| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে বাংলা পড়ানো হয় না, বেঙ্গলী পড়ানো হয় : প্রজ্ঞাপারমিতা রায়

Reporter
প্রজ্ঞাপারমিতা রায় / ৭৬১ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২২

বাংলা ভাষা সম্পর্কে এরকম ভাবে লিখতে হবে, কখনো ভাবিনি। বেশ কিছু বছর বিদ্যালয়ে পঠন-পাঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছি বলে মনে হ’ল, অনেক কথাই বলার আছে। যে কথা আমরা বলতে পারি না, প্রতিদিন ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে একটা অদ্ভুত অনীহা লক্ষ্য করি, যা সত্যিই ভাবিয়ে তোলে। ইংরাজি মাধ্যমে পড়া ছাত্র-ছাত্রীরা যখন বাংলা বলে, তখন তার মধ্যে বাংলা ভাষার প্রতি তাদের যে অনাগ্রহ, তাদের যে অনিচ্ছে সেটা বড্ড বেশি প্রকাশ হয়ে পরে। সমাজ পাল্টে যাচ্ছে, শিক্ষা ব্যবস্থা পাল্টাচ্ছে, পারিপার্শিক অবস্থা পাল্টে যাচ্ছে, বদলে যাচ্ছে পারিবারিক পরিবেশ আর ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে জাতীয় শিক্ষানীতি। এই সমস্ত বিষয় অনেক গুরুগম্ভীর ব্যাপার। কিন্তু যে জিনিষটি খুব সহজেই চোখে পড়ছে তা হ’ল ‘বাংলা জানার তেমন কোনো প্রয়োজন নেই,’ ‘না জানলেও চলবে’।

বাংলা নিয়ে পড়াশুনা করেছিলাম, খুব একটা ভালবেসে, এই কথাটা বলা যাবে না, বললে মিথ্যে বলা হবে। বরং বলা যেতে পারে যে পড়তে পড়তে ভালোবেসে ফেলেছিলাম বাংলা সাহিত্যকে। পরবর্তী কালে যাকে, যেখানে বলেছি যে, আমার বিষয় বাংলা, সেই অবজ্ঞার দৃষ্টি উপহার দিয়েছে, একটা করুনা মাখা হাসিতে হেসেছে। যেন আমি এক বিরাট অপরাধ করে বসে আছি। কাকে বোঝাবো যে, বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা করলে অপরাধ হয় না। বাংলা সাহিত্যকে ভালোবাসলে, ভালোবাসা ছোটো হয়ে যায় না।

আমার এক পরিচিত — যিনি সেই কোন্ ছোটোবেলা থেকে আমায় অত্যন্ত স্নেহ করতেন, ভালোবাসতেন — যেদিন শুনেছিলেন, আমি বাংলায় অনার্স নিয়ে শান্তিনিকেতনে ভর্তি হয়েছি, সেদিন বাড়ীর সকলের সামনে বলে দিয়েছিলেন — “তোর বাবা তোকে একদম পছন্দ করে না, তোকে দেখতে পারে না, তাই তোকে সব ছেড়ে বাংলা পড়াচ্ছে। ছিঃ ছিঃ, আর বিষয় ছিল না?” সেই দিনটি আমার জীবনের এমন একটি দিন, যার কথা কোনোদিনই ভুলতে পারিনি আমি। তার পর অনার্স পড়াকালীন সময়ে তার সঙ্গে আমার কয়েকবার দেখা হয়েছিল, তিনি প্রতিবার দেখা হবার সময় একটি করে মন্তব্য করেছিলেন — অন্য কথা বলার আগে। সেইগুলি আমায় আজও আঘাত করে, কষ্ট দেয়। যেমন — “কিছুই তো করতে পারবি না জীবনে।” “তোর দ্বারা তেমন কিছু হবে না।” “কি করবি বাংলা পড়ে?” “কবিতা লিখলি?” “চেহারাটা তো ভালোই, শেষে বাংলা? কি হবে?”

আমি আজও বুঝে উঠতে পারিনি, চেহারার সঙ্গে বাংলা পড়া আর না পড়ার কি সম্পর্ক? বাংলা ভাষা তো শুধু আমার নয়, সকলেরই মনের প্রাণের ভাষা। না হয়, জীবনে কিছু নাই বা হলাম, তাতেই বা কি? আমি বাঙালি, বাংলা আমার মাতৃভাষা, এই ভাষায় আমি কথা বলি, এই টুকুই কি যথেষ্ট নয়? কিছুই না হতে পারাটাও একটা পারা। সবাই তো সব সময় অসাধারণ হতে চাইছে, না হয় নাই বা হলাম অসাধারণ। সাধারণ হয়ে ভালোই তো আছি। মোটামুটিভাবে জীবনে বেঁচে থাকার জন্যে যা যা প্রয়োজন তা তো পেয়েছি। অপ্রয়োজনের যে প্রয়োজন, তা না হয় বাদ দিলাম।

অবমাননা সহ্য করেও বাংলা ভাষা তার নিজস্ব জায়গায় যে আজও সুপ্রতিষ্ঠিত আছে সেটা তো মানতেই হবে। যদিও এটাও সত্যি, যারা এই ধরণের মন্তব্য করেন বা করি বাংলা ভাষা নিয়ে, সেই আমরা নিজেরাও কি আমাদের মাতৃভাষা ঠিক করে বলতে, বুঝতে, লিখতে এবং পড়তে পারি? এটাও তো ভাবতে হবে। একটা ভাষা জানা মানে তাকে সম্পূর্ণ আয়ত্ব করা, সেই ক্ষমতা কি সবার আছে? নেই তো। তাহলে, যারা এই ভাষা খুব অল্প হলেও জানা বা বোঝার চেষ্টা করছে, করে চলেছে — তাদেরকে না হয় একটু ভালো চোখেই দেখলাম। কি আর ক্ষতি? তুমি হিন্দি জান, কেউ ইংরেজি জানে, কেউ সাঁওতালি ভাষা জানে, আমি বাংলা জানি। এতে তো কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। সমস্ত ভাষার প্রতিই আমাদের শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিৎ। আর সেটা মনে প্রাণে হতে হবে। এ নয় যে, মুখে বললাম, আর অন্য কারো সঙ্গে কথা বলার সময় একটু হাসাহাসি করে নিলাম। বাংলা ভাষা কোনোভাবেই হেয় করবার নয়, একথা আমাদের মনে রাখা দরকার। আমাদের সকলেরই পরবর্তী প্রজন্মকে বুঝিয়ে দেওয়া কর্তব্য যে, নিজের ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান এবং গর্ববোধ থাকা উচিৎ এবং স্বাভাবিক। তারা যেন বাংলার থেকে ইংরেজি বলতে পারে ভালো, লিখতে পারে ভালো — এই নিয়ে অহংকারটা না করে। একটা জিনিষ আমরা ভুলে যাই, পৃথিবীর যে কোনো দেশের মানুষ যখন তার মাতৃভাষায় কথা বলে, তখন কিন্তু তাকে কেউ অসম্মান করে না। বড় বড় রাষ্ট্র নেতারাও যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেন তখন সবাই চুপ করে শোনেন, সেই ভাষা সে বুঝুক আর না বুঝুক — অন্যের ভাষার প্রতি তাদের সম্মানটা ঠিক রাখেন। তাহলে আমাদের মধ্যে “বাংলা টা তো লিখতে পারি না, বা ভালো বলতে পারি না” — এই কথাগুলো কি গর্বের সঙ্গে বলা উচিৎ? আমাদের কি এটা মনে হওয়া উচিৎ না যে, “বাংলা আমার মায়ের ভাষা, তাকে না জানাটা ঠিক নয় মোটেই।” “মাকে জানি না — ঠিক মতো চিনি না, বুঝিও না সেভাবে” — এই ভাবনাটা কিন্তু খুব অহংকার করার মতো বিষয় নয়।

ইংরাজি মাধ্যমে পড়াশুনা করলেই খুব বড় হওয়া যায়, ভালো মানুষ হওয়া যায় — এই ধারণাটা তো আমরাই আমাদের সন্তান বা পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে গেঁথে দিয়েছি।

সারা বিশ্বে বহু বড় বড় মানুষ আছেন — যাদের নাম আমরা সবাই জানি, তারা সবাই নিজের মাতৃ ভাষাকে না জেনেই বড় হয়ে গেছেন এমন তো না ! চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, চিত্রকর, রাষ্ট্রনেতা, খেলোয়াড়, সামাজিক নেতা যাদের আমরা একডাকে জানি এবং চিনি, তাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো খুব ভালো করে ইংরাজি বলতে পারেন না, কিন্তু তাতে করে তার বড় হওয়াটা বাধা হয়ে যায়নি। আর সারা বিশ্বে তার পরিচিতির ক্ষেত্রেও কোথাও কোনো অসুবিধা হয়নি। আজকাল যে সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীরা ইংরাজি মাধ্যমে পড়াশুনা করছে তাদের প্রতি আমার কোনো রাগ নেই, তাদেরকে আঘাতও করছি না — শুধু একটা কথাই বলতে চাই তাদের — তোমাদের সঙ্গে সঙ্গে যারা বাংলা মাধ্যম স্কুলে পড়ছে তাদের দিকে অবহেলার চোখে তাকিও না।

আর একটা কথা, একটা ভাষাকে জানা মানে তার ব্যাকরণগত দিকটিও জানা। একটি ভাষাকে সম্পূর্ণ ভালোভাবে জানলে অন্য অনেক ভাষাই জানা বা বোঝার ক্ষেত্রে সুবিধা হয় অনেক বেশি। তাই সকলের কাছেই অনুরোধ এই ভাষা সম্পর্কে আরও অনেক যত্নশীল দৃষ্টিভঙ্গী রাখো। ইংরাজি ভাষার প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা এবং সম্মান রেখেই বলছি, একথা যে, বাংলা ভাষা এবং সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা করার সময় অনেক বিদেশী লেখকের রচনাও পড়েছি ইংরাজিতে। তাতে প্রথম প্রথম হয়তো সবটা বুঝে উঠতে পারতাম না — কিন্তু পরে আর কোনো অসুবিধা তো হয়নি। বরং ভালো লাগতো এটা সত্যি। এটা তো মানতেই হবে — প্রতিটি ভাষার আছে তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। যা কি না তাকে অন্যের থেকে আলাদা করে রাখে। আমাদের বাংলা ভাষারও এমন অনেক বৈশিষ্ট্য আছে, যাকে না ভালোবেসে আমরা থাকতে পারিনা, আমিও পারিনি। সেই বোধটি যেন সকলের মধ্যেই থাকে। যেমনভাবে ছোটোদের ইংরাজির উপর জোর দিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে হয় – তেমনিভাবে সে যেন বাংলাটাও নিজের অধিকার থেকে পড়ে এবং পড়তে ভালোবাসে। সেই চেষ্টাটা আমাদের করে যেতে হবে। যেহেতু ভাষা আমাদের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে বহন করে নিয়ে চলেছে বছরের পর বছর, প্রজন্মের পর প্রজন্ম অন্য অনেক কিছুর মতো। তাই আমাদের তো একটা দায়িত্ব এবং কর্তব্য রয়েই গেছে এই ভাষার প্রতি।

বাংলার মতো মিষ্টি ভাষা আর ক’টা আছে? এত সমৃদ্ধশালী যে ভাষা — তার প্রতি আমাদের তো নজর দিতেই হবে। সন্তানকে যখন লালন-পালন করছি আমরা, তার সমস্ত প্রয়োজন যখন আমরা সাধ্যমতো মেটাবার চেষ্টা করি, তাহলে ভাষাটার ক্ষেত্রেও একটু যত্ন নিতে পারি না কি? আমার সন্তানকে না হয় বাংলাটাও একটু ভালোভাবে শেখাবার চেষ্টা করি। ভাষাও তো আমার মা। মাকে যদি একটু যত্ন করতে শেখাই আমার সন্তানকে — তাতে কিন্তু কোথাও কোনো বাধা নেই, ক্ষতি নেই। আছে এক নীরব প্রতিশ্রুতি। আছে এক অকুণ্ঠ ভালোবাসা। একবার যদি মনে মনে ভাবি — এ ভাষা আমার — শুধু আমার — একে আমি কিছুতেই ছাড়বো না। তাহলেই তো মিটে যায় অনেক সমস্যা। সারা পৃথিবী কিন্তু আমাদের বিচরণ ক্ষেত্র তাই না? কোনো দেশের মানুষই কি এটা খুব সম্মানের চোখে দেখে? আমি যদি বলি, আমি আমার মাতৃ ভাষাটা ভালোভাবে বলতে এবং লিখতে পারি না, পড়তেও তেমন জানি না, তাহলে কি খুব গর্ব অনুভব হয়? বাইরে হলেও ভিতরে কিন্তু হয় না। বাইরে কিন্তু সবসময় দেখাচ্ছি যে, বাংলা না জেনে আমি খুবই গর্বিত। মনে রাখা উচিত, এই সন্তান কিন্তু কোনো এক সময় বলতেই পারে — “মা, আমাকে একটু বাংলাটা শেখাতে পারতে।” সেদিন তো কোনো উত্তর দিতে পারবো না। কোনো না কোনো দিন তার একথা মনে হতেই পারে নিজের মাতৃভাষা একটু শিখলে ভালো হতো। আমরা কেন তবে, যখন সুযোগ থাকে তখন এটা নিয়ে ভাবি বা ভাববো না?

পৃথিবীতে তো বহু বিজ্ঞানী, বহু চিকিৎসক আগেও ছিলেন, এখনও আছেন — যারা বাঙালি, তাদের কথাই বলছি, সেই মানুষগুলি তো বাংলা ভাষায় বহু লেখা লিখে গিয়েছেন। অথচ সারা পৃথিবী তাদের চেনে এবং জানে। ইংরাজি ভাষার সঙ্গে তো আমাদের কোথাও কোনো বিরোধ নেই। নিশ্চয়ই শিখবো ইংরাজি, কিন্তু তার জন্য বাংলা ভাষা না জানার কোনো প্রয়োজন নেই একা কেন? বাংলাকে অবহেলা করে ইংরাজি শিখতে হবে, এটা তো ঠিক নয়।

ছাত্র জীবন তো মাত্র কয়েকটি বছরের। অভিভাবকদের কাছে বিনিত অনুরোধ, এই প্রস্তুতির সময়, বাংলা ভাষার সম্পদগুলির সঙ্গে একটু না হয় পরিচয় করিয়ে দিলেন। যে বোধ, যে ভালোবাসা তৈরী হবে, তাতে আমাদের এই ছাত্র-ছাত্রীরা তো উপকার পাবেই, আর কে না জানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভাবধারা বহতা নদীর মতো। তাই আজকের শিক্ষা কালকেও থেকে যাবে। খুব কষ্ট হয় যখন দেখি, (অনলাইন ক্লাসের কথা বলছি) প্রশ্নঃ ‘অপুর দিদির নাম কি’?

Ans. Apur didir nam Durga.

আমরা কিন্তু এমন উত্তরে নম্বর কাটতে পারছি না। জানি ছাত্র-ছাত্রীদের কষ্ট হচ্ছে, বাংলা লিখতে, তাই সহনীয় হতেই হয়। ছাত্র-ছাত্রীদের বলতেও পারছি না, যদি মোবাইলে সব শিক্ষা গ্রহণ করতে পারো, তবে বাংলা কিবোর্ড বেছে নিয়ে শিখে নিতে পারছো না কেন? জানি অনলাইন ক্লাসের অনেক সুবিধা, অসুবিধা আছে। বলা ভালো সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই বেশি। তবু … সারাদিন কিন্তু ছাত্র-ছাত্রীরা অনেক কাজই করে চলেছে। কিন্তু বাংলা লিখতে তাদের ভালো লাগে না।

জানি, ‘বাংলা ভাষার অনেক সমস্যা’, ‘কিছুদিন পর তো বাংলা ভাষা উঠেই যাবে’।—এই সব বড় তর্কে নাই বা গেলাম, চেষ্টা করতে দোষ কোথায়?

দেখছি তো প্রতিদিন যেভাবে ইংরাজি মাধ্যম স্কুলগুলিতে পড়া হচ্ছে তাতে না হচ্ছে ভালো করে ইংরেজি শেখা, না বাংলা, না হিন্দি। অন্ততঃ পক্ষে একেকটি শ্রেণীতে চার/পাঁচজন বাংলা ভাষী ছাত্র-ছাত্রী হিন্দিকেই তাদের দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে পড়ে। বাংলা তাদের তৃতীয় ভাষা।

কোনোরকমে কাজ করছেন বাংলা শিক্ষক-শিক্ষিকারা। একজন শিক্ষিকা আর একজনকে বলছেন, ‘তোমাকে একটা জিনিস Ask করতে পারি’? তিনি উত্তর দিচ্ছেন, ‘Ofcourse, Ask করো’ বাংলা ভাষা নিয়ে যারা এত কাজ করে চলেছেন অক্লান্তভাবে, তাদের কি কষ্ট হচ্ছে না? প্রতিটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে কিন্তু বাংলা পড়ানো হয় না, বেঙ্গলী পড়ানো হয়। আর ছাত্র-ছাত্রীরাও বলে ‘বেঙ্গলী ম্যাম’। একটু অবহেলার দৃষ্টি সবাই বাংলা শিক্ষক-শিক্ষিকাকে উপহার দিয়ে থাকেন, বহু বছর ধরে বেসরকারি বিদ্যালয়ে পড়িয়ে এই জিনিসটি বুঝেছি—কিছু বলার নেই। মেনে তো নিতেই হবে। আমি বা আমার মতো যারা বাংলা ভাষার শিক্ষক এবং শিক্ষিকা তাদের তো এরই মধ্যে কাজ করতে হবে, রুজি-রোজগার করতে হবে। জীবন অতিবাহিত করতে হবে।

মাতৃ ভাষার সঙ্গে শৈশবের একটি গভীর সম্পর্ক আছে। পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশে শিশুরা নিজের মাতৃ ভাষাকে সঠিক ভাবে বলতে, পড়তে এবং লিখতে শেখে, সেই সময় আমরা অভিভাবকেরা আরো একটু সচেতন হলে প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রীকে সঠিক মাতৃ ভাষা শেখাতে পারবো। শৈশব থেকে এই ভাষার চর্চার মাধ্যমে প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রীকে সহজ, সাবলীল ভাবে নিজের অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ করার একটি সুযোগ দিতে পারবো। চিন্তা করলে বোঝা যায় যে, ছোট বেলা থেকে মাতৃ ভাষার সঙ্গে একটি নিবিড় যোগাযোগ থাকার ফলে ছাত্র-ছাত্রীরা অনেক স্পষ্ট পরিষ্কার ভাবে নিজের বক্তব্য রাখতে পারে।

রবীন্দ্রনাথ এই বিষয়টি সম্পর্কে একটি কথা বলেছেন, যা আজকে না বলে পারছি না। “…..চারদিকের আবহাওয়া থেকে এ বিদ্যা বিচ্ছিন্ন ; আমাদের ঘর আর ইস্কুলের মধ্যে ট্রাম চলে, মন চলে না। ইস্কুলের বাইরে পড়ে আছে আমাদের দেশ……শিক্ষার সঙ্গে দেশের মানুষের মনের সহজ মিলন ঘটাবার আয়োজন আজ পর্যন্ত হল না। যেন কনে রইলো বাপের বাড়ীর অন্তঃপুরে ; শ্বশুর বাড়ী নদীর ওপারে বালির চর পেড়িয়ে। খেয়া-নৌকাটা গেল কোথায়?”

অনেকে এখনও মনে করেন যে, শিক্ষা দানের মাধ্যম হওয়ার জন্যে বাংলা ভাষার যে শক্তি এবং ঐশ্বর্য থাকা প্রয়োজন, তা নেই। সরকারি স্তরে আমরা দেখতে পাই, বাংলা ভাষাকে তেমন মর্যাদা দেওয়া হয় না। জানি না কেন হয় না। প্রয়োগের ক্ষেত্রে পরিভাষার অভাব আছে বলে অনেকে বলেন। তবে আমরা এ কথাও জানি যে কিছু দেশে মাতৃ ভাষার মাধ্যমেই শিক্ষা দান করা হয়। তাতে তাদের তেমন কোনো অসুবিধা হয় না। যদি আমরা আমাদের উদ্দেশ্য এবং উপায়, দুটি মিলিয়ে চিন্তা করি, তাহলে কি একটি সামঞ্জস্য বিধান করা যায় না?

সুবিধে অসুবিধে তো থাকবেই, তবুও তার মধ্যে চেষ্টা করলে অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করা যায় না কি? যে কোনো ভাষাকে সব দিক থেকে, সঠিক ভাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে যদি তুলে ধরা যায়, তাহলে আশা করি অনেক রকম সমস্যার সমাধান হতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev