| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বাঙালি জাতিসত্তা : দীপঙ্কর দে

Reporter
দীপঙ্কর দে / ৩৩৩৮ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২০

বিষয়টা বেশ জটিল। প্রথম প্রশ্ন ‘বাঙালি’ কে বা কারা? গুগুল দাদা জানাচ্ছে এই ভারত রাষ্ট্রে পঞ্জিকৃত জাতির সংখ্যা প্রায় তিন হাজার আর উপজাতির সংখ্যা পঁচিশ হাজার! এতো জাতি আর উপজাতির দেশে বাঙালি কে? বাঙালির সংজ্ঞা নির্ধারণ হবে কি উপায়ে? পরবর্তী প্রশ্ন জাতি গঠনের ভিত্তি কি হবে? জিন, ভাষা, না ধর্ম? সংজ্ঞা কি কোনো ভৌগোলিক সীমা নির্ভর?

এই আলোচনার খাতিরে আমরা প্রস্তাব করছি—

১) ‘বাঙালি’ বলতে আমরা সেই সব নাগরিকদের বুঝবো যারা (ক) পশ্চিম বঙ্গ নামে পরিচিত একটি ভূখণ্ডে বাস করেন, (খ)  বিদেশে ও  ভিন রাজ্যে বাস করলেও যাদের মাতৃভাষা বাংলা। (গ) পশ্চিম বঙ্গে বাস করেও যারা বাংলা বা বাঙালির প্রতি বিদ্বেষ বা অশ্রদ্ধা প্রকাশ করেন তারা ‘বাঙালি’ নন।

২) এই আলোচনা ভারতে বসবাস করা বাঙালির জাতিসত্তা বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে।

জাতিসত্তা ও জাতিবাদ :

বাঙালি জাতির সংজ্ঞা না হয় একটা হলো এবার প্রশ্ন হচ্ছে জাতিসত্তা মানে কি? জাতিবাদ আর জাতি সত্তার তফাৎ কোথায়? এটা আরো জটিল প্রশ্ন। সঠিক সংজ্ঞা নির্ধারণ করা মুশকিল। বাংলায় ‘জাতিসত্তা বিকাশের অসম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার’ কথা অধ্যাপক সুনীতি ঘোষ তাঁর ‘বাংলা ভাগের রাজনীতি ও অর্থনীতি’ পুস্তকে একাধিকবার উল্লেখ করেছেন কিন্তু সেখানেও তিনি বাঙালি জাতি সত্তার কোনো, নিদৃষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ করে যান নি। তাই আলোচনার সুবিধার্থে আমরা জাতিসত্তার একটা সংজ্ঞা এখানে প্রস্তাব করবো।

জাতিসত্তা মানে কোনো জাতির আত্মপরিচয়। এই আত্মপরিচয় গড়ে ওঠে  একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। একদিনে হয় না। সময় লাগে। জাতিসত্তা বিকাশের প্রক্রিয়া একটা দীর্ঘকালীন অনুশীলন, শিকড়ের অনুসন্ধান ও আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। বিকশিত জাতিসত্তা অন্য জাতিকে সম্মান করে ও তাদের সত্তার বিকাশে সাহায্য করে। বিকশিত বাঙালি জাতিসত্তা একজন বাঙালিকে গর্বিত করবে, নিজের আত্মপরিচয়ের অধিকার সম্মন্ধে নিজেকে সচেতন করবে, জাতি স্বার্থের পরিপন্থী যেকোনো পদক্ষেপের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। কিন্তু জাতিসত্তা জাতিবাদী হয়ে ওঠে যখন জাতি নিজেকে অন্যদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ মনে করে ও অন্য জাতির বিকাশে অন্তরায় হয়ে ওঠে। জাতিসত্তা জাতির অধিকার রক্ষার কথা বলে, জাতিবাদ অন্যের অধিকার খর্বের কথা বলে। জাতিবাদ আগ্রাসী।  জাতিবাদ জাতি দাঙ্গার জন্ম দেয়। বিদ্বেষ ছড়ায়।

বিগত ক দশকে আসামে আহোম ও বর্নহিন্দু অসমীয়া জাতিবাদী লড়াইয়ের শিকার অসহায় বাঙালি। এতে আহোম, অসমীয়া বা বাঙালি কোনো পক্ষেরই কোনো উপকার হয়নি। আখেরে সবারই ক্ষতি হয়েছে।

বাঙালি জাতি সত্তার অসম্পূর্ণ বিকাশ

শুরুতেই আমরা দেখেছি ‘ভারতবর্ষ’ একটি জাতি নয় বহুজাতির বাসভূমি। ব্রিটিশ শাসন শুরু হওয়ার আগেই ভারতে বিভিন্ন জাতিসত্তা যেমন তামিল, তেলেগু, বাঙালি, মারাঠি, গুজরাটি ইত্যাদি প্রত্যেকে তাদের নিজস্ব অঞ্চলে, নিজস্ব জনতত্ত্বগত (ethnic) বৈশিষ্ট্যে, নিজস্ব ভাষায়, নিজস্ব জীবন চর্চায়, নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে এবং ঐক্যবোধ নিয়ে গড়ে উঠছিল। জাতি গঠনের যে ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া ভারতে চলছিল, তা ব্রিটিশ আমলে ব্যাহত হয়। এক জাতিসত্তার ফলে মানুষের মধ্যে যাতে জাতীয়তাবোধ না জন্মায় সেটাই ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নীতি। এবং এই উদ্দেশ্যেই ১৯০৫ সালে বাংলাকে ভাগ করা হয়েছিল।

স্বাধীনতার পর ভারতের শাসকশ্রেনি চেয়েছে এক কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র। তারা চেয়েছে(এবং এখনও চাইছে) একটি শক্তিশালী কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন জাতিসত্তাকে শাসন, দমন ও শোষণ করতে। তাই ‘নিখিল ভারতীয় জাতীয়তাবাদ’ তত্বকে হাতিয়ার করে ১৯৫০-এর সংবিধান অনুযায়ী ভারতরাষ্ট্র আজ বিভিন্ন জাতিসত্তার সংমিশ্রণ। সুনীতি ঘোষ বলেন ‘বিভিন্ন জাতিসত্তার কারাগার’!

যখন জাতীয় উন্নয়নের দোহাই দিয়ে ১৯৫২ সাল থেকে বাংলা, বিহারের খনিজ সম্পদ নির্বিচারে স্থানান্তরিত হচ্ছিল, সেই দশকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ও পূর্ব পাকিস্তানের (অধুনা বাংলাদেশ) রাজনীতিতে প্রাদেশিক ও জাতিসত্তার উন্মেষ ঘটেছে। যেমন- মহারাষ্ট্রের মারাঠিদের ‘সংযুক্ত মহারাষ্ট্র আন্দোলন’ (১৯৫৬), গুজরাটিদের ‘মহাগুজরাট আন্দোলন’ (১৯৫৬), তামিলদের ‘দ্রাবিড় জাতিসত্তার আন্দোলন’, প্রথম ভাষাভিত্তিক (তেলুগু) রাজ্য অন্ধ্রপ্রদেশ প্রতিষ্ঠা (১৯৫৬), পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাভাষার স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলন (১৯৫২)।

আজ স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, উপরিউক্ত প্রতিটি অঞ্চলই পশ্চিমবঙ্গকে আর্থিক ক্ষেত্রে পিছনে ফেলে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে। বাঙালি জাতিসত্তা গঠনের আন্দোলনকে অস্বীকার ও অবহেলা করাই পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড়ো ব্যর্থতা।

পশ্চিমবঙ্গ  ছাড়া গত ছয় দশকে ভারতের প্রায় সব প্রান্তে (যেমন মহারাষ্ট্র, গুজরাট, তামিলনাড়ু, অন্ধ্র, পাঞ্জাব, নাগাল্যান্ড, তেলেঙ্গানা) এই একমাত্রিক ‘নিখিল ভারতীয় জাতীয়তাবাদ’ তত্ত্বের বিরুদ্ধে নিজ জাতিসত্তা, জনতত্ত্বগত বৈশিষ্ট্য, নিজস্ব ভাষা, জীবন চর্চা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠার আন্দোলন হয়েছে। কন্যাকুমারীতে বিবেকানন্দ শিলার পাশেই তামিল কবি থিরুক্কুরাল-এর ১৩৩ ফুট মর্মর মূর্তি প্রতিষ্ঠা বা হালে গুজরাটে বল্লবভাই প্যাটেলের ২০০ ফুট উঁচু মূর্তি প্রতিষ্ঠা জাতিগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষারই এক প্রয়াস।

ভাষা ও জাতিগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠার ভারতব্যাপী এই প্রক্রিয়ার বাইরে থেকেছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।  পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রাদেশিক, সর্বভারতীয় না আন্তর্জাতিক (‘চিনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান’) কোন ‘আইডেনটিটি’ আঁকড়ে ধরবে সেটাই ঠিক করতে পারেনি গত ছয় দশকে। কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ‘বিমাতৃসুলভ আচরণের’ অভিযোগ দেওয়াল লিখন আর ময়দানী ভাষণেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। জাতিসত্তা গঠনের অসম্পূর্ণ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ করতে এগিয়ে আসেনি পশ্চিমবঙ্গের কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বই।

নিজস্ব ভাষা, গৌরবময় সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস ও ঐতিহ্যপূর্ণ কৃষ্টির প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে ও সম্মান দেখাতে পারেনি বলেই আজও বাংলার হাজার হাজার স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে একটিও উপযুক্ত স্মারকস্তম্ভ গড়ে তুলতে পারল না বাংলার কোনো সরকার। ‘বিনয়-বাদল-দীনেশ বাগ’ পরিণত হলো বাস টার্মিনাসে। ‘শহিদ মিনার’ বলে বর্ণিত ধর্মতলায় যে স্তম্ভটি দন্ডায়মান সেটি আসলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিজয় স্মারক। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মেজর জেনারেল স্যার ডেভিড অক্টারলোনি (David Orchterlony) মারাঠা ও গোর্খাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ের স্মারক হিসেবে ১৮২৮ সালে নির্মাণ করেছিলেন মিনারটি। তারপর ৯ আগষ্ট ১৯৬৯ সালে তৎকালীন রাজ্য সরকার এই সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ মিনারের গায়ে একটি বিজ্ঞপ্তি সেঁটে নাম পালটে লিখলেন ‘শহিদ মিনার’- ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে শহিদদের উদ্দেশে…। পরে বামফ্রন্টের এক মন্ত্রী লাল রঙে রাঙাতে চেয়েছিলেন এই মিনার! এই হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক নেতৃত্বের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর নমুনা। ব্রিটিশ শাসনকালে বাংলায় ১৭৭০ সালে(১১৭৬ বঙ্গাব্দে) ও ১৯৪৩ সালে(১৩৫০ বঙ্গাব্দে) বিদেশি শাসক সৃষ্ট ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে ১ কোটি ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ ‘শহিদ’ হয়েছেন। তাদের কথাও কেউ মনে রাখেনি।

করনীয় কী?

যে জাতি তার ভাষা, জনতত্ত্বগত বৈশিষ্ট্য ও নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সম্মান জানাতে কুন্ঠিত হয়, সে জাতির ভবিষ্যৎ কখনই গৌরবের হয় না। হতে পারে না। সে না পারে নিজেকে সম্মান করতে না পারে অন্যের সম্মান রাখতে। পশ্চিমবঙ্গের হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনার পূর্ব শর্তই হচ্ছে অতীতকে ফিরে দেখা- নিজেদের হৃত সম্মান ফিরে পাওয়া।

আজ থেকে বছর পাঁচেক আগে (জুন ২০১৫) বাংলার মুখ্যমন্ত্রী একটি সাক্ষাৎকারে ঘোষণা করেছিলেন ‘বাংলার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনাই তাঁর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ’! আমাদের মনে হয়, বাংলার হারানো গৌরব ফিরে পেতে গেলে সবার আগে প্রয়োজন জাতিসত্তা গঠনের অসম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার পুনর্জাগরণ। বাংলার ঐতিহ্য, লুপ্তপ্রায় হস্তশিল্প ও সর্বোপরি স্বাধীনতা আন্দোলনের গৌরবময় অধ্যায়কে এই প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে। যেমন—

ক) কলকাতার উপকন্ঠে কিছু বিশ্বমানের স্মৃতি সৌধ নির্মান করে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর মাধ্যমে শুরু হোক জাতিসত্তা গঠনের প্রথম পদক্ষেপ। ওই স্মৃতি সৌধের মধ্যে দুর্ভিক্ষে শহিদদের উদ্দেশেও নির্মিত হোক একটি স্বতন্ত্র স্তম্ভ।

খ) শুধু স্মৃতিসৌধ নির্মানই যথেষ্ট নয়। স্মৃতিসৌধের পাশেই নির্মান হোক এক আধুনিক সংগ্রহশালা যেখানে প্রত্যেক স্বাধীনতা সংগ্রামীর নাম, ছবি ও তাঁদের আত্মত্যাগের কথা লিপিবদ্ধ থাকবে সাধারণ দর্শক ও ছাত্রছাত্রীদের জন্যে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার গৌরবময় ভূমিকা সবার জানা উচিত। সবাইকে জানানো উচিত।

গ) বাংলার মুক্তি দিবস পালিত হোক ১৭ ডিসেম্বর; পূর্ববঙ্গ স্বাধীনতার লড়াই করেছে দু’বার। একবার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। দ্বিতীয়বার পাকিস্তানী শাসকের বিরুদ্ধে। দ্বিতীয় স্বাধীনতার লড়াই ছিল তার জাতিসত্তার লড়াই। সে দেশের নতুন স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ। বাংলাদেশের জনগণ আরও একটি দিন গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে- ২১ ফেব্রুয়ারি যা এখন আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস বলে সারা বিশ্বে সম্মানিত। ভারতের স্বাধীনতা দিবস (১৫ অগস্ট) আসলে বাঙালি ও পাঞ্জাবি জাতি গোষ্ঠীর কাছে এক অভিশপ্ত  দিবস। স্বজন হারানোর দিন। ভাগ হওয়ার দিন। অঙ্গচ্ছেদের দিন। এ রাজ্যে ভাষা শহিদ নেই। কিন্তু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রথম স্বাধীনতা ঘোষণা হয়েছিল এই রাজ্যেই। ১৯৪২ সালের ১৭ ডিসেম্বর বিপ্লবী সতীশ সামন্তের নেতৃত্বে ‘তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার’ (Tamralipta National Government) গঠিত হয়েছিল ইতিহাস প্রসিদ্ধ তাম্রলিপ্ত (অধুনা তমলুক) বন্দরের পাশেই। তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার ১৯৪৪-এর সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত মুক্ত ছিল। আমাদের প্রস্তাব ১৭ ডিসেম্বর এ রাজ্যে ‘মুক্তি দিবস’ হিসেবে পালিত হোক। প্রস্তাবিত স্মৃতিসৌধ নির্মিত হোক তমলুক ও কলকাতার মাঝামাঝি কোনো এক স্থানে। রাজ্য সরকার ঘোষিত যাবতীয় পুরস্কার প্রদান হোক ওই ১৭ ডিসেম্বর ‘মুক্তি’ দিবসে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ১ মে দিনটি মারাঠিরা ‘মহারাষ্ট্র দিবস’ হিসেবে মহাসমারোহে পালন করে। ওই একই দিনে গুজরাটিরা পালন করে ‘গুজরাট স্থাপনা দিবস’। ১ নভেম্বর তামিলনাড়ুতে ‘তামিলনাড়ু প্রতিষ্ঠা দিবস’ পালিত হয় আর ২ জুন পালিত হয় তেলেঙ্গানা দিবস হিসেবে।

ঘ) বাংলা ভাষার ইতিহাস, যার ভিত্তিতে বাঙালি জাতির সংজ্ঞা নির্ধারণ হচ্ছে,  নতুন নানা আবিষ্কারের নিরিখে পুনঃমূল্যায়ন করা খুব জরুরি। বাংলা ভাষা ও বাঙালি যে উত্তর পশ্চিমের আর্য ভাষা সংস্কৃত থেকে স্বতন্ত্র তার সপক্ষে বৌদ্ধিক সমাজের স্বীকৃতি আদায় করা দরকার। নইলে বাংলা ভাষা হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতায় ও স্বকীয় মর্যাদা ফিরে পেতে সফল হবে না।

৩) রাজ্যের হাতে অধিক ক্ষমতার দাবি :

বাস্তবে ভারত নামক ‘দেশ’টি বহুজাতির বাসভূমি। সে অর্থে একটি ‘যুক্তরাষ্ট্র’ (Federation of States)। সংবিধান বর্ণিত ‘রাষ্ট্রসংঘ’(Union of States) নয়। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই সহজ সত্যটি অনুধাবন না করলে বাংলা ও বাঙালির হারানো গৌরব ফেরানো অসম্ভব।

বিধান রায় ও ডঃ অশোক মিত্রের পর বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা আবার কেন্দ্র রাজ্য সম্পর্ক ও রাজ্যের হাতে অধিক ক্ষমতার দাবি তুলেছেন। সারকারিয়া কমিশনের পর একমাত্র ‘আনন্দপুর সাহিব প্রস্তাবের’ কথা তিন দশক আগে শোনা গেছে। খালিস্থান আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার পর রাজ্যের হাতে অধিক ক্ষমতার দাবিও শীত ঘুমে চলে গেছে।

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতীয় যুক্ত রাষ্ট্রের কাঠামো বদলের সময় হয়েছে। আমাদের আগে ভাবতে হবে নতুন কাঠামোর বিন্যাস কেমন হবে তা নিয়ে। সে বিষয়ে আলোচনা শুরু করা দরকার।

এ প্রসঙ্গে আমাদের  তিনটি বিনীত প্রস্তাব

ক) Rajamannar Committee Report (1969) কেন্দ্র রাজ্য সম্পর্ক সংক্রান্ত একটি প্রাথমিক দলিল। আগে সেটা খুঁটিয়ে পড়া হোক। তারপর সারকারিয়া কমিশন রিপোর্ট ও আনন্দপুর সাহিব রেসলুশন পড়তে হবে। সব কিছু পড়ে একটা সংক্ষিপ্ত খসড়া প্রস্তুত হোক আলোচনার জন্য। সেটার নাম হতে পারে Bengal Resolution.

খ) কেন্দ্র রাজ্য সু সম্পর্কে সবচেয়ে বড় অন্তরায় Concurrent list ..  যত দিন যাচ্ছে state list (রাজ্য তালিকা) কেটে ছোট করে ভারত রাষ্ট্র Concurrent List লম্বা করছে। ফলে রাজ্যগুলি দিন দিন ক্ষমতা হারাতে হারাতে নিধিরাম সর্দারে পরিণত হচ্ছে। অবিলম্বে তা বন্ধ হওয়া দরকার। দাবি উঠুক Concurrent list বাতিল করে সে লিস্টের যাবতীয় কার্যকলাপ রাজ্যের আওতায় (স্টেট লিস্ট এ) আনতে হবে।

গ) লবন উৎপাদন আজও সম্পুর্ন ভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন। লবনকে কেন্দ্র তালিকা থেকে রাজ্য তালিকায় আনতে হবে। বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশে এটি একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী দাবি।

মনে রাখা প্রয়োজন ভারত রাষ্ট্রের বর্তমান কাঠামোটি দেশের বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর কাছে একটি দমবন্ধ করা কারাগারের মত। জাতিসত্তার সার্বিক বিকাশের প্রয়োজনে একটি নতুন কাঠামো খুব জরুরি যেখানে সবাই শ্বাস নিতে পারবে ও জাতিসত্তার বিকাশ ঘটবে।

আপনার মতামত লিখুন :

3 responses to “বাঙালি জাতিসত্তা : দীপঙ্কর দে”

  1. Debdas Bandyopadhyay says:

    খুবই প্রয়োজনীয় রচনা। মুখ্যমন্ত্রীর নজরে আনা দরকার।
    বাঙালী জাতিস্বত্বা আলোচনা পূর্ব বাংলাকে বাদ দিয়ে কি সম্ভব? আলোচনায় স্বাভাবিকভাবেই সেটা এসেছে।
    আমাদের কাজ অবশ্য পশ্চিম বাংলা ভিত্তি করেই হবে এবং সেটা ভারতবর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে।
    স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মরণ করে সৌধ ও জাদুঘর খুব গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতা সংগ্রামের পাশাপাশি বিজ্ঞান ও সাহিত্য শিল্পে বাংলার বিকাশের ইতিহাসও থাকা উচিৎ সেই জাদুঘরে।

  2. santanu sengupta says:

    অনবদ্য. স্পষ্ট বক্তব্য সাহসের সঙ্গে ব্যক্ত করেছেন আপনি। অনেক কিছু জানলাম

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev