সৌরপঞ্জিকামতে বিষুব রেখায় সূর্যের গমনাগমন এর প্রভাব এই ভূমে নানান প্রভাব তৈরি করে। এ জ্যোতির্বিজ্ঞানে কথা। আমাদের আদি পুরুষেরা সেই পঞ্জিকা মতে আমাদের জন্য পার্বন স্থির করে গেছেন। বাংলায় যা নববর্ষ তার বয়স খুব বেশি নয়। মোঘল আমলে ফসলি বছর হিসাবে যে পূন্যাহ ছিল তদানীন্তন বড় বাংলায়, সেই সময়টাই বাংলা নামে অঞ্চল বা দেশ পরিচিতি পাওয়ার পর নববর্ষ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। তাহলে কি নববর্ষ প্রচলনের আগে পূন্যাহ নামে পরব হতো ? তাও নয়। পুন্যাহ ছিল রাজস্ব বিষয়ক একটি প্রশাসনিক বিষয়।
দিল্লির অধীশ্বর মোঘলেরা গৌড় দখল নেয় ১৫৭৫ সালে । মসনদে আকবর। পুরো বাংলার দখল নিতে পারেনি মোঘল সেনা। ইশা খার কাছে মোঘল সৈন্য দুই দুই বার হেরে ছিল। সে গল্প ভিন্ন। তবে মোঘলেরা তাঁদের সাম্রাজ্যে যে প্রশাসনিক, সামরিক সংস্কার করেছিল তার একটা প্রভাব বাংলায় তো আজও আছে। বাংলার দায়িত্বে তখন টোডরমল মোঘলের প্রতিনিধি। প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে সুবা বাংলা বাংলাদেশ হয়। মোঘল সম্রাট ফসলি বছরের হিসাবের জন্য একটি ক্যালেন্ডার চেয়েছিলেন। সেই ক্যালেন্ডার বানিয়েছিলেন সাম্রাজ্যের প্রধান বিজ্ঞানী ফতাউল্লাহ সিরাজি। সেই ফসলি ক্যালেন্ডারের হিসাবেই এবছর ১৪২৯ বঙ্গাব্দ।

তাহলে কি বাঙ্গালী এবছর ১৪২৯ তম নববর্ষ উদযাপন করছে? না, সে রকম প্রমান পাওয়া যায় না। তবে পূন্যাহের সময়ে নানান পরব ছিল, নববর্ষ নামে কোনও পরব ছিল না। অনুমান করা হয় বাংলা নামে দেশের অধিবাসীরা যে দিন বাঙ্গালী নামে পরিচিতি পেল সে দিন একদেহি বাঙ্গালীর নিজ কৃষ্টি সংস্কৃতি, বর্ষ রয়েছে নানান চেহারায়। গুজরাতে আজও তাঁদের ফসলি বছর বা নববর্ষ আসে কার্তিক মাসে। কিন্তু দেখা যায় সৌরপঞ্জিকার কারনে এই চৈত্রের পরব বা নয়া বছর বরনের আয়োজন প্রায় কাছাকাছি বা সামঞ্জস্যপূর্ন। নানান রাজ্যে প্রায় কাছাকাছি নামেও পরিচিত। সব খানেই বিষুব বা বিষু কথাটি প্রচলিত। ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকামতে বাংলা নববর্ষ উদযাপন হয় বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরায়। এর বাইরে আসামেও হয়।

ত্রিপুরা যদি আলোচ্য তাহলে বাঙ্গালীর নববর্ষ উদযাপনের সূচি শুরু হয় পয়লা বৈশাখের দুই দিন আগে থেকে। হাড় বিশু, চৈত্র সংক্রান্তি আর নববর্ষ। এই বিশু শব্দটি এসেছে বিশুব শব্দ থেকে। দেশের আর যেখানে যেখানে এই উৎসব বা পার্বন উদযাপন হয় তার মধ্যে রয়েছে কেরল। কেরলে এর নাম বিষু।পাঞ্জাব আর হরিয়ানায় বৈশাখী, ওড়িশায় মহা বিষুব সংক্রান্তি,আসামে এই পরবের নাম বিহু আর চাকমা সমাজ বলে বিঝু।চাকমা উপজাতিদের একটি বৃহদংশের বাস ত্রিপুরা , বাংলাদেশে। এই রাজ্যে উপজাতি সমাজের একটি বড় জনগোষ্ঠী হচ্ছে ত্রিপুরি সম্প্রদায়। এরা এই সময়ে পালন করে থাকে বৈশু উৎসব। যদিও বাঙ্গালীর হাড় বিশুর দিনটি ত্রিপুরায় এতো দিন সরকারি ভাবে ছুটি গন্য হয়নি আর এই দিনেই ত্রিপুরি সমাজের বৈষু উৎসব, ত্রিপুরা সরকার এই বছর থেকে চৈত্র সংক্রান্তির দিনটিতে সরকারি ছুটি ঘোষনা করেছে বৈশু উৎসব হিসাবে।
ত্রিপুরায় বাঙ্গালীদের যেমন হাড় বিষু, চৈত পরব আর নববর্ষ, তেমনি চাকমাদের রয়েছে ফুল বিঝু, মূল বিঝু আর গাচ্যপাচ্য বিঝু। ফুল বিঝুতে তারা নদী জলাশয়ে ফুল ভাসাবেন কারো উদ্দেশ্যে। মূল বিঝুতে গাছ গাছড়ার পাতা ফল মূল দিয়ে সবজি খাওয়া হবে, এই অঞ্চলের বাঙ্গালীরা যেমন পাচন বা ঘেট রান্না করবে নানান শাক পাতা ফুল শেকড় সবজি দিয়ে। আবার আসামে যেমন সাত দিন ধরে বিহু বা রঙ্গোলি বিহু চলতে থাকবে তেমনি ত্রিপুরায় সংখ্যাগরিষ্ঠ ত্রিপুরি সমাজ চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিনে অর্থাৎ বাঙ্গালীর হাড় বিষুর দিনে হাড়ি বিষু পালন করবে। তাঁদের ভাষায় এই হাড়ি মানে অপবিত্র বা অশুচি। অর্থাৎ চৈত্রের ধোয়ামোছা বা পরিচ্ছন্নতা। বৈষু উৎসবের দ্বিতীয় দিনটি অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তির দিনটি বৈষু সেনা হিসাবে পরিচিত এই সমাজে। আর বাংলা নববর্ষের দিন থেকে শুরু হবে গড়িয়া পূজা । শেষ হবে বৈশাখের সাত তারিখে।

আদি ত্রিপুরি সমাজ মূলত জুম চাষি। এই সময়ে পাহাড়ে জুম খেতে আগুন দেওয়া হয়। জুম পোড়ানোর পর সাময়িক অবসর কালটি কাটবে উৎসবে। এর পর জুম খেতের কাজ শুরু হয় পুরোদমে, এই অঞ্চলের প্রাক বর্ষার বর্ষন তারা এ ভাবেই কাজে লাগাবেন। এই সময়টা পাহাড় মেতে উঠবে গড়িয়া নৃত্যের বিভঙ্গে আর মাদলের বা খামের শব্দ গীতে। সে দিক থেকে শুধুমাত্র ত্রিপুরি সমাজ নয় রিয়াং, জমাতিয়া সহ ত্রিপুরায় ১৯ টি উপজাতি জনগোষ্ঠীর প্রায় সবাই-ই গড়িয়া পূজায় মেতে থাকবে। বলাই বাহুল্য বছরের শেষদিনটি বাঙ্গালী সমাজ চড়ক পূজা আর মেলা দিয়ে কাটাবে। পুরো একমাস ধরে এই প্রস্তুতি ছিল। শিব গৌরীর নাচ, রাত জেগে কালী নাচ- ছোট ছোট পালার আকারে ঢাকির দল পাড়ায় পাড়ায় পালা করে বেরিয়েছে উঠানে উঠানে। ত্রিপুরার কোনও কোনও গ্রামে চড়কের মেলা চলে সাতদিন ধরে। যাত্রাপালার মঞ্চ বানানো হয়, শহর থেকে ছুটে আসে নাগরদোলা।

বাঙ্গালী যখন ধন্তেরাস, কর্বাচভ, নবরাত্রির চাপানো কালচার নিয়ে ভাবতে বসেছে তখন নিজ সংস্কৃতির অবশিষ্টটুকু আজও মাথা তুলে এই চরকের সময়ে, হাড় বিশুর দিনে বা চৈত পরবের দিনে। হয়তো এই পূজায় বংশগত পুরোহিতদের ঠাই নেই বলেই আজও এই পরব, পূজা, মেলা মাথা তুলে স্বমহিমায়, নিজ ঔদ্ধত্যে। পশুপালক সমাজের নেতা পশুপতি শিব এখানে এইট প্যাক নন। হয় অপুষ্টিতে হাড় জিরজিরে নয়তো পেটমোটা আশুতোষ। এতে ঢাকির দলের পালাগুলি টিভি শোর সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে না বটে তবে উপনিবেশিক হ্যাং ওভারের যে ভদ্রলোকেরা তথাকথিত শিক্ষিত পরিচয়ে কৃষ্টি সংস্কৃতির ঠিকাদার, তাঁদের ভদ্রবিত্ততাকে উপেক্ষা করে ছোটিলোকি জ্ঞান প্রদীপকে বাচিয়ে রাখে। আর এই ভাবেই বেঁচে থাকে আমাদের পরব, পরম্পরা।
চমৎকার একটা চৌম্বকীয় বিবরণী! অল্পকথায় পুরো নর্থইষ্ট সহ বাংলার বর্ষবরনের একটা চালচিত্র পেয়ে গেলাম। লেখককে ধন্যবাদ।
খুব জরুরি এবং তাৎপর্য পূর্ণ লেখা। আমার একটি না জানা তথ্য জিজ্ঞাসার নিরসন হল। ধন্যবাদ।