১৮৯২) ও The memoirs of Sharlock Holmes ১৮৯৪ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছিল।

‘আর্থার কোন্যান ডয়েল–জীবন ও সাহিত্য’ নামে এ বিষয়ে একটি তথ্য সমৃদ্ধ বই লিখেছেন প্রসাদ সেনগুপ্ত। গোয়েন্দা কাহিনির চেয়ে ঐতিহাসিক গল্প লিখতেই ডয়েলের ভাল লাগত এবং সে কারণেই তিনি শেষ গল্পে শার্লক হোমসকে মেরে ফেলে হাত ধুয়ে ফেলেন। কিন্তু অনুরাগী পাঠকেরা ছাড়বে কেন? অতএব শার্লক হোমসকে বাঁচিয়ে তুলে ডয়েলকে লিখতে হয় Hound of the Baskervilles (১৯০২)। রহস্য গল্পের কথা বললে আগাথা ক্রিস্টির (১৮৯০-১৯৭৬) নাম তো উল্লেখ করতেই হয়। ইংল্যান্ডের মহিলা গোয়েন্দা কাহিনির এই লেখিকাকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাহিনিকার হিসাবে গণ্য করা হয়। আগাথা মিলার বিয়ের পরে হয়েছিলেন আগাথা ক্রিস্টি। তার সৃষ্ট ডিটেকটিভের নাম এরকুল পোয়ারো (Poirot)। মোট ৬৭টি গোয়েন্দা কাহিনী রচনা করেছেন তিনি, প্রথমটির নাম ছিল The mysterious affairs at styles (১৯২০)। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য রচনা — The murder on the links (১৯২৩), The mystery of the blue train (১৯২৮), Murder on the orient express (১৯৩৪) প্রভৃতি। সবশেষে উল্লেখ করা যায় অনেক আগে (১৮৪৪) প্রকাশিত ডব্লিউ রেনল্ডস রচিত Mysteries of the court of London বইটির কথা।

বাংলা সাহিত্য বারংবার অনুপ্রাণিত হয়েছে বিদেশি সাহিত্য দ্বারা। যার একটা কারণ যদি হয় বিদেশি উপনিবেশ, অপর কারণ হল সাহিত্য কখনোই ভাষার পাঁচিলে বাঁধ মানেনি। বারবার ভেঙেছে,নতুন ভাবে এগিয়েছে। গোয়েন্দা গল্পের বীজ পোঁতা হয়েছিল, সুগন্ধির দেশ ফ্রান্সে। যদিও তার প্রকৃত জন্ম আমেরিকায়। বাংলা ভাষায় প্রথম গোয়েন্দা কাহিনি নিয়ে বিতর্কের বিষয়টি বেশ মজার এবং জটিল। জটিলতা থাকলেও বাংলা সাহিত্যের আছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং দুর্দান্ত কিছু গোয়েন্দা চরিত্র ও কাহিনি। আঠারো শতকের গোড়ার দিকে পাদ্রি উইলিয়াম কেরির ‘ইতিহাসনামা’ বইটিতে সমস্যার সমাধান করেছিলেন এক বিচারক। এই বিচারক স্বয়ং গোয়েন্দার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। আধুনিক গোয়েন্দা গল্পের মজা অনুপস্থিত থাকলেও এই সমস্ত গল্পের মধ্যেই লুকানো ছিল গোয়েন্দা গল্পের বীজ। স্বর্ণকুমারী দেবী তখন ‘ভারতী’ মাসিক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদিকা, তাঁরই উৎসাহে ১৮৮৭ সালে প্রকাশিত হল নগেন্দ্রনাথ গুপ্তর ‘চুরি না বাহাদুরি’। যদিও এই গল্পের মাধ্যমেই বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যের সূচনা বলে ধরা হয় কিন্তু সে অর্থে ডিটেকটিভ গল্প না বলে একে রহস্যমূলক গল্প বলা যেতে পারে। এরই সমসাময়িক সময়পর্বে প্রকাশিত হল ‘উদাসিনী রাজকন্যার গুপ্তকথা’। ছদ্মনামধারী লেখক হলেন ‘দেড়ে বাবাজি’।

১৮৯০ সালে প্রকাশিত হয় দামোদর মুখোপাধ্যায়ের ‘শুক্লবসনা সুন্দরী’। এটি মূলত উইলকি কলিন্সের লেখা ‘দ্যা উওম্যান ইন হোয়াইট’ এর অনুবাদ। ‘নথীর নকল’, ‘স্বর্ণবাঈ’ ইত্যাদি বাংলা গোয়েন্দা গল্প প্রকাশিত হয় ‘গোয়েন্দা গল্প’ নামী পত্রিকায় যেটি শুরু করেছিলেন প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক অম্বিকাচরণ গুপ্ত। ১৮৯২ সাল। সরকারি ডিটেকটিভ বিভাগে কর্মরত প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় ‘আদরিণী’ ১৮৮৭), ‘ডিটেকটিভ পুলিস’-১ম খন্ড (১৮৮৭), ‘বনমালী দাসের হত্যা’ (১৮৯১) ইত্যাদি বই প্রকাশ করলেও তিনি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন কিন্তু ‘দারোগার দপ্তর’ লিখে। লক্ষ্য করার বিষয় কোনান ডয়েলের প্রথম ডিটেকটিভ কাহিনি ‘এ স্টাডি ইন স্কারলেট’ প্রকাশিত হয় ১৮৮৭ সালে এবং সে বছরেই প্রিয়নাথের ‘ডিটেকটিভ পুলিশ’ অসাধারণ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। বইটি সম্বন্ধে ১৮৮৮ সালের ২৫শে জানুয়ারির Indian Mirror মন্তব্য করে –“We have also read with attention another book composed by the same author, and styled ‘Detective Police’. The book has also been written by following the story of a man who was actually tried by the High Court of Calcutta on the most serious charges and is up to the date undergoing the term of punishment in the criminal jail of Alipore”। জর্জ ডবল্যু. এম. রেনল্ডসের Joseph Wilmot অবলম্বনে ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ‘এই এক নূতন! আমার গুপ্তকথা’ (১৮৭০-৭৩) রচনা করার পর ছয় বছর ধরে (১৮৭৩-৭৯) প্রকাশ করেন ‘আমার গুপ্তকথা-আশ্চর্য্য!!!’

১৯০৪ সালে বেরিয়েছিল ‘আর এক নতুন! হরিদাসের গুপ্তকথা’। হয়ত নামের জন্যই এই ‘গুপ্তকথা’ নামাঙ্কিত বইগুলি লিখেই ভুবনচন্দ্র বিখ্যাত হয়েছিলেন। তাঁর এ ধরনের আরও কয়েকটি বই ‘বঙ্কিমবাবুর গুপ্তকথা’, ‘বিলাতী গুপ্তকথা’, ‘সংসার শর্বরী বা ভবকারাগারের গুপ্তকথা’ ইত্যাদি। চার খন্ড ‘মার্কিন পুলিশ কমিশনার’ (‘হারাধনের অনুসন্ধান’, ‘মেয়ে চুরি’, ‘অপূর্ব্ব নারী ডিটেকটিভ’ ও ‘জলবিবি’), ‘গুপ্তচর’ (১৮৯৮), ফরাসী লেখক ইউজিন সু রচিত Wandering Jew অবলম্বনে ‘ঠাকুরবাড়ীর দপ্তর’ (চার খন্ড), মারী কোয়েলির Sorrows of satan –এর বঙ্গানুবাদ ‘সন্তপ্ত শয়তান’ (১৯০৩-০৪), Mysteries of the court of London-এর কয়েক খন্ডে অনুবাদ ‘লন্ডন রহস্য’ (১৯১২-১৪) প্রভৃতি তাঁর অন্যান্য রচনা। ‘সাহিত্য পদবাচ্য’ গোয়েন্দা কাহিনি প্রকাশিত হবার আগে বটতলার বেশ কিছ বই পাঠক সাধারণের কাছে যথেষ্ট সমাদৃত হয়েছিল। বাণিজ্যিক কারণে অনেক প্রতিষ্ঠিত লেখকের নাম দিয়েও অন্যের লেখা বই ছাপা হয়েছে। প্রেসিডেন্সি কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক প্যারীমোহন সরকারের পুত্র শরচ্চন্দ্র দেব (সরকার)। তাঁর সাহিত্য রচনার অন্যতম প্রেরণাদাতা ছিলেন পণ্ডিত মহেন্দ্রনাথ বিদ্যানিধি। ‘দারোগার দপ্তরে’র ধাঁচেই তিনি শুরু করলেন সংকলিত ‘গোয়েন্দা কাহিনি’। এগুলির বিক্রির বহর দেখে বোঝা যায় ক্রাইম কাহিনি কীভাবে পাঠককুলকে সম্মোহিত করেছিল। এর প্রতিটি খন্ড সপ্তাহে দু’দিন করে ফর্মা ধরে বিক্রি হত। হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘রাণী সুধামুখী’ সে যুগের আর একটা গোয়েন্দা উপন্যাস প্রকাশিত হয় ১৮৯৪ এ। ‘কলকাতার একাল ও সেকাল’ লিখে পরিচিত ঐতিহাসিক হরিসাধন মুখোপাধ্যায়ের ‘আশ্চর্য হত্যাকান্ড’কে গবেষকরা মনে করেন কিশোরদের জন্য লেখা প্রথম ক্রাইম থ্রিলার।

১৮৯৪ সালে ‘সখা ও সাথী’ মাসিক পত্রিকাতে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর লেখা অন্যান্য গল্পগুলি হল — ‘কঙ্কণ চোর’, ‘লাল চিঠি’, ‘পান্নার প্রতিশোধ’ ইত্যাদি। এরপর ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায় কেলেঙ্কারি ও অপরাধমূলক ঘটনা নিয়ে লেখেন ‘হরিদাসের গুপ্তকথা’ এবং এই একই সময় পর্বে অর্থাৎ ১৮৯৬ এ কালীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায় প্রকাশ করলেন ‘বাঁকাউল্লার দপ্তর’। বর্গীদের মতই এক সময়ে দেশে ঠগীদের অত্যাচার অসহনীয় রূপ নিয়েছিল। ইংরেজ প্রশাসনকে নাস্তানাবুদ হতে হয়েছে এদের দমন করতে। এই উদ্দেশ্যেই কমিশনার নিযুক্ত হয়েছিলেন উইলিয়াম হেনরি শ্লীম্যান (Shleeman) (১৭৮৮-১৮৫৬)। তাঁরই অধীনে দারোগা ছিলেন বরকতউল্লা নামে একজন বুদ্ধিমান বাঙালি যুবক। পরে ধূর্ততার জন্য লোকমুখে তাঁর নাম হয় বাঁকাউল্লা, যাঁর চাতুর্যের ও দক্ষতার কিছু কাহিনি ইংরাজিতে রচিত হয়েছিল। লেখকের নাম জানা না থাকলেও ‘বাঁকাউল্লার দপ্তর’ নাম দিয়ে ১২টি অধ্যায়ে বইটি বাংলায় প্রকাশিত হয়। ‘বাঁকাউল্লা দপ্তরে’র হাত ধরেই নারীরা গোয়েন্দা কাহিনিতে স্থান পেতে শুরু করে। এরকমই অপর একটি বই ছিল ‘সেকালের দারোগার কাহিনি’, লেখক গিরিশচন্দ্র বসু। ডাকাতি দমনের যে চেষ্টা ইংরেজ শাসকরা করেছিল সে আমলেরই এক দারোগা ছিলেন তিনি। তাঁর বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা তিনি আত্মজীবনীর ভঙ্গিতে বর্ণনা করেছেন ১৮৮৮ সালে প্রকাশিত বইটিতে। এটি সে অর্থে গোয়েন্দা কাহিনি না হলেও সূচনা হিসাবে ধরা যেতে পারে নিশ্চয়ই। গিরিশচন্দ্র দারোগার চাকরিতে নিযুক্ত ছিলেন ১৮৫৩ থেকে ১৮৬০ পর্যন্ত। কাহিনিটি প্রথম ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় ‘নবজীবন’ নামক মাসিক পত্রে ১২৯৩-এর শ্রাবণ সংখ্যা থেকে। দীনেন্দ্রকুমার রায়ের প্রথম মৌলিক রচনা ‘উদোর ঘিরে বুদোর বোঝা’। ‘নন্দনকানন’ পত্রিকায় অন্য নামে তিনি লিখতেন। তাঁর বিখ্যাত গল্পগুলি হল- ‘আয়েষা’, ‘চীনের ড্রাগন’ ইত্যাদি। এছাড়া তিনি ‘রহস্য লহরী’ নামে গোয়েন্দা গল্পের সিরিজ প্রকাশ করেছিলেন।

শরচ্চন্দ্র দেব (সরকার)-এর বইকে পুনঃপ্রকাশ করার মধ্য দিয়ে বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যের আসরে যুক্ত হন কেদারনাথ দে-র পুত্র পাঁচকড়ি দে (১৮৭৩-১৯৪৫)। গোয়েন্দা কাহিনি লিখে জনপ্রিয়তায় যিনি প্রায় রবীন্দ্রনাথের কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন। ‘যমুনা’ পত্রিকার ফণীন্দ্রনাথ পাল, তাঁর দাদা যতীন্দ্রনাথ পাল এবং পাঁচকড়ি দে-এই তিন জন মিলে বিরামহীনভাবে লিখে গিয়েছেন। পাঁচকড়ির প্রথম রচনা ‘সতী শোভনা’। মাত্র চল্লিশ পৃষ্ঠার বই, তবে মূল রচনাটা আকর্ষণীয়। তাঁর অন্যান্য বই — ‘মায়াবী’, ‘মায়াবিনী’, ‘মনোরমা’, ‘হত্যাকারী কে?’, ‘নীল বসনা সুন্দরী’ (‘অবসরে’ বেরিয়েছে), ‘জীবন্মৃত রহস্য’, ‘হত্যা রহস্য’, ‘ভীষণ প্রতিশোধ’, ‘ভীষণ প্রতিহিংসা’, ‘গোবিন্দরাম’, ‘মৃত্যু বিভীষিকা’, ‘হরতনের নওলা’ (কোনান ডয়েলের Sign of four-এর অনুবাদ), ‘কালসর্পী’, ‘পরিমল’, ‘প্রতিজ্ঞাপালন’, ‘লক্ষ টাকা’ প্রভৃতি। বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যে সম্ভবতঃ তিনিই প্রথম ডিটেকটিভ চরিত্র সৃষ্টি করেছেন। তাঁর বিভিন্ন গোয়েন্দা কাহিনিতে তিনি গোয়েন্দার ভিন্ন ভিন্ন নাম দিয়েছেন। সবচেয়ে পরিচিত চরিত্র ডিটেকটিভ দেবেন্দ্রবিজয় ও তার গুরু অরিন্দমবাবু। কোন কোন রচনায় গোয়েন্দার নাম গোবিন্দরাম, কোথাও কীর্তিচন্দ্র আবার কোথাও রামপাল। সাড়া জাগানো ‘হত্যাকারী কে?’ উপন্যাসে গোয়েন্দা ছিলেন বৃদ্ধ অক্ষয়কুমার। অনেকে মনে করেন পাঁচকড়িবাবুর অনেক বইয়ের লেখক আসলে ধীরেন্দ্রনাথ পাল।

সুকুমার সেন লিখেছেন — “পাঁচকড়ির এক প্রধান লেখক বা ‘গোস্ট লেখক’ ছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ পাল। … পাঁচকড়ি দে’র কৃতিত্বের কতখানি ধীরেন্দ্রনাথের প্রাপ্য তা নির্ণয় করা যায়নি।” পাঁচকড়ি দে-র ‘মায়াবিনী’ যখন ‘গোয়েন্দার দপ্তর’ পত্রিকায় প্রকাশিত হতে শুরু হয় তখন গল্পটির নাম ছিল ‘জুমেলিয়া’। প্রথম কয়েক ফর্মা বেরোবার পর পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে সম্পূর্ণ বইটি ‘মায়াবিনী’ নামে প্রকাশিত হয় ১৮৯৯ সালে। এখানেই প্রথম আবির্ভাব গোয়েন্দা দেবেন্দ্রবিজয়ের। এরপর ১৯০১ সালে ‘মায়াবী’, দেবেন্দ্রবিজয়ের সঙ্গে আসেন তার গুরু অরিন্দমবাবু। কোথাও কোথাও উল্লেখ দেখতে পাচ্ছি ‘মায়াবী’ বেরিয়েছিল ‘মায়াবিনীর’ আগে। ‘জীবন্মৃত রহস্য’ বেরোয় ১৯০৩ সালে। রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাইজ পাবার বছরে লেখক এই বইটি উৎসর্গ করেন কবিগুরুকে। উৎসর্গ পত্রে লেখা ছিল — “শ্রদ্ধাস্পদ কবিবর / শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর / মহাশয় করকমলেষূ।” ‘জীবন্মৃত রহস্য’ বইটি সম্বন্ধে স্টেটসম্যানের মন্তব্য –“This is a sensational hypnotic novel in Bengali”। সম্ভবতঃ ‘হিপ্নোটিক’ শব্দটির অভিঘাতে পঞ্চম সংস্করণে বইটির নাম হয় ‘সেলিনাসুন্দরী’। পাঁচকড়ি দে-র বই বিক্রি এক লক্ষ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তাঁর বই ইংরাজি, হিন্দি, উর্দু, তামিল, তেলেগু, মারাঠি প্রভৃতি বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বই বিক্রির টাকায় তিনি কলকাতায় তিনটি প্রাসাদোপম বাড়ি তৈরি করেছিলেন। ১৯০৪ সালে প্রকাশিত ‘নীলবসনা সুন্দরী’ পাঠকমহলে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল।

সুকুমার সেন তার তথ্যবহুল ক্রাইম কাহিনির কালক্রান্তি বইটিতে অজানা কারণে একজন লেখকের কথা উল্লেখ করেননি, তিনি মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য (১৯০৩-১৯৩৯)। মনোরঞ্জনের জন্ম ফরিদপুরে (এখন বাংলাদেশে) বিদ্যালয়ে পাঠরত অবস্থাতেই সংস্কৃত ছিল তাঁর অত্যন্ত প্রিয় বিষয়। ব্যাকরণ সহ এই ভাষা নিজেই আয়ত্ব করেছিলেন তিনি এবং একটি বিতর্ক সভায় সংস্কৃতে বক্তব্য পেশ করে প্রতিযোগিতায় বিজয়ীও হয়েছিলেন। পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে রিপন কলেজে অধ্যাপনাও করেছেন। তাঁর বাবা বিশ্বেশ্বর ভট্টাচার্য ছিলেন জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট। তিনি ছিলেন ছোটদের প্রিয় ‘রামধনু’ মাসিক পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা। পত্রিকার তৃতীয় বছরে সম্পাদকের পদ গ্রহণ করেন মনোরঞ্জন। এই পত্রিকাতেই বেশ কয়েকটি রহস্য ও ডিটেকটিভ কাহিনি লিখেছিলেন তিনি। তাঁর গল্পে ডিটেকটিভ একজন জাপানী, নাম হুকাকাশি। কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজের পেছনে ডাফ ষ্ট্রীটে ছিল এই বিখ্যাত অপরাধ-তত্ববিদ ও গোয়েন্দার বাস। ছদ্মবেশ ধারণে সুনিপুণ হুকাকাশি মারামারি ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের চেয়ে মগজ খাটিয়ে রহস্যভেদেই ছিলেন অধিক অভ্যস্ত। তবে জাপানী যুযুৎসুর প্যাঁচও বেশ ভালই জানা ছিল। তার সাকরেদ ছিল রণজিৎ বা কখনো অভিজিৎ। জটিল সমস্যা সমাধানে হেমেন্দ্রকুমারের জয়ন্তর মত ঘন ঘন নস্যি নিতে দেখা যেত তাকে। হুকাকাশি নিঃসন্দেহে বাঙালি পাঠকদের বিশেষ করে ছোটদের মনে স্থান করে নিয়েছিল। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে পরলোক গমন না করলে মনোরঞ্জন আরও রচনার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে গোয়েন্দা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে যেতে পারতেন।

প্রসঙ্গত, মনোরঞ্জনের গোয়েন্দা কাহিনি ও ডিটেকটিভ হুকাকাশির রেশ ধরেই শিবরাম চক্রবর্তী তার স্বভাব সিদ্ধ সরস ভঙ্গিতে গল্প লিখেছিলেন, তার গোয়েন্দার নাম ছিল কল্কেকাশি। ‘রামধনু’তে প্রকাশিত মনোরঞ্জনের গোয়েন্দা কাহিনিগুলি হল — ‘পদ্মরাগ’ (উপন্যাস, শ্রাবণ ১৩৩৫ থেকে ১৭ কিস্তিতে), ‘ঘোষ চৌধুরীর ঘড়ি’ (উপন্যাস, আশ্বিন ১৩৩৭ থেকে ১১ কিস্তিতে), ‘সোনার হরিণ’ (উপন্যাস, মাঘ ১৩৪১ থেকে ২৬ কিস্তিতে), ‘শান্তি ধামের অশান্তি’ (ছোটগল্প, অগ্রহায়ণ, ১৩৪৩), ‘তের নং বাড়ীর রহস্য’ (ছোটগল্প, শ্রাবণ, ১৩৪৪), ‘হীরক-রহস্য’ (ছোটগল্প, কার্ত্তিক, ১৩৪৪), ‘চণ্ডেশ্বরপুরের রহস্য’ (ছোটগল্প, মাঘ, ১৩৪৪)। ‘সংসক্তপুরের রহস্য’ নামে একটি ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছিল সুনির্মল বসু সম্পাদিত ‘আরতি’ বার্ষিকীতে (১৯৩৮)। মনোরঞ্জনের লেখার ভক্ত ছিলেন হেমেন্দ্রকুমার, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সত্যজিৎ রায়ও। হেমেন্দ্রকুমার রায় তার ‘ড্রাগনের দুঃস্বপ্ন’ বইটি মনোরঞ্জনকে উৎসর্গ করেন; তাতে তিনি লিখেছিলেন “স্বর্গীয় সুহৃদ, সাহিত্য-সেবক মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য্য / দেখা পেয়েছি দু’দিন, মনে রাখব চিরদিন।” গোয়েন্দা কাহিনির বাইরেও মনোরঞ্জনের অনেক লেখা রয়েছে। তার অনুজ ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্যও ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত লেখক।

ত্রিশের দশকে প্রণব রায় আনলেন গোয়েন্দা প্রতুল লাহিড়ীকে। সুরেন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য লিখলেন ‘দুই দারোগা’ , ‘নকল নারী’, ‘ধরিবাজ চোর’ ইত্যাদি। প্রেমেন্দ্র মিত্র পরাশর বর্মাকে পাঠকের কাছে হাজির করলেন প্রথম লেখা ‘গোয়েন্দা কবি পরাশর’-এর মধ্য দিয়ে। সম্ভবতঃ চল্লিশের দশকের শেষে ‘দেব সাহিত্য কুটীরের’ জন্ম। রহস্য, রোমাঞ্চ ও গোয়েন্দা কাহিনি নিয়ে দেব সাহিত্য কুটির প্রধানতঃ দুটি সিরিজ বের করেছিল — ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ সিরিজ ও ‘প্রহেলিকা’ সিরিজ। বহু লব্ধপ্রতিষ্ঠ লেখকেরা এই বইগুলি লিখেছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন — হেমেন্দ্র কুমার রায়, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়, প্রভাবতী দেবী সরস্বতী, বুদ্ধদেব বসু, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, শৈলবালা ঘোষজায়া, দীনেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত সহ আরো বহু লেখক। কাঞ্চনঞ্জঙ্ঘা সিরিজের কয়েকটি বই — ‘অন্ধকারের বন্ধু’, ‘রাত্রির যাত্রী’, ‘কেউটের ছোবল’, ‘উদাসী বাবার আখরা’, ‘গুপ্ত ঘাতক’, ‘মিসমিদের কবচ’, ‘মুখ আর মুখোস’, ‘নিঝুম রাতের কান্না’ আর প্রহেলিকা সিরিজের — ‘ডাকাত কালীর জঙ্গলে’, ‘রাত যখন সাতটা’, ‘দেশের ডাক’, ‘ঝড়ের প্রদীপ’, ‘অপরাধের কারখানা’, ‘মৃত্যুদূত’, ‘নৈশ অভিযান’ ইত্যাদি বইগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল সেই সময়। ‘সব্যসাচী’ ছদ্মনামে সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায় বেশ কিছু বই লিখেছেন।

পত্রভারতী পূজার সময় একটি বার্ষিকী বের করত। এক এক বছর নাম হত এক এক রকম যেমন, ‘দেবালয়’, ‘আগমনী’, ‘পরশমণি’, ‘অরুণাচল’, ‘উত্তরায়ণ’ ইত্যাদি। রঙিন ছবিতে ভরা এই বইগুলি ছিল ছোটদের খুবই প্রিয়। প্রতি বছর অন্যান্য লেখকদের সঙ্গে যার লেখা না থাকলে মন খারাপ হত, তিনি হলেন হেমেন্দ্রকুমার রায় (১৮৮৮-১৯৬৩)। বাংলা গোয়েন্দা কাহিনিতে নতুনত্ব নিয়ে আসেন হেমেন্দ্রকুমার রায়। তিনিই প্রথম ডিটেকটিভ ভাবনায় বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সঞ্চার করেছিলেন। তাঁর ‘জয়ন্তের কীর্তি’, ‘শনি মঙ্গলের রহস্য’, ‘সাজাহানের ময়ূর’ ইত্যাদি বহুল পরিচিত। হেমেন্দ্রকুমার ছিলেন ছোটদের (এবং সেই সঙ্গে বড়দেরও) অত্যন্ত প্রিয় লেখক। বিদেশি গল্পের ছায়া অবলম্বনে হেমেন্দ্রকুমারের রচনা — ‘অদৃশ্য মানুষ’, ‘আজব দেশে অমলা’, ‘মানুষের গড়া দৈত্য’, ‘কিং কং’ ইত্যাদি। সে সময়টা ছিল ছোটদের স্বর্ণযুগ। কাঞ্চনঞ্জঙ্ঘা সিরিজের মোট চব্বিশটি বইয়ের মধ্যে গোয়েন্দা কাহিনি ছিল এগারোটিতে। হেমেন্দ্রকুমার লিখেছেন সব চেয়ে বেশি সংখ্যক-চারটি। ছোটদের জন্য তিনি লিখলেও বড়রাও এগুলি উপভোগ করেছেন। খুব সহজ ভাষায় তিনি যেভাবে রহস্য ঘনীভূত করে তুলে সেটা উন্মোচন করতেন, পাঠককে সেটা আকর্ষণ করে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেত। তিনি লেখার কোথাও সচেতন ভাবেই কোন করুণ রসের সৃষ্টি করেন নি। তাঁর মতে — “এ্যাডভেঞ্চার গল্পের উদ্দেশ্যই হল, দুঃসাহসী দৃঢ় চরিত্রের ছেলেমেয়ে গড়ে তোলা।” তাঁর অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি বা গোয়েন্দা গল্পে তিনি তিন জোড়া গোয়েন্দা (বা রহস্যভেদী) ও সহকারী সৃষ্টি করেছেন। এরা হলেন — জয়ন্ত ও মানিক, বিমল ও কুমার এবং হেমন্ত ও রবীন। জয়ন্ত-মানিক এবং বিমল-কুমারের সাহায্যকারী পুলিশ অফিসার হলেন ইনস্পেকটর সুন্দরবাবু এবং হেমন্ত-রবীনের ভূপতিবাবু ও সতীশবাবু। কোন কোন কাহিনিতে পুরাতন ভৃত্য রামহরি ও প্রভুভক্ত সারমেয় ‘বাঘা’কেও ভুলবার নয়। পাঁচকড়ি দে’র ডিটেকটিভ দেবেন্দ্রবিজয় বা অরিন্দমবাবুর মতো হেমেন্দ্রকুমার রায়ের গোয়েন্দা জয়ন্ত কিন্তু বয়স্ক নয়। ছোটদের কাছে আকর্ষণীয় হবে না ভেবে হেমেন্দ্রকুমার তাঁর ডিটেকটিভের বয়স অনেক কম করেছেন। জয়ন্তর বীরত্বব্যঞ্জক ও আকর্ষণীয় চেহারার বর্ণনা করা হয়েছে ‘জয়ন্তের কীর্তি’ বইটিতে —“জয়ন্তের বয়স একুশ-বাইশের বেশি হবে না-তবে তার লম্বা চওড়া চেহারার জন্য বয়সের চাইতে তাকে অনেক বেশি বড় দেখায়। তার মত দীর্ঘদেহী যুবক বাঙালী জাতির মধ্যে বড় একটা দেখা যায় না — তার মাথার উচ্চতা ছয় ফুট চার ইঞ্চি। ভিড়ের ভিতরেও সে নিজেকে লুকোতে পারত না, সকলের মাথার উপরে জেগে থাকত তার মাথাই। রীতিমত ডন-বৈঠক, কুস্তি, জিমন্যাস্টিক ক’রে নিজের দেহখানিকেও সে তৈরি করে তুলেছিল। বাঙালীদের মধ্যে সে একজন নিপুণ মুষ্টিযোদ্ধা বলে বিখ্যাত। আপাততঃ এক জাপানী মল্লের কাছ থেকে যুযুৎসুর কৌশল শিক্ষা করছে।” এ চেহারার বর্ণনা এবং জয়ন্তের নানা দুঃসাহসিক বীরত্বব্যঞ্জক কাহিনি পড়ে ছোটরা হয়ত তাদের শরীরটাকে গড়ে তোলার উৎসাহ পেত। হেমেন্দ্রকুমারের নিজের একটা সংগ্রহশালা ছিল। দু’খানা ঘর ভর্তি ছিল দুষ্প্রাপ্য বই, নানা মূর্তি ও নামকরা চিত্রকরদের আঁকা ছবিতে। হেমেন্দ্রকুমার তার অনেক গল্পের মধ্য দিয়ে ছোটদের বিজ্ঞান-চেতনা ও জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত করতে চেষ্টা করেছেন। এ প্রসঙ্গে অবশ্যই নাম করতে হয় ‘জয়ন্তের কীর্তি’ বইটির। মানুষের দেহকে জিইয়ে রেখে জরা ও বার্ধক্যের হাত থেকে রক্ষা করে পরে আবার তাকে জীবিত করে তোলার প্রচেষ্টা কাল্পনিক ঠিকই কিন্তু এ বিষয়ে অনেক বিজ্ঞান সম্মত পরীক্ষা নিরীক্ষার কথাও বলা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে তিনি ১৯১২ সালে নোবেলজয়ী বৈজ্ঞানিক রকফেলার ইনস্টিটিউটের অ্যালেক্সিস ক্যারেলের নামও উল্লেখ করেছেন। হেমেন্দ্রকুমারের অনেক লেখাতে এরকম বিজ্ঞানের ছোঁয়া আছে। বইটির শেষে জয়ন্ত ঘটনার বিজ্ঞান-ভিত্তিক সারমর্মও ব্যাখ্যা করেছেন। গোয়েন্দাদের যুক্তিনিষ্ঠ বিশ্লেষণ ও বুদ্ধিদীপ্ত কথাবার্তা ছোটদের আত্মবিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেছিল নিশ্চিত ভাবে। ইনস্পেকটার সুন্দরবাবুর চরিত্রটি খুবই চিত্তাকর্ষক। বিপুল ভুঁড়ির অধিকারী ভোজনরসিক সুন্দরবাবু্র ঘন ঘন “হুম” শব্দটি উচ্চারণ খুবই উপভোগ্য। অনেক সময়েই তিনি সমস্যার সমাধানে সাহায্য করা ত দূরের কথা নিজের বোকামিতে সমস্যা তৈরি করেছেন। গম্ভীর পরিবেশ ও আলোচনার মধ্যে তার নির্বুদ্ধিতা হাস্যরসের সৃষ্টি করে সমগ্র ঘটনাকে আরও উপভোগ্য করে তোলে। মানিকের কাজই ছিল মাঝে মাঝে সুন্দরবাবুর পেছনে লাগা। তদন্তে প্রবৃত্ত হয়ে কোন ‘ক্লু’ পেলে শামুকের নস্যদানী থেকে জয়ন্তর ঘন ঘন নস্য নেওয়ার অভ্যাসটাও লক্ষণীয়। ১৯০৩ সালে পনেরো বছর বয়সে ‘বসুধা’ পত্রিকায় হেমেন্দ্রকুমারের প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়। ১৯২০ সালে ‘মৌচাক’ পত্রিকায় ‘যকের ধন’ প্রকাশিত হলে রীতিমত সাড়া পড়ে যায়। এর পর ছোটদের জন্য বিরামহীন ভাবে লিখে গিয়েছেন হেমেন্দ্রকুমার। নামকরা এস্রাজ বাদক রাধিকাপ্রসাদ রায়ের পুত্র প্রসাদদাস রায় ছিল হেমেন্দ্রকুমারের পিতৃদত্ত নাম। ছদ্মনামে লিখতে গিয়ে পরে সেই নামই স্থায়ী হয়ে যায়। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী হেমেন্দ্রকুমার ছিলেন নাটকপ্রিয়। শিবরাম চক্রবর্তীর ভাষায় — “… শিশিরকুমারের নাট্যমন্দিরেই বেশির ভাগ সময় কাটাতে দেখেছি তাঁকে।” নাট্যকলা বিষয়ক ‘নাচঘর’ পত্রিকাটির পরিকল্পনা তারই এবং তিনি এর সম্পাদকও ছিলেন। হেমেন্দ্রকুমার নিজে শরীর চর্চা করতেন। ‘ডেয়ার ডেভিল’ গোছের লোক ছিলেন তিনি। বহু অদ্ভুত ও রোমাঞ্চকর ঘটনা তাঁর জীবনে ঘটেছে। মেঘনাদ গুপ্ত ছদ্মনামে এমন অনেক ঘটনা লিখে গিয়েছেন তিনি। অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় এই লোকটি কিন্তু কবিতা লিখেছেন অনেক এবং গভর্ণমেন্ট আর্ট কলেজে ছবি আঁকাও শিখেছেন কয়েক বছর। সঙ্গীত ছিল অত্যন্ত প্রিয়। নিজে গান লিখেছেন প্রায় চারশ’র মত।

বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যের শক্তিশালী লেখকদের একজন নীহাররঞ্জন গুপ্ত(১৯১১-১৯৮৬)। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ নীহাররঞ্জন যুদ্ধের অবসানে লন্ডনে গিয়ে স্নাতোকত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। সেখানে কৌতূহলবশতঃ আগাথা ক্রিস্টির বাড়িতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখাও করেছিলেন। অনেকের মতে রহস্য গল্প ও গোয়েন্দা কাহিনি রচনায় নীহাররঞ্জনের খ্যাতি হেমেন্দ্রকুমারকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তাঁর এ ধরনের রচনা ‘কিরীটি অমনিবাস’ (১৪ খন্ড) নামে গ্রন্থিত হয়েছে। নীহাররঞ্জনের গোয়েন্দা গল্পের একটি বৈশিষ্টের কথা উল্লেখ করতেই হয়। বহু লেখায় যৌনতা ও যৌন-আবেগ ছড়িয়ে আছে। সে অর্থে এগুলি মূলত বড়দেরই পাঠ্য। গোয়েন্দা কাহিনি রচয়িতাদের মধ্যে সম্ভবত নীহাররঞ্জনই ছিলেন একমাত্র চিকিৎসা শাস্ত্র বিশেষজ্ঞ। ‘আলোক আঁধারে’, ‘হীরকাঙ্গুরীয়’, ‘নগরনটী, ‘ঘুম ভাঙার রাত’, ‘নীলকুঠী’ নামক গল্পগুলি এর সাক্ষ্য বহন করে। পেশায় চিকিৎসক হবার জন্য চিকিৎসা শাস্ত্রের অনেক তথ্য ও জ্ঞান স্থান পেয়েছে তাঁর রচনায়।

যদিও তর্ক আাছে সুকুমার সেন বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ লেখকের মর্যাদা দিয়েছেন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়কে। প্রথম উল্লেখযোগ্য গল্প ‘রক্তসন্ধ্যা’ (১৯৩০), প্রথম উপন্যাস ‘বিষের ধোঁয়া’ (১৯৩০-৩২)। এবার গোয়েন্দা কাহিনি। তাঁর লেখা গল্পে গোয়েন্দার নাম ছিল ‘ব্যোমকেশ বক্সি’। ডিটেকটিভ, গোয়েন্দা ইত্যাদি নামগুলি পছন্দ না হওয়ায় ব্যোমকেশ নিজেকে ‘সত্যান্বেষী’ বলেই তুলে ধরতে ভালবাসে। পুলিশি নয়, তার কাজ হল আসল ঘটনার উদ্ঘাটন, সত্যের অন্বেষণ। শরদিন্দুর প্রথম গোয়েন্দা গল্প ‘পথের কাঁটা’ প্রকাশিত হয় ‘মাসিক বসুমতী’ পত্রিকায় ১৩৩৯-এর মাঘ সংখ্যায়। সাইকেলের ঘন্টার ঢাকনায় ছোট ফুটো করে ঘন্টার ভিতরে বসানো স্প্রিং-এর সাহায্যে একটা গ্রামোফোনের পিনকে সজোরে বাইরে নিক্ষেপ করার অভিনব যন্ত্র উদ্ভাবন এবং এটির সাহায্যেই শত্রুর বা ‘পথের কাঁটা’র বক্ষভেদ করে মৃত্যু ঘটানোর কথা বলা হয়েছে গল্পটিতে। নিঃসন্দেহে মৌলিক চিন্তা। এর পরে ফাল্গুন সংখ্যায় প্রকাশিত হয় ‘সত্যান্বেষী’ গল্পটি। পরে বেরোলেও কাহিনির সামঞ্জস্য ও ধারাবাহিকতা রক্ষার খাতিরে এটিকেই প্রথম গল্প হিসাবে ধরা হয়। ‘সত্যান্বেষী’তেই অতুলচন্দ্র মিত্র ছদ্মনামে ব্যোমকেশের আগমন একটি মেস বাড়িতে। এখানেই তার সঙ্গে দেখা হয় পরে তার অভিন্ন হৃদয় বন্ধু ও সহায়ক অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। যে অসামান্য পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও বিশ্লেষণী শক্তি কাজে লাগিয়ে ব্যোমকেশ অবশেষে অপরাধীকে চিহ্নিত করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে সেটা এক কথায় অসাধারণ। এ দুটি গল্পের অনুসারী হয়ে পর পর প্রকাশিত হয়েছে আরও আটটি গল্প — ‘সীমন্তহীরা’, ‘মাকড়সার রস’, ‘অর্থমনর্থম’, ‘চোরাবালি’, ‘অগ্নিবান’, ‘উপসংহার’, ‘রক্তমুখী নীলা’, ‘ব্যোমকেশ ও বরদা’। এই দশটি গল্প লেখার পর শরদিন্দু আর ব্যোমকেশকে নিয়ে গল্প লেখেননি। কারণ, তাঁর মনে হয়েছে এই ‘সিরিজে’র গল্প পাঠকদের হয়ত আর ভাল লাগবে না। অনেক পরে একবার তিনি কলকাতায় পরিমল গোস্বামীর বাড়িতে এসেছিলেন। সে সময় বাড়ির ছেলেমেয়েরা জানতে চায় কেন তিনি ব্যোমকেশকে নিয়ে আর লিখছেন না। শরদিন্দু বুঝতে পারেন এ ধরনের গল্পের চাহিদা তখনও রয়েছে। দীর্ঘ পনেরো বছর পর তিনি আবার ব্যোমকেশের গল্প লিখতে শুরু করেন। এ পর্যায়ে তাঁর প্রথম গল্প ‘চিত্রচোর’ (পৌষ ১৩৫৮)। বাইশটি গল্প লেখার পর তিনি মৃত্যুর মাস কয়েক আগে লিখতে শুরু করেন শেষ গল্প ‘বিশুপাল বধ’, কিন্তু এটি তিনি শেষ করে যেতে পারেন নি। শোনা যায় শরদিন্দুর রচনা গ্রন্থাকারে প্রকাশ করার সময় সম্পাদক প্রতুলচন্দ্র গুপ্তর অনুরোধে সাহিত্যিক নারায়ণ সান্যাল গল্পটির সমাপ্তি টেনেছিলেন। শরদিন্দু অমনিবাসে অসমাপ্ত ‘বিশুপাল বধ’-ই মুদ্রিত হয়েছিল। শরদিন্দু ছিলেন কোনান ডয়েল এবং আগাথা ক্রিস্টির ভক্ত। শার্লক হোমস ও ওয়াটসনকে দেখে ব্যোমকেশ ও অজিতকে সৃষ্টি করা হয়েছে বলে অনেকে মনে করলেও বয়স ও মানসিকতায় তাদের মধ্যে অনেক অমিল রয়েছে।

শরদিন্দু একের পর এক ব্যোমকেশ কাহিনি যখন লিখে গিয়েছেন, গল্পের মধ্যে তিনি সময়ের সঙ্গে ব্যোমকেশের সাংসারিক অবস্থা ও পরিবর্তনের দিকটাও নজরে রেখেছেন। ব্যোমকেশ বিয়ে করেছে ‘সত্যবতী’ নামের একটি মেয়েকে, যার সঙ্গে তার প্রথম সাক্ষাৎ ‘অর্থমনর্থম’ গল্পে। বিয়ের পরে হ্যারিসন রোডের বাড়ি ছেড়ে দক্ষিণ কলকাতার কেয়াতলায় নতুন বাড়ি তৈরি করে চলে এসেছে সবাই। সবাই বলতে সঙ্গে রয়েছে অকৃতদার অজিত এবং সর্বক্ষণের বাড়ির কাজের লোক পুঁটিরাম। পুঁটিরাম প্রথম থেকেই ব্যোমকেশের সঙ্গী এবং সংসারের একজন সদস্যের মতই তার অবস্থান। ব্যোমকেশের একটি ছেলে হয়েছে সে কথাও বলা হয়েছে। ‘অদ্বিতীয়’ গল্পটি শুরুই হয়েছে ব্যোমকেশ সত্যবতীর ঘরোয়া বিবাদ দিয়ে। গল্পে এসবের উল্লেখ থাকলেও এগুলি কখনই কাহিনিতে গুরুত্ব পায় নি, মুখ্য বিষয় হয়ে ওঠে নি। ব্যোমকেশের গল্পের কাহিনিকার মুখ্যতঃ অজিত হলেও, শরদিন্দু কিন্তু সব গল্পে অজিতকে আনেন নি। কারণ বোঝা গেল না। অবশ্য তাঁর দেওয়া একটি কৈফিয়ৎ হচ্ছে — অজিত একটা বইয়ের দোকান চালাচ্ছে, লিখবার সময় কোথায়? তাছাড়া তার ভাষাও সেকেলে রয়ে গেছে, একঘেয়ে মনে হচ্ছে। ‘বেণীসংহার’ গল্পটি ব্যোমকেশ অজিতের সাহায্য ছাড়া নিজেই লিখে শেষ করেছে। শরদিন্দুর ব্যাখ্যা যাই হোক, একজন মনযোগী পাঠক হিসাবে প্রথম দিকের গল্পগুলির সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেলে কাহিনির মধ্যে অজিতকে ছেড়ে থাকতে কিন্তু মন চায় না। অন্যান্য বহু গোয়েন্দা কাহিনির মতো ব্যোমকেশ কাহিনিতে কেন অ্যাকশন বা গোলাগুলি নেই, এ প্রশ্নের উত্তরে শরদিন্দুর বক্তব্য — “আমার মেজাজের সঙ্গে গোলাগুলি খাপ খায় না। তাছাড়া গোয়েন্দা কাহিনিকে আমি ইন্টেলেকচুয়াল লেভেলে রেখে দিতে চাই। ওগুলি নিছক গোয়েন্দা কাহিনি নয়। প্রতিটি কাহিনিকে আপনি শুধু সামাজিক সমস্যা হিসাবেও পড়তে পারেন। কাহিনির মধ্যে আমি পরিচিত পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাই। মানুষের সহজ সাধারণ জীবনে কতগুলি সমস্যা অতর্কিতে দেখা দেয়-ব্যোমকেশ তারই সমাধান করে। কখনো কখনো সামাজিক সমস্যাও এর মধ্যে দেখাবার চেষ্টা করেছি। যেমন ‘চোরাবালি’ গল্পে আছে বিধবার পদস্খলন।। একটি কথা, জীবনকে এড়িয়ে কখনো গোয়েন্দা গল্প লেখার চেষ্টা করি নি।” এ প্রসঙ্গে বলা যায়, দীর্ঘদিন পর্যন্ত বাংলায় গোয়েন্দা কাহিনিকে অন্ত্যজ শ্রেণীর এবং সাহিত্য পদবাচ্য নয় বলে অনেকে মনে করতেন। এসব লেখাকে ‘বটতলা’ শ্রেণীভুক্ত করার একটা মানসিকতাও ছিল। এ সম্পর্কে শরদিন্দুর বক্তব্য, যে লেখা কোনান ডয়েল লিখে গিয়েছেন সেসব লিখতে তাঁর অন্তত কোন লজ্জা নেই। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে লেখা উপন্যাসগুলি এক অসাধারণ সৃষ্টি। সম্প্রতি শরদিন্দুর কাহিনি অবলম্বনে একাধিক চলচ্চিত্র রূপায়িত হয়েছে, ব্যোমকেশের সবগুলি গল্প নিয়ে দূরদর্শনে ‘সিরিয়াল’ও তৈরি হয়েছে।

১৯৭৪ সালে মঞ্জু দে’র পরিচালনায় ‘শজারুর কাঁটা’ ছায়াছবি নির্মিত হয়েছিল। সাহিত্য ক্ষেত্রে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যয়ের ছদ্মনাম ছিল ‘চন্দ্রহাস’। শরদিন্দু ভুতে বিশ্বাস করতেন। জীবনের রহস্যময় দিকগুলিতে তাঁর একটা স্বাভাবিক আকর্ষণ ছিল। জ্যোতিষগ্রন্থ পাঠ করেছেন, চর্চাও করতেন। বহুবার প্ল্যানচেটেও বসেছেন। ভাষার মাধুর্যে ও অনায়াস গতিময়তায় শরদিন্দুর লেখা যেন বাস্তবে রূপ পরিগ্রহ করে। সম্পূর্ণ দেশীয় পরিবেশে ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে তাঁর গোয়েন্দা কাহিনিগুলি পাঠকের মনকেও সঙ্গী করে এগিয়ে চলে। শরদিন্দু প্রসঙ্গে সুকুমার সেন মনে করতেন –“ভুতের গল্প, ডিটেকটিভ গল্প, ঐতিহাসিক গল্প এবং নাট্যচিত্র লেখায়ও ইনি অসাধারণ স্বাচ্ছন্দ্য ও দক্ষতা দেখাইয়াছেন। বিশেষ করিয়া ভৌতিক এবং ডিটেকটিভ গল্পে তাঁহার দক্ষতা ইংরেজি গল্পের প্রায় সমতুল্য। শরদিন্দুবাবুর স্টাইল অনায়াসসুন্দর সহজ ও স্বচ্ছ রচনারীতির মনোহর আদর্শ। যে গুণ থাকিলে অনাড়ম্বর রচনা কালের সম্মার্জনীর স্পর্শ এড়াইতে পারে সে গুণ শরদিন্দুবাবুর অনেক গল্পে বিদ্যমান।”

যারা অল্প বয়সে গোয়েন্দা কাহিনির ভক্ত ছিলেন, তাঁরা ‘মোহন সিরিজে’র দুই একটা বই পড়েননি এমন সম্ভাবনা কম। এক সময়ে শশধর দত্তের লেখা ‘মোহন সিরিজ’ বাজার মাতিয়ে রেখেছিল। শশধর দত্ত (১৯০১-১৯৫২) রচিত মোহন সিরিজের বইয়ে ‘হিরো’র ভূমিকায় আছে মোহন। তার কোন সহকারী নেই; সে একাই এক’শ। মোহনের একটা বৈশিষ্ট ছিল, সে ছিল ধনীদের শত্রু ও গরীবের বন্ধু। ধনীদের অর্থ লুঠ করে সেই অর্থে গরীবদের সাহায্য করেছে সে। এদিক থেকে দেখলে প্রখ্যাত ‘রবিন হুডে’র সঙ্গে তার তুলনা করা চলে। মূলতঃ এই রবিন হুড মার্কা কার্যকলাপের জন্যই মোহনকে পাঠকরা পছন্দ করত। মাঝে মাঝে অবশ্যই থাকত প্রেমিকা রমার সঙ্গে তার প্রেম কাহিনি। মোহনের কান্ডকারখানা পড়লে সে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিল ধরে নিতে হয়। যে সব অবস্থায় ও প্রতিকুল পরিবেশে মৃত্যু নিশ্চিত, সে সব পরিস্থিতি থেকেও সে অনায়াসে অবিশ্বাস্য ভাবে নিজেকে মুক্ত করে আনে। শশধর দত্তের লেখা মোহন সিরিজের কয়েকটি বই — ‘কারাগারে মোহন’, ‘মোহন ও রমা’, ‘নারীত্রাতা মোহন’, ‘দস্যু মোহন’, ‘বার্লিনে মোহন’ ইত্যাদি। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে যাঁরা মোহন সিরিজের বইয়ে মোহনের অসামান্য দক্ষতা ও বীরত্বের কাহিনি পাঠ করেছেন তাঁরা নিশ্চয়ই স্বপনকুমারের লেখা বইয়ে ডিটেকটিভ দীপক চ্যাটার্জি ও সহকারী রতনলালের সঙ্গে পরিচিত। স্বপনকুমারের এই বইগুলি বিভিন্ন ‘সিরিজে’র অন্তর্গত হয়ে দেদার বিকিয়েছে। বইগুলি ছিল ছোট আকারের — এখনকার অনেক লিটল ম্যাগাজিনের মতো, পৃষ্ঠা সংখ্যাও কম। প্রচ্ছদে ছিল রোমহর্ষক সব রঙিন ছবি, দেখলেই খুলে পড়তে ইচ্ছা করে। চিত্রকর ছিলেন নারায়ণ দেবনাথ, শৈলেশ পাল, তুষার চ্যাটার্জি প্রমুখ শিল্পীরা। প্রতি বইয়ের দাম ছিল আট আনা, এই বইগুলি বিভিন্ন সিরিজের নামে বিক্রি হত যেমন, — ‘কালো নেকড়ে সিরিজ’ (‘কালো নেকড়ের প্রতিহিংসা’, ‘কালো নেকড়ের ষড়যন্ত্র’, ‘আকাশপথে কালো নেকড়ে’ ইত্যাদি), ‘বাজপাখী সিরিজ’ (‘বাজপাখির রক্তলীলা’, ‘বাজপাখির প্রতিহিংসা’, ‘মহাশূন্যে বাজপাখি’ ইত্যাদি), ‘বিশ্বচক্র সিরিজ’ প্রভৃতি। বইগুলি পড়া হয়ে গেলে এগুলি সংগ্রহে রেখে দিতে কিন্তু লোকে আগ্রহী ছিল না। হাতে হাতে ঘুরে শেষে হারিয়ে যাওয়ার জন্যই যেন এগুলির জন্ম। অথচ নতুন অপঠিত বইয়ের আকর্ষণ ছিল অপ্রতিরোধ্য। সাহিত্যিক সুচিত্রা ভট্টাচার্যের কথায় — “পড়িনি মানে। ভীষণ পড়তাম। অবশ্য সেটা সাময়িক উত্তেজনা। পড়ার পর বইগুলি হারিয়ে যেত বা হাতে হাতেই অন্য কোন বন্ধুর কাছে চলে যেত। বইগুলি রেখে দেওয়ার কথা কখনও মনে হয়নি।”

সমরেন্দ্রনাথ পাণ্ডে (১৯২৭-২০০১) ওরফে স্বপনকুমারের জন্ম রাজশাহীতে আইনজীবী পরিবারে। ডাক্তারি পড়বার খুব ইচ্ছা ছিল, ভর্তি হয়েছিলেন আর. জি. কর মেডিক্যাল কলেজে। অর্থাভাবে পড়া বন্ধ হবার উপক্রম হলে লিখতে শুরু করেন গোয়েন্দা কাহিনি। ডাক্তারি পাশ করেছেন কিন্তু কখনো ডাক্তারি করেননি। তবে ‘টেক্সট বুক অব প্যাথোলজি’, ‘টেক্সট বুক অব অ্যানাটমি’, ‘হোম নার্সিং’ ইত্যাদি নামে চিকিৎসাশাস্ত্রের বই লিখেছেন প্রচুর, বিক্রিও হয়েছে অজস্র। সবজি চাষ ও পশুপালনের বইও লিখেছেন। অদৃষ্ট চিরকাল অপ্রসন্নই থেকেছে সমরেব্দ্রর উপর। অনেক প্রকাশক তাঁকে দিয়ে অনেক লিখিয়ে নিয়েছেন কিন্তু সব সময় তাঁর প্রাপ্যটুকু দেন নি। বিদ্যুতের খরচ বাঁচাবার জন্য শিয়ালদা ষ্টেশনে আলোর নীচে বসেও লিখেছেন তিনি। এই সমরেন্দ্রনাথই ‘শ্রীভৃগু’ নামে জ্যোতিষ শাস্ত্রের বই লিখেছেন, এগুলির চাহিদাও ছিল যথেষ্ট। পরে অবশ্য ‘ভৃগু’ নামে অনেকেই লিখেছেন। কোনটা কোন ভৃগু কে জানে! তবে সম্প্রতি ‘লালমাটি প্রকাশন’ স্বপনকুমার নামে লেখা বইগুলি একত্রিত করে ‘স্বপনকুমার সমগ্র’ নাম দিয়ে প্রথম খন্ডটি প্রকাশ করেছেন। নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় প্রচেষ্টা। স্বপনকুমার অন্তত বাঙালির মন থেকে মুছে যাবেন না। এখন বিস্মৃতপ্রায় সাহিত্যিক হলেও এক সময় কিন্তু বেশ সুনাম অর্জন করেছিলেন শৈলবালা ঘোষজায়া (১৮৯৪-১৯৭৪) ‘প্রবাসী’তে ধারাবাহিকভাবে (বৈশাখ ১৩২২ থেকে) বেরিয়েছিল তাঁর উপন্যাস ‘সেখ আন্দু’। পাঠকমহলে যথেষ্ট আদৃত হয়েছিল এই উপন্যাসটি। জীবনে তাঁকে অনেক ঝড়-ঝাপ্টা সহ্য করতে হয়েছে। স্বামী নরেন্দ্রমোহন, যিনি এক সময়ে তাঁর সাহিত্য চর্চায় উৎসাহ জুগিয়েছেন, তিনি হঠাৎ হয়ে গেলেন বদ্ধ উন্মাদ ও স্ত্রীর সাহিত্য রচনার বিরোধী। যাই হোক, অন্যান্য রচনার সঙ্গে শৈলবালা রহস্য ও গোয়েন্দা কাহিনি রচনাতেও হাত দিয়েছেন। তাঁর রচিত রহস্য উপন্যাস ‘চৌকো চোয়াল’ প্রকাশিত হয়েছে ‘বঙ্গশ্রী’ মাসিক পত্রিকায়। গোয়েন্দা কাহিনি ‘জয়-পতাকা’ বইটি বেরিয়েছিল ‘দেব সাহিত্য কুটীর’ থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা সিরিজের নামাঙ্কিত হয়ে। শৈলবালা বহু সংখ্যক গোয়েন্দা কাহিনি লেখেননি ঠিকই, কিন্তু তিনি সম্ভবতঃ একাধিক নূতন লেখিকাকে গোয়েন্দা কাহিনি রচনায় উদ্বুদ্ধ করেছেন। অগ্রগণ্যা হলেন প্রভাবতী দেবী সরস্বতী (১৯০৫-১৯৭২)। তাঁরই লেখনীতে আমরা পেয়েছি বাংলা সাহিত্যে প্রথম মহিলা গোয়েন্দা কৃষ্ণাকে। সেকালের সমাজের রীতি মেনে প্রভাবতীর বিয়ে হয়েছিল মাত্র ন’বছর বয়সে। অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া শিখে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের আহ্বানে কর্পোরেশন স্কুলে শিক্ষকতাও করেছেন তিনি। আঠারো বছরের কাছাকাছি বয়সে ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘বিজিতা’। বড়দের জন্য লেখার সঙ্গে সঙ্গে ছোটদের উপযোগী লেখাও প্রাণভ’রে লিখেছেন তিনি। তাঁর রোমহর্ষক এ্যাডভেঞ্চার কাহিনী — ‘বন্দী জেগে আছো?’, ‘আঁধার রাতের যাত্রী’, ‘আসামের জঙ্গলে’ ইত্যাদি বইগুলি ছোটদের খুবই প্রিয় ছিল। ‘দেব সাহিত্য কুটীর’ থেকে প্রকাশিত কাঞ্চনজঙ্ঘা সিরিজের তাঁর দু’টি গোয়েন্দা কাহিনি ‘গুপ্তঘাতক’ ও ‘হত্যার প্রতিশোধ’। প্রথম বইটিতে বর্ণনা করা হয়েছে একটি হত্যাকাহিনী এবং তারই প্রতিশোধের কথা বলা হয়েছে দ্বিতীয়টিতে। সে অর্থে ‘হত্যার প্রতিশোধ’কে ‘গুপ্ত ঘাতকে’র দ্বিতীয় পর্ব বলা যেতে পারে। তার সৃষ্ট মহিলা গোয়েন্দা কৃষ্ণা একের পর এক রহস্যের সমাধান করে অপরাধীকে খুঁজে বের করছে। এই ঘটনাগুলিকে নিছক গোয়েন্দা কাহিনি না বলে, মহিলা প্রগতির চিহ্ন হিসাবেও গণ্য করা যেতে পারে। ‘দেব সাহিত্য কুটীর’ থেকে ‘কৃষ্ণা সিরিজ’ নাম দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে প্রভাবতীর সাতখানি গোয়েন্দা কাহিনি – ‘কারাগারে কৃষ্ণা’, ‘মায়াবী ও কৃষ্ণা’, ‘কৃষ্ণার অভিযান’, ‘কৃষ্ণার পরিচয়’, ‘বনে জঙ্গলে কৃষ্ণা’, ‘মুক্তিপথে কৃষ্ণা’ ও ‘কৃষ্ণার জয়যাত্রা’।

১৯৬৫ তে সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে শুরু হল ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি। প্রদোষ চন্দ্র মিত্র ওরফে ফেলুদা একজন প্রতিভাবান গোয়েন্দা। তিনি নিজেকে বিজ্ঞাপিত করেন ‘প্রদোষ সি. মিটার, প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর’ নামে। রিভলবার বা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার তাঁর খুব পছন্দের নয়, তাঁর প্রধান সম্বল ‘মগজাস্ত্র’। এই মগজাস্ত্র বা মস্তিষ্ককে কাজে লাগিয়ে সূক্ষ বুদ্ধি প্রয়োগ করে রহস্যের জাল ছিন্ন করেন তিনি। ফেলুদা শুধু গোয়েন্দাই নন, তাঁর জ্ঞানের সীমা একাধিক বিষয়ে পরিব্যাপ্ত, বিশেষ করে বিজ্ঞান বিষয়ে। তাঁর আবার খুড়তুতো ভাই ও সহকারী তপেশ রঞ্জন মিত্র ওরফে তোপসেকে ছাড়া চলে না। অসাধারণ ডিসিপ্লিনড ও সময়ানুবর্তী ফেলুদার মধ্যে অনেকে স্রষ্টা সত্যজিতের ছায়া দেখতে পান। ব্যোমকেশ ও ফেলুদা দু’জনেরই ইন্টেলেকচুয়াল স্তরে মূলতঃ চলাফেরা, রহস্য সমাধানের ধরনটাও তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যের জগতে গোয়েন্দা গল্পে যুক্তি ও বুদ্ধির দাপট দেখিয়েছেন সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ। নারায়ণ সান্যালের ‘কাঁটা সিরিজ’ বেশ উল্লেখযোগ্য। তাঁর সৃষ্ট গোয়েন্দা চরিত্রগুলি হলো- পি.কে.বসু, শার্লক হেবো। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গোয়েন্দা চরিত্র বরদাচরণ মূলত কিশোর পাঠ্য মজার চরিত্র। এছাড়া তাঁরই সৃষ্ট শবর দাশগুপ্ত পাঠক মহলে খুবই জনপ্রিয়। সমরেশ বসু লিখেছেন ছোটদের জন্য গোয়েন্দা কাহিনি। তাঁর গোয়েন্দা গল্পের নায়ক গোগল প্রাপ্ত বয়স্ক গোয়েন্দা নয়,তার ছিল অনুসন্ধিৎসু মন এবং অপার কৌতূহল। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বানালেন একটু অন্য ধরণের অ্যাডভেঞ্চার চরিত্র রাজা রায়চৌধুরী অর্থাৎ কাকাবাবুকে। ‘রহস্য রোমাঞ্চ’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন বিমল কর ও কবি অরুণ ভট্টাচার্য। বিমল করের সৃষ্ট চরিত্র কিকিরা ওরফে কিঙ্কর কিশোর রায়। ‘রহস্য’ পত্রিকার সম্পাদক গোবিন্দলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রধান গোয়েন্দা দিলীপ সান্যাল ও তার সহকারী ত্রিদিব চৌধুরী। কবি আনন্দ বাগচীর গোয়েন্দা সত্যপ্রিয়। হীরেন চট্টোপাধ্যায় গোয়েন্দা সাহিত্যে আনলেন যে দুজন গোয়েন্দাকে তারা হলেন সুধাময় ও ম্যাক। হাসির গল্পকার হিমনীশ গোস্বামী হাস্যরস সহযোগে গোয়েন্দা গল্প লিখেছেন। হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায় সৃষ্টি করলেন গোয়েন্দা পারিজাত বক্সীকে। এই পারিজাত বক্সী কল্পিত হয়েছে ব্যোমকেশ বক্সীর ভাইপো হিসাবে। অন্যদিকে পূর্ণেন্দু পত্রী তাঁর গল্পে গোয়েন্দা চরিত্র হিসাবে আনলেন ব্যোমকেশের পুত্র জুনিয়র ব্যোমকেশকে। শেখর বসু অল্প বয়সী গোয়েন্দা চিন্ময়কে সৃষ্টি করলেন। অন্যদিকে ‘কিশোর ভারতী’ পত্রিকায় দিলীপকুমার চট্টোপাধ্যায় নিয়ে এলেন ব্ল্যাক ‘ডায়মন্ড’ সিরিজ। পাশাপাশি কিশোরদের জন্যই ডিটেকটিভ গল্পের সিরিজ এনেছেন ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়। এই প্রসঙ্গে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ভাদুড়ী মশাইকে বাদ দেওয়া যায় না। ষাটের দশকে উপেন্দ্র কিশোর রায়ের নাতনী নলিনী দাস বাংলা সাহিত্যে আনলেন মেয়ে গোয়েন্দার দল ‘গন্ডালু’। আধুনিক সময় পর্বে সুচিত্রা ভট্টাচার্যের হাত ধরে এলেন মিতিন মাসি। হয়ে উঠলেন বাংলা সাহিত্যের নামকরা গোয়েন্দা। এরপর অদ্রীশ বর্ধনের ‘নারায়ণী’, প্রদীপ্ত রায়ের ‘জগাপিসি’, মলয় রায়চৌধুরীর ‘রিমা খান’ এবং সম্প্রতি সময়ে দেবারতি মুখোপাধ্যায় আনলেন ‘রুদ্রাণী’সোমজা দাস টাপুরদি। হাল আমলে সুজন দাশগুপ্তর ‘একেন বাবু’ খুবই জনপ্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র।

টানটান উত্তেজনায় ভরা এই রহস্য রোমাঞ্চের গোয়েন্দা গল্পের সাথে অন্যান্য গল্পের মূল পার্থক্যের জায়গাটা হল বুদ্ধির খেলা। গোয়েন্দা তার বিশ্লেষণ ক্ষমতা, যুক্তিবোধ, তীক্ষ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা,ক্ষুরধার বুদ্ধি এসবের উপর ভিত্তি করে অপরাধীর সাথে বুদ্ধির প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করেন। সহজ কথায় গোয়েন্দা গল্প হল একজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ হয়ে ওঠার, তার সাফল্য লাভের গল্প। বহু শতাব্দী পূর্বে পথচলা শুরু করে আজও একইরকম জনপ্রিয়তার সঙ্গে এগিয়ে চলেছে গোয়েন্দা সাহিত্য। এই লেখার উদ্দেশ্য বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করা নয়। সে জ্ঞানও আমার নেই। ছোটবেলা থেকেই গোয়েন্দা সাহিত্য পড়তে খুব ভাল লাগে, তারই রেশ ধরে কিছু লেখক ও তাদের লেখার কথা উল্লেখ করেছি মাত্র। কালানুক্রমিক ধারাবাহিকতা হয় ত কোথাও কোথাও ক্ষুণ্ণ হয়েছে।

মধ্যরাত, ১৯ জুন, ২০২৫

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev